| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শোভন রাজ
ভালবাসি লিখতে। থাকতে চাই আমার দেশের মানুষের পাশে। জানাতে চাই আমার মনের কথা গুলো।
আমাদের টেস্ট একাদশের ব্যাটিং লাইন আপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি হল তিন নম্বর বা অন ডাউন। বিশ্বের সকল মহারথিদের ব্যাটিং করার পজিশন এই অন ডাউন। যেকোন ভালো টেস্ট খেলেড়ু দেশের অন ডাউন পজিশনে আসে তাদের দেশের সেরা ব্যাটসমানটি, যে কিনা নতুন লাল বলের সুইং ও পুরাতন বলের টার্নিং, এই দুইটাতেই সমানভাবে দক্ষ। যার মানসিকতা হবে ধীর স্থির ও দৃঢ়। ক্রিকেটের ভাষায় বলতে গেলে যাকে হতে হবে টেকনিক্যালি সাউন্ড। সামনে থেকে লড়ে যাওয়ার সাহস ও মেধা দিয়ে বিপক্ষ দলকে ঘায়েল করার কৌশল। এখানে যে উপমা বা শব্দ ব্যাবহার করলাম তার প্রতিটিরই ব্যাখ্যা আমি পরবর্তী অংশে উপস্থান করার চেষ্টা করেছি আমাদের দেশের ব্যাটিং লাইন আপের সাথে তুলনা করে। মোদ্দা কথা হল, যে তিন নম্বর পজিশনে ব্যাটিং করবে সে হবে আমাদের দেশের টেস্ট খেলোয়াড়দের মধ্যে সেরা। উদাহরণ হিসাবে আমি বর্তমান সময়ের ও কিছুটা অতীতকে উপস্থাপন করতে চাই। অস্ট্রেলিয়ার রিকি প্নটিং, ভারতের রাহুল দ্রাবিড়, শ্রীলংকার সাঙ্গাকারা, সাউথ আফ্রিকার হাসিম আমলা, ইংল্যান্ডের পিটারসন, তারও কিছুটা আগে মাইকেল ভন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রায়ান লারা। আরো অনেকেই হয়তো আমার উদাহরণ থেকে বাদ পরে গিয়েছেন।
এবার আসি আমার আসল কথায়। বাংলাদেশ টেস্ট খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে ২০০০ সাথে। আমারা একযুগ পার করে ফেলেছি টেস্ট ক্রিকেটে। সংখ্যাতে অনেক বেশি মনে হলেও, মনে হচ্ছে এই তো সেদিন আমরা টেস্ট খেলা শুরু করলাম। কিন্তু আধুনিক সময়ের চিন্তা ভাবনার এই যুগে ১২টা বছর অনেক বেশি।
আমরা যখন টেস্ট খেলা শুরু করি তখন আমাদের অন ডাউনের পজিশনটি অনেকটা যোগ্যতার ভিত্তিতেই আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দখলে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কিছুটা নতুন পেস বোলিং খেলার দিক বিবেচনায় স্থানটি হাবিবুল বাশারের দখলে যায়। হাবিবুল বাশার ওই পজিশনটির যে যোগ্যতম ছিল, সেটা সে প্রমাণ করেছিল। পেস বোলিংকে সোজা ব্যাটে খেলার যোগ্যতার কারণে স্বভাবতই সে ওই পজিশনে ভাল রান পেতে শুরু করে। আর তাই আমাদের ওই পজিশনে বিকল্প কোন খেলোয়াড়ের চিন্তা করতে হয়নি। নতুন লাল বলের সুইং ও পেসকে সামলানোর জন্যে একজন ব্যাটসম্যানের যেটা দরকার সেটা হল, খুব লম্বা ফর্মফুটে না গিয়ে সোজা ও শক্ত ব্যাটটাকে অনেক উপর থেকে দ্রুততার সাথে চালানো। ব্যাটটাকে অনেক উপর থেকে অনেকটা বড় শর্ট খেলার মত করে পেস বলটাকে খেলতে হয়। হাফ বলি বা ফুল লেন্থের বলগুলো, সজোরে হাকিয়ে না খেলে অনেক উপর থেকে শক্ত ব্যাটে স্যাডো স্টাইলে খেলাটাই টেস্টের জন্যে যথেষ্ট। শর্টটা যদি গ্যাপে যায় তাহলে চার বা দুই রান পাওয়া যায়। সব ব্যাটসম্যানের খেলার স্টাইল এক না হলেও, বিশ্বের প্রসিদ্ধ সকল অন ডাউন পজিশনের ব্যাটসম্যানের এই যোগ্যতাটা আছে। ঠেকানোর বল বলে একভাবে আর চার মারার বল বলে হাকিয়ে শর্ট খেলার প্রবণতাটা হাবিবুল বাশারের অনেক কম ছিল, তাই ওই পজিশনে ব্যাটিং করে সে সাফল্য লাভ করেছে।
নতুন লাল বলে খেলার যোগ্যতা আমাদের দেশের তখনকার সময়ে খুব কম খেলোয়াড়ই ছিল। তাদের মধ্যে থেকে ওপেনিং দুই ব্যাটসম্যান এবং তিন ও চার নম্বরের কিছুটা ছিল। প্রথম দিকে ঐ পজিশন গুলোতে যোগ্যতা সম্পন্ন খুব অল্প ব্যাটসম্যান পেয়েছিলাম। ব্যাটংয়ের যোগ্যতা অনুসারে অনেকটা আগেই আমারা টেস্ট স্টাটাস পেয়েছিলাম। কেন এটা বললাম তার কারণ টেস্ট স্টাটাস পাওয়ার আগে আমাদের ফার্টস ক্লাস ক্রিকেটে আমাদের ব্যাটসম্যানদের লম্বা ইনিংস খেলার পর্যাপ্ত সুযোগ বা বড় কোন স্কোর করার নজির তৈরী হয়নি। ওয়ানডে স্টাটাস পাওয়ার পর এডি বার্লোর পরামর্শে আমাদের দেশে তখন যে অবকাঠামো তৈরী হয়েছিল সেটাও পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার আগেই আমরা টেস্ট স্টাটাস পেয়ে যাই। ১৯৯৭ সালের পর মাত্র তিন-চার বছরের মাথায় আমরা টেস্ট খেলার যোগ্যতা অর্জন করি, তার মানে মাত্র তিন বছরের মাথায় বড়জোর তিনটা জেনারেশন উপলব্ধি করার সময় পায় যে তাদের টেস্ট খেলতে হবে। এত অল্প সময়ে একটা ১২-১৪ বছরের ছেলের টেস্ট খেলার মনমানসিকতা ও যোগ্যতা অর্জন করা সত্যিই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমরা যেদিন টেস্ট খেলা শুরু করি তখন আমাদের ব্যাক আপ বেঞ্চের খেলোয়ার বলতে যারা ছিল তারা হল রোকন, হান্নান সরকার, জামাল উদ্দিন আরো অনেকে। এদের বয়স যখন ১২-১৪ তখন তারা কখনো ৫০ওভারের ম্যাচ খেলেছে কিনা সন্দেহ, আর টেস্ট ম্যাচের আদলে তিন/ চার ম্যাচ খেলার কথাতো অকল্পনীয়। তার মানে আমাদের অভিজ্ঞটা যে কি ছিল তা ফিরে তাকানোটা তখনকার সময়ে অবিবেচিত মনে করাই শ্রেয়, আর তা না হলে টেস্ট স্ট্যাটাসটাই হয়তো পাওয়া হতোনা। আমারা যাদের সাথে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেছি তখন তাদের দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বেশির ভাগই ১২-১৩ বছর থেকেই তিন/চার দিনের ম্যাচ খেলে আসছে ও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে দুইশ বা লম্বা ইনিংস অহরহ খেলে আসছে। আমরা কি তখন থেকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিয়ে চিন্তা করেছি? শুধু অবকাঠামো তৈরী করে আমারা প্রতিভার আশায় বসেথাকা ছাড়া কি আর কিছু আমারা করেছি। যাই হোক আবেগি কথা থেকে সরে এসে আসল কথায় আসি। যা বলছিলাম, হাবিবুল বাশার। তার অন ডাউনের পরিসংখ্যানটা একবার দেখা যাক। পরিসংখ্যানে হাবিবুল বাশারের সাথে মোহাম্মদ আশরাফুল ও শাহারিয়ার নাফিসের উপাত্তগুলো দেখাযাকঃ
হাবিবুল বাশারঃ
Span Mat Inns NO Runs HS Ave BF SR 100 50 0 4s 6s
3rd position 2000-2008 43 80 1 2523 113 31.93 4180 60.35 3 19 6 331 3
4th position 2002-2008 9 13 0 218 53 16.76 413 52.78 0 1 1 30 0
5th position 2001-2007 5 6 0 285 76 47.50 427 66.74 0 4 0 40 1
আশরাফুলঃ
2nd position 2002-2002 1 1 0 22 22 22.00 28 78.57 0 0 0 3 0
3rd position 2002-2008 3 4 0 33 27 8.25 65 50.76 0 0 2 4 0
4th position 2002-2011 24 44 0 691 77 15.70 1618 42.70 0 3 7 87 1
5th position 2001-2010 32 53 3 1239 158* 24.78 2520 49.16 3 4 7 152 17
6th position 2001-2009 7 8 1 408 129* 58.28 897 45.48 2 1 0 52 3
7th position 2001-2001 1 1 0 26 26 26.00 53 49.05 0 0 0 4 0
শাহারিয়ার নাফিসঃ
1st position 2008-2008 1 1 0 12 12 12.00 25 48.00 0 0 0 3 0
2nd position 2005-2007 9 17 0 476 138 28.00 844 56.39 1 2 2 66 0
3rd position 2008-2012 10 20 0 558 97 27.90 931 59.93 0 4 2 89 1
4th position 2005-2006 3 5 0 131 51 26.20 261 50.19 0 1 0 19 0
5th position 2008-2008 2 3 0 50 28 16.66 148 33.78 0 0 0 6 0
হাবিবুল বাশার যখন তিন নম্বরে ব্যাটিং করে তখন থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মদেরকে ঐ পজিশনের তৈরী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল কি না জানি না। তবে পরিকল্পনা নেওয়া হয়ে থাকলেও সেটা যে সাফল্য অর্জন করেনি, সেটা আমরা এখন উপলব্ধি করছি। ঐ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের হয়ে বাশারের ব্যাটিং গড় ত্রিশ রাখাটা সত্যই অভাবনীয় মনে হয়। বুলবুল, আকরাম, দুর্জয় কারোরিই ঐ পজিশনে ব্যাটিং করার ইচ্ছা, টেকনিক্যাল জোড় কিংবা সময় ছিল না। অনুর্ধ ১৭ দল থেকে আশরাফুলকে দলে নেওয়া হয়। ওপেনার ব্যাটসম্যান ছিল আশরাফুল, কিন্তু তারপর অভিজ্ঞতার কারণে তাকে পাঁচ/ ছয় নম্বরে ব্যাটিং করতে হয়েছে। সাধারণভাবে এটাই হতে দেখেছি পন্টিং শচীনদের বেলায়। ছয় নম্বরে আশরাফুলের ব্যাটিং গড় ৫৮দশমিক দুই আট, ২টি শতক আর একটি অর্ধশতক। আবেগ ও প্রতিভার দাবিতে আশরাফুল উপরের দিকে ব্যাটিঙয়ে যাওয়ার দাবীদার হলেও, বয়স আর অভিজ্ঞতার বিচারে আমাদের সেইদিন আশরাফুলকে উপরের দিকে ব্যাটংয়ে পাঠানো উচিত হয়নি। এবার আসি আমাদের বর্তমান দলের তিন নম্বর পজিশনে। শাহারিয়ার নাফিস এখন তিন নম্বরে ব্যাট করে। প্রথমে সে এসেছিল ওপেনার হিসাবে, অনেক বাধা ও উত্থান পতনের মধ্যেদিয়ে সে গতকিছু বছর ধরে তিন নম্বরে ব্যাটিং করে আসছে। ঐ সেই একই কারণ। নতুন বল খেলার যোগ্যতার কারণে সে মোটামুটি দায় সারা পারফর্মন্সের উপর দিয়ে ঐ পজিশনে ব্যাটিঙয়ে যাওয়ার দাবীদার। বিকল্প হিসাবে কে আছে? আছে জুনায়েদ সিদ্দিকি। আমাদের পাশের দেশ ভারতের সুনীল গাভাস্কারের ধারাভাষ্যের থেকে শোনা একটা উদাহরণ না দিলেই নয়, তাদের টেস্ট দলের নির্বাচকরা ব্যাটসম্যানদের টেকনিক্যাল যোগ্যতার ভিত্তিতে স্মরণে আনে আর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দলে টানে। টেকনিক্যাল দিক দিয়ে আপনি যদি সম্পূর্ণ হোন, সাফল্য আপনাকে ধরা দিতে বাধ্য। আমাদের দেশে নির্বাচকরা দেখে সাময়িক পারফর্মেন্স। টেকনিক্যালি সে তিন নম্বরে ব্যাটিঙয়ের যোগ্য কিনা, তারা সেটা বিবেচনা করে বলে মনে হয় না। খেলতে গেলে আপনার পারফর্মেন্সের উত্থান পতন দুইটাই থাকবে, ভাল পারফর্মেন্সের সময় আপনাকে সবাই মাথায় করে রাখবে, কিন্তু খারাপ পারফর্মেন্সের সময় আপনাকে ভুলে যাবে, আপনার দিকে আঙ্গুল তুলবে। শুধুমাত্র টেকনিকই ঐ খারাপ অবস্থায় আপনার সাথে থাকবে এবং সেই’ই আপনাকে খারাপ সময় থেকে বেড়িয়ে আসতে সাহায্য করবে। শচীন পন্টিংদের অনেক খারাপ যেতে দেখেছি, কিন্তু তারা টেকনিক্যাল ব্যাটিংদিয়ে খারাপ সময়ের বলয় থেকে বেড়িয়ে এসেছে।
ব্যাটিং টেকনিকের দিক দিয়ে নাফিসের দুর্বল ফুটয়ার্ক, শর্ট খেলার সময় তার স্টাবিলিটি হাঁড়ায় ফেলা, ক্রস ব্যাটে শর্ট খেলার প্রবণতা, মানসিকভাবে ধীর স্থির না হওয়ার কারণে তাকে নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার সময় আমাদের না। পরবর্তীতে যাদেরকে নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করতে পারি তাদের মধ্যে আছে এবং ছিল তারা হলেন জুনায়েদ সিদ্দিক,রকিবুল, জহিরুল। কিন্তু তাদের কেউই টেকনিক্যালি খুব ভাল না, তবে রকিবুল কিছুটা ধীরস্থির মনমানসিকতার কারণে ও কিছুটা সোজা ব্যাট চালানোর কারণে বিবেচনার দাবীদার।
আমাদের বর্তমান ব্যাটিঙয়ে চার, পাঁচ ও ছয়ে ব্যাটিং করেন সাকিব, মুসফিক ও মাহামুদুল্লাহ। তাদের ঐ পজিশন গুলোতে ব্যাটিং ধারাবাহিকতা, ম্যাচের মধ্যমভাগ ও শেষেরভাগ পরিচালনা করার দায়িত্ব ভালভাবে পালন করে আসছে। আসলে ঐ পজিশনে ব্যাটিঙয়ে আশরাফুল, অলক এরাও সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু যখনই দলের প্রয়োজনে আশরাফুল অলকরা উপরের দিকে ব্যাটিঙয়ে গিয়েছে তখনি তাদের খারাপ পারফর্মেন্সের সূত্রাপাত, তখন কিন্তু ঐ পাঁচ ছয় পজিশনে সাকিব মুশফিকরা পুরাতন বলে মোটামুটি রান পেতে শুরু করেছে, আর অলক আশরাফুলদের দল থেকে বাদ পরতে হয়েছে।
এখন আমাদের সময় এসেছে তিন নম্বর পজিশনটাকে নিয়ে চিন্তা করার। সাকিব মুশফিক, মাহামুদ্দুলাহদের সময় এসেছে পরীক্ষা দেওয়ার। কেননা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আনামুল, মনিমুল, সৌম্য সরকারদের আগে সাকিব মুশফিক, মাহামুদ্দুলাহদের তিন নম্বর বা নতুন বলে ব্যাটকরার সময় এসেছে। যতই দলের সাফল্যের কেন্দ্রে থাকুক না কেন, সাকিব মুশফিক, মাহামুদ্দুলাহদের এখনই পরীক্ষাদিয়ে বোঝানোর সময় এসেছে যে তারা সামনে থেকে লড়াই করার যোগ্যতর কিনা? আর তারা যদি তিন নম্বরে ব্যাটিঙয়ের যোগ্যতর না হয় তবে তিন নম্বরকে সন্মান দেখিয়ে তাদের ঐ চার পাঁচ ছয় পজিশন নিয়ে চিন্তাভাবনা করা উচিত। আর পরবর্তীতে আমাদের ঐ পজিশনটাতে যাদের আশার সম্ভাবনা যাদের আছে তাদেরকে এখন থেকেই পারফর্মন্সের পাশাপাশি টেকনিকের ব্যাপারে নজর দেওয়া উচিত। তা’না হলে আনামুল, মনিমুল, সৌম্য সরকারদের ঐ পাঁচ ছয়ে ব্যাটিংকরতে দেখাযাবে আর মুশফিক, মাহামুদ্দুলাহদের ত্রিশ বছরের পরিপূর্ণ বয়সে জীবিকা নির্বাহের জন্যে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করতে হতে পারে।
©somewhere in net ltd.