| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সুব্রত দত্ত
পরিশ্রমকে সঙ্গী করে কত মানুষ উর্ধ্বে গেলো, আকাশের ঐ তারার দলে/ চিরদিনই অলস আমি, আছি পড়ে অনন্তকাল এই ধরনীর গাছের তলে।
একজন নিহিলিস্ট হিসেবে যা-ই লিখি তা-ই হয়তো অর্থহীন হয়ে ওঠে। কিন্তু যা ‘অর্থহীন’ তা কি কখনো কিছু ‘হয়ে ওঠা’? যেহেতু জন্মেছি এবং মৃত্যুর জন্য নিরন্তন অপেক্ষা- সেই অপেক্ষাকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করার তাগিদে ও একেবারে মৌলিক চাহিদাগুলোকে পূরণ করার প্রয়োজনে ‘অপটিমিস্টিক নিহিলিস্ট’ হওয়া ছাড়া গতি দেখি না। আমি হয়তো ‘অপটিমিস্টিক নিহিলিস্ট’ কিন্তু প্রবলভাবেই কেবল ‘নিহিলিস্ট’ হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে চাই। জগতের যাবতীয় দর্শন, তত্ত্ব, জ্ঞান-বিজ্ঞান, রীতি-নীতিকে নিজের মতো করে ‘নিহিলিস্ট’ দৃষ্টি থেকে সংজ্ঞায়িত করতে চাই। জীবনের অনেকগুলো বছর কাটিয়ে আজও সেগুলোকে ‘সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা’য় আনতে পারিনি। একদিন পারব হয়তো। কিন্তু না পারলেও ক্ষতি নেই। পারা বা না-পারা কোনোটাই তো জরুরি নয় একজন নিহিলিস্টের কাছে। যাহোক, এইসব নিরর্থক কথা। আজকে আসলে জীবনের কিছু চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করার জন্য লিখতে বসেছি।
সময়টা ২০০০ সাল। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি টঙ্গীর একটি কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে। ঐসময় খুবই ভীতু এবং বোকাসোকা টাইপের ছেলে ছিলাম আমি (হয়তো এখনও)। তো একদিন সমাজ পরীক্ষায় নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই প্রায় সব প্রশ্নের উত্তর লিখে একটি প্রশ্নে আটকে ছিলাম। প্রশ্নটা বুঝতে পারছিলাম না যে কি লিখব! কিন্তু স্যারকে যে সাহস করে জিজ্ঞেস করবো তার সাহস ছিল না। কিন্তু অনেকক্ষণ লিখছি না দেখে একজন স্যার আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন আমি লিখছি না কেন! আমি বলি যে প্রশ্নটি বুঝতে পারছি না। স্যার কেবল প্রশ্নটি পড়ে বুঝিয়ে দেন! অবাক হয়ে খেয়াল করি যে উত্তরটা আমি জানি। স্যার না বলে দিলেও পরে আমি প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারি। ঐসময়ে মনে হয় স্যার যেন একজন জাদুকর! তিনি উত্তর বলে দিলেন না কিন্তু তবুও আমি উত্তর খুঁজে পেলাম! ঐদিন বাসায় ফিরতে ফিরতে সিদ্ধান্ত নেই বড় হয়ে আমিও জাদুকর হবো অর্থাৎ স্যারের মতো একজন শিক্ষক হবো। স্যারের নাম-পরিচয় এমনকি চেহারা কিছুই মনে নেই অথচ ঐদিনের ঐ অনুভূতি কি চমৎকারভাবে সত্য হয়ে যায় ১৫টি বছর পর। ২০১৫ সালে আমি শিক্ষক হিসেবে আমার কর্মজীবন শুরু করি।
সময়টা ২০০৭ সাল। এসএসসি পরীক্ষা দিবো। তো এসএসসি পরীক্ষার আগে স্কুলে স্পেশাল ক্লাস হতো। ইংরেজি স্যার নানা রকমের টপিক দিতেন রাইটিং প্র্যাকটিসের জন্য। এমন তিনি সেটা কঠোরভাবেই মনিটর করতেন। একদিন টপিক দিলেন ‘The place you wanted to visit’। আমার দারুণ লাগলো টপিকটা। বাসায় এসে বড় বোন আর প্রাইভেট টিউটরের সহযোগিতায় রচনা লিখে ফেলি। বড় বোন ও স্যারের সহযোগিতা নিলেও ঠিক কোন জায়গার কথা বলবো, কী কী বলবো সেগুলো নিজেই সিদ্ধান্ত নেই। যেহেতু ছোট মানুষ এবং দেশেরই কোনো স্থান ঘুরে দেখিনি সেহেতু চট করে বলে দেয়া যায় না ঠিক কোথায় আমি যেতে চাই। তখন ইন্টারনেটও ততটা উন্নত হয়নি যে প্রযুক্তির কল্যাণে ঘরে বসেই অনেক কিছু জেনে যাবো। পাঠ্যবইয়ের কল্যাণে জেনেছিলাম কাশ্মির হলো ‘পৃথিবীর স্বর্গ’। সুতরাং ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ দেখার একটা ইচ্ছে তখন জেগেছিল। আমি এমন পরিবারের সন্তান যে তখন সেটা আমার জন্য অনেকটা দুঃসাহসিক স্বপ্ন ছিল। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কেউ কাশ্মির যাবে বেড়াতে সেটা চারটেখানি কথা না। তাই ‘The place you wanted to visit’ রচনায় কাশ্মির দেখতে চাওয়াটা মানানসই-ই ছিল। ঠিক কী কী লিখেছিলাম তা মনে নেই। বিস্ময়করভাবে ২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচ থেকে আমরা ভারত ভ্রমণে যাই। ১৯ দিনের সফরের টানা ৪দিন আমরা কাশ্মিরে ছিলাম। সত্যি চমকপ্রদ না ব্যাপারটা!
২০০৬ সাল। দশম শ্রেণিতে পড়ি। বড় বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে। তার পছন্দের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বাবা-মাও চায় মেয়ে ঢাকার কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক। ভালো ছাত্রী সে। বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষা দেয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের পরীক্ষার দিন আমি তার সঙ্গে যাই। বাবা অফিসিয়াল কাজের জন্য যেতে পারে না। সম্ভবত পরীক্ষাটা ছিল ১ ঘণ্টার। সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনের ছোট উঠানে বসে আমি বোনের পরীক্ষার সময়টুকু অপেক্ষা করি। এত সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয়! মনে মনে ভাবি আমিও চেষ্টা করবো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য। তখন এসএসসিও দেইনি। এইচএসসি পাশ করার পর মাত্র দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফর্ম কিনি। মোটামুটি রেজাল্ট নিয়ে সেটা দুঃসাহসিকই ছিল বটে। অবশেষে ২য় অপেক্ষমান তালিকায় ঝোলাঝুলির শেষে সুযোগ পাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। মজার কথা বড় বোনও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছে। ব্যাপারটা সুন্দর না?
সাল ২০১০। বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত পূর্বেরগুলোতে নানা সংযোজন ও বিয়োজনের শেষে। তো, ২০১০ সালের সেই শিক্ষানীতিতে দেশে পরিচালিত আন্তর্জাতিক কারিকুলামগুলোতে ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে বাংলা এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয় দুটোকে বাধ্যতামূলক করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়তে যাওয়ার সাথে সাথেই অনেকে বলেছিল বাংলা পড়ে কী করবে? আমার বাবা-মা সেসব নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না। তাদের বক্তব্য ভালো জায়গায় পড়াশুনা করলে একটা না একটা কিছু করে খেতে পারবোই। অনেক বড় কোনো স্বপ্ন তাদের ছিল না। গড়পড়তায় সৎ জীবনযাপন করার মতো ব্যবস্থা যেন হয়- তা-ই ছিল তাদের প্রত্যাশা। আমিও আসলে ক্যারিয়ার নিয়ে অত কিছু ভাবতাম না। এই শিক্ষানীতি প্রণীত হওয়ার পর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে অফিসিয়ালি বাংলা শিক্ষক নিয়োগ শুরু হয়। ছোটবেলায় যখন শুনতাম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে কথা তখন তা রূপকথার মতো লাগতো। অনেক ধনীলোকের সন্তানেরা পড়ে। সেখানে সবকিছু অন্যরকম। ইচ্ছা হতো ইংলিশ মিডিয়াম সম্পর্কে জানার। সৌভাগ্যক্রমে ২০১৭ সালে ইংলিশ মিডিয়ামে বাংলা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাই। কেমন সুন্দর ব্যাপার!
সাল ২০১৮। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি করার ১ বছর পূর্ণ হলো। প্রথম ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে বিদায় নিয়ে জয়েন করলাম আরেকটি প্রতিষ্ঠানে। সেখানে কয়েকজন সহকর্মীর সাথে বেশ দারুণ সম্পর্ক হলো। তাদের সাথে গল্পে গল্পে জানতে পারলাম International Baccalaureate কারিকুলাম সম্পর্কে। ISD স্কুল সম্পর্কে। মর্যাদা এবং স্যালারি দুই দিক থেকেই এই ধরনের চাকরি করতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু বাংলা শিক্ষক হিসেবে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে জয়েন করার কি সহজ ব্যাপার! শুনলাম ট্রেনিং করা থাকা লাগে, বেশিরভাগ সাবজেক্টের শিক্ষকই বাইরে থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত- ইত্যাদি, ইত্যাদি। যার মানে হলো আমার মতো শিক্ষকের জন্য এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। খুব মন দিয়ে ক্যামব্রিজ কারিকুলামে কাজ করতে থাকলাম। ২০২৩ সালে বর্তমান কর্মস্থলে বাংলা শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলো। সাহস করে এপ্লাই করলাম এবং বিশাল ভাইভা বোর্ডেই (প্রায় ১৮/২০ জন ছিলেন) জানানো হলো আমাকে চাকরি দিতে তারা আগ্রহী। যুক্ত হলাম আইবি স্কুলে। মাত্র ৩ বছরের মাথায় দুটি ট্রেনিং নিয়ে আইবি রেজিস্ট্রার্ডড শিক্ষক হয়ে গেলাম। সত্যি জীবনটা সুন্দর! অথচ আমি একজন নিহিলিস্ট।
এইসব গল্প কেন বলছি! নিজেকে জাহির করার জন্য? না। বিশ্বাস করুন আমি অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ। গড়পড়তায় আমার জীবন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে এখনও রয়ে গেছি। আমার উচ্চাশা নাই। শিক্ষকতা ভালোবাসি এই যা। এই গল্প এই জন্য বলছি যে আপনি অনুপ্রাণিত হন। অনুপ্রাণিত হয়ে অতীতের দিকে তাকালে দেখবেন কত চমৎকার প্রাপ্তি রয়েছে আপনার। অনুপ্রাণিত হয়ে বর্তমানের দিকে তাকালে দেখবেন কতটা সম্ভাবনাময় আপনি। অনুপ্রাণিত হয়ে ভবিষ্যতের কল্পনা করলে দেখবেন ইতিবাচকতা এখনও আছে। বলতে পারেন, তাতে আপনার লাভ কী? এর উত্তর আমার কাছে নাই। লিখলাম, মন চাইল তাই। লিখতে ভালো লাগে তাই।
সবাই ভালো থাকবেন। এমনসব প্রাপ্তি থাকলে শেয়ার করবেন পাঠকদের সাথে। মানুষকে অনুপ্রাণিত করা ভালো কাজ।
২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৭
সুব্রত দত্ত বলেছেন: নিঃসন্দেহে সততা ও মানবিকতা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আপনার অভিজ্ঞতাও সময়-সুযোগ হলে লিখবেন। ভালো থাকবেন।
২|
২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪
রাজীব নুর বলেছেন: সুন্দর লেখা।
জটিলতা কুটিলতা মুক্ত লেখা।
ধন্যবাদ। ভালো থাকুন।
২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩২
সুব্রত দত্ত বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই। আপনার লেখাও অনেক সুন্দর। পড়ে বরাবরই ভালো লাগে আমার। ভালো থাকবেন।
©somewhere in net ltd.
১|
২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৮
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: ২০১৫ সালে আমি শিক্ষক হিসেবে আমার কর্মজীবন শুরু করি।
..........................................................................................
বিশ্বাস মানুষের কর্মজীবনকে প্রভাবিত করে ।
এছাড়াও ছোটবেলায় আমি বিশ্বাস করতাম যা চাই,
কষ্ট করলে তা পাই ।
আশ্চর্য হলেও বলতে হয় এমন কিছু ঘটনা আমিও প্রতক্ষ্য করেছি ।
............................................................................................
তবে একটি বিষয় খুব পরিস্কার নিজের কাছে সৎ ও মানবিক হতে হবে ।