নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সায়েদুল ইসলাম এর বাংলা ব্‌লগ

সায়েদুল ইসলাম এর বাংলা ব্‌লগ › বিস্তারিত পোস্টঃ

অা‌জও তারা জ্ব‌লে অাকাশে

০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ১০:৩০


গ্রামের কাচা রাস্তাটা বড্ড উচুনিচু।
বর্ষা শরৎ শেষ হয়ে শীতে পা দিয়েছে
গ্রামবাংলা। বর্ষার এটেল মাটি
শুকিয়ে কোথাও উচু কোথাও নিচু হয়ে
গেছে।
কাচা রাস্তাটা দিয়ে আমরা গরুর
গাড়িতে এগিয়ে চলেছি।
সময় অনেকটা পরিবর্তিত হয়েছে।
গ্রামেও আধুনিক প্রযুক্তির ছোয়া
লেগেছে।কিন্তু এই যুগেও গ্রামে গরুর
গাড়ি টিকে আছে।আর সেই গরুর
গাড়িতে করেই নানাবাড়ি চলেছি
আমরা।আমি, আমার বোন আর মা!
তখন বিকেল হয়ে গেছে।পরন্ত
বিকেলে গ্রামের শান্ত পরিবেশে
এগিয়ে চলেছে গাড়িটা! কাঠের
সাথে কাঠের ঘর্ষনে মাঝে মাঝে
'ক্যাচ ক্যাচ' শব্দ হচ্ছে!
.
নানাবাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে
সন্ধ্যা হয়ে গেল।মামা, মামি আর
মামাত ভাই বোনেরা দিয়ে ভর্তি
নানাবাড়িতে এসে ভালোই
লাগছিল।
নানাবাড়ি আসার ইচ্ছা আমার ছিল
না।কিন্তু মা এমনভাবে ধরলেন,না এসে
পারলাম না। মাকে কেমনে বোঝাই,
আমি আর ছোট্টটি নেই!
.
রাতের খাবার খেতে বসেই
বুঝলাম,নানাবাড়িতে সময় ভালোই
কাটবে।সমস্যা একটাই,এখানে আমার
সমবয়সী কেউ নেই!!
.
রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পরেছি।
রাত বেশি হয় নি।বড়জোর ১০.০০ টা
হবে। গ্রামের মানুষ একটু তারাতারিই
শোয় কিনা!
বিছানায় শুয়ে আছি,ঘুম আসছে না।এমন
সময় মৃদু একটা শব্দ কানে এলো।মনে হচ্ছে
মৃদু স্বরে অদুরেই গান গাইছে কেউ!
আমি বিছানায় উঠে বসলাম।
জানালার পর্দাটা সারাতেই অবাক
হয়ে গেলাম।বাইরে জোৎস্না ঠিকরে
পরছে!
আমি বাইরে এসে দাড়ালাম।এখনো
গানশোনা যাচ্ছে।বড় মধুর সে কন্ঠ!!
.
উঠোনের মাঝখানে দাড়িয়ে
আকাশের দিকে তাকালাম।চাঁদের
নরম আলোয় চারদিক ভেসে যাচ্ছিল।
গ্রামে না আসলে পৃথিবীর অন্যতম
সেরা এ সৌন্দর্যটুকু কি দেখতে
পেতাম?
আমি উঠোন পেরিয়ে বাড়ির বাইরে
এসে দাড়ালাম।নানাবাড়ি থেকে
অদুরেই আরেকটা বাড়ি ৷ বাড়ির সাম‌নে গা‌ছে হেলান দি‌য়ে গান গাই‌ছে মেয়েটা! বুঝ‌তে পারলাম,এ অামার মামাত বোন পারুল ৷
.
পারুল অামার বড়মামার মেয়ে! অামার তিন মামা! ছোট অার মেজমামা নানার সা‌থে থাক‌লেও বড়মামার জায়গা নানাবাড়িতে হয় নি,কারন বড়মামা মা‌কিকে পালিয়ে বি‌য়ে করে‌ছি‌লেন!
এজন্য নানা বড়মামাকে বাড়ির পাশে ছোট্ট একটা বা‌ড়ি ক‌রে দিয়ে‌ছেন ৷ ছোট অার মেজমামা নানার সব সম্পত্তি পে‌য়ে‌ছে,বড়মামা‌কে নানা কিছুই দেন নি!
তখন থে‌কে বড়মামার সা‌থে অামা‌দের তেমন কোন সম্পর্ক‌ই নেই!?
.
পারুল তখনও গুনগুন করে গান গে‌য়ে‌ই চ‌লে‌ছে৷ অামি ধীর পা‌য়ে এগি‌য়ে গেলাম ৷ কাছাকা‌ছি গি‌য়ে বললাম,
'কেমন অাছিস পারুল?'
পারুল চমকে উঠে ফি‌রে তাকাল! বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে অা‌ছে! অামি অাবার বললাম,
'কি রে,চুপ ক‌রে অা‌ছিস কেন? উত্তর দি‌বি না?'
পারুল স‌ম্বিৎ ফি‌রে পেয়ে বলল,
'ভা‌লো অাছি৷ কেমন অা‌ছেন ভাই?'
'অা‌মি তো ভাল অাছি,তুই এত রা‌তে বাই‌রে কি ক‌রিস?'
'এমনিই! অাপনারা কখন এসে‌ছেন? ফুফু এসে‌ছে?মিতু কেমন অা‌ছে?'
অামি বললাম,'মা ভাল অাছে! মিতুও এসে‌ছে!'
পারুল হাসিমু‌খে জিজ্ঞেস করল,
'এবার কত‌দিন থাকবেন এখা‌নে?'
'‌ঠিক নাই রে৷ '
তারপর জি‌জ্ঞেস করলাম,
'বড়মামা কি বাসায়?'
পারুল মাথা ঝাকিয়ে বলল,'হু'
অামি বললাম,
'এখন ঘ‌রে যা পারুল ৷ কাল সকা‌লে মামা মা‌মির সা‌থে দেখা কর‌তে অাসব'
পারুল চোখ কপা‌লে তু‌লে বলল,
'অাপ‌নি অাস‌বেন অামা‌দের বাসায়?'
অামি বললাম,'হু,অাস‌লে কোন সমস্যা অা‌ছে'?
পারুল বলল,'দাদু জান‌তে পার‌লে অাপনা‌কে মেরেই ফেল‌বে'
'‌মে‌রে ফেললে ফেল‌বে,‌তোর অত চিন্তা কর‌তে হ‌বে না ৷ এখন যা,ঘ‌রে যা!
,
পারুল ঘ‌রে যওয়ার জন্য পা বাড়াল! অামি পেছন থে‌কে ডাকলাম,
'পারুল?'
পারুল দাড়ি‌য়ে পরল! বললাম,
'এতক্ষন তোর সাম‌নে দাড়ি‌য়ে কথা বললাম,‌তোর মুখটাই তো দেখলাম না '
পারুল হাস‌তে হাস‌তে মুখ থে‌কে ওরনাটা সরাল ৷ সা‌থে সা‌থে একটা ধাক্কা খেলাম,মনে হল অামার সাম‌নে কোন পরী দা‌ড়ি‌য়ে অা‌ছে!
হঠাৎ ম‌নে হল চাঁ‌দের অালোটা বেড়ে গে‌ছে অ‌নেকগুন! অামার মুখ থে‌কে কোন কথা বের হল না ৷
পারুল বলল,'ভাই,অা‌মি কি যাব'?
সম্বিৎ ফি‌রে পে‌য়ে বললাম,'হ্যা হ্যা,তারাতারি ঘ‌রে যা'
পারুল ধীরপা‌য়ে বা‌ড়ির ভেত‌রে চললে গেল!
.
____০২____
,
পর‌দিন সকা‌লে ঘুম ভাঙ্গল মিতুর ডাক শু‌নে! চোখ মে‌লে তাকাতেই মিতু বলল,
'ভাইয়া,তারাত‌রি ওঠ,নানা ডাক‌ছে'
নানার কথা শু‌নে উঠে পরলাম! মুখটা ধু‌য়ে তারাতারি গেলাম নানার সা‌থে দেখা কর‌তে!
নানা বারান্দায় চেয়া‌রে ব‌সে অা‌ছেন ৷ তার সামনে একটা প্লেট ৷ প্লেটে গরম ফাপাপিঠা থে‌কে ধোয়া উঠ‌ছে!
নানার পা‌শে বস‌তে বস‌তে বললাম,
'‌কেমন অা‌ছেন নানা?'
নানা বললেন,'বু‌ড়ো হ‌য়ে গেছিরে ভাই ভাল থাকার বয়স কি অা‌ছে? নে,পিঠা খা'
অামি একটা পিঠা হা‌তে নি‌তে নি‌তে বললাম,
'বড়মামার বাসায় একবার যাব নানা?'
নানা অামার কথা শুনে এক্কেবা‌রে থম‌কে গেল! কিছুক্ষন চুপ ক‌রে বলল,
'ওর কথা অামার সাম‌নে কোনদিন বল‌বি না'
অামি অার ভ‌য়ে কিছু বললাম না!
,
পিঠা শেষ ক‌রে মিতু‌কে বললাম,
'‌মিতু চল,বড়মামার কাছ থে‌কে ঘু‌রে অা‌সি'
মিতু বলল,
'ও‌রে বাপ‌রে,অা‌মি যাব না'
অামি মিতুর কোন কথা না শু‌নে ওর হাত ধ‌রে টে‌নে বাই‌রে নিয়ে অাসলাম!
,
বড়মামার বাড়ির সাম‌নে এসে দাড়া‌তেই বড়মা‌মি দৌ‌রে এলেন! অামা‌দের খু‌শি‌তে গদগদ হয়ে বললেন,
'কেমন অাছ‌ বাবা'
'ভাল';
'অাপা কেমন অা‌ছেন?
'মা ও ভাল অা‌ছে'
অামাদের তি‌নি ঘ‌রে নিয়ে বসালেন!
বড়মামার দুরাবস্থা দে‌খে খুব মন খারাপ হল! বড়লোক বা‌পের ছে‌লে হয়েও ফ‌কি‌রের মত জীবন যাপন কর‌ছেন!
অামমি বললাম,'মামী,পারুল কোথায় ?'
মামী বল‌লেন,'ও গোসল কর‌ছে,একটু বস,ও এসে যা‌বে!
একটু প‌রেই পারুল‌কে দেখ‌তে পেলাম,উ‌ঠো‌নে ভেজা কাপর শুকা‌তে দিচ্ছে সে! ভেজা কাল চুলগু‌লো বে‌য়ে পা‌নি গ‌ড়ি‌য়ে পর‌ছে পিঠ বে‌য়ে!
,
পারুল ঘ‌রে এসেই বলল,
'অাপ‌নি স‌ত্যিই এসেছেন?
অা‌মি মুচ‌কি হে‌সে বললাম,হু
'দাদু জান‌তে পার‌লে?'
‌'জান‌বে না'
অামি হে‌সে হে‌সে কথা বল‌ছি,কিন্তু পারু‌লের চো‌খে ভয়!
অারও কিছুক্ষন থে‌কে মিতু সহ বের হ‌য়ে অাসলাম,।
,
দিন শে‌ষে অাবার রাত নে‌মে এল! অামি অপেক্ষা কর‌তে থাকলাম,কখন গান শোনা যা‌বে!
রাত দশটা পার হ‌য়ে ১১ টা বে‌জে গেল গান শোনা গেল না। অগত্যা বাই‌রে এসে দাড়ালাম। নাহ,অাজ গাছতলায় কেউ নেই। অা‌রো কিছুক্ষন অ‌পেক্ষা ক‌রে চ‌লে এলাম। রা‌তে পারু‌লের দেখা পেলাম না!
,
সকা‌লে দাত মাজ‌তে মাজ‌তে বা‌ড়ির বাই‌রে অাসলাম। পারুল ক্লান্ত ভঙ্গি‌তে দা‌ড়ি‌য়ে অা‌ছে । চাক‌দিকটা তাকি‌য়ে নি‌য়ে এগি‌য়ে গেলাম,
'কাল রা‌তে বাই‌রে অাসিস নি?'
শুক‌নো হে‌সে পারুল বলল,
'প্র‌তি‌দিন বের হওয়া যায়?
'‌কিন্তু অা‌মি তো অ‌পেক্ষা ক‌রেছিলাম'
'অাপ‌নি অামার অ‌পেক্ষা কর‌বেন কেন?'
কি উত্তর দেব ভে‌বে পেলাম না। তাই বললাম,
'তোর গা‌নের গলা সুন্দর'
পারুল হে‌সে ফেলল।
বললাম,
'অাজ রা‌তে গান গাই‌বি তো?'
পারুল কিছু বলল না। অামার মু‌খের দি‌কে তা‌কি‌য়ে রইল।
,
রা‌তে অামি কান পে‌তে রইলাম।‌কিন্তু অাজও গান শোনা গেল না।বাই‌রে রএসে দেখি গা‌ছের নি‌চে পারুল দা‌ড়ি‌য়ে। অা‌মি দ্রুত এগিয়ে ‌গেলাম ।
কিন্তু কি বলব ও‌কে?অপ্রস্তত গলায় তাই বললাম,
'খে‌য়ে‌ছিস পারুল?'
পারুল অামার কথার উত্তর না দি‌য়ে বলল,
'অাজ চাদটা কেমন মলিন'
'কই,চাঁদ‌তো ঠিকই অা‌ছে '
'অাপনি কিছু বল‌বেন ?'
অা‌মি বললাম,'চাদটা‌কে অা‌মি সারাজীবন অামার ক‌রে নি‌তে চাই'
পারুল কিছু বল‌তে যাচ্ছিল,এমন সময় পেছন থে‌কে ডাকল,'ভাইয়া,,,.'
মিতুর কন্ঠটা চিন‌তে দেরি হল না অামার!
,
____০৩____
,
পর‌দিন সবাই পারুলের সা‌থে দেখা করার কথা জে‌নে গেল।‌মিতু সবাই‌কে এটাও ব‌লে দিল যে,অা‌মি পারুল‌কে ভা‌লোবা‌সি। সবাই এমনভা‌বে তাকা‌নো শুরু করল যেন অা‌মি কোন মানুষ খুন ক‌রে এসে‌ছি। ছোট অার মেজমাসা বড় মামা মামী‌কে অকথ্য ভাষায় গালি দিল। পারুলে বাই‌রে অাশা এক্কেবা‌রে অসম্ভব হ‌য়ে পরল।
তিন‌দিন পর মা অমো‌দের নি‌য়ে চলে এলেন।
পারুলের সা‌থে শে‌ষ দেখাটাও হ‌লো না।
,
দেখ‌তে দেখ‌তে ক‌য়েক মাস কে‌টে গেল। পারু‌লের সা‌থে কোনভাবেই যোগা‌যোগ কর‌তে পারলাম না।
এক‌দিন ছা‌দে ব‌সে অা‌ছি। একটা অ‌চেনা নাম্বার থে‌কে ফোন এল।রি‌সিভ ক‌রে কা‌নে লাগা‌তেই বলল,
‌'হ্যালো'
'কন্ঠ শু‌নে অা‌মি চমকে উঠলাম।এ যে পারুল!! বললাম,'
পারুল,কেমন অাছ,নাম্বার কোথায় পে‌লে?
পারুল বলল,নাম্বার কোথায় পে‌য়ে‌ছি প‌রে বলব,কাল অামার বি‌য়ে।পারলে এসো!
না হ‌লে চাঁদটা কোন‌দিন তোমার হ‌বে না!
,
ফোনটা কেটে গেল।
ব্যা‌গে ক‌য়েকটা কাপড় নি‌য়ে অামি বেড়ি‌য়ে পরলাম।
,
বাস থেকে নে‌মে কাচা রাস্তায় হাটা শুরু করলাম। ততক্ষ‌নে রাত হ‌য়ে গে‌ছে।
নানা বাড়ি সাম‌নে কাউকে দেখ‌তে পেলাম না। বড়মামার ছোট্টবা‌ড়িটাতে কিছু মানুষ ঘোরাফ‌রো কর‌ছে।
অা‌মি গাছের নি‌চে এসে দাড়ালাম।
কিছুক্ষন পর ব্যাগ হা‌তে এক ছায়ামুর্তি সাম‌নে এসে দাড়াল।তার হাতটা
চে‌পে ধ‌রে হাটা শুরু করলাম।,
,
অাকা‌শে ততক্ষ‌নে পূ‌র্নিমা চাঁদ উঠে‌ছে।চাদটা‌কে তারার মেলা অাকা‌শে।চা‌দের অা‌লোয় কাচারাস্তা ধ‌রে এগি‌য়ে চ‌লে‌ছি অামরা দু‌টি প্রানী। পাড়ি দি‌য়ে‌ছি অজানার প‌থে!!গ্রামের কাচা রাস্তাটা বড্ড উচুনিচু।
বর্ষা শরৎ শেষ হয়ে শীতে পা দিয়েছে
গ্রামবাংলা। বর্ষার এটেল মাটি
শুকিয়ে কোথাও উচু কোথাও নিচু হয়ে
গেছে।
কাচা রাস্তাটা দিয়ে আমরা গরুর
গাড়িতে এগিয়ে চলেছি।
সময় অনেকটা পরিবর্তিত হয়েছে।
গ্রামেও আধুনিক প্রযুক্তির ছোয়া
লেগেছে।কিন্তু এই যুগেও গ্রামে গরুর
গাড়ি টিকে আছে।আর সেই গরুর
গাড়িতে করেই নানাবাড়ি চলেছি
আমরা।আমি, আমার বোন আর মা!
তখন বিকেল হয়ে গেছে।পরন্ত
বিকেলে গ্রামের শান্ত পরিবেশে
এগিয়ে চলেছে গাড়িটা! কাঠের
সাথে কাঠের ঘর্ষনে মাঝে মাঝে
'ক্যাচ ক্যাচ' শব্দ হচ্ছে!
.
নানাবাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে
সন্ধ্যা হয়ে গেল।মামা, মামি আর
মামাত ভাই বোনেরা দিয়ে ভর্তি
নানাবাড়িতে এসে ভালোই
লাগছিল।
নানাবাড়ি আসার ইচ্ছা আমার ছিল
না।কিন্তু মা এমনভাবে ধরলেন,না এসে
পারলাম না। মাকে কেমনে বোঝাই,
আমি আর ছোট্টটি নেই!
.
রাতের খাবার খেতে বসেই
বুঝলাম,নানাবাড়িতে সময় ভালোই
কাটবে।সমস্যা একটাই,এখানে আমার
সমবয়সী কেউ নেই!!
.
রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পরেছি।
রাত বেশি হয় নি।বড়জোর ১০.০০ টা
হবে। গ্রামের মানুষ একটু তারাতারিই
শোয় কিনা!
বিছানায় শুয়ে আছি,ঘুম আসছে না।এমন
সময় মৃদু একটা শব্দ কানে এলো।মনে হচ্ছে
মৃদু স্বরে অদুরেই গান গাইছে কেউ!
আমি বিছানায় উঠে বসলাম।
জানালার পর্দাটা সারাতেই অবাক
হয়ে গেলাম।বাইরে জোৎস্না ঠিকরে
পরছে!
আমি বাইরে এসে দাড়ালাম।এখনো
গানশোনা যাচ্ছে।বড় মধুর সে কন্ঠ!!
.
উঠোনের মাঝখানে দাড়িয়ে
আকাশের দিকে তাকালাম।চাঁদের
নরম আলোয় চারদিক ভেসে যাচ্ছিল।
গ্রামে না আসলে পৃথিবীর অন্যতম
সেরা এ সৌন্দর্যটুকু কি দেখতে
পেতাম?
আমি উঠোন পেরিয়ে বাড়ির বাইরে
এসে দাড়ালাম।নানাবাড়ি থেকে
অদুরেই আরেকটা বাড়ি ৷ বাড়ির সাম‌নে গা‌ছে হেলান দি‌য়ে গান গাই‌ছে মেয়েটা! বুঝ‌তে পারলাম,এ অামার মামাত বোন পারুল ৷
.
পারুল অামার বড়মামার মেয়ে! অামার তিন মামা! ছোট অার মেজমামা নানার সা‌থে থাক‌লেও বড়মামার জায়গা নানাবাড়িতে হয় নি,কারন বড়মামা মা‌কিকে পালিয়ে বি‌য়ে করে‌ছি‌লেন!
এজন্য নানা বড়মামাকে বাড়ির পাশে ছোট্ট একটা বা‌ড়ি ক‌রে দিয়ে‌ছেন ৷ ছোট অার মেজমামা নানার সব সম্পত্তি পে‌য়ে‌ছে,বড়মামা‌কে নানা কিছুই দেন নি!
তখন থে‌কে বড়মামার সা‌থে অামা‌দের তেমন কোন সম্পর্ক‌ই নেই!?
.
পারুল তখনও গুনগুন করে গান গে‌য়ে‌ই চ‌লে‌ছে৷ অামি ধীর পা‌য়ে এগি‌য়ে গেলাম ৷ কাছাকা‌ছি গি‌য়ে বললাম,
'কেমন অাছিস পারুল?'
পারুল চমকে উঠে ফি‌রে তাকাল! বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে অা‌ছে! অামি অাবার বললাম,
'কি রে,চুপ ক‌রে অা‌ছিস কেন? উত্তর দি‌বি না?'
পারুল স‌ম্বিৎ ফি‌রে পেয়ে বলল,
'ভা‌লো অাছি৷ কেমন অা‌ছেন ভাই?'
'অা‌মি তো ভাল অাছি,তুই এত রা‌তে বাই‌রে কি ক‌রিস?'
'এমনিই! অাপনারা কখন এসে‌ছেন? ফুফু এসে‌ছে?মিতু কেমন অা‌ছে?'
অামি বললাম,'মা ভাল অাছে! মিতুও এসে‌ছে!'
পারুল হাসিমু‌খে জিজ্ঞেস করল,
'এবার কত‌দিন থাকবেন এখা‌নে?'
'‌ঠিক নাই রে৷ '
তারপর জি‌জ্ঞেস করলাম,
'বড়মামা কি বাসায়?'
পারুল মাথা ঝাকিয়ে বলল,'হু'
অামি বললাম,
'এখন ঘ‌রে যা পারুল ৷ কাল সকা‌লে মামা মা‌মির সা‌থে দেখা কর‌তে অাসব'
পারুল চোখ কপা‌লে তু‌লে বলল,
'অাপ‌নি অাস‌বেন অামা‌দের বাসায়?'
অামি বললাম,'হু,অাস‌লে কোন সমস্যা অা‌ছে'?
পারুল বলল,'দাদু জান‌তে পার‌লে অাপনা‌কে মেরেই ফেল‌বে'
'‌মে‌রে ফেললে ফেল‌বে,‌তোর অত চিন্তা কর‌তে হ‌বে না ৷ এখন যা,ঘ‌রে যা!
,
পারুল ঘ‌রে যওয়ার জন্য পা বাড়াল! অামি পেছন থে‌কে ডাকলাম,
'পারুল?'
পারুল দাড়ি‌য়ে পরল! বললাম,
'এতক্ষন তোর সাম‌নে দাড়ি‌য়ে কথা বললাম,‌তোর মুখটাই তো দেখলাম না '
পারুল হাস‌তে হাস‌তে মুখ থে‌কে ওরনাটা সরাল ৷ সা‌থে সা‌থে একটা ধাক্কা খেলাম,মনে হল অামার সাম‌নে কোন পরী দা‌ড়ি‌য়ে অা‌ছে!
হঠাৎ ম‌নে হল চাঁ‌দের অালোটা বেড়ে গে‌ছে অ‌নেকগুন! অামার মুখ থে‌কে কোন কথা বের হল না ৷
পারুল বলল,'ভাই,অা‌মি কি যাব'?
সম্বিৎ ফি‌রে পে‌য়ে বললাম,'হ্যা হ্যা,তারাতারি ঘ‌রে যা'
পারুল ধীরপা‌য়ে বা‌ড়ির ভেত‌রে চললে গেল!
.
____০২____
,
পর‌দিন সকা‌লে ঘুম ভাঙ্গল মিতুর ডাক শু‌নে! চোখ মে‌লে তাকাতেই মিতু বলল,
'ভাইয়া,তারাত‌রি ওঠ,নানা ডাক‌ছে'
নানার কথা শু‌নে উঠে পরলাম! মুখটা ধু‌য়ে তারাতারি গেলাম নানার সা‌থে দেখা কর‌তে!
নানা বারান্দায় চেয়া‌রে ব‌সে অা‌ছেন ৷ তার সামনে একটা প্লেট ৷ প্লেটে গরম ফাপাপিঠা থে‌কে ধোয়া উঠ‌ছে!
নানার পা‌শে বস‌তে বস‌তে বললাম,
'‌কেমন অা‌ছেন নানা?'
নানা বললেন,'বু‌ড়ো হ‌য়ে গেছিরে ভাই ভাল থাকার বয়স কি অা‌ছে? নে,পিঠা খা'
অামি একটা পিঠা হা‌তে নি‌তে নি‌তে বললাম,
'বড়মামার বাসায় একবার যাব নানা?'
নানা অামার কথা শুনে এক্কেবা‌রে থম‌কে গেল! কিছুক্ষন চুপ ক‌রে বলল,
'ওর কথা অামার সাম‌নে কোনদিন বল‌বি না'
অামি অার ভ‌য়ে কিছু বললাম না!
,
পিঠা শেষ ক‌রে মিতু‌কে বললাম,
'‌মিতু চল,বড়মামার কাছ থে‌কে ঘু‌রে অা‌সি'
মিতু বলল,
'ও‌রে বাপ‌রে,অা‌মি যাব না'
অামি মিতুর কোন কথা না শু‌নে ওর হাত ধ‌রে টে‌নে বাই‌রে নিয়ে অাসলাম!
,
বড়মামার বাড়ির সাম‌নে এসে দাড়া‌তেই বড়মা‌মি দৌ‌রে এলেন! অামা‌দের খু‌শি‌তে গদগদ হয়ে বললেন,
'কেমন অাছ‌ বাবা'
'ভাল';
'অাপা কেমন অা‌ছেন?
'মা ও ভাল অা‌ছে'
অামাদের তি‌নি ঘ‌রে নিয়ে বসালেন!
বড়মামার দুরাবস্থা দে‌খে খুব মন খারাপ হল! বড়লোক বা‌পের ছে‌লে হয়েও ফ‌কি‌রের মত জীবন যাপন কর‌ছেন!
অামমি বললাম,'মামী,পারুল কোথায় ?'
মামী বল‌লেন,'ও গোসল কর‌ছে,একটু বস,ও এসে যা‌বে!
একটু প‌রেই পারুল‌কে দেখ‌তে পেলাম,উ‌ঠো‌নে ভেজা কাপর শুকা‌তে দিচ্ছে সে! ভেজা কাল চুলগু‌লো বে‌য়ে পা‌নি গ‌ড়ি‌য়ে পর‌ছে পিঠ বে‌য়ে!
,
পারুল ঘ‌রে এসেই বলল,
'অাপ‌নি স‌ত্যিই এসেছেন?
অা‌মি মুচ‌কি হে‌সে বললাম,হু
'দাদু জান‌তে পার‌লে?'
‌'জান‌বে না'
অামি হে‌সে হে‌সে কথা বল‌ছি,কিন্তু পারু‌লের চো‌খে ভয়!
অারও কিছুক্ষন থে‌কে মিতু সহ বের হ‌য়ে অাসলাম,।
,
দিন শে‌ষে অাবার রাত নে‌মে এল! অামি অপেক্ষা কর‌তে থাকলাম,কখন গান শোনা যা‌বে!
রাত দশটা পার হ‌য়ে ১১ টা বে‌জে গেল গান শোনা গেল না। অগত্যা বাই‌রে এসে দাড়ালাম। নাহ,অাজ গাছতলায় কেউ নেই। অা‌রো কিছুক্ষন অ‌পেক্ষা ক‌রে চ‌লে এলাম। রা‌তে পারু‌লের দেখা পেলাম না!
,
সকা‌লে দাত মাজ‌তে মাজ‌তে বা‌ড়ির বাই‌রে অাসলাম। পারুল ক্লান্ত ভঙ্গি‌তে দা‌ড়ি‌য়ে অা‌ছে । চাক‌দিকটা তাকি‌য়ে নি‌য়ে এগি‌য়ে গেলাম,
'কাল রা‌তে বাই‌রে অাসিস নি?'
শুক‌নো হে‌সে পারুল বলল,
'প্র‌তি‌দিন বের হওয়া যায়?
'‌কিন্তু অা‌মি তো অ‌পেক্ষা ক‌রেছিলাম'
'অাপ‌নি অামার অ‌পেক্ষা কর‌বেন কেন?'
কি উত্তর দেব ভে‌বে পেলাম না। তাই বললাম,
'তোর গা‌নের গলা সুন্দর'
পারুল হে‌সে ফেলল।
বললাম,
'অাজ রা‌তে গান গাই‌বি তো?'
পারুল কিছু বলল না। অামার মু‌খের দি‌কে তা‌কি‌য়ে রইল।
,
রা‌তে অামি কান পে‌তে রইলাম।‌কিন্তু অাজও গান শোনা গেল না।বাই‌রে রএসে দেখি গা‌ছের নি‌চে পারুল দা‌ড়ি‌য়ে। অা‌মি দ্রুত এগিয়ে ‌গেলাম ।
কিন্তু কি বলব ও‌কে?অপ্রস্তত গলায় তাই বললাম,
'খে‌য়ে‌ছিস পারুল?'
পারুল অামার কথার উত্তর না দি‌য়ে বলল,
'অাজ চাদটা কেমন মলিন'
'কই,চাঁদ‌তো ঠিকই অা‌ছে '
'অাপনি কিছু বল‌বেন ?'
অা‌মি বললাম,'চাদটা‌কে অা‌মি সারাজীবন অামার ক‌রে নি‌তে চাই'
পারুল কিছু বল‌তে যাচ্ছিল,এমন সময় পেছন থে‌কে ডাকল,'ভাইয়া,,,.'
মিতুর কন্ঠটা চিন‌তে দেরি হল না অামার!
,
____০৩____
,
পর‌দিন সবাই পারুলের সা‌থে দেখা করার কথা জে‌নে গেল।‌মিতু সবাই‌কে এটাও ব‌লে দিল যে,অা‌মি পারুল‌কে ভা‌লোবা‌সি। সবাই এমনভা‌বে তাকা‌নো শুরু করল যেন অা‌মি কোন মানুষ খুন ক‌রে এসে‌ছি। ছোট অার মেজমাসা বড় মামা মামী‌কে অকথ্য ভাষায় গালি দিল। পারুলে বাই‌রে অাশা এক্কেবা‌রে অসম্ভব হ‌য়ে পরল।
তিন‌দিন পর মা অমো‌দের নি‌য়ে চলে এলেন।
পারুলের সা‌থে শে‌ষ দেখাটাও হ‌লো না।
,
দেখ‌তে দেখ‌তে ক‌য়েক মাস কে‌টে গেল। পারু‌লের সা‌থে কোনভাবেই যোগা‌যোগ কর‌তে পারলাম না।
এক‌দিন ছা‌দে ব‌সে অা‌ছি। একটা অ‌চেনা নাম্বার থে‌কে ফোন এল।রি‌সিভ ক‌রে কা‌নে লাগা‌তেই বলল,
‌'হ্যালো'
'কন্ঠ শু‌নে অা‌মি চমকে উঠলাম।এ যে পারুল!! বললাম,'
পারুল,কেমন অাছ,নাম্বার কোথায় পে‌লে?
পারুল বলল,নাম্বার কোথায় পে‌য়ে‌ছি প‌রে বলব,কাল অামার বি‌য়ে।পারলে এসো!
না হ‌লে চাঁদটা কোন‌দিন তোমার হ‌বে না!
,
ফোনটা কেটে গেল।
ব্যা‌গে ক‌য়েকটা কাপড় নি‌য়ে অামি বেড়ি‌য়ে পরলাম।
,
বাস থেকে নে‌মে কাচা রাস্তায় হাটা শুরু করলাম। ততক্ষ‌নে রাত হ‌য়ে গে‌ছে।
নানা বাড়ি সাম‌নে কাউকে দেখ‌তে পেলাম না। বড়মামার ছোট্টবা‌ড়িটাতে কিছু মানুষ ঘোরাফ‌রো কর‌ছে।
অা‌মি গাছের নি‌চে এসে দাড়ালাম।
কিছুক্ষন পর ব্যাগ হা‌তে এক ছায়ামুর্তি সাম‌নে এসে দাড়াল।তার হাতটা
চে‌পে ধ‌রে হাটা শুরু করলাম।,
,
অাকা‌শে ততক্ষ‌নে পূ‌র্নিমা চাঁদ উঠে‌ছে।চাদটা‌কে তারার মেলা অাকা‌শে।চা‌দের অা‌লোয় কাচারাস্তা ধ‌রে এগি‌য়ে চ‌লে‌ছি অামরা দু‌টি প্রানী। পাড়ি দি‌য়ে‌ছি অজানার প‌থে!!

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.