| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নকিব সাহেব কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন। পাশের টেবিলে বসা তাসলিমার সঙ্গে কথা বলছিল অফিসের সুন্দরী কলিগ মেয়েটি। কথার ফাঁকে হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আক্ষেপের সুরে মেয়েটি বলে উঠল, জানি না এই জীবনে বিয়ে হবে কি না!
কথাটা কানে আসতেই একবার পাশ ফিরে তাকালেন নকিব সাহেব। মেয়েদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে তিনি সাধারণত নাক গলান না। বরং যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেন। কিন্তু মেয়েটির কথায় কেমন যেন মায়া হলো তাঁর। মনে মনে দোয়া করলেন, মেয়েটি যেন তার পছন্দমতো একজন ভালো মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পায়। যার সঙ্গে সারাজীবন সুখে থাকা যায়।
নকিব সাহেব অফিসের এডমিন বিভাগে কাজ করেন। চাকরির সুবাদে প্রতিদিনই নানা মানুষের নানা প্রয়োজন সামলাতে হয় তাঁকে। কারও বিপদ হলে বীমার টাকা তোলার ব্যবস্থা করা, কারও জরুরি প্রয়োজনে লোনের কাগজপত্র তৈরি করা, আবার অফিসের নতুন বিয়ে হওয়া কর্মীদের জন্য বিবাহ উপহারের ব্যবস্থা করা, সবই তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
সেদিনের পর দিন গড়িয়ে যায়। অফিসের ব্যস্ততা, ফাইলপত্র আর নিত্যদিনের কাজের ভিড়ে মেয়েটির কথাটা একসময় প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ একদিন ট্রান্সপোর্টে যাওয়া-আসার সময় সহকর্মীদের মুখে শুনলেন, মেয়েটির সঙ্গে তাঁদেরই আরেক সহকর্মীর প্রেমের সম্পর্ক হয়েছে।
খবরটা শুনে অকারণেই ভালো লাগল নকিব সাহেবের। মনে মনে ভাবলেন, যাক, মেয়েটির জীবনে তাহলে কেউ এসেছে। হয়তো তার আক্ষেপের দিনগুলো এবার শেষ হতে চলেছে। তিনি বরাবরই মেয়েটির একজন নীরব শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। এত বড় অফিস হওয়ায় এবং এত বড় বড় সব ডিপার্টমেন্ট থাকায় কখনো কথা হয়নি, আলাদা করে পরিচয়ও নেই, তবু মেয়েটির ভালো থাকাটা যেন তাঁর কাছে অদ্ভুত এক আনন্দের বিষয় হয়ে উঠেছিল।
এর কিছুদিন পর অফিসের ট্রান্সপোর্ট দিয়ে অফিসে আসার সময় মিষ্টি বিতরণ হলো। সহকর্মীদের হাতে হাতে মিষ্টির প্যাকেট। কেউ একজন ফেসবুক খুলে দেখাল, মেয়েটির বিয়ে হয়েছে। পাত্রও তাঁদেরই অফিসের সহকর্মী। ছেলেটির নাম রেজা, আর মেয়েটির নাম অনু।
নকিব সাহেবের মুখে হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে মেয়েটির বিয়ে হলো। পছন্দের মানুষটিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছে। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!
বাসে বসেই মিষ্টিটা মুখে নিলেন তিনি। অফিসের অনেক সহকর্মীকে বিয়েতে দাওয়াত করা হলেও তাঁকে করা হয়নি। অবশ্য তাতে তাঁর কোনো অভিযোগ ছিল না। অনুর সঙ্গে তাঁর তেমন কথাবার্তাই হয় না। দাওয়াত দেওয়ার মতো সম্পর্কও তৈরি হয়নি কখনো। মিষ্টি খেতে খেতে মন থেকে দুজনের সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য দোয়া করলেন।
অফিসের নিয়ম অনুযায়ী নতুন বিবাহিত কর্মীদের জন্য এডমিন বিভাগ থেকে উপহার হিসেবে একটা বিশেষ অংকের টাকা দেওয়া হয়। অনু ও রেজার বিয়ের খবর পাওয়ার পর নকিব সাহেব নিজেই তাদের উপহারের জন্য আবেদন ফর্ম প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।
কাজটা তিনি বেশ আগ্রহ নিয়েই করছিলেন। মনে হচ্ছিল, নিজের পরিবারের কারও জন্য কিছু একটা করছেন। ফর্মের সব কাজ শেষ করে একদিন ডিরেক্টর স্যারের স্বাক্ষর নিতে গেলেন।
স্যার ফর্মটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত দেখলেন। তারপর বিরক্তির সঙ্গে বললেন, রেজাকে আবার কিসের বিয়ের উপহার দিতে হবে? অফিস থেকে এমনিতেই কত লোন নেয় ও। এই প্রয়োজন, সেই প্রয়োজন দেখিয়ে টাকা তোলে। আগে সেগুলো ফেরত দিয়ে নিক, তারপর তার বিয়ের উপহারের কথা ভাবা যাবে, আর অনু মেয়েটা তো নতুন, চাকরির মেয়াদ ছয় মাস হয়নি তার, কাজেই সে এই বীমার আওতায় পড়ে না।
নকিব সাহেব বিনয়ের সঙ্গে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, স্যার, এটা তো অফিসের নিয়মিত বিবাহ উপহার। নতুন বিয়ে হলে সবাইকেই দেওয়া হয়।
কিন্তু সেদিন আর কোনো কাজ হলো না। স্বাক্ষর ছাড়াই ফিরে আসতে হলো তাঁকে।
কয়েকদিন নিজের বিভাগের আরেকজন সহকর্মীকে দিয়ে ফর্মটা পাঠালেন। ভেবেছিলেন, হয়তো অন্য কেউ গেলে স্যার স্বাক্ষর করে দেবেন। কিন্তু সেদিনও একই পরিণতি। ফিরে এল স্বাক্ষর ছাড়াই।
এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। নকিব সাহেবের মাথায় বিষয়টা ঘুরপাক খেতে লাগল। অফিসের নিয়ম অনুযায়ী উপহার পাওয়ার কথা, অথচ সামান্য একটা স্বাক্ষরের জন্য দুজন মানুষ অপেক্ষা করছে। তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন না, কেন এতটা আন্তরিক হয়ে পড়েছেন বিষয়টা নিয়ে।
একদিন অফিসের করিডোরে অনুর সঙ্গে দেখা হলো। মেয়েটি একটু ইতস্তত করে তাঁর কাছে এগিয়ে এল। মুখে কেমন একটা অসহায় ভাব।
নকিব সাহেবকে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া, আমাদের বিয়ের উপহারের টাকাটা কি আমরা পাব না?
কথাটা শুনে থমকে গেলেন নকিব সাহেব। এই প্রথম অনু নিজে থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলল। অথচ কথার মধ্যে এমন একটা আকুতি ছিল যে, মুহূর্তের জন্য তাঁর বুকটা কেমন করে উঠল।
তিনি মেয়েটিকে আশ্বস্ত করে বললেন, আরে না না, পাবেন। একটু সময় লাগছে। আমি চেষ্টা করছি।
অনু আর কিছু বলল না। শুধু মৃদু হাসি দিয়ে চলে গেল।
সেদিন থেকে বিষয়টা নিয়ে আরও বেশি তৎপর হয়ে উঠলেন নকিব সাহেব। আবার গেলেন ডিরেক্টর স্যারের কাছে। এবারও ধমক শুনতে হলো। স্যার বিরক্ত হয়ে তাঁকে বেরিয়ে যেতে বললেন।
মন খারাপ করে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন তিনি। এতবার চেষ্টা করেও যখন কাজ হচ্ছে না, তখন আর কী করার আছে! করিডোর ধরে কয়েক পা এগিয়েছেন, ঠিক তখনই পেছন থেকে ডাক এল।
- নকিব!
পেছনে ফিরে তাকালেন তিনি। ডিরেক্টর স্যার আবার ডাকছেন। কাছে যেতেই স্যার এপ্লিকেশনটা টেনে নিয়ে স্বাক্ষর করে দিলেন বললেন শুধু তোমার দিকে তাকিয়ে সাইনটা করে দিলাম।
নকিব সাহেব কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না। এতদিনের চেষ্টা অবশেষে সফল হয়েছে।
জীবনে অনেক আনন্দের মুহূর্ত এসেছে তাঁর। প্রথমবার বাবা হওয়ার দিনটিতে যে আনন্দ অনুভব করেছিলেন, আজ যেন ঠিক তেমনই একটা অনুভূতি হচ্ছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কোনো কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছেন।
চেকটা হাতে নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে অনুদের ডিপার্টমেন্টের দিকে গেলেন। মনে মনে ভাবছিলেন, আজ মেয়েটিকে খুশির খবরটা দেবেন। কতদিন ধরে অপেক্ষা করছে! নিশ্চয়ই শুনে খুব খুশি হবে।
কিন্তু সেখানে গিয়ে অনুকে পেলেন না। সহকর্মীরা জানাল, সে আজ আরলি লিভ একটু আগে চলে গেছে।
নকিব সাহেবের উৎসাহ অবশ্য একটুও কমল না। সরাসরি রেজার কাছে চলে গেলেন। রেজা তখন নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছিল। কাছে গিয়ে হাসিমুখে বললেন, এই যে রেজা সাহেব, আপনাদের বিয়ের উপহারের চেকের ব্যবস্থা হয়ে গেছে।
রেজা একটু বিরক্ত মুখে হাতে নিল। তারপর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কিসের চেক?
নকিব সাহেব হেসে বললেন, আরে ভাই, আপনাদের বিয়ের উপহারের চেক। অনেক কষ্টে স্যারের স্বাক্ষর করিয়ে এনেছি। কী বলেন, এবার তো একটু খাওয়াতে হবে! বিয়েতে তো দাওয়াত করেননি, এবার কিন্তু খাওয়ানো মিস করা যাবে না।
কথাটা তিনি একেবারেই হাসি-ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন। আসলে চেকটা ইস্যু করাতে পেরে তাঁর নিজেরই এত আনন্দ হচ্ছিল যে, সেই আনন্দটুকু রেজার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু রেজার মুখের বিরক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। বললো
- ধুর মিয়া! কী কাজ করেন আপনারা? বিয়ের উপহারের চেক দিচ্ছেন বিয়ের এক মাস পর! এই টাকা দিয়ে এখন কী করব? ধুর, ফালতু!
কথাগুলো শুনে নকিব সাহেবের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা বুকভরা আনন্দ নিয়ে করিডোর ধরে হেঁটে এসেছিলেন, সেই মানুষটাই এবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন।কোনো উত্তর দিলেন না। দেওয়ার মতো কথাও খুঁজে পেলেন না।
যে উপহারটা পৌঁছে দিতে এতদিন ধরে এত চেষ্টা করেছেন, যে সামান্য স্বাক্ষর পাওয়ার জন্য বারবার অপমানিত হয়েছেন, যে আনন্দটা নিজের সন্তানের কোনো সুখবর পাওয়ার মতো অনুভব করেছিলেন, সেই আনন্দের কোনো মূল্যই যেন রইল না মুহূর্তের মধ্যে।
ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নকিব সাহেব। করিডোরটা আজ কেমন যেন দীর্ঘ মনে হচ্ছে। পায়ের গতি কমে গেল। মাথাটা নিচু হয়ে রইল।
কাউকে কিছু বললেন না। নিজের ডেস্কে ফিরে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়লেন।কম্পিউটারের স্ক্রিনে তখনও কাজের ফাইল খোলা। চারপাশে সহকর্মীদের কথাবার্তা, হাসাহাসি, ফোনের শব্দ সবই আগের মতো চলছে। শুধু নকিব সাহেবের মনটা আর আগের মতো নেই।
পরদিন অফিসে অনুর সাথে দেখা, অনু তার দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকে ভ্রু নাচিয়ে বলল, আপনি যে কি করেন না, চেকটা ওর হাতে দেওয়ার দরকার কি ছিল আমাকে দিলেই পারতেন,
নকিব বলল, আমি প্রথমে আপনার ডিপার্টমেন্টেই গিয়েছিলাম কিন্তু আপনি ছিলেন না।এইজন্য আপনার হাসবেন্ড কে দিয়েছি; একই তো কথা, অনু বিরক্ত হয়ে ঝাড়ি দিয়ে বলল
- একটা দিন অপেক্ষা করতে পারলেন না? এটা কি একই কথা হলো? ধুর! বলে গটগট করে হেঁটে অনু চলে গেল।
অফিসের চারপাশে ব্যস্ততা। কেউ মন দিয়ে কাজ করছে, কেউ ফাইল নিয়ে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যাচ্ছে, আবার কেউ সহকর্মীদের সঙ্গে হাসিঠাট্টায় মেতে আছে। জানালার পাশে কয়েকজন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প করছে। নকিব সাহেব নিজের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন। চারপাশের এত মানুষের ভিড়েও তাঁর নিজেকে একা লাগছে খুব। এইজন্যই এই যুগের মানুষ নিঃস্বার্থভাবে কারো উপকার কেউ সহজে করতে যায় না, বিপদে পড়লে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায় না। পৃথিবীতে আন্তরিকতার চেয়ে স্বার্থের মূল্যই এখন বেশি।
(সমাপ্ত)
©somewhere in net ltd.
১|
০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৫
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: পৃথিবীতে আন্তরিকতার চেয়ে স্বার্থের মূল্যই এখন বেশি।
..................................................................................
অতীব সত্য কথা, সত্য হলে ও তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার আছে ।
আন্তরিকতার হাতটি যারা বাড়িয়ে রাখে রোজ,
বিনিময়ে চায় না কিছু, নেয় যে শুধু খোঁজ।
একটু হাসি, গভীর চাওয়া, আলতো ছোঁয়া বুকে,
অন্যকে হাসিয়ে তারা বাঁচে আপন সুখে।