| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ অথচ রাতের বেলা দেখেছিলাম অনেক তারার মেলা আকাশে। একটুখানি অরোরার আলো ও ঝিলিক দিয়েছিল। রাত ভোরের দিকে অনেকটা সময় আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম। জরুরী কিছু কাজের ভিতরে ডুবে ছিলাম তার থেকে। ছুটি নিয়ে আকাশের তারার মাঝে অবকাশ যাপনের চেষ্টা করেছিলাম।
অনলাইনে অনেকক্ষণ ধরে তথ্য খুঁজতে খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ করে আর ভাল লাগছিল না কাজ করতে। বাড়িওয়ালি নামের একটা মুভি পাশেই ছিল। ঋতুপর্ণ ঘোষের এই ছবিটি রিলিজ হওয়ার পরে দেখে ফেলেছিলাম। তখন অপেক্ষা করে থাকতাম কখন ঋতুপর্ণের ছবি আসবে।
তখন অনলাইনে এত ছবি পাওয়া যেত না, একটাই সোর্স ছিল ইউটিউব। নতুন ছবি সেখানে ছিলই না বলতে গেলে। একমাত্র ভরসা ছিল ডিভিডি, ক্যাসেটের দোকান তারাও অরিজিনাল কপি নয় পাইরেট কপি বিক্রি করতো আসলে।
কিনে এনে দেখতাম পিকচার কোয়ালিটি খুবই খারাপ। ইউটিউব এ ভালো একটি ছবির নাম দিয়ে যেকোনো একটা অচল ছবি দিয়ে রাখতো অনেকে। কত যে সময় করে নষ্ট করেছি ভালো একটা ছবি খুঁজে খুঁজে। আজকাল অনেক ছবি শুরু করার পর মনে হয় ও আগে দেখেছিলাম। অথচ কিছুই মনে নেই, গল্প । অথচ অনেক আগে দেখা
বাড়িওয়ালি ছবিটার প্রতিটি দৃশ্য যেন চোখের সামনেই ছিল। প্রতিটি ঘটনা মনে ছিল। ভাবলাম একটুখানি দেখি, দেখতে শুরু করে শেষ পর্যন্ত না দেখে, থামতে পারলাম না। আমার অনেকটা সময় আবার ঋতুপর্ণ ঘোষ দখল করে নিলো। নিজের জরুরী কাজ বাদ দিয়ে ছবির ভিতরে তন্ময় হলাম। মেঘলা আকাশ যেন সহযোগী ছিল এই ছবি দেখার মুহূর্তে।
অতি সাধারণ বিষয় গুলো কি অদ্ভুত মাদকতা মিশিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রসন্নর অভিব্যক্তিহীন চোখে তাকিয়ে থাকা, কাজের লোক হয়েও অভিভাবক সুলভ ব্যবহার। পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেওয়া। মালতির প্রতিটি বিষয়ে ঝগড়া, প্রতিপদে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করার চেষ্টা। আবার সেই মালতীরই ভালোবাসায় আদ্র একটা মন দিদির প্রতি যত্নশীল হয়ে ওঠা। নারায়ণের গভীর আবেগ মালতির প্রতি, সমাজের দুশ্চরিত্র পুরুষ থেকে রক্ষা করার জন্য রাগ। ছোট ছোট প্রতিটি দৃশ্যই ব্যক্ত করে অনেক নাবলা কথা অনেক অভিব্যাক্তি।
মধ্যবয়সী বনলতা বিয়ের আগের দিনই যার হবু বরের মৃত্যু হয়েছিল সাপের কামড়ে। সব সাধ আহ্লাদ বাদ দিয়ে নিয়ম আর কঠিন ব্রতের মাঝে যার জীবন একটি বিন্দুতে থেমে গিয়েছিল।
প্রকট শক্ত গম্ভীর, কঠিন চরিত্রের মুখোশের আড়ালে, ভিতরে প্রচন্ড রকম নরম একটি নারী চরিত্র। সব স্বাদ আহলাদ, ইচ্ছে যার অপূর্ণ রয়ে গেছে। ঘুমের মাঝে স্বপ্নে বিয়ের দিনগুলোর আয়োজন ফিরে ফিরে আসে এতদিন পরেও। হঠাৎ করে পাওয়া নিজের বাড়িতে সিনেমা করার প্রস্তাব, নিজের একক জীবনের নিয়ম নিষ্ঠা, পূজা পাঠের মধ্যে থাকার সময়গুলোকে অহেতুক ঝামেলা বিরম্বনা ভেবে ফিরিয়ে দিতে চাইলেও একে একে সবকিছুই গ্রহণ করা। মেনে নেয়া ভিতরের কৌতুহল, ইচ্ছা প্রকাশ না করেও সব কিছুর সাথে নিজেকে এগিয়ে দেয়া। দেবাশিসের মতন একটি ছেলেকে ছোট ভাইয়ের জায়গা দিয়ে ভালোবাসায় সম্পর্ক তৈরি করা।
এমন কি জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করার সাথে, নিজে অভিনয় করে নিজেকেও দিয়ে দেওয়া। মনের ভিতরের গভীরের স্রোতস্বিনী নদীটি যেন অচেনা হট্টগোলের মাঝে জেগে উঠেছিল ভালোবাসায়, ঝর্ণাধারা হয়ে। সব থাকা অথচ কিছু না পাওয়া একজন মানুষের মনে গভীর আশার ছায়া ফেলে ছিল কিছু সম্পর্কের আশায়।
পরিচালক, যার স্ত্রী আছে। যাকে এই ছবির নায়িকা ভালোবাসতো এখনো তার প্রতি আগ্রহ আছে। এসব কিছু জানার পরও সেই লোকের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা। নিজের না পাওয়া জীবনে একটি শীতল নদীর ধারা যেন হঠাৎ করে পাওয়া। আঁকড়ে ধরার ইচ্ছা ছিল, মনের গহীনে যা কখনোই প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু আশা ছিল ভীষণ রকম মনের গহীনে।
অথচ বাস্তব বড়ই নিষ্ঠুর সেই প্রথম জীবনের বিয়ের আগের দিন স্বামীর মৃত্যুর মত, ছবির শুটিং শেষ করে চলে যাওয়ার পর সবকিছুই হারিয়ে গেল। আশা করে থাকা নিজের করতে না চাওয়া, অভিনয়টুকুও, ছবির ভিতরে যা পরিচালক কেটে ফেলেছিলেন শেষে। চিঠিতে সে খবর জেনে ভয়ানক বাস্তবতার মুখোমুখি হলো বনলতা আবার। আশার ঝিলিক ছিল মিথ্যে মরীচিকা। যে মানুষগুলো কাজের জন্য এসেছিল কাজের পরই তারা হারিয়ে গেল। তাদের মনে কোন আবেগ ছিল না। শুধু ব্যবহার করেছে তার সরলতা। যেটা স্বাভাবিক অথচ কিছু না পাওয়া বিশাল জমিদার বাড়ির অন্দর মহল যেখনে গেইটে অনেক তালা দিয়ে বাড়িটি সুরক্ষিত রাখা হয় সেখানা বাস করা নারীটির মনে সমুদ্র জেগে ছিল।
এই হতাশা সেই না পাওয়া দ্বিতীয়বার যেন, মধ্য বয়সের নারী কে আবারো জর্জরিত করল শোকে।
এমন শোকাবৃত নারীদের গল্প এক সময়ের বাংলায়, চারপাশের অতি সাধারণ বিষয় ছিল। রবীন্দ্রনাথের গল্প, শরৎচন্দ্রের গল্পে এমন নারীদের কথা অনেক বলা হয়েছে। নিয়মের বেড়াজালে জীবনের প্রতিটি চাওয়া যাদের গোপন কুটিরে রাখতে হতো। এমন নয় যে, সে সময় গুলো বদলে গেলেও এখনো নারীদের সব পাওয়া পূরণ হয় তা কিন্তু নয়। হয়তো না পাওয়ার ধরন বদলে গেছে। কিন্তু অপূর্ণতা রয়ে গেছে। এখনও নানা ভাবে শৃঙ্খলিত নারীরা।
আদি সমাজ থেকে বর্তমান। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত, এমন শৃঙ্খলিত নারীর গল্পে ভরপুর। বলে, লিখে শেষ করা যাবে না।
বলি শুধু বাড়িওয়ালি ছবিটির প্রতিটি দৃশ্যপট, ঋতুপর্ণ ঘোষের উপস্থাপনা আমার সময়ের আড়াই ঘন্টা আবারও কেড়ে নিলো আগে তো দেখেছিলামই। সে সময় হিসাব করলে পাঁচ ঘন্টা। সাথে মাথার কোষে আবারও জমা হলো গল্পের উপস্থাপনার অতি সাধারনের মাঝে, অসাধারন কিছু বিষয় উপস্থাপনার কৌশল যা শুধু সেই পারতো। বেশ কিছু দিন সাথে সাথে থাকবে আবারও। ঋতুপর্ণ ঘোষের দেখা ছবিগুলো নতুন করে দেখার জন্য টানবে।
ও যদি থাকত তাহলে অনেক নতুন কিছু পেতাম। অনেক নতুন ভাবনা, যা ভাবতে পারছি না তা ওর ছবি দেখে নতুন করে উপলব্ধি করতাম। এমন মানষগুলো কেন ক্ষণজন্মা হয়!
©somewhere in net ltd.