নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

রোকসানা লেইস

প্রকৃতি আমার হৃদয়

রোকসানা লেইস › বিস্তারিত পোস্টঃ

টরন্টো থেকে মনোরম পথে অত্যাশ্চর্য সুন্দর দ্বীপ কেপ ব্রেটন ক্যাবট ট্রেইল

০৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:২৬




দুই হাজার সাত সালে তৃতীয়বারের মতন আবার রওনা দিলাম কানাডার পূর্বদিকের শেষ প্রান্ত দেখার জন্য। আগে দুইবার ঘুরে এসেছি। গিয়েছি উত্তর পূর্বদিকের একপাশের ছোট দ্বীপ প্রিন্স এডওয়ার্ড আয়ল্যান্ড পর্যন্ত। এবার ইচ্ছা, দক্ষিণ পূর্বের শেষটা দেখা।
পৃথিবীর দ্বিতীয় বিশাল দেশে থেকে যদি তার সবটুকু না দেখি তাহলে নিজেকে বঞ্চিত করা হয় বিশাল সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্য দেখা থেকে। এমন না যে দেখতেই হবে। এই দেশে জন্ম নিয়ে সারা জীবন কাটিয়ে, অনেককে দেখেছি নিজের শহরের বাইরে কোথাও যায়নি কখনো। তাদের ইচ্ছে করেনা বলে যায় না। কিন্তু আমি তো পছন্দ করি ঘুরতে, দেখতে পৃথিবীর রূপ, জানতে অজানাকে। যাযাবর স্বভাবে পৃথিবীর সব জায়গার মাটির ধূলোমাটি নিজের মনে করে তার সাধ, গন্ধ, রূপ নিজের করে নিতে চাই।
এবারের বেরিয়ে পরার পিছনে আরো একটা বিশাল কারণ খুব ইচ্ছে করছে সমুদ্রের জলের সাথে ভাব করতে। বাড়ির কাছেই আছে বিশাল হ্রদ। কয়েকটা। সমুদ্রের মতনই তার বিশালতা ঢেউও ওঠে সমুদ্রের মতন কিন্তু তবু সে সমুদ্র নয়। তাই হয় পশ্চিমে নয় পূবে যেতে হবে, সমুদ্রের সাথে ভাব করতে। পূর্ব দিকটাই বেছে নিলাম এবার সময়ের হিসাব করে। যতই বোহেমিয়ান হই যাপিতজীবনের পিছুটান পায়ে শিকল পরিয়ে রাখে। অনেক জঞ্জাট পেরিয়ে ছুটি নিতে হয়।
নিউ ব্রন্স উইকের বে অফ ফান্ডি সমুদ্র সৈকত আমার খুব পছন্দের একটা জায়গা। আর ছোট প্রভিন্স প্রিন্স এডয়ার্ড আয়ল্যান্ড তার চারপাশ ঘিরে কয়েকটা উপসমুদ্র। মশৃণ বালুর সৈকত খুব ভালোলাগার জায়গা। তবে দেখা হওয়া জায়গায় আবার না গিয়ে নতুনের কাছে যেতে চাই আমি।

সেই সময়টা বর্তমান সময়ের মতন এত সহজ ছিল না পথ চলা। হাতে মোবাইল ফোন থাকলেও তার ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল শুধুই ফোন করায়। আর কোন কার্যক্রম ছিল না ফোনের এবং অনেক ব্যায় ছিল ব্যবহারে। শহরের বাইরে গেলেই বাড়তি চার্জ যুক্ত হতো।
কয়েকদিন কাজের পরে খাটাখাটি করে গুগোল ম্যাপ থেকে পথ বাছাই করে নিজের মতন একটা পথ তৈরি করেছিলাম। প্রায় দুই আড়াই হাজার কিলোমিটার পথের দিশার ভিতর খোঁজে খোঁজে। কোথায় থাকা হবে আর কোথায় বেড়াব তার অনেক হিসাব করে নিজের মতন রাস্তার মানচিত্র প্রিন্ট করে নিলাম। ট্রান্স কানাডার সোজা এক নাম্বার রাস্তা বাদ দিয়ে, ভিতর দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে যাওয়ার পথ পছন্দ করলাম।
যতটা যাওয়া হবে ততটা পথ ফিরতে হবে। সাথে আরো ঘোরাঘুরি সব মিলিয়ে পথ চলা হয়েছিল সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটারের বেশি। এইবার প্রথম আমার গাড়ি ছিল নতুন ঝকঝকে। মাত্র পাঁচ হাজার কিলোমিটার চলেছি তখন। গাড়িটা ছিল নতুন প্রযুক্তির প্রথম আসা হাইব্রিড যার তেল খরচ ছিল অসম্ভব কম।
বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে পথে নামলাম। দু তিনবার বিরতি নিয়ে, দশ ঘন্টা মতন চলে কুইবেক সিটি ছাড়িয়ে ছোট একটি শহরে প্রথম দিনের জন্য রাত্রী যাপনের আস্তানা নিলাম ছোট একটি মটেলে। রাতে বেশি কিছু করার ছিল না। শাওয়ার নিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম। খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি সারিসারি এফিটাফ লেখা স্মৃতিস্তম্ভ। করবস্থান ঠিক ঘরের পিছনেই। এত মৃত মানুষের পাশেই রাত্রী কাটালাম ! আগে জানলে হয় তো এমন জায়গায় উঠতাম না। কিন্তু সমস্যা কিছু হয়নি আমার ঘুমানো দরকার ছিল আর খুব ভালো ঘুম হয়েছে এটাই জরুরী।

এখন আবার বেরিয়ে পরব অজানার উদ্দেশ্যে। এবার যাবো সমুদ্রের পাড় ধরে যে রাস্তা গিয়েছে সেটা ধরে। অনেকটা ঘোরা পথ কিন্তু তাতে সমস্যা নাই। আমি ঘুরতে বেড়িয়েছি আর দেখে দেখে যাবো। যেখানে ভালোলাগবে সেখানে থেমে সেই জায়গার সৌন্দর্য উপভোগ করব। পথ লম্বা হোক, সময় লাগুক তাতে সমস্যা নেই আমার। ব্রেকফাস্ট সেরে ছোট শহর ঘুরে দেখে পথ খুঁজে চলে এলাম সমুদ্র একপাশে আর পাহাড়ের সারিওলা একপাশের পথে। চলছি তো চলছি এ চলার যেন কোন শেষ নেই। সারাদিন চলার পর যখন পথে সন্ধ্যা নামল। সূর্য ডুবছে একধারের সাগর জলে। অন্য পাশে পাহাড়ের সারি। নিরব রাস্তায় নেমে সূর্যাস্তের ছবি তুলে নিলাম। সূর্যটা ডুবে যাচ্ছিল সাগরের জলে। অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য।
অন্ধকার হওয়ার আগেই গ্রামের একটি দোকানের ঝাঁপি বন্ধ হওয়ার আগে কিছু শুকনো খাবার কিনে রাতের গন্তব্যের খোঁজে বেরুলাম।
ধূধূ প্রান্তর জনমানুষের বসতিহীন শুধুই প্রকৃতির বসবাস। আকাশ, মাটি, গাছ, পাখি, প্রাণী, সন্ধ্যাতারা অন্ধকার সাথে ছুটতে ছুটতে বুঝতে পারলাম আজ রাতের জন্য কোন মানুষ্য তৈরি আবাস মিলবে না। রাস্তার শেষে দূরে তখনও মৃদু গোলাপি আভার টান দেখা যাচ্ছে দিগন্ত জুড়ে, সে আলো অনুসরন করে যেখানে পৌঁছুলাম মনে হলো স্বর্গে চলে এসেছি। এর চেয়ে ভালো থাকার জায়গা আর হয়না। সামনে সমুদ্র ঢেউ তুলে নাচছে। আকাশ যেখানে জলের সাথে মিশেছে। সূর্য ডোবার রঙ ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। বে অফ ফান্ডির অপূর্ব গোলাপী আভা সাগর জড়িয়ে আমাদেরও জড়িয়ে ধরেছে। ধীরে ধীরে গোলাপী রঙ হালকা নীলাভ আলোয় মাখামাখি হয়ে গেল। দূরন্ত বাতাসের সাথে মগ্ন হলাম প্রকৃতি উপভোগে।

প্রকৃতির কাছে জীবনযাপন বড়ই সুন্দর, বড় আয়োজন বিহীন সহজ। গাড়ির দরজা খুলে খোলা হাওয়ায় সমুদ্রের ওজন বাতাসে ভ্যাপসা ভাব ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে নিলাম। চারপশের পরিবেশে খানিক খোলা মাঠ ছাড়া আর কিছু নেই। বেশ দূরে একটা কার্গো জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে একা জনবিহীন। পুরানো মনে হলো। গাছগাছালির মেলা ছাড়া আর কিছু নেই। পাথুরে সাজানো রাস্তাটা এখানে এসেছে কেন জানি না হয়তো কখনো কেউ সাগর জলে ভেসে যায় এখান থেকে। অথবা আমার মতন কারো প্রকৃতি উপভোগ করার জন্যই বানিয়ে রাখা হয়েছে। এমূহুর্তে এই বিশাল সমুদ্রপাড়ের জায়গাটা শুধুই আমার জন্য নিবেদিত। খাড়া পাহাড়ের উপর আমি গাড়ি পার্ক করেছি। সমুদ্র ঠিক নিচে ঢেউ আছড়ে পরছে পাহাড়ের গায়।
যা হোক আপাতত। প্রকৃতি উপভোগ ছাড়া আর কোন কাজ নেই। সমুদ্রজলের ঢেউ ভেঙ্গে পরছে পাড়ে তার রিদিমিক সঙ্গীত আকাশের ছায়া জলের ভিতর বিস্তর্ণি এক পৃথিবী আর আমরা দুজন এই অপরূপ সৌন্দর্যের সাক্ষী হয়ে একটা সন্ধ্যা উপভোগ করলাম। রাত বাড়তে আকাশে তারা ঝকমক করতে শুরু করল। এমন দৃশ্য সহজে দেখা যায় না।
নিরিবিলি প্রান্তর শুধু আমাদের দুজনের। খাবারের প্যাকেট বের করে খাওয়া দাওয়া শেষ করে নিলাম। খাবার পানিও আছে বোতলে পর্যাপ্ত। প্রকৃতির মাঝে প্রকৃতির কাজ সেরে সিট নামিয়ে বিছানা করে শুয়ে অসংখ্য তারার আকাশ দেখছি। ঢেউ,বাতাসের গানের সাথে আমাদের গল্পগাঁথা মিলিয়ে দিয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পরলাম আরামে।
উত্তর থেকে এবার দক্ষিনে নামব আজ সারাদিন সেদিকেই পথ চলা।
নিউ ব্রান্সউইকের ঘন জঙ্গলের একটা রাস্তা পার হচ্ছিলাম। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে সামনে দুটো রঙধনু দারুণ এক আর্চ তৈরি করেছে। আমার সঙ্গী দারুণ মনোযোগে পড়ছে হ্যারিপটার বই। আসার আগেই বইটা চ্যাপ্টার বুক শপ থেকে কিনে দিলাম। দুদিন পুরো সময় আমি একাই নিজের সাথে কথা বলছি আর গাড়ি চালাচ্ছি। সঙ্গী ব্যাস্ত বই পড়ায়। রঙধনুর কথা শোনে একটু চোখ মেলে তাকাল বাইরে। এরপর ক্যামেরা নিয়ে বলল, একটু আস্তে যাও ছবি তুলি। রাস্তাটা একা আমারই আর কোন গাড়ি নাই গতি কমিয়ে দিলাম আর ঠিক তখনই সামনে রাস্তার উপর অনেক বড় গর্ত দেখতে পেলাম। আর ঠিক সেই সময় পাশের খাদ থেকে উঠে আসছিল বিশাল আকারের এক মোষ।
রংধনু আকাশে জেগে, মূহুর্তের মধ্যে প্রায় ঘটে যাওয়া একটি দূর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল আমাদের। গাড়ির গতি না কমালে মোষটার সাথে ধাক্কা লাগত অথবা বড় গর্তে পরে ঝঁকি লাগত অনেক বলা যায় না ছিটকেও যেতে পারত এই চিকন রাস্তায়।
মোষটা রাস্তার উপর মাত্র দুই হাত দূরে আমার গাড়ি থেকে। ও বেচারাও ভয় পেয়েছে মনে হলো। যেদিকে যাচ্ছিল সে দিকে না গিয়ে ফিরে গেল জঙ্গলের ভিতর। স্বস্থির নিঃশ্বাস নিয়ে আবারও চলতে শুরু করলাম। অন্ধকার ঘন হওয়ার আগেই নির্ধারিত হোটেলে পৌঁছাতে চাইলাম। এই পথে একাটাই মাত্র ভালো হোটেল পেয়েছিলাম সেই সময় গুগোল ঘেটে। সন্ধ্যা নেমেছে বেশ, অন্ধকার গাড় হচ্ছে কিন্তু আমি যেন চলছি এক নিধুয়া পাথারে। পথ ফুরানোর নাম নাই। সংশয়াপন্ন হয়ে কখনো ভাবছি ঠিক যাচ্ছি তো। ফিরে যাবার উপায় নেই বরঞ্চ সামনেই যাই। অবশেষে পাওয়া গেলো সেই চার তারকা একটি মাত্র হোটেল। চেক ইন করেই খাবার খেতে গেলাম তাড়াতাড়ি। আটটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে ডাইনিং।
গভীর ঘুমে রাত ভালোই কাটল নিউ গ্লাসগো নোভা স্কোসিয়া প্রভিন্সের এই শহরে।
নাস্তা সেরে চেক আউট করে, সকালেই টয়োটার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গাড়ির ওয়েল চেঞ্জ করা জরুরী। নতুন গাড়ির প্রথম ওয়েল চেঞ্জ আট হাজার কিলোমিটারে করতে হবে। আমি পৌঁছেছি নয় হাজারের কাছাকাছি। এই শহরে টয়োটার একটা ডিলারশিপ আছে আর আমার চলার মাঝামাঝি পরবে বলে বেছে নিয়েছিলাম।
গাড়ি নিয়ে চলতে হলে গাড়িও ঠিক রাখতে হয়, সময় মতন তেল পানি বদল করে প্রয়োজনীয় মেরামত করে।
গাড়ির কাজ শেষ হলে একটা চক্কর দিয়ে গ্লাসগো শহরটা দেখে নিলাম। এর কাছাকাছি একটা সমুদ্র সৈকত আছে। রওনা হলাম সাগরের খুঁজে যেখানে সাঁতার কাটার জন্য এত দূরের পথ পারি দিচ্ছি।
দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি নীল জল রাশি কিন্তু ওখানে যাওয়ার কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না। কয়েকটা চক্কর খেয়ে অবশেষে একটা দোকানে থামলাম। জানতে চাইলাম সমুদ্রে যাওয়ার দিক নির্দেশনা। ভদ্রলোক ডানে বায়ে সোজা কিভাবে যেতে হবে বোঝানোর পর এক সময় নিজেই গাড়ি নিয়ে রওনা দিলেন আমাকে পথ দেখানোর জন্য। পথ চলতে এমন কত ভালো মানুষের সাথে দেখা হয়েছে পরিচয় হয়েছে। অনেক মানুষের সহযোগীতা পেয়েছি।
খুব দূরে নয় কিন্তু কিছুটা ঘোর প্যাঁচ রাস্তা পেরিয়ে আমার কাঙ্খিত সমুদ্র সৈকতে তিনি আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেলেন। এমন জন মানবহীন সৈকত আর কোথাও দেখি নাই। মেলমার্বি বিচ, লিটল হারবার মনে হলো একান্ত আমার একার সমুদ্র সৈকত। পাড়ে গাড়ি রেখে জলে নেমে গেলাম। তীব্র ঠান্ডা পানি উপেক্ষা করে অনেকটা সময় নোনা জলে স্নান করে মনে হলো আর ঠান্ডা লাগছে না। ঘন্টা দুই সময় কাটিয়ে দিলাম জলের সাথে কেলি করে। চাঙ্গা হলো মন প্রাণ।
যখন উঠে এলাম পানি থেকে কয়েকজন দর্শক ছিলেন সাগরপাড়ে। আমকে বলেই ফেললেন, ইউ আর ব্রেভ গার্ল। ওয়াটার ইজ ভেরি কোল্ড। হাসি দেয়া ছাড়া আর কিছু বলার ছিল না। জলের মধ্যে একমাত্র আমিই ছিলাম স্নানরত।
সাগর স্নান সেরে আরামে ঘুমে চোখ ঢুলু ঢুলু হয়ে গেলো। তবু যেতে হবে খাওয়ার সন্ধানে। খেয়ে দেয়ে রেস্ট করে আবার পথে নামলাম।

বিকাল বেলায় পৌঁছালাম, নোভা স্কোসিয়া থেকে কেপ ব্রেটন আইল্যান্ড যাওয়ার সংযোগ ক্যানসো ক্যানাল ব্রিজের কাছে। এখানে বেশ কিছু গাড়ি এক সাথে দেখতে পেলাম। আমরা সবাই অপেক্ষা করছি অন্যপাড়ে যাবার। অথচ আমার সামনে ওপারে যাবার সেতুটি আস্তে আস্তে সরে যেতে থাকল। এখন জাহাজ চলাচলের সময়। সেতু সরে যাওয়ার পর দুদিক থেকে দুটো জাহাজ চলে গেলো ধীরে ধীরে। পার হলো কিছু ছোট নৌকা। সেতু আবার জায়গা মতন জোড়া লাগল। দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলো নড়াচড়া করে ব্রীজের উপর উঠে গেলো রাস্তা থেকে। কেপ ব্রেটন আইল্যান্ডে ঢুকে গেলাম। আজকের রাত্রী যাপন হবে একটি ক্যাম্প গ্রাউন্ডের ভিতর। যা খুব দূরে নয়। অথচ আমি রাস্তা দিয়ে অনেক দূর পাড় হয়ে যাচ্ছি ক্যাম্প গ্রাউন্ডটা আর পাচ্ছি না। কয়েকবার ঘোরা ফেরার পর চোখে পরল রাস্তার পাশেই পার্কটি। অন্ধকার হওয়ার জন্য দেখতে পাইনি।
পথে একটা সুপার শপে ঢুকে কিছু খাবার কিনে নিয়েছিলাম। ক্যাম্পে ঢুকে দেখলাম টিকেট কাউন্টার বন্ধ হয়ে গেছে। আমার আর এই রাতে যাওয়ার কোন জায়গা নেই। তাই দ্বিধা না করে ভিতরে ঢুকে পরলাম। সকালে কাউন্টার খুললে দেনা পাওনা মেটানো যাবে ভেবে।
দূরে দূরে তাবু খাটিয়ে কিছু মানুষ বাস করছে। একপাশে টয়লেট শাওয়ারের সুব্যবস্থা আছে। আরো দূরে আছে কিছু কেবিন। সেখানে পরিবারসহ মানুষ ছাড়াও গ্রুপ করে আসা অনেক মানুষ স্কুলের ছাত্র ছাত্রী আছে।
অন্ধকার ঘন হয়ে আসছে, চারপাশে প্রচুর গাছ কিন্তু এর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে আকাশে অজস্র তারা জ্বলছে ঝকঝক করে। আগস্টের রাত্রী নাতিশীতোষ্ণ উত্তাপ খুব আরামদায়ক । আজকের রাত্রী যাপন আবারও গাড়ির ভিতর। যেহেতু আমার সাথে কোন তাবু নাই। আর তাবু খাটানোর ঝামেলা করার চেয়ে, আমার গাড়ির ঘুম মধ্যে ঘুমানোয় কোন সমস্যা নেই। সাথে আছে কাঁথা, চাদর। তোয়ালে আর ড্রেস দিয়ে চারপাশের জানালা ঢেকে নিজেদের তার ভিতরে নিরাপদ করে নিয়ে, সিট লম্বা করে শুয়ে পরলাম, আকাশের তলে।
বাতাসের মৃদু শব্দ আর তারার আলোর স্পর্শে রাত্রী গভীর হওয়ার আগেই গভীর ঘুম নামল শরীর জুড়ে। আরমদায়ক প্রকৃতির সতেজ বাতাসে, সমুদ্রজলের ছোঁয়ায়, শরীর মন ছিল শান্ত অনেকটা পথ গাড়ি চালানোর পরও।
কানাডা এবং পৃথিবীর কত জায়গায় যে আমি এমন গাড়িতে ঘুমিয়ে বেশ কিছু রাত্রী যাপন করেছি, সে জায়গা গুলো হয় তো আর খুঁজে পাব না।
নিরব ক্যাম্পাস জনরণ্যে পরিণত হলো সকাল হওয়ার সাথে। অরণ্যের মাঝে এতলোকের বসবাস ছিল রাতের বেলা বুঝতেই পারি নাই। সকালে হাঁটতে বেরুলাম। অনেকটা জুড়ে ছড়ানো বনভূমি, ভিতর ভিতর সুন্দর লগ হাউস। তাবু খাটানোর জায়গা। গাছের ঘেরা জায়গা প্রত্যেকের আলাদা প্রাইভেসি রক্ষা করে। বড় সর কয়েকটা খাবারের দোকান লোকে লোকারণ্য। সেখানে আমরাও সকালের নাস্তা করে ফেললাম। পাশে সমুদ্র অনেকে গোসল করতে সাঁতার কাটতে নেমেছে। অনেকে ভাসছে কায়াক নিয়ে। হাঁটা চলার দেখার পর গাড়ি চালিয়ে ভিতরের অনেকটা দেখলাম।
এরপর বেরিয়ে পরলাম কেপ ব্রেটন আয়ল্যাণ্ডের বিখ্যাত ক্যাবট ট্রেইল প্রদক্ষিণ করতে। এক পাশে পাহাড় এক পাশে সাগর মাঝে আঁকাবাঁকা রাস্তা এমন দৃশ্য আমাকে অসম্ভব টানে। সুযোগ পেলেই তেমন রাস্তায় নেমে পরি আমি। ক্যাবট ট্রেইল পুরোটা জুড়েই এই আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে।
একটানা গাড়ি চালিয়ে চললে পাঁচ ঘন্টায় শেষ করা যায়। কিন্তু থেমে থেমে দেখে চলতে আমার সময় লেগে ছিল দুইদিন। চারপাশে ঘিরে থাকা অসংখ্য বিখ্যাত জায়গা। কেপ ব্রেটন হাইল্যান্ডস ন্যাশনাল পার্ক, সিডনি শহরে বিশাল বেহালা মূর্তি বিগ ফিডল, লুইসবার্গ দুর্গ এবং আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান।
ইঙ্গোনিশ সৈকত দূরে পাহাড়ের মায়া ছড়ানো সাগরের মাঝে। আবার নিলস হারবার রুক্ষ পাথুরে সৈকত। আর আছে প্রচুর বাতিঘর। প্রতিটি বাঁকে আলাদা সৌন্দর্য আলাদা মায়া। পাশাপাশি কাছাকাছি জায়গার মাঝে কত রকমের বৈচিত্র। চোখ মেলে মন প্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়।

প্রতিটি জায়গায় থেমে দেখে যেতে কয়েকদিন অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু আমি দ্রুততায় কিছুটা ছূঁয়ে দেখে ওশান তিমি দর্শণের স্থানটিতে সমুদ্রের পাড়ে বসে সারাদিন পার করে দিলাম। পরিযায়ী তিমিদের জন্য পরিচিত ওশান সমুদ্র সৈকত। দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশি তার মাঝে হঠাৎ ভেসে উঠছে বিশাল তিমি মাছের শরীর। কখনো লাফিয়ে উঠছে তারা অনেকটা উঁচুতে পানি থেকে। কখনো শুধুই ভেসে যাচ্ছে শান্ত হয়ে।
অনেক মানুষ বোটে করে জলের ভিতর আরো কাছে চলে যাচ্ছে তাদের দেখতে। সেদিন একটি কেবিন নিয়ে রাত কাটালাম, হাইল্যান্ডস ন্যাশনাল পার্কে।
সারাদিন কাটিয়ে দেয়া যায় এমন প্রকৃতির মাঝে কিন্তু আমাদের ফিরতে হবে। আরো অনেক কিছু দেখার বাকি ফেরার পথে। তাই ভিন্ন স্বাদের তাজা সামুদ্রিক খাবার দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ সেরে অন্যরকম ভালো লাগার একটা উপলব্ধি নিয়ে. অন্যপাশের রাস্তা ধরে ফিরে আসার পথ ধরলাম পরের দিন বিকালে।
পিছনে রইল সেই দ্বীপ, যার মাটি ছূঁয়ে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের জলের কলকাকলী চলছে এখনো।



মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.