| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রচন্ড তাপপ্রবাহে তালতলা সরকারি হাই স্কুলটি যেন বাষ্পীভূত হওয়া শুরু করেছে। আমরা তার আগেই পৌঁছুলাম। গেটে পরীক্ষার্থীদের ভিড়, স্কুলটি বিরাট মহাকাশযানের মতো মুখ খুলে দিয়েছে। মহাকাশযাত্রীরা একসাথে যেন ওটাতে প্রবেশ করছে। বন্যা, আমার স্ত্রীও সেই কল্পিত মহাকাশযানের যাত্রী আজ। ওর হলুদ রঙের জামাটা অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত গেটে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এরপর এসে বসলাম যাত্রী ছাউনির নিচে।
স্কুলের সামনে রাস্তার ওপাশে এই ছাউনি। অনেক পরীক্ষার্থীর সাথে কেউ না কেউ এসেছে। পিচঢালা পথটায় গরম ভাপ উঠছে, আর বৃষ্টি হবো হবো ভাব যেন গরমকে আরো উসকে দিয়েছে। ঘনবসতির ঢাকা শহরের রাস্তার ধারে একটু বসবার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে না। ছাউনির নিচে এসে দেখি অনেক ভিড়। তবে আমি অপেক্ষা করলাম। কিছু পরীক্ষার্থী এখনো বসে শেষবারের মত বই দেখছে। এরা উঠে গেলে ছাউনির নিচের বেঞ্চ ফাঁকা হবে।
আকাশে ঘনকালো মেঘ, সকালে এক পশলা বৃষ্টি হওয়াতে, এই বিকেলটা যেন সন্ধ্যার মতো। কিংবা ভোরের মতো। বাতাসের শরীর জুড়ে প্রচুর বাষ্প— সূর্য থেকে আসা উত্তাপকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
যাত্রী-ছাউনির নিচে যারা বসে, তারা সকলেই যেন বৃষ্টির অপেক্ষা করছে। মুখোমুখি দুটো সিমেন্টের বেঞ্চ পাতা। দরদর করে বৃষ্টি হলে যে ছাউনির নিচে বসা এরাও তেমন রেহাই পাবে না, তা ভাল করেই জানে। তবু গরমের উত্তাপ থেকে একটু স্বস্তির আশা কে না করে?
ঘড়িতে দুইটা পনের বাজতেই কয়েকজন পরীক্ষার্থী উঠে গেল কেন্দ্রের দিকে। আমি সেই সুযোগে এসে সিমেন্ট ঢালাই করা বেঞ্চিতে বসলাম। একটি যুবক—পরনে নোংরা জামা, মুখ ভর্তি দাড়ি—আসলে পাগল—না হলে এতো মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও এই বেঞ্চিতে শুয়ে থাকে?— আমি এসে ওর মাথার কাছে বসলাম।
"এই ক্যান্টনমেন্ট কে করেছে? সরকার। আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আমি দেখেছি, এই ক্যান্টনমেন্ট কত কষ্ট করে বানিয়েছে।"
পাগলের প্রলাপ—কেউ ভ্রুক্ষেপ করছে না, কেউ শুনছে না ওর কথা। এখানে কোন ক্যান্টনমেন্ট নেই। মাথাটি ওর উল্টোদিকে দেয়ালের দিকে ঘুরানো, আপন মনের ভাষণ। কান লাগিয়ে শুনলে মনে হয়, কারো সাথে কথা বলছে। "তুমি আসো নাই? রিকশা পাঠিয়েছিলাম। কেন? খুব গরম লেগেছিল বুঝি? তুমি ঠিকই ডাক্তার ছেলেটির সাথে গেলে।"
আমার বাম পাশে এক মহিলা বসা, বোরখা পরা, মধ্যবয়স্কা। মুখ খোলা। তার ডান হাতের কাছে একটি বড় তরকারির বাটি, মেলামাইনের, সেই বাটিতে একটি মুরগির বাচ্চা। নাকি পাখির বাচ্চা? আমি একটু ঘাড় ঘুরিয়ে পরীক্ষা করবো, কিন্তু তার পাশের এক কৌতুহলী তরুণী বসা আর কথা বলছে মহিলাটির সাথে।
আমি বরং তাদের কথোপকথনে মনোযোগী হলাম, মহিলাটি বলছে, "এটা রঙরঙা পাখির বাচ্চা। রাস্তায় পড়ে আছিলো। মনে হয় ঝড়ে বাসা থেকে পড়েছে। আমি কুড়িয়ে আনছি।" রঙরঙা পাখি এটা? এই নামে ত কোন পাখি নেই!
"আপনি কি পালবেন এটা?" তরুনীটি জিজ্ঞেস করছে।
"না। আমার মেয়ে পালবে। ও পাখি ভালবাসে। ওর জন্য বাটিতে নিয়েছি। এই তো পরীক্ষা দিতে ঢুকল।"
"আপনার মেয়ে ডাক্তার?"
"হ। চাকরির প্রমোশনের পরীক্ষা আইজ।" বলে মহিলাটি তার টোপলা থেকে পান বের করে মুখে পুড়ে দিলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই মুখটি লাল হয়ে গেল। একটু পর পর পানের পিক ফেলছে এখানে সেখানে।
"ডাক্তার হয়ে আপনার মেয়ে পাখি পালে কিভাবে? এত সময় পায় কোথায়? চেম্বার প্র্যাক্টিস করে না?"
"করে মা। প্রতিদিন ডিউটিতে যাওয়ার সময় পাখির খাঁচা নিয়ে যায় সাথে। চারটা বাজরিগার, দুইটি কবুতরের বাচ্চা।। সব নিয়ে যায়।"
"আপনার মেয়ের মাথা খারাপ নাকি? আমি হলে শুধু কবুতর দুটো নিয়ে যেতাম।" মেয়েটি অবাক হয়ে বলে।
আমার সামনে মুখোমুখি এক ভদ্রলোক, দাঁড়ি টুপি পাঞ্জাবি পরা, মনে হয় হুজুর। না হলে এতক্ষণ ধরে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে তেলাওয়াত করে যাবে কেন? মোবাইলে আজকাল মুরুব্বিরাও ফেসবুক স্ক্রল করে। কিন্তু এই ভদ্রলোক ইবাদত বন্দেগী করছে। মোবাইলেই আজকাল কোরান হাদিস পড়া যায়। ভদ্রলোক কিছুক্ষন থেমে আবার জিকির করে—অতিরিক্ত গরমে? এই উত্তাপে কি সবাই পাগল হয়ে গেছে?
উনার পাশের একটি যুবক খুব বিরক্তি নিয়ে তাকালো। যুবকটিরও কেউ হয়তো পরীক্ষা দিতে এসেছে। এতোক্ষন নিজেও মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
"চাচা মিয়া, একটু আস্তে পড়েন।" সে বলে।
মুরুব্বি তার মতো তেলাওয়াত চালিয়ে যায়, আড়চোখে এই ছেলেটির একবার তাকায়।
"তোমার বয়সী একটা ছেলে ছিল আমার। কিন্তু কখনো এমন করে হুকুম করে নি। বড় ভাল ছেলে ছিল সে।"
এইবার যুবকটি কৌতুহলী হয়। হয়তো সে নিজেকে ঐ মুরুব্বির ছেলের সাথে রিলেট করতে পারে।
"ছিল মানে কি? মারা গেছে নাকি?"
মুরুব্বি উত্তর দেয় না। আপন মনে জিকির করে। আরো জোরে। রোজ কেয়ামত যেন খুব কাছে। আমি অনুভব করি, লোকটির একমাত্র ছেলেটি হারিয়ে গেছে। তাকে খুঁজছে, কতকাল ধরে যেন খুঁজছে। বড় অদ্ভুতুড়ে পরিবেশ। আমি যেন আচ্ছন্ন হয়ে যাই, গরমের কথাও ভুলে যাই।
পাশের পাগলটি প্রলাপ বকেই যাচ্ছে, "তোমাকে চিঠি দিয়েছি, টেলিফোন করেছি। তুমি জবাব দাও নাই। তোমার মেডিকেলে চান্স পাওয়াটাই জরুরী। আর আমি যে পেলাম না? শুনছো? এই যে দেখো, আমি এই ক্যান্টনমেন্টের মালিক। আমি প্রেসিডেন্ট, সবাই আমাকে সালাম দেয়..."
পাখির বাচ্চাওয়ালা মহিলা বলছে, "এই বাচ্চাটা বড় হলে, আমার মেয়ের সাথে বিয়ে দিবো।"
তরুণীটি অবাক হয়, মহিলার দিকে তাকিয়ে বলে, "এটা কী করে সম্ভব?"
"আমার মেয়েডা বড়ই দিলখোলা। পাখি ভালবাসে।"
তরুণীটি বলে, "সংসার টিকবে না তাহলে চাচী। এই পাখির পরিচয় নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এটা কি আসলেই রঙরঙা পাখি? নাকি ভঙ ধরেছে? আপনি শিউর?"
"কী কও মা? এইডা রঙরঙা পাখি৷" মহিলাটি পাখির বাটি হাতে নেয়, যেন একটু আদর করতে চায় বাচ্চাটিকে।
"আমি ফেসবুকে অনেককে দেখেছি, ফেইক একাউন্ট করে মেয়েদের সাথে কথা বলে। কেউ কেউ তো আর্মি অফিসার পরিচয় দিয়ে মেয়েদের পটায়। আমি এমন একটা ছেলেকে চিনি। সে আসলে কোন মানুষ ছিল না।"
"মানুষ ছিল না?" মহিলাটি জিজ্ঞেস করে।
"না। আমি একটি হোটেলে দেখা করতে যাই ওর সাথে। বাবা মাকে না বলে। একটা চিঠি লিখে গিয়েছিলাম অবশ্য। আর ফিরবো না। হোটেলে দেখা করতে গিয়ে দেখি, ফেসবুকের সেই ছেলেটি আসলে একটি সজারু। সারা গায়ে কাটা। আমার খুব কষ্ট হয়েছিল, যখন সে আমায় জড়িয়ে ধরেছিল। সাড়া শরীরে কাটা ফুটে গেছে অনেক দাগ হয়েছে।"
মহিলাটি আবেগাপ্লুত হয়ে যায়। তরুণীটিকে কী বলে শান্তনা দিবে? এতোটুকুন একটা মেয়ে, বাড়ি থেকে পালিয়েছে।
"তুমি বাড়ি ফিরো নাই?"
"এই লজ্জার দাগ নিয়ে কিভাবে ফিরবো?"
"তুমি মা খুব ভালা মা। পাখি হলে তোমারে নিয়ে আমার মেয়েকে দিতাম।"
আমি পিচঢালা পথে তাকাই, অদূরে গেটের সামনে কাচা সবজির দোকান বসেছে, লাউ, ঢেড়স, বেগুন, আলু, পটল, ঝিঙ্গা, চিচিংগা। ক্রেতা কম, এই গরমে এখন সবাই সুপারশপে বাজার করে। স্কুলের গেটের কাছে একটি ডিমের দোকান। অনেক সিদ্ধ ডিম সাজিয়ে রেখেছে, মনে হচ্ছে ডিমগুলো নড়ছে। লাল ডিম। বাতাসের আর্দ্রতা এতো বেশি ডিমগুলোকে টলমল পানির মত দেখাচ্ছে।
"চাচী, আপনি আপনার এই পাখিটি ওদের দিয়ে দেন।" তরুনীটির গলা শুনি। সে ঐ ডিমওয়ালাকে নির্দেশ করছে। ডিমওয়ালাকে পাখির বাচ্চা দিয়ে কী হবে?
"ঐ ডিমওলাকে এই পাখির বাচ্চা ক্যান দিবো? সে কি ডাক্তার আমার মেয়ের মতো? সে তো ডিম বেচে! ডাক্তার হলে দিতাম।" চাচীটি বলে। বোরখাওলা চাচী।
আশেপাশের মানুষ কৌতুহলী হয়। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে, "পাখিকে কী খাওয়ান?"
"এই তো লিচু, পেয়ারা, আর মেহগনির কচি ডাল।"
"ভাত খায় না?"
"দেশের মানুষেই পায় না ভাত। এতো আকাল। হাওরে আবার বন্যায় সব ধান ভেসে গেছে। পাখিকে খাওয়ালে দেশের মানুষ ভাত পাইবো কই?"
"চাচীর বাড়ি কি ময়মনসিং? "
চাচী কথা বলে না।
"আহারে বাবা! ছেলেটিকে পরী ধরেছিল। হলুদ রঙের একটা পরী।" আমার সামনের মুরুব্বিটি জিকির থামিয়ে বিড়বিড় করে বলা শুরু করে। "প্রতি পূর্ণিমার রাতে আমার ছেলেটি পাগল হয়ে যেত। তারপর এক রাতে ছেলেটিকে পরীয়ে তুলে নিয়ে যায়। মনে হয় পরীদের দেশে। কত ফকির কবিরাজ ধরেছি। তারা কেউ হদিস দিতে পারে নাই। এখনো খুঁজি তাকে।"
আমার বিরক্তি ধরে যায়। একটু মাথা তুলে গেটের দিকে দেখি, পরীক্ষা শেষ হল কিনা। আমার স্ত্রী, হলুদ জামা পরে পরীক্ষা দিতে ঢুকেছে। আমি অনেক বার বারণ করেছি, বৃষ্টির দিনে নীল শাড়ি পরতে হয়। কিন্তু ওর কথা, ডাক্তাররা শাড়ি পরে না। শাড়ি পরতে হয় না। নীল রঙ ওর খ্যাত লাগে।
গেটের পাশের ডিমওলার সিদ্ধ ডিমগুলো থেকে বাচ্চা বের হয়েছে। অনেকগুলো ছোট ছোট বাচ্চা। এই গরমেই এই অবস্থা! জাহান্নামের গরমে কী হবে তাহলে? মুরুব্বিটি আরো জোরে জোরে তেলাওয়াত করে, লাল ডিমগুলো সব পাখির বাচ্চা হয়ে কিচিরমিচির শুরু করেছে। মানুষের কৌতুহল এখন আর এই চাচীর পাখিটির দিকে নেই। সবাই ডিমওয়ালা দোকানদারের বাচ্চাগুলো দেখছে।
তরুনীটি করুনস্বরে বলল, "আজ মনে হয় বৃষ্টি হবে না আর। এতো গরম! এখন ডিমওলার বাচ্চাগুলো কে কিনে খাবে?"
আমিও এমনটাই ভাবছিলাম। কে অতো পাখির বাচ্চা কিনে খাবে? দুই তিনটি হলে এই চাচীকে দেয়া যেত। উনি উনার মেয়েকে দিতেন। আমার অবশ্য অতো গরম লাগে না। ত্রিশ বছর আগের কথা মনে পড়লো। এই এখানে রাস্তার ওপাশে তখন নতুন একটি সরকারি ভবন হচ্ছিল। আমি এসে এখানে শুয়ে পড়েছিলাম। কারন বন্যা সেদিন মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা দিতে এই ভবনের পাশের স্কুলটিতে ঢুকেছিল। আমি শুয়ে থেকেই তাকিয়ে ছিলাম গেটের দিকে। হলুদ রঙের একটি জামা পরে ঢুকেছিল। আমি নীল শাড়ি পরতে বলেছিলাম। সে শোনে নি। নীল তার পছন্দ না। আর ডাক্তাররা নাকি শাড়ি পরে না।
আর আমার কথাই শুনবে বা কেন? আমি তো ডাক্তার নই। ও হয়তো ওর মতোই কোন ডাক্তার ছেলের কথায় ওঠা বসা করবে। নীল শাড়িও পরবে। তাই ওকে দেখার জন্য এই এখানে এসে শুয়ে থাকি। প্রতিবছর গরম পরলে এই স্কুলে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা হয়। আর প্রতিবারই ওকে হলুদ জামা পরে কেন্দ্রে ঢুকতে দেখি। ভালই লাগে।
আমি সিমেন্টের ঢালাই করা বেঞ্চে শুয়ে থেকে বেঞ্চের ফাঁক গলে যেন গেট দেখতে পাচ্ছি। ডিমওলার বাচ্চাগুলো এখন কক কক করছে, ওগুলো পাখি নয়—মোরগ। আমার মাথার কাছে এক ডাক্তার যুবক বসা, তার ডাক্তার-স্ত্রী পরীক্ষা দিতে গেছে, সে অপেক্ষায় বসে আছে। ডাক্তার-স্ত্রীটি আবার পাখি পালতে ভালবাসে।
আজ খুব গরম পরেছে।
খুব গরমে লোকজন বোধহয় অস্বাভাবিক আচরণ করে। না হলে কখন উঠে পড়তাম! উঠে গিয়ে ঐ সবজিওলাদের পাশে বসে থাকতাম। দেখতাম কেউ আমাকে কেজি দরে কেনে কিনা।
©somewhere in net ltd.
১|
১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬
রাজীব নুর বলেছেন: গরম এ আসলে মানুষের মন মেজাজ ঠিক থাকে না।
ডাক্তার হওয়া অনেক কষ্টের।