| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
"যখন সময় থমকে দাঁড়ায়
নিরাশার পাখি দু’হাত বাড়ায়
খুঁজে নিয়ে মন নির্জন কোন
কি আর করে তখন
স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্ন…স্বপ্ন দেখে মন।।"
গানটি শুনতে শুনতে ইজিচেয়ারে বসে দোল খাচ্ছিলেন হামিদ সাহেব। এটি তার অতি প্রিয় একটি গান। সময় পেলেই শুনেন। আর রিটায়ার করার পর তো অফুরন্ত সময়। ছয় বছর হয়ে গেল উনার স্ত্রী মারা গেছেন। খুব বেশি বয়স হয়তো হয়নি ওর। কিন্তু সবই আল্লাহর ইচ্ছা। এসবই ভাবেন হামিদ সাহেব।
নিজের চাকরী জীবনের কথা ভাবছিলেন। প্রথম প্রথম চাকরীতে ঢুকে নিজেকে মানিয়ে নিতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে উনাকে। বয়সে একেবারে কাঁচা ছিলেন। হাল্কা দাড়িগোঁফ দেখা যেত। অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে নিজেকে মনে হত বাচ্চা ছেলে। তবে সবাই মানিয়ে নিতে বেশ সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন। বিশেষ করে তার ইমিডিয়েট বস মঈন সাহেব। ভদ্রলোক বয়সে তার দ্বিগুন হলেও বেশ মিশুক। হামিদ সাহেবের অনাকাংক্ষিত ভুলগুলো নিজ দ্বায়িত্বে ঠিক করে দিতেন। হাঁসিখুশি থাকতেন সবসময়।
এই মঈন সাহেবের বাসায়ই অনেকবার দাওয়াত খেতে গিয়েছেন হামিদ সাহেব। সেখানেই দেখা হয় রুবিনা'র সাথে। রুবিনা মঈন সাহেবের ছোট শালী। খুবই শান্তশিষ্ঠ আর মিষ্টি মেয়ে। দাওয়াত খাওয়ার ফাঁকে দেখা হত তাদের। রুবিনাকে অনেক ভালো লাগতো তার। রুবিনার মাঝে কেমন যেন শিশুসুলভ মায়া ছিল। আর সে হামিদ সাহেবকে অপ্রস্তুত করতে ভালোবাসত মাঝে মাঝেই শিশুসুলভ কিছু আচরণ করে অপ্রস্তুত করে ফেলত তাকে। অপ্রস্তুত অবস্থায় হামিদ সাহেবকে নাকি অনেক সুন্দর লাগে। কথাটি তিনি রুবিনার কাছ থেকেই শুনেছিলেন।
এভাবেই ক্ষণিকের দেখায় ভালোবেসে ফেলেন রুবিনাকে। রুবিনাও ভালোবাসতো হামিদ সাহেবকে। কিন্তু প্রকাশ করতে চাইতো না। দেখা হলেই অদ্ভুত ডঙে হাঁসতো। হাঁসতে হাঁসতে গড়িয়ে পড়ার স্বভাব ছিল রুবিনার। রুবিনার সামনে গেলে সবসময়ই নিজেকে অসহায় লাগতো হামিদ সাহবের। শেষমেষ ঠিক করে ফেলেন রুবিনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবেন।
মঈন সাহেবের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করেন হামিদ সাহেব। মঈন সাহেব খুবই খুশি হন। তিনি হামিদ সাহেবকে বলেন পারিবারিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে। হামিদ সাহেব তার বাড়িতে বিয়ের কথা আলোচনা করেন। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ার সুবাদে তার কথা গৃহীত হয়। তিনি তার বাড়িতে রুবিনার ফটো দেখান। সবাই খুব পছন্দ করে রুবিনাকে। হামিদ সাহেবের বাবা নিজে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান রুবিনার বাড়িতে।
রুবিনার বাবা আগেও দেখেছেন হামিদ সাহেবকে। আর মঈন সাহেবের কাছ থেকে শুনেছেন তার অসংখ্য গুণগান। বিয়ের প্রস্তাবে রাজী হয়ে যান তিনি। রুবিনাও কোন অমত করে নি। কিছুদিন পরই বেশ ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যায় তাদের।
বিয়ের পর নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ ভাবতে থাকেন হামিদ সাহেব। এখনো মনে হলে চোখ ভিজে যায়। চশমার কাঁচটা পরিস্কার করেন তিনি তারপর আবার ভাবতে থাকেন। কি সুন্দর! কি মিষ্টি করে কথা বলতো রুবিনা আর সাথে। শিশুসুলভ চপলতায় সবসময় ভরিয়ে রাখতো তার অন্তর। প্রতিদিনই করতো নিত্যনতুন বায়না। তার বায়না শুনেই হামিদ সাহেবের শহরে আলাদা বাসা নেয়া। শহরে থাকতে চায় রুবিনা। গ্রামের পরিবেশ আর ভালো লাগে না তার। শহরের সুযোগ সুবিধা ভোগ করে অভ্যস্ত হওয়ায় গ্রামে দম বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবারের বড় ছেলে হামিদ সাহেব। পরিবারের সবার প্রতি তার একটা আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। তারপরও তিনি রুবিনার কথা শুনে শহরে বাসা নেয়ার কথা বাড়িতে বলেন তিনি। সবাই কিছুটা মনোক্ষুণ্ণ হলেও সায় দেয়।
রুবিনাকে নিয়ে তার চাকরীস্থল ঢাকাতে দুই রুমের বাসা ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন হামিদ সাহেব। দিনগুলি যেন পাখির ডানায় ভর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। সুখ নামের বস্তুটি এত ভালো করে উপলব্ধি হামিদ সাহেব আর কখনো করেননি। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে রুবিনার সাথে গল্প করেই সময় কেটে যেত। প্রতি সপ্তাহের ছুটিতে তারা ঘুরতে যেতেন। কোনদিন হয়তো চিড়িয়াখানা, কোনদিন শিশুপার্ক, কোনদিন ঢাকার রাস্তায় রিক্সা নিয়ে ঘুরতেন। তখন ঢাকা এখনকার মত এত জনবহুল ছিল না। ঢাকার রাস্তায় অনায়াসে রিক্সা নিয়ে ঘুরা যেত। মাঝে মাঝে হয়তো তারা চলে যেতেন ঢাকার বাইরে। বুড়িগঙ্গার পাড়ে বসে থাকতেন। রুবিনার আবদার মেটাতেই হামিদ সাহেব অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ঘুরে এসেছিলেন কক্সবাজার।
বিয়ের তিন বছরের মাথায় তাদের বড় ছেলে আকিব জন্মায়। কি সুন্দর ফুটফুটে একটা বাচ্চা ছিল আকিব। ওর চেহারাটা দেখলে হামিদ সাহেব তার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত দুঃক্ষ ভুলে যেতেন। দুই বছর পর জন্মায় ছোট ছেলে আরিফ। দুই ছেলেই ছিল তাদের চোখের মনি। ছেলেদের সকল আবদার মেটানোর চেষ্টা করতেন হামিদ সাহেব। শহরের নামী স্কুলে পড়িয়েছেন। বাড়িতে বেশি সাহায্য করতে হত না বলে হামিদ সাহেবের কোন সমস্যা হয় নি।
একদিন বড়ছেলে আকিব বলল সে বিদেশ যাবে। সেখানে গিয়ে পড়াশুনা করবে। হামিদ সাহেব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি মধ্যবিত্ত চাকুরীজীবি। তার ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে লেখাপড়া করানোর এত সাধ্য নেই। তিনি একথা আকিবকে বললেন। কিন্তু আকিবের এক কথা। সে পড়তে বিদেশ যাবেই। আকিবের জেদের কাছে হার মানলেন হামিদ সাহেব। নিজের বাড়িতে কথা বলে খানিকটা জমি বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠালেন। আকিব লন্ডনে পড়াশুনা করতে চলে গেল।
একসময় আরিফও চাইলো লন্ডনে গিয়ে পড়াশুনা করতে। এবার আর তিনি না করলেন না। নিজের শেষ যা সামান্য সম্পদ ছিল তাও বিক্রি করে আরিফকে লন্ডন পাঠালেন। দুই ছেলেই বিদেশ চলে গেল। পড়াশুনা শেষ করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করল। দেশে আর ফিরে এলো না। নিজেদের বাবা-মার খেয়ালও রাখলো না।
"চাচা, আপনার চা।" বৃদ্ধাশ্রমের মেয়েটির কথায় সম্বিত ফিরে পেলেন হামিদ সাহেব। মেয়েটি খুবই ভালো। খুব সুন্দর ব্যবহার করে তার সাথে। ভালো করে যত্ম নেয় তার। বৃদ্ধাশ্রমে আসার পর থেকে মেয়েটির সাথে কথা বলে সময় কাটান। মেয়েটি অনেক কথা বলে তার সাথে। তার মনটাই ভালো করে দেয়। মেয়েটার ঘরে শুধু একা বাবা আছে। বাবা অন্ধ। চোখে দেখে না। সংসারের সমস্ত খরচ মেয়েটি বৃদ্ধাশ্রমে কাজ করে মেটায়।
আজকে মেয়েটার কথা বলার সময় নেই। বাড়িতে যাবে। বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হবে। চা দিয়ে মেয়েটি চলে যায়। হামিদ সাহেব চা হাতে নিয়ে বসে থাকেন। চা ঠান্ডা হয়ে যায়। কানের কাছে বেজে যায় "যখন সময় থমকে দাঁড়ায়।"
©somewhere in net ltd.