| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

বিকেলবেলা বৃষ্টি নামলে আমার আজকাল অদ্ভুত অস্বস্তি হয়।
মনে হয় কেউ একজন খুব ধীরে ধীরে আমার বুকের ভেতর একটা পুরোনো দরজা খুলছে। সেই দরজার ওপাশে জমে আছে কিছু গন্ধ, কিছু শব্দ, কিছু অসমাপ্ত কথা। আমি সেগুলো ভুলে গেছি ভেবে দিব্যি সংসার করছি, বাজারে যাচ্ছি, মানুষের সাথে হেসে কথা বলছি, অথচ বৃষ্টি হলেই তারা আবার ফিরে আসে।
আজও এলো।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাপড় তুলছিলাম। হঠাৎ নিচে রাস্তায় একটা ছেলে ভিজতে ভিজতে হেঁটে গেলো। তার হাতে ছিলো হলুদ রঙের একটা ফাইল। খুব সাধারণ দৃশ্য। এমন দৃশ্য রোজই দেখা যায়। কিন্তু কেন জানি না, আমার মনে পড়ে গেলো অর্ণবকে।
অর্ণবও সবসময় হাতে ফাইল নিয়ে ঘুরতো।
ফাইলের ভেতর কী থাকতো জানি না। সম্ভবত এলোমেলো কাগজপত্র, ক্লাস নোট, আর আধলিখা কবিতা। ওর একটা স্বভাব ছিলো, গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কখনও গুছিয়ে রাখতে পারতো না। অথচ মানুষ হিসেবে ভীষণ গোছানো ছিলো।
এই ধরনের মানুষ আমি আগে দেখি নি।
চুপচাপ, ভদ্র, ধৈর্যশীল। এমন না যে খুব সুন্দর ছিলো। কিন্তু তার দিকে তাকালে মনে হতো, পৃথিবীটা খুব বেশি খারাপ না। কিছু মানুষ এখনও আছে যাদের ভেতর নোংরামি ঢুকতে পারে নি।
আমাদের সম্পর্কটা প্রেম ছিলো কিনা আমি আজও জানি না।
কারণ প্রেমে মানুষ সাধারণত কিছু চায়। আমরা কিছু চাইতাম না।
ও আমাকে কখনও বলেনি যে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। আমিও বলি নি। ও শুধু পাশে থাকতো সব ব্যাপারে আমাকে লাগতো ওর সবখানে আমাকে খুঁজতো।
একবার আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোতে যেদিন আব্বু দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসারে চলে গেলেন, সেদিন রাত দুটোর সময় আমি অর্ণবকে ফোন করেছিলাম। কিছু বলি নি। শুধু কেঁদেছিলাম। ও কিছু বলে নি পুরো চৌত্রিশ মিনিট ফোন কানে ধরে বসে ছিলো।
মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস খুব কম ছিলো তখন। এখনও সে অভ্যাসটা আছে। কিন্তু অর্ণবকে দেখে মাঝে মাঝে মনে হতো, হয়তো সবাই একরকম হয় না।
তারপর একদিন ও হুট করে বদলে গেলো। মানুষ বদলাতে খুব বেশি সময় নেয় না আসলে।একটা মাত্র মুহূর্ত লাগে একটি মাত্র ঘটনা লাগে কিংবা একটা বাক্য। আমি সেই বাক্যটা আজও জানি না।
শুধু জানি, শেষের দিকে অর্ণব আমার দিকে এমনভাবে তাকাতো যেন আমি তার একাধিক বিরক্তির কারণ। আমি কথা বললে ও চুপ করে থাকতো। আমি রাগ করতাম, ঝগড়া করতাম, কাঁদতাম। ও একদিন বলল আমি চাই আমার বন্ধু-বান্ধবরা সবাই অনেক বড় হোক জীবনে অনেক ভালো থাকুক,
এই কথাটার চাইতে নিষ্ঠুর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই, ভালোবাসার মানুষকে মানুষ বন্ধু বলে সম্বোধন করে কখন। এর মানে কি এই হলোনা আমার জীবনে আর থেকো না।শেষবার যেদিন দেখা হয়েছিলো, সেদিন ঐ নীল শার্টটা পড়েছিলো আমার খুব প্রিয় ছিলো শার্টটা আমিই কিনে দিয়েছিলাম। তারপর আমি ইচ্ছে করেই কিছু বলি নি। মানুষের চলে যাওয়ার আগে তাকে আটকে দিতে ইচ্ছে করে না আমার। অপমান লাগে।
ও চলে গেলো। আমি ভেবেছিলাম ঘৃণা জন্মাবে ওর প্রতি, জন্মায় নি। ভীষণ অপমান হয়েছিলো, কষ্ট হয়েছিলো, রাগ হয়েছিলো। কিন্তু ঘৃণা হয় নি। বরং অনেকদিন পরে বুঝলাম, ভালোবাসার ঠিক উল্টো দিকে ঘৃণা থাকে না। থাকে উদাসীনতা।
যেদিন একজন মানুষকে দেখে তোমার বুক আর ধক করে উঠবে না, যেদিন তার নাম শুনে তোমার হাত কাঁপবে না, যেদিন সে অন্য কারও হাত ধরে হাঁটলেও তোমার রাত জেগে থাকবে না, সেদিন বুঝবে ভালোবাসা শেষ।
ঘৃণা শেষ না।
ঘৃণা হচ্ছে ভালোবাসারই অসুস্থ সংস্করণ। সেখানে এখনও আবেগ আছে, প্রত্যাশা আছে, আহত অহংকার আছে।
অর্ণবকে আমি বহুদিন ভুলে ছিলাম। সত্যি সত্যিই ভুলে ছিলাম।
তারপর আজ বিকেলে, বৃষ্টির মধ্যে একটা হলুদ ফাইল হাতে ছেলেকে দেখে আবার মনে পড়ে গেলো।
মনে পড়তেই বুকের কোথাও হালকা ব্যথা করলো। খুব ছোট্ট; পুরোনো সেলাইয়ের দাগের মতো।
আমি বারান্দা থেকে ভেতরে এসে চুপচাপ বসে রইলাম। রান্নাঘরে চুলার ওপর দুধ উপচে পড়ছিলো, ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ঘুরছিলো, ফোনে কেউ একজন মেসেজ দিচ্ছিলো। জীবন তার নিজের নিয়মে চলছিলো।
শুধু আমার মাথার ভেতরে একটা মানুষ ধীরে ধীরে হাঁটছিলো।
আমি জানি না সে এখন কোথায় আছে। কার সাথে আছে। সুখে আছে কিনা। জানার ইচ্ছেও নেই।
তবু আজ হঠাৎ খুব ইচ্ছে করছে, কেউ যদি টেবিলের ওপর থেকে আমার পুরোনো ডায়েরিটা এনে দিতো!
আমি একটু লিখতাম আজ।
©somewhere in net ltd.