নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কেন মিছে ভাবো আমায় নিয়ে? আমি আছি আমার মতো।

ইসিয়াক

জয় বাংলা!!

ইসিয়াক › বিস্তারিত পোস্টঃ

গল্পঃ জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী

২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৭



আমাদের সেই পুরনো ভিটেটার অস্তিত্ব  এখন আর নেই। তবে বুকের গহীনে ভিটেমাটির মায়াটুকু  ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। কত স্মৃতি, কত গান, কত গল্প-কোলাহল,  মান- অভিমান ! চাইলেই কি আর  মোছা যায় না, ভোলা যায় সব? দেশ তো দে-শই। জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।


আমি জানকী। বর্তমান বাস কলকাতার হুগলি শহরের এক ছোট্ট দু'কামরার খুুপড়ি ঘরে। এই জায়গাটা  অবশ্যই আমার জন্মস্থান নয়, শ্বশুরবাড়ির এলাকা। আমার জন্মভিটা ওপার বাংলায়—পাবনা জেলার হাওলি গ্রামে।এতোদিন পর এখন আর সাং সাকিন মনে নেই ঠিক ঠাক।
তবে আমাদের গ্রামের মতো কোন গ্রাম আজও আমি চোখে দেখিনি। এত সুন্দর ছবির মতো সাজানো-গোছানো! আর কি যে মায়ায় মোড়ানো ছিল!
অনেক মিলিয়েছি অমন দৃশ্যপট আর কোথাও পাইনি।কে জানে নিজের জন্মস্থান বলে হয়তো অমন টান।
যখন আমরা দেশান্তরি হই তখন বয়স নিতান্ত অল্প  হলেও একেবারে কমও নয়।এখনও সবটা আমার চোখে ভেসে ওঠে। সাতসকালে বিছানা ছেড়ে মা ভূমি-প্রণাম শেষ করে ঘরে ধূপ জ্বালতেন তারপর নিত্যকার্য সারতেন একে একে.. বেলা বাড়লে আমরা পাঠশালায় যেতাম। পথে যেতে কত দস্যিপনা।কখনও কখনও বাড়িতে নালিশও আসতো...
আর বাবা?
আমার বাবা রামকমল দাস ছিলেন একতারা হাতে ঘুরে বাড়ানো এক বৈষ্ণব গায়ক। স্বভাবে উড়নচণ্ডী, আর পেশায় শখের কবিরাজ। দিন আনা দিন খাওয়া সংসার হলেও অভাব আমাদের সুখ কখনও কেড়ে নিতে পারেনি। কিন্তু কেন জানি  এইটুকু সুখ ঈশ্বরের সইলো না।দেশটা তো আগেই উত্তাল ছিল, সেই দেশভাগের সময় থেকে । কিন্তু আমাদের এলাকায় সেই আঁচ তেমন একটা পৌঁছাতো না।যখন সত্তরের ভোটের পর আন্দোলন শুরু হলো তারও কয়েক মাস পরে এক ঠুনকো বাহানায় আমাদের বাড়ি ঘেরাও করলো স্থানীয় রাজাকারের দল। আমাদের বাড়িতে নাকি মুক্তি সেনাদের যাতায়াত আছে। সেবার খুব ভয় পেয়েছিলাম। আশ্রয় নিয়েছিলাম বড় পালঙ্কের নিচে মাটির তৈরি চাল রাখা বড় বড় মটকার পিছনে।

আমাদের পরম প্রতিবেশী আফসার মন্ডল বাবার বন্ধু।  কাকুর বুদ্ধিমত্তায় আমরা দুই বোন, মা আর বাবা কৌশলে এক বস্ত্রে ভিটে ছেড়ে পালিয়ে যাই সেই রাতের অন্ধকারে। আফসার কাকু আমাদের ফেলে যাওয়া ঘরদোর যক্ষের ধনের মতো আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; রাজাকাররা আফসার কাকুকে নির্মমভাবে পিটিয়ে  মেরে ফেলেছিল।লুট করে নিয়ে গিয়েছিল সব। তারপর জ্বালিয়ে দিয়েছিল আমাদের বসত ভিটা গোলা সব।কাকুর লাশ দুই দিন গাছে ঝোলানে ছিল।কারো হাত দেওয়ার সাহস ছিল না।.. এসব কথা বাবার মুখে শোনা  ।

ভারতে পিসির বাড়িতে আমাদের নিরাপদে রেখে কিছু দিন পর বাবা ওপার বাংলায় ফিরে গিয়েছিলেন।অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে—নিজের বাপ ঠাকুরের ভিটে -প্রাণাধিক প্রিয় বন্ধু আফসার কাকুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে।তারমধ্যে  একদিন মধ্য রাতে প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়ে বাবা এসেছিলেন আমাদের এখানে।সেটাই ছিল তার সাথে আমাদের শেষ দেখা।তার মুখে নিজেদের ভিটে মাটি পোড়ানোর চেয়ে আফসার কাকুর করুন মৃত্যুর কথা শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।কথা বলার সময় বাবার চোখে দেখেছিলাম প্রতিশোধের আগুন।

বাবার সেই শেষবার বের হওয়ার দৃশ্যটা আজও চোখে জল এনে দেয়। পিসির বাড়ির তুলসীতলায় মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা বলেছিলেন, "আফসারের রক্তের ঋণ মিটিয়ে আমি ফিরব, জানকীর মা।আমরা আবার আমাদের ভিটেয় ফিরব। আমাদের আবার সব হবে।এবার খুব মন দিয়ে সংসার করবো। মেয়ে দুটো বড়ো হচ্ছে ওদের বিয়ে দিতে হবে। তুই এই একতারা আর মেয়ে দুটোকে দেখে রাখিস।আমি ফিরবই।"

একতারাটা এখনও আছে কিন্তু বাবার আর ফেরা হয়নি। ওপার বাংলা স্বাধীন হলো, রক্তে রাঙা নতুন এক মানচিত্রের জন্ম হলো, কিন্তু স্বাধীন দেশে আমাদের আর ফেরা হলো না। বাবা নিখোঁজ হওয়ায় আর ভিটেমাটি হারানোর শোকে কয়েক বছর পরে আষাঢ়ের এক ঝুম বৃষ্টির দিনে মা-ও  মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।শরীর মন অনেক আগেই ভেঙে গেছিল তার। আমি আর বোন ভারতের বুকেই রয়ে গেলাম, একসময় হুগলিতেই আমাদের সংসার জীবন শুরু হলো।
তারপর জীবন চলতে লাগলো জীবনের নিয়মে।
দীর্ঘ ৪০ বছর পর,আমার ভাসুরে ছেলের বিয়ে হলো বাংলাদেশের পাবনা জেলার হাওলি গ্রামের কাছের এক গ্রামে।
নিজের ভিটের মাটি ছুয়ে দেখার লোভ কেন জানি আমাকে আবারও পেয়ে বসলো। বোনকে বলতে সেও রাজী এক কথায়।যদিও তার শরীর তেমন একটা ভালো নয় বয়সের ভারে। বেশ কিছু ঝক্কি ঝামেলা সেরে অবশেষে  আমি আর আমার ছোট বোন পাবনার সেই হাওলি গ্রামে পা রেখেছিলাম। ভিটেবাড়ির কোনো অস্তিত্বই ছিল না ততদিনে।সেখানে উঁচু ঢিবির জঙ্গল।  ঘন বাঁশবাগান আর আজানা অচেনা গাছের ঝোপ। লোকজন বলল কার না কার কবর। বুকভাঙা কান্না চেপে আমাদের স্মৃতিগুলো মেলাবার চেষ্টা করছিলাম।কত পরিবর্তন। সময় আসলে সব বদলে দেয়।কিছুই আর আগের মত থাকে না।
হঠাৎ গ্রামের এক প্রবীণ লোক আমাদের আসবার কথা শুনে ছুটে এলেন। পরিচয় দিতেই অশীতিপর বৃদ্ধের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
- তোমরা রামকমলের মাইয়া? তোমরা বাঁইচ্চা আছো?
- হ্যাঁ কাকা আমরা দুবোন বেঁচে আছি। খুব ভালো না থাকলেও বেঁচে আছি। মা গত হয়েছেন।
এরপর দ্রুত কতগুলো ঘটনা ঘটলো।

জহির কাকা আমাদেরকে তার ভিটের বারান্দায় শীতলপাটিতে বসিয়ে দিলেন। এরপর কাকে যেন নির্দেশ দিলেন হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে। গামছায় মুখ মুছে কাঁপা কাঁপা হাতে কাঁচের গ্লাসে ডাবের পানি এগিয়ে দিয়ে বললেন,
-"খা মায়েরা, আগে মুখ-হাত ধুইয়া ডাবের পানিটা খা।পরানডা জুড়াইবো। তোগো দেইখ্যা মনে হইতাছে যেন রামকমল ভাইই আমার সামনে আইসা দাঁড়াইয়া আছে।"

আমি ডাবের জলের গ্লাসটা হাতে নিয়ে ভিজে যাওয়া গলায় বললাম,
- "কাকা, বাবার কথা কিছু বলুন ! সেই রাতের পর থেকে আমরা তো আর কিছুই জানি না। বাবা কীভাবে..."

কথাটা শেষ করতে পারলাম না, কান্না চেপে কাকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

জহির কাকা অন্তরের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তাঁর দৃষ্টি যেন একপলকে ফিরে গেল ১৯৭১ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলোয়।
কিছু সময় চুপ থেকে তিনি শুরু করলেন

"তোর বাপের মতো অমন হিম্মতওয়ালা মানুষ আমি খুব কম দেখছি রে জানকী। আবার এত সহজ সরল,"

"নিজের ভিটা মাটি পুড়নের খবরের লগে আফসার হত্যার খবর পাইয়া রামকমল ভাই যখন ওপার থাইকা ফিরে আসলো, ওনার চোখেমুখে তখন আর বৈষ্ণবের শান্তভাব আছিল না। আছিল রক্তের বদলা নেওয়ার আগুন।ট্রেনিং লইয়া ফিরছিলো। হাতে একতারার বদলে স্টেনগান! ইছামতীর ঘাটে রাজাকারের যে শক্ত ফাঁড়িটা আছিল, ওইটা ওড়ানোর দায়িত্ব একা নিজের কাঁধে তুইল্যা লইছিল।সাথে আরও মুক্তি যোদ্ধারা আছিল।সত্যি বলতে কি আমিও আছিলাম।"

ছোট বোন আমার কাকার হাত দুটো চেপে ধরে বলল, "তারপর কী হলো কাকা?"

"ঘটনার দিন অমাবস্যার রাত আছিল," কাকা চোখ দুটো বুজে বললেন, "নদী সাঁতরায়া একদম ফাঁড়ির গোড়ায় গিয়া গ্রেনেড মারলো তোর বাপে। বিকট শব্দে পুরা এলাকা কাঁইপ্যা উঠলো, রাজাকারের ঘাঁটি ধ্বংস হইলো! কিন্তু ফাঁড়ি ওড়ানোর পর পেছনে পেছনে গুলির শব্দ শোনা যাইতে লাগলো। আমরা সকলতেই ততক্ষণে নদীর জলে। রামকমল ভাইও নদীর জলে ঝাঁপ দিলেন ঠিকই, কিন্তু বুকে তিনটা গুলি খায়া ইছামতীর লাল জলে তলায়া গেলেন। আমরা দূর থাইকা খালি গুলির শব্দ আর জলের তোড় দেখতেছিলাম... কিচ্ছু করার আছিল না রে মা।"

বারান্দায় তখন পিনপতন নীরবতা। ডাবের জলের গ্লাস হাতে আমি আর বোন পাথরের মতো বসে আছি। জহির কাকা একটু থেমে গামছা দিয়ে নিজের চোখের কোণ মুছে আবার বললেন,
-"পরের দিন সকালে আমরা লুকাইয়া নদীর তীর ধইরা খুঁজতে যাইয়া দেখি—তোদের বাবার নিথর দেহটা পাড়ে আটকাইয়া আছে। বৈষ্ণব মানুষ, কিন্তু তখন চারপাশে কোনো কাঠ নাই, দাহ করার উপায় নাই। আফসারের পোলা করিম তোর বাপের রক্তমাখা লাশটা জড়িয়ে ধইরা হাউমাউ করে কাঁইন্দা উঠলো। কইল,
-'কাকা আমার বাপের বদলা নিতে নিজের জীবন দিছে। ওনারে আমি বেওয়ারিশ লাশের লাহান পঁচতে দিমু না। আমরা উনারে দাফন করমু।' আমরা আর কেউ না করতে পারি নাই রে মা..."
আমাদের পা দুটো যেন মাটিতে জমে গেল। আমরা দু-বোন ছুটে গেলাম বাঁশবাগানের সেই আগাছার জঙ্গলে। ঝোপঝাড় সরাতেই দেখতে পেলাম জরাজীর্ণ, শ্যাওলা ধরা একটা ছোট কবরে পোড়ামাটির  ফলক। অস্পষ্ট অক্ষরে হাতের সাহায্যে  লেখা—‘শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা বৈষ্ণব রামকমল দাস’।

যে বাবা সারা জীবন একতারা হাতে বৈষ্ণব কীর্তন গাইলেন, তার শেষ ঠিকানা হলো একটি ইসলামী কবরে! আর যে বাবার কোনো চিতাই জ্বলেনি, তার জন্য সারা জীবন গঙ্গাঞ্জলি দেওয়া আমি আজ দাঁড়িয়ে আছি তার কবরের পাশে।

বাবার কবর ছুঁয়ে  আমরা দুই বোন সেদিন বাধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। দুই ধর্মের দুই ভাইয়ের রক্তের বন্ধন আর ভিটে হারানোর চিরন্তন হাহাকার—দুটোই সেদিন নিঃশব্দে শুয়ে ছিল সেই স্যাঁতসেঁতে কবরের অন্ধকারে।

© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.