নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মুক্ত মানুষ , মুক্ত সমাজ, মুক্ত পৃথিবী; মুক্তিই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ।

সালমান মাহফুজ

সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা সেই কৈশোর থেকেই । মাঝে মাঝে লিখতেও চেষ্টা করি । যেই সাহিত্য আমাকে ধরেছে, সেই সিলেবাস আমাকে দূরে সরিয়ে দিছে । সুতরাং একাডেমিক কন্ডিশন চরম বাজে । প্রচণ্ড অলস এবং অসামাজিক । নিজের কাজের প্রতি চরম বিশ্বাসহীনতা । মাঝে মাঝে সবকিছুকেই অনর্থক ফাও ফাও মনে হয় । এমনকি বেঁচে থাকাটাও । তবুও বেঁচে আছি । কেন ? জানি না । শুধু জানি, কিছু একটা করতে হবে । কী সেটা ? তাও জানি না । মানবজন্মটাকে এভাবে বৃথা চলতে দেয়া যায় না, এই ভেবেই বোধোহয় আরেকটু বাঁচবার লোভ হয় ।

সালমান মাহফুজ › বিস্তারিত পোস্টঃ

সাহিত্যপাঠ : তেইশ নম্বর তৈলচিত্র — শুধু ক্যানভাসে আঁকা ছবি নয়, রক্তমাংসে গড়া জীবনের গল্পও

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০




‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’— যেন উপন্যাসের আঙ্গিকে এক রোমান্টিক চিত্রশিল্পীর সামগ্রিক জীবনদৃষ্টিকে তুলে আনার প্রচেষ্টা ! যার পরতে পরতে অঙ্কিত হয়েছে ‘জাহেদ’ নামক একজন চিত্রশিল্পীর জীবন ও জগতকে ঘিরে নানারূপ অন্তর্নিহিত শিল্পভাবনা । সেইসঙ্গে, তার নিজের সৃষ্ট শিল্পের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং কখনো কখনো তিক্ততা, অনীহা । শিল্পীবন্ধুদের প্রতি বরাবরই উদার মনোভঙ্গি । নারীর প্রতি অকৃত্রিম প্রেমের প্রতিচ্ছবিকে শিল্পরূপ দেয়ার মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে নেয়া । প্রেম থেকে থেকে উৎসারিত ঘৃণাকে জয় করার জন্য ভিতরের শিল্পশক্তিকে জাগিয়ে তোলার অদম্য স্পৃহা । এবং নারীর রহস্যময় শরীরী রূপ ও দুর্বোধ্য মনস্তত্ব— দুটোরই উদঘাটনের এক ক্লান্তিহীন প্রয়াস

১৯৬০ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির স্রষ্টা আলাউদ্দিন আল আজাদ । এটিই তাঁর প্রথম রচিত উপন্যাস । নিজের রচিত প্রথম উপন্যাস সম্পর্কে লেখক তার ভাবনা ব্যক্ত করতে গিয়ে বইয়ের ভূমিকাতেই উল্লেখ করেছেন—
“ যে কোনো লেখক শিল্পীর প্রথম সৃষ্টি সম্পর্কে তার যে অনুরাগ ও দুর্বলতা, এই লেখাটিও আমার হৃদয়ে তেমনি মিঠেকড়া, কাটাগুল্মময়, কখনো বা স্বপ্নের মায়াবৃক্ষ । লিখন সময়েই ছিল জীবনের গভীরে নিমজ্জন ও বিচ্ছিন্নতা যা তখন আমার জানা ছিল না— আজ বহুদিন পরে কাব্যতত্ত্বের এই উপাদান আবিষ্কার করে আমি বিস্মিত হই । জাহেদ চরিত্রে লেখকের আত্মবিলুপ্তি ঘটেছে ।...”
এই জাহেদ চরিত্রে লেখকের আত্মবিলুপ্তি ঘটুক কিংবা আত্মজাগরণ ঘটুক, সেই হিসাব বাদ দিয়ে আমরা দেখব, উপন্যাসটি পাঠের মাধ্যমে একজন পাঠক কতটা আনন্দ নিজের আনন্দের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারছেন, এবং কতটা বেদনা নিজের বেদনার সঙ্গে একীভূত করে সিক্ত হচ্ছেন । এবং সেই হিসাবেই একটা উপন্যাসের সার্থকতা কিংবা ব্যর্থতা নির্ধারিত হওয়া উচিত বলেই আমি মনে করি ।

উপন্যাসের প্রথমেই, হলভর্তি শিল্প-অনুরাগীদের ভিড়ে যখন জাহেদের আঁকা তেইশ নম্বর তৈলচিত্র— ‘মাদার অব আর্থ’ প্রথম পুরস্কার হিসাবে ঘোষিত হল— তখনই আমরা দেখি জাহেদ নিজের কর্মের স্বীকৃতিতে আনন্দে যতটা আত্মহারা হয়ে পড়েছেন, তার চেয়ে বেশি বেদনাহত হয়েছেন তার অন্যান্য শিল্পীবন্ধুরা পুরষ্কারটা না পাওয়ায় । সেইসব শিল্পীবন্ধু— যাদেরকে জাহেদ নিজের চেয়ে শক্তিমান এবং প্রতিভাবান শিল্পী হিসাবেই ভাবে । জাহেদের এই উদার মনোভঙ্গি আমরা গোটা উপন্যাসেই লক্ষ করি ।
উপন্যাসটি পাঠ করার সময়ে পাঠক জাহেদের যতজন শিল্পীবন্ধুর সাক্ষাৎ পাবেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম মুজতবা চরিত্রটি । যার কাছে প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় বিদ্যমান নিয়মগুলো সব জরাজীর্ণ । প্রচলিত নিয়মগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া নয়, সেইসবকে ভেঙে দেয়াই একজন শিল্পীর একমাত্র কর্তব্য বলেই মুজতবার ধারণা । কি শিল্পীর ব্যক্তিক জীবনে, কি শিল্পীর সৃষ্টিকর্মে ।
জাহেদ যদিও মুজতবাদের মত প্রচলিত সমাজ-সভ্যতার সবকিছুকে ছেঁড়া জামার মত ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না, তবুও শিল্পীবন্ধুর এই জীবনদৃষ্টির প্রতি তার কোনো বিরোধীতা নেই । বরং কিঞ্চিত শ্রদ্ধা আছে । আকর্ষণও আছে । কেননা, মুজতবার হাত ধরেই জাহেদকে আমরা প্রথম বেশ্যালয়ে গমন করতে দেখি ।
ব্যক্তিক ভোগের জন্য যেখানে প্রায় সব খদ্দেরদের আনাগোনা । কিন্তু খদ্দরের ছদ্মবেশে সেখানে একজন শিল্পীর আনাগোনা প্রধানত শিল্পের প্রয়োজনেই । জীবিকার তাড়নায় বেশ্যালয়ে নারীর যে এক ভিন্ন ছলনাময়ী নিষ্ঠুর নগ্ন রূপ, সেই রূপকে জাহেদ ক্যানভাসে আঁকতে গিয়ে এতটাই আত্মপীড়নে আক্রান্ত হয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত তুলি ছুঁড়ে ফেলে দৌঁড়ে বেরিয়ে আসে রাস্তায় ।
জাহেদ যখন ‘ছবি’ নাম্নী এক সারল্যময়ী প্রেমময়ী দেবীতুল্য নারীমূর্তির সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন একে একে মুছে যেতে থাকে আত্মপীড়নের চিহ্নগুলি !
ছবি উপন্যাসের নায়িকা । জামিল নামক এক সামান্য কমার্সিয়াল আর্টিস্ট বড় দাদাকে আশ্রয় করে একটা অভাবের সংসারে যার বেঁচে থাকা । দাদা জামিল যেদিন একজন টগবগে তরুণ আর্টিস্টকে সহযোগী হিসাবে বাড়ি নিয়ে আসলেন, সেদিন হয়ত ছবি ভাবতেই পারে নি— এই টগবগে তরুণই হতে যাচ্ছে তার পরবর্তী জীবনের আশ্রয় ! ছবির রূপটি লেখক জাহেদের ভাবনার ভিতর দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে—
“আমার দেহের অভ্যন্তরেই জেগেছিল সে বিধাতার মত, অচেনা রহস্যময় আমার হাত দিয়ে ক্যানভাসের ওপর কাজ করে চেলে গেছে । তাকে চিনি না , কিন্তু তবু মনে হয় সে-ই তো জেগেছিল রাফেল দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলোর মাঝে, গগাঁ রেনোয়া পিকাসোর আত্মায় ?”

নির্জন ক্যানভাসে একটু একটু করে অঙ্কিত হতে থাকা জাহেদ-ছবির প্রেমের মহৎ চিত্রকর্মটি যখনই ছবির দাদা জামিলের নজরে আসে তখনই তাকে এক টানেই মুছে ফেলে দিতে চেয়ছিল জামিল । মীরা নামক এক নারীকে ভালোবেসে বিয়ে করে অসুখী দাম্পত্যজীবনের কষাঘাতে জর্জরিত ব্যর্থ আর্টিস্ট জামিলের দাবি— “শিল্পীর জীবনে প্রেম দরকার । কিন্তু তাতে জড়িয়ে পড়লে চলবে না ।”
কিন্তু প্রেম কি আর এসব বড় বড় বুলির বাঁধ দিয়ে আটকানো যায় ! নানা ঘাত প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে জাহেদ আর ছবির প্রেম চলতে থাকে । ছবিকে নিত্য নতুন ভাবে আবিষ্কার করতে থাকে শিল্পী জাহেদ । অন্ধকার নির্জন ঘরে শায়িতা ঘুমন্ত ছবির স্থির মূর্তি দেখে জাহেদ সৃষ্টির প্রেরণা পায় । ক্যানভাসে ছবিকে নতুন করে সৃষ্টি করবার প্রেরণা ! সেইসাথে রক্ত-মাংসের ছবির প্রতি জেগে এক অবাধ্য অদম্য প্রেম-তৃষ্ণা !
কিন্তু জাহেদের এই প্রেম-তৃষ্ণা যাকে ঘিরে, সমস্ত কিছু যার হাতে, সেই ছবির মনস্তত্ব প্রচলিত রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থা দ্বারা পুরোমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত ! সে জাহেদকে তার শরীর কিছুতেই বিয়ের আগে ছুঁতে দিবে না ! জাহেদের কণ্ঠ থেকে নিঃসরিত কোনো কাব্যিক প্রেমোদ্দীপক বাক্যই খুলতে পারে না ছবির মস্তিষ্কের জট ! বরং মাঝে মাঝেই জাহেদের দিকে সে ছুঁড়ে মারে একগাধা অবিশ্বাস আর অনাস্থায় মোড়ানো কথার প্রস্তরখণ্ড – “মিলন হলে ভালোবাসা টেকে না... পুরুষের কাছে কাছে প্রেম জিনিশটা অভিনয় আর শিকার ধরবার টোপমাত্র কিন্তু মেয়েদের সেটাই জীবন ।”
প্রেম নিবেদন করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত জাহেদ অবশ্য এসব তীর্যক কথায় ক্ষেপে উঠে না ! কিংবা সেইসব রক্ষণশীলতাকে ভেঙেচূরে দেয়ার প্রবণতাও জাহেদের মধ্যে আমরা লক্ষিত হতে দেখি না । জাহেদ ‘ছবি’ নাম্নী নারীমূর্তির কাছে আপাতত নতমুখ নতজানু ! সে অপেক্ষা করতে থাকে ছবিকে বিয়ে করে ঘর বাঁধবার পরের সেই চরম রহস্যময় মুহূর্তগুলোর জন্য । ক্যানভাসে রংতুলি দিয়ে সমস্ত রহস্যময়তার উন্মোচিত রূপকে সৃষ্টি করবার জন্য ।
জাহেদের অপেক্ষার অবসান ঘটে । বিয়ের মন্ত্রবলে পাওয়া রক্ত-মাংসের ছবি এখন তার পাশেই শুয়ে আছে । কিন্তু ছবিকে ঘিরে তার ভিতরে চলতে থাকা রহস্যময়তার জটগুলো খোলার বদলে আরো পাকিয়ে উঠে । মাতৃত্বের প্রতি ছবির প্রবল আকাঙ্ক্ষা, শিশুর প্রতি উৎকট প্রীতি জাহেদকে নতুন রহস্যময়তার জালে আটকাতে থাকে । সেইসাথে আমাদেরও । কিন্তু সমস্ত রহস্যময়তার জাল ছিঁড়ে যখন আমাদের সবার সামনে ছবির জীবনের গোপন ক্ষতটি উন্মোচিত হতে থাকে, তখন আমরা শুধু বিস্মিতই হই না, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ঘৃণ্য চেহারাটা দেখে তাকে আঘাত করবার প্রেরণাও খুঁজে পাই ।
অভাবী বাউণ্ডেলে ভাইয়ের সংসারে বেড়ে ওঠা নিরীহ ছবিকে নির্জন ঘরে কোনো এক ছদ্মবেশী মার্চেন্ট ভদ্দরলোকের ধর্ষণ, নির্দোষ ধর্ষিতা কুমারীর গর্ভবতী হওয়ার লজ্জায় নুয়ে পড়া মস্তক , পরিশেষে মায়ের শরীরে বেড়ে ওঠা নিষ্পাপ প্রাণটাকে হত্যা— এই ভয়ানক দৃশ্যগুলো আমাদের সমস্ত মানবিক সহনাভূতিকে জাগিয়ে তোললেও বিধ্বস্ত করে দেয় জাহেদকে—
“সারাদেহে মৃত্যুর মত ক্লান্তি, ঝিমিয়ে এসেছে চোখ । শরীরটা কখন এলিয়ে পড়ল তাও বলতে পারব না । বাইরের জগৎ নিমজ্জিত হয়ে গেল । তা একরাত্রির জন্য বটে কিন্তু আমার চেতনায় অনন্তকালের মত... দু’দিন আগেও নিজেকে মনে হত রাজার মত; আর এখন পরাজিত সৈনিক ... ”
কিন্তু পরেশেষে সমস্ত মানসিক বিধ্বস্ততাকে ঝেড়ে ফেলে জাহেদকে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে দেখে অভিভূত হয়ে পড়ি । ছবির জীবনের উন্মোচিত ক্ষতটিকে মুছে দেবার জন্য জাহেদ ক্ষমা এবং প্রেমের যে সুন্দর দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে স্থাপন করে, তা একমাত্র মহৎ উদার শিল্পীমনের পক্ষেই সম্ভব !

ছবির কোলে জাহেদের ফুটফুটে সন্তান আসে । যার নাম টুলটুল । টুলটুলকে পেয়ে মাতৃত্বের অহংকারে পূর্ণ হয়ে ওঠে ছবির জীবনের সব অপূর্ণতা ! চিত্রশিল্পী জাহেদ রং তুলি দিয়ে ক্যানভাসে এঁকে পেলে তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘মাদার অব আর্থ’ ! এই অয়েল পেইন্টিংটি স্বীকৃত হয় জাতীয় চিত্রশিল্পের নাম্বার ওয়ান পিস্‌ হিসাবে । অসুন্দরকে পরাস্ত করে সুন্দরের ধ্যানে মগ্ন রোমান্টিক জাহেদ যখন কর্মের স্বীকৃতি হাতে পায়, তখন আরো বড় জায়গায় গিয়ে আরো বড় বিখ্যাত শিল্পী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা মনের কোণে উঁকি মারলেও জাহেদকে আমরা সেই গন্তব্যেই ফিরতে দেখি । যেখানে তার পথ চেয়ে বসে আছে মাতৃত্বের মমতার আঁচলে শিশুকে জড়িয়ে এক মা এবং পুষ্পের হাসি হেসে এক অবুঝ শিশু— ছবি ও টুলটুল ।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০৩

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: ১৯৬০ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির স্রষ্টা আলাউদ্দিন আল আজাদ ।
.......................................................................................................
উক্ত সময়ে উপন্যাসটি সাড়া ফেলেছিলো,
বর্তমানে জেন-জি র দুনিয়ায়, কেউ খোজঁও করতনা ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.