নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

Shakhawat Nayon

শাখাওয়াৎ

শাখাওয়াৎ নয়ন: জন্ম ২০ মে, মাদারীপুর জেলার কুন্তিপাড়া গ্রামে নানাবাড়িতে। বাবা মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী মোল্লা এবং মা রিজিয়া বেগম। ক্লাস ওয়ানের ফাইনাল পরীক্ষায় ডাবল শূন্য পেয়ে শিক্ষাজীবনের শুরু হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করতে পেরেছিলাম। সমাজবিষয়ক গবেষণা দিয়ে আনুষ্ঠানিক কর্মজীবন শুরু। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পাবলিক হেলথ’-এ পিএইচডি করছি। বাল্যকালে ছোট চাচাকে পত্র লেখার মধ্য দিয়ে লেখালেখিতে হাতেখড়ি। ঢাকা, কলকাতা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও লন্ডন থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও গল্প, উপন্যাস লিখি; পাশাপাশি এসব দেশের অনলাইনভিত্তিক পত্রিকাতেও বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি করি। "ব্যাপ্টিস্ট চার্চ এবং একটি টিকটিকির গল্প (২০১২)" আমার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। "অদ্ভুত আঁধার এক (২০১৩)" প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। "নিয়তিপাড়ে গলে যাওয়া ডিমগুলি" (২০১৪) প্রথম নিবন্ধ গ্রন্থ।

শাখাওয়াৎ › বিস্তারিত পোস্টঃ

মায়াবতী (অনুগল্প)

১০ ই জুন, ২০১৪ দুপুর ২:৪২

সকাল এগারোটা, টাওয়াল দিয়ে ভেজা চুল ঝারছি। চায়ের কাপ হাতে মা এসে বললেন, খবর শুনেছিস শুভ্রা?

কী খবর?

মাহবুবকে বাড়িতে এনেছে।

অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলাম না। মা থেমে থেমে বললেন, ভালো মন্দ যা খেতে চায় ডাক্তাররা খাওয়াতে বলেছে। মায়ের দিকে তাকাতে পারছি না। তারপরেও তাকালাম, মায়ের চোখে জল টলমল। নিজেকে কিছুটা সামলিয়ে বললাম, ছি: মা, কাঁদেন কেন?

মা স্বাভাবিক গলায় বললেন, না, কাঁদি না তো। নে চা’টা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।



মা অশ্রু লুকাতে পারছেন না, আঁচলে চোখ মুছছেন। মায়েরা কত রকমের দু:খ পুষে রাখে!

এত কিছুর পরে মাহবুবের কথা ভেবে কি আর কাঁদতে আছে? হয়তো আছে। আমারও ভীষণ কান্না পাচ্ছে, থামাতে পারছি না। বাথরুমে গিয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিলাম। কিন্তু দু:খ কি ধুয়ে ফেলা যায়? নিজেকে একটু গুছিয়ে বের হতেই দেখি আকাশ ভরা মেঘ। চারিদিক কেমন অন্ধকার।



এ আমার কেমন দিন? শরীর মণ কোনোটাই ভালো নেই। মাহবুবের খবরটা তিন চারদিন আগেই শুনেছি। একদম যেতে ইচ্ছে করেনি বা একবারও দেখতে ইচ্ছে করেনি তা নয়। খুউব দেখতে ইচ্ছে করেছে। যদিও এমনটা হওয়ার কথা না। পৃথিবীতে কাউকে ঘৃনা করলে মাহবুবকেই করি। তারপরেও দেখতে ইচ্ছে করছে। যার প্রতি এত ঘৃনা, তাকে আবার দেখার কি আছে? কিন্তু ঘৃনা তো মানুষ তাকেই করে, যাকে অনেক ভালোবাসতো।



দু’পা হেটে রিকশা নিলাম। আড়িয়াল খাঁর পাশ ধরে যাচ্ছি। নদীর বুকে পালতোলা নৌকায় কত রকমের সুখ দু:খ দুলছে! প্রায় ভর দুপুরে মাহবুবদের বাড়িতে পৌঁছালাম। কত দিনের চেনা ঘর-বাড়ি, কেমন অচেনা লাগছে। বাড়ি ভর্তি মানুষ কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না। মাহবুবের ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। দরজায় গিয়ে আর পা চলে না। কিছুতেই চৌকাঠ পেরুতে পারছি না। অথচ এই ঘরটিতেই একদিন আমাদের বাসর হয়েছিল। পরদিন জ্বর...। মাঝখানের ছ’সাত মাস বাদ দিলে এখানেই তো নয় দশটা বছর কেটেছে। সেই রড আয়রনের খাট, কচ কচ শব্দ, ফিসফিস করে কথা বলা দিনগুলি।



কত স্মৃতি! প্রথম চিঠি পাঠালো বইয়ের মধ্যে, সে তো চিঠি নয় যেন এক শিল্প কর্ম। কী কারুকাজ, কী নিপুন হাতে লেখা! এক পৃষ্ঠার চিঠিতে ষোলোটি বক্সের এক ম্যাট্রিক্স। ‘দেবী’ সম্বোধনে লেখা। একটা চিঠি এতখানি মুগ্ধ করতে পারে, কোনোদিন ভাবতেই পারিনি।

কী উদ্ভট সব কান্ড করতো! তখন ক্লাস টেন এ পড়ি। একটা গাধা নিয়ে স্কুলে হাজির। পকেটে সিঁদুর আর রেজর। জয়নাল স্যার বিএসসি’র মাথায় রক্ত উঠে গেল। কিন্তু মাহবুবকে কে ঠেকায়? প্রাকটিক্যালে ‘গাধার কপালে সিঁদুর লাগানো পরীক্ষণ’ করবেই করবে। মার’টাও খেয়েছিল। জোড়া বেতের পিটুনীতে জ্বরে পড়লো, বেশ কিছু দিন স্কুলে আসতে পারেনি। তারপর আবার পাগলামি...। নানান ধরনের পাগলামি! চৈত্র মাসের এক ভর দুপুরে মাঠের মধ্যে ঠায় দাড়িয়ে চিৎকারে করে বললো--

শুভ্রা তোমাকে ভালোবাসি।



লজ্জায় মরে যাবার যোগাড়। কয়েকদিন পর জিজ্ঞেস করলাম, কতখানি?

কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে কিছুই না বলে চলে গেল। কিন্তু মাথায় ঢুকলো, কিভাবে ভালোবাসা মাপার যন্ত্র বানানো যায়? কী পাগল ছেলে! সেই মাহবুব এখন মুমূর্ষু। আহা: একবার মনে হচ্ছে ছুটে যাই, আবার মনে হচ্ছে না থাক। কিন্তু ওর হাতটা খুউব ধরতে ইচ্ছে করছে। ঐ হাত ধরেই তো একদিন কৃষ্ণপক্ষের রাতে ঘর ছেড়েছিলাম।

দুয়ার ধরে দাড়িয়ে আছি। মাহবুব অচেতন, শিয়রে ক্লান্ত অল্প বয়ষ্কা এক অভাগী। মাহবুবের মলিন মুখখানি চোখে পড়তেই বুকের মধ্যে কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠলো। আহারে! এমন করুন মুখ কখনই দেখতে চাইনি। এই মানুষটাই একদিন বলেছিল--

শুভ্রা, তোমাকে ছাড়া বাচঁবো না।



মাহবুবের স্ত্রীর শীতল দৃষ্টি আমাকে ছাড়িয়ে অন্য দিগন্তে। অমন দৃষ্টি কি উপেক্ষা করা যায়? তাই না দেখার মতো করে মাহবুবকে আরেক বার দেখলাম। বিশ্বাসের বাঁধন ছেড়া সেই দিনগুলির কথা মনে পড়ে গেল। কত রকম কথার ছলে সত্য গোপন করতো! আবার মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতো, বুঝেছো? উত্তরে বলতাম--

যা বললে তার অধিকাংশই বুঝিনি। যা বলোনি তার অনেকখানিই বুঝেছি।



মাহবুবের চেহারায় চিন্তার ভাঁজ, শ্বাস-প্রশ্বাসে ছেদ পড়তো। বিশ্বাসের ফাটল কি চোখে না পড়ে পারে? কিন্তু মানুষ কি এতটাই বদলায়? বদলায়। নষ্টামি করার আগেই মানুষ নষ্ট হতে থাকে। আমার বাচ্চা-কাচ্চা না হওয়ায় ওর হতাশাটা বুঝতাম। কিন্তু আমারও কি দু:খ কম ছিল? মাস চারেক আগে যেদিন জানলাম আমি অন্ত:স্বত্ত্বা সেদিনই মাহবুবের বিয়ের খবরটা পেলাম। জীবনের শ্রেষ্ঠতম সুসংবাদটি ঐ ভয়ংকর দু:সংবাদই খেয়ে ফেললো। নিজের জন্য, সন্তানের জন্য ভীষণ মায়া হলো। বুকের মধ্যে কেমন জানি হু হু করে উঠলো। দুরে কোথাও, সেদিন অনেক দুরে চলে যেতে ইচ্ছে করেছিল।



গর্ভের সন্তান আর মাহবুবের জন্য আজ গভীর বিষাদে মনটা ভারী হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদি। যে চলে যাচ্ছে তার জন্য, যে আসবে তার কথা ভেবে আরেক বার...।



--[শাখাওয়াৎ নয়ন]



মন্তব্য ১৮ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (১৮) মন্তব্য লিখুন

১| ১০ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৩:০০

সৌরভ১৫ বলেছেন: ভালোবাসা কেন জানি একসময় শেষ হয়ে যায়!

১০ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:২০

শাখাওয়াৎ বলেছেন: হু...কারো কারো বেলায় শেষ হয়।

২| ১০ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:০৯

সোজা কথা বলেছেন: অসাধারণ! আর কিছুই বলার নাই!

১০ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:১৯

শাখাওয়াৎ বলেছেন: ধন্যবাদ। অনেক।

৩| ১০ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:২৪

মামুন রশিদ বলেছেন: বৃষ্টি ভেজা দিনে বিষাদ মাখা গল্প পড়লাম । ভালো লিখেছেন ।

১০ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:২৯

শাখাওয়াৎ বলেছেন: 'মায়াবতী' গল্পটি ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক প্রথম আলোর ভালোবাসা সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পটি আজ লিখি নাই। ধন্যবাদ মামুন ভাই।

৪| ১০ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:৪৪

স্বপ্নছোঁয়া বলেছেন: নষ্টামি করার আগেই মানুষ নষ্ট হতে থাকে!!
লিখা ভালো লেগেছে।

১০ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৫:১৭

শাখাওয়াৎ বলেছেন: ধন্যবাদ। আপনাকে। 'বিশ্বাসের ফাটল কি চোখে না পড়ে পারে?'

৫| ১০ ই জুন, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:২৩

সুমন কর বলেছেন: ভাল লাগল।

১১ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৪:১৪

শাখাওয়াৎ বলেছেন: ধন্যবাদ।

৬| ১০ ই জুন, ২০১৪ রাত ৮:১৫

শুকনোপাতা০০৭ বলেছেন: খুব সুন্দর.. ভালো লাগল :)

১১ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৪:১৪

শাখাওয়াৎ বলেছেন: ধন্যবাদ।

৭| ১০ ই জুন, ২০১৪ রাত ৮:৩০

পাজল্‌ড ডক বলেছেন: ভালো লেগেছে, শেষের টাচ টা।

১১ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৪:১৫

শাখাওয়াৎ বলেছেন: ধন্যবাদ।

৮| ১১ ই জুন, ২০১৪ রাত ১২:৩৪

দিনের শেষ আলোকবিন্দু বলেছেন: খুব সুন্দর একটা এন্ডিং।
ভালো লেগেছে।

১১ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৪:১৫

শাখাওয়াৎ বলেছেন: ধন্যবাদ।

৯| ১১ ই জুন, ২০১৪ রাত ১:১১

মিনুল বলেছেন: সুন্দর লেখা। শুভকামনা রইলো।

১১ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৪:১৫

শাখাওয়াৎ বলেছেন: ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.