নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

পেশা শিক্ষকতা, নেশা সাহিত্য। একজন নিহিলিস্ট।

সুব্রত দত্ত

পরিশ্রমকে সঙ্গী করে কত মানুষ উর্ধ্বে গেলো, আকাশের ঐ তারার দলে/ চিরদিনই অলস আমি, আছি পড়ে অনন্তকাল এই ধরনীর গাছের তলে।

সুব্রত দত্ত › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছোটগল্প: আমি ডাক্তার হবো

৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫

দ্রুত মাছ ধরার জালগুলো গুছিয়ে নেয় মহিউদ্দিন। ইতোমধ্যে অন্যান্য যন্ত্রগুলোও গুছিয়ে রেখেছে একপাশে। “জমির, ও জমির” বলে উঁচুস্বরে ডাকে কিছুক্ষণ পর পর। চারিদিকে মানুষের ছুটোছুটি। সবাই ব্যস্ত। কেউ বড় বড় বস্তা, ট্র্যাঙ্ক, বাক্স নিয়ে ছুটছে, কেউ হাতপাখা, থালা-বাসন, শখের জিনিস, কাঁথা বালিশ নিয়ে এগিয়ে চলছে। ঘাটে কোনো নৌকা নেই, ট্রলারও নেই। নিরাপদ স্থানে সেগুলোকে সরিয়ে নিয়েছে অনেকে। মহিউদ্দিনের চোখে কি যেন আতঙ্ক! বারবার আকাশের দিকে তাকায়। আকাশটা কালো হয়ে আছে। ভ্যাপসা গরমে সে ঘেমে একাকার। হাওয়াও কম। দূর থেকে বারবার মাইকিং করা হচ্ছে। আজ রাতের মধ্যেই সবাইকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে হবে। এবারের ঝড় নাকি আইলা-সিডরকেও হার মানাতে পারে। গরু, ছাগলগুলোর কথা মনে পড়ে ওর। ওগুলো নিয়ে আরেক ঝক্কি। অবলা প্রাণীগুলোকে বলেও বোঝানো যায় না কিছু। বৌও তার কম যায় না। আবার ৭মাসের পোয়াতী। পেট ব্যথায় হাঁটতেও পারে না তাড়াতাড়ি। অত দূর হেটে যাবে কেমনে? রিক্সা-ভ্যান পাওয়ারও জো নেই। মহিউদ্দিনের বিষন্ন লাগে। জমির এরই মধ্যে এসে মাছ ধরার যন্ত্রগুলো নিয়ে গিয়েছি। জাল নিয়ে দ্রুত যেতে হবে বাড়ি। মালপত্র গোছানোও হয়তো এতক্ষণে শেষ। এবার রওনা দেওয়া পালা। হঠাৎ চোখ পড়ে সাজু মিয়ার দিকে। উদাস মুখে অনেকটাই ভাবনা-চিন্তাহীনভাবে হেটে আসছে সে। মহিউদ্দিন দাঁড়ায়।
‘কি মিয়া! খবর কী? গোছগাছ হইছে?’
অন্যমনস্ক সাজু বলে, ‘কি! কীসের কথা কও?’
‘কই! কানে কি মিয়া তালা দিছো? হুনতাছো না মাইকিং-এ কইতেছে আশ্রয় কেন্দ্রে যাইতে। যাবা না?’
‘ও! হ, যামু।’ অনেকটা নির্লিপ্ত থেকেই সাজু উত্তর দেয়। তারপর দু’জনে হেঁটে যায় বাড়ির দিকে। হাঁটতে হাঁটতে মহিউদ্দিন জেনে নেয় সাজুর বিষন্নতার কারণ। বৃদ্ধ মা খুবই অসুস্থ। যায়, যায় আরকি। সারাটা দিন সাজু ডাক্তার খুঁজে ফিরেছে। পায় নি। একে তো করোনার ঝামেলা ছিল তার সঙ্গে এই বৈরি আবহাওয়া। সুপার সাইক্লোন আম্ফানের আস্ফালন। মহিউদ্দিন সান্ত্বনা দেয়। তা ছাড়া তার দেওয়ার কিছুই নেই। করাও নেই। সে নিজেও আজ বড় বিপন্ন। মাগরিবের আযান দিয়েছে ততক্ষণে। ইফতার নিয়ে ওদের মাথাব্যথা নেই। আল্লাহ রসুলের কথা সারাদিন স্মরণ করলেও সাচ্চা মুসলমান হয়ে ওঠা ওদের জন্য দুরূহ। মহিউদ্দিন আর সাজু মিয়া বাড়ির কাছিকাছি পৌঁছে যায়। ওদের ঘরও কাছেই। মহিউদ্দিন বলে,
‘তয় মিয়া, কি আর করবা। যাও যা পারো গুছাইয়া লও। খালারে বুঝায়া কও। মন না চাইলেও তো যাইতে হব।’
সাজু সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ে। যে যার বাড়ির দিকে হাঁটে। সাজুর মা ছেলের সংসার। তিনবেলা ভরপেট খেতে পারে ওরা আর এতেই ওদেরকে এখানকার সবার থেকে আলাদা মনে হয়ে। এছাড়া ওদের ঘরে মালপত্র বলতে যৎসামান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া আর কিছু না। সাজু মাকে বুঝিয়ে বলে। কিন্তু সে হাঁটবে কীভাবে? বৃদ্ধা চিন্তিত হয়ে ছেলেকে একাই যেতে বলে। সাজু রেগে যায়। রাগটাও ঠিকমতো প্রকাশ করতে জানে না সে। অগত্যা বৃদ্ধা রাজি হয়। বড় একটা বস্তা বাঁধে সাজু। তাদের জরুরি জিনিসগুলোই তাতে নেয়। রাত হয়ে এসেছে। দমকা হাওয়া ছুটছে হুটহাট। আশেপাশে মানুষেরা রওনা দিয়ে দিয়েছে এরই মধ্যে। সাজু কাঁধে বস্তাটা ঝুলিয়ে নেয়। মাকে নেয় কোলে। বৃদ্ধার কষ্ট হয়। কোলে উঠতে মন চায় না। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সাজুর নীরবতা তাকে ভয় পাইয়ে দেয়। তারপর সাজু হাঁটতে শুরু করে। অন্তত মাইল খানেকের পথ তো হবেই। হাঁটবে, জিরোবে, হাঁটবে— এভাবেই একসময় পৌঁছে যাবে রাঙ্গুনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সাজু হাঁটতে থাকে। ছোটবেলার বহু স্মৃতি আজ মনে পড়ে ওর। ঐ স্কুলেই পড়ত ও। ফাইভের পরীক্ষাটা আর দেওয়া হয়নি এমনই ঝড়ে বাপ-ভাইকে হারানোর জন্য। সে দিন মা খুব কেঁদেছিলেন। সাজু ভাবে মা-ও তো চুপচাপ। তারও কি ঐসব মনে পড়ছে? সাজু কথা বলে। অদ্ভুত লাগে ওর। বৃদ্ধা কেবল তার ঘর, ঘরের চৌকি, বদনা, হাড়ি-পাতিলের জন্য হা-হুতাশ করে। স্বামী সন্তানের স্মৃতির থেকেও কি ওগুলো বেশি দামি! সাজু ভাবে। কথা বাড়ায় না। স্কুলের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মহিউদ্দিন আর সাজু একসঙ্গেই স্কুলে যেত প্রতিদিন। পড়ালেখায় খুব তো খারাপ ছিল না। ভাগ্য। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় আজ সে জেলে। ঘণ্টাখানেক পর স্কুল বিল্ডিং-এ গিয়ে পৌঁছায় সাজু। মহিউদ্দিন দাঁড়িয়ে ছিল গেটের পাশ ঘেষে। ওরও কম কষ্ট হয়নি আসতে। সাজুর কেবল অসুস্থ বৃদ্ধা মা। মহিউদ্দিনের বাপ, মা, বৌ, দুই বাচ্চা, ছোট ভাই, গরু, ছাগল, কয়েটা হাঁস ও মুরগি। অবশ্য ছেলে, ভাই ছোট হলেও গতরে খাটতে পারে তাই কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়েছে। মহিউদ্দিন খালাকে ধরে নিয়ে যায় তিনতলার একটা ঘরে যেখানে তার ঘরের মানুষরাও উঠছে। বস্তাটা এককোণে রেখে সাজু মহিউদ্দিনকে নিয়ে নিচে নামে। এই বিদ্যালয়েও হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। রাত গনিয়ে এসেছে বিধায় হাক-ডাক কমেছে কিছুটা। দমকা হাওয়া হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। সাজুর মন চায় অতীতের গল্প করতে কিন্তু দ্বিধাও হয়। মহিউদ্দিনই হঠাৎ বলে ওঠে-
‘মিয়া মনে পড়ে কিছু। এইখানেই পড়তাম আমরা। ঐ যে পুরাতন বিল্ডিং, ঐখানের কোণার ঘরেই আমাদের ক্লাস ছিল। মনে পড়ে?’
সাজুর দ্বিধা কেটে যায়। গল্প জুড়ে দেয় মহিউদ্দিনের সাথে। ফঁাঁকে ফাঁকে বিড়ি ধরায় দু’জনে। টেনে চলে বিড়ি আর ঘেঁটে চলে স্মৃতির পাতা। কথায় কথায় ওরা ওদের ক্লাসরুমের সামনের এসে পড়ে। জানালাগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। দরজাগুলো গেছে কবরে। টিনের চালে শত ছিদ্র হয়ে যেন চালনি হয়ে উঠেছে। মহিউদ্দিন হাতের টর্চ দিয়ে আলো ফেলে চারপাশটায়। হঠাৎ ভাঙা দেওয়ালের এক কোণে আলো পড়ে। মহিউদ্দিন আলোটা স্থির করে সেখানে। বহু পুরাতন কিছু একটা লেখা ওদের চোখে পড়ে। সাজু থমকে দাঁড়ায়। সুপার সাইক্লোনের দেড়শো-দুশো কিলোমিটার গতির থেকেও দ্রুত গতিতে সাজুর স্মৃতির পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মহিউদ্দিন আলোটা সরিয়ে নেয়। দু’জন চুপচাপ বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে আর হাঁটা ধরে তিনতলার দিকে।


সুব্রত দত্ত
উত্তরখান, উত্তরা, ঢাকা
মে ২১, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ।

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: পড়লাম আর ১৯৬৯ সনের সাইক্লোনের কথা ও স্মৃতি চোখের উপর ভাসছে ।
আমার জানামতে বাংলাদেশে ১৭০/১৯০ এর উপর ঝড় হয় নাই স্মরণকালে ।
তবে ৫০০ শত বৎরের মধ্যে ২১৫ মাইল বেগে একবার সাইক্লোন হয়েছিলো ।

৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫২

সুব্রত দত্ত বলেছেন: পড়ার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি কি ১৯৬৯ সালের সাইক্লোন প্রত্যক্ষ করেছেন!

২| ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:০৫

রাজীব নুর বলেছেন: সুন্দর লিখেন আপনি।

৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:০৭

সুব্রত দত্ত বলেছেন: আর লেখা ভাই। লিখেও বা কি হয়!

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.