নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

দিলু নাসের এর রচনা

সৈয়দ নাসের

আমার ঠিকানা সীমানাবিহীনপৃথিবীর মানচিত্র[email protected]

সৈয়দ নাসের › বিস্তারিত পোস্টঃ

যীশু (হজরত ঈসা আঃ) এর জন্মস্থান বেথলেহামে একদিন

২৫ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১১:৩৫

দিলু নাসের
মার্চ মাসের রোদ ঝলমলে দিন। ফিলিস্তিনের ওয়েস্ট ব্যাংকে ঐতিহাসিক হেবরন নগরে নবী ইব্রাহিম আঃ তার পুত্র ইসহাক আঃ এবং ইসহাক পুত্র হজরত ইয়াকুব আঃ সহ তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পবিত্র রওজা মোবারক পরিদর্শন শেষে আমরা যাচ্ছি আরও দুইজন অন্যতম নবীর জন্মস্থান এবং রাসুলদের স্মৃতিবিজড়িত ঐশ্বর্যময় শহর বেথলেহাম অভিমুখে। আমার সাথে রয়েছেন বন্ধুবর এমদাদুল হক চৌধুরী ( সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদক তৎকালীন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব সভাপতি) সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমেদ, তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমদাদ সিদ্দিক । মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হাসান হাফিজুর রহমান পলক আর আমার বন্ধু শামীম জামান।
জুদাইন পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে উঁচু-নীচু আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায়, সমুখে চোখ জুড়ানো অসীম সৌন্দর্য। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি সবজি আর ফলের বাগান,জলপাই, ডালিম, আঙ্গুর, ডুমুর আরও কতো কি। উঁচুনিচু পাহাড়গুলো অনিন্দ্য সুন্দর, কখনো কঠিন পাথুরে, আবার কখনো নরম সবুজে মোড়া। বেথলেহামের কাছাকাছি পৌঁছাতেই চোখের সামনে খুলে গেল অপরূপ সব পাহাড়ি ঢাল। দেখে মনে হলো নরম সূর্যের আলোয় ঝলমল করা সবুজ আর মাটির রঙের স্তরগুলো যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখনো । মনে হলো, এই শান্ত পাহাড়গুলোর পাদদেশেই হয়তো একদিন কিশোর নবী দাউদ (আ.) তার মেষপাল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, আর তার কণ্ঠের মোহনীয় সুরে আকাশ ভরিয়ে দিতেন প্রশান্তির আলোয় । তার সুর শুনে বনের পাখিরা থমকে যেতো। তন্ময় হয়ে শুনতো নবী দাউদের সুরেলা কণ্ঠ। এই প্রাচীন পথে যেতে যেতে আমাকেও আচ্ছন্ন করলো সেই অবিনশ্বর সময়ের সুবাস। চোখের সামনে দিয়ে একঝাঁক রঙিন পাখি উড়ে গেলো, দেখে মনে হলো হয়তো এদের পূর্বপুরুষরাই একদিন নবী দাউদের সাথে কথা বলতো।
মনে হচ্ছিল আমি সময়ের স্রোত বেয়ে ফিরে যাচ্ছি সেই পুরোনো যুগে, যখন নবীরা হেঁটেছেন এই ভূমিতে, প্রার্থনা করেছেন এই আকাশের দিকে তাকিয়ে, ভালোবেসেছেন এই জনপদের মানুষদেরকে। আমার হৃদয় ভরে উঠলো এক অদ্ভুত আলোয়, শ্রদ্ধা, বিস্ময় আর স্রষ্টার প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতায় আমার চোখ অশ্রু সিক্ত হলো।
নবীদের পদচিহ্নে ভেজা জনপদ ভ্রমণের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই অনির্বচনীয় মাহাত্ম্য, যা কেবল অনুভব করা যায়, বলা যায় না।
উল্লেখ্য যে খ্রিস্টপূর্ব ১০৪০ সালের দিকে (আনুমানিক) বেথলেহেমের এরকম এক পাহাড়ী গ্রামে নবী দাউদ আঃ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নবী দাউদ (আঃ) ছোটবেলায় ছিলেন একজন মেষপালক।তিনি বেথলেহেমের আশেপাশের এসব পাহাড়ি এলাকায় ভেড়া চরাতেন।এই সময়ই আল্লাহ তাঁকে সুরেলা কণ্ঠ ও সাহসী হৃদয় দান করেন।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তার সম্পর্কে বলেছেন - “নিশ্চয় আমি দাউদকে আমার তরফ থেকে অনুগ্রহ প্রদান করেছিলাম। হে পর্বতমালা, তোমরা দাঊদের সঙ্গে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং হে পক্ষীকুল তোমরাও। আর লৌহকে তার জন্য নম্র করেছিলাম।" (সূরা আস-সাবা, আয়াত ১০)
দাউদ (আঃ) তাঁর শৈশব ও কৈশোরের পুরোটা সময়ই বেথলেহেমে কাটিয়েছেন।
আনুমানিকভাবে তিনি ২০ বছর বয়স পর্যন্ত বেথলেহেমে ছিলেন। রাজা হওয়ার পরেও এখানে ছিলেন প্রায় সাত বছর।
তবে বেথলেহামে দাউদের জন্মস্থান হিসেবে কোন নির্দিষ্ট গির্জা অথবা সিনেগগ নেই, তবে শহরটি দাউদের জীবনী ও ধর্মীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত।

ফিলিস্তিয়ান যুগে শহরটি ফিলিস্তিয়ান ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের ছোট রাজ্যসমূহের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ রাখত। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, কিং ডেভিডের সময়ও বেথলেহাম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। বেথলেহাম মূলত বাইবেলের জন্য বিখ্যাত। এটি এখন যীশু খ্রিষ্টের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত,তাছাড়া প্রাচীনকালের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, যা অনেক শতাব্দী ধরে ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বাইবেলের পাশাপাশি বেথলেহাম ফিলিস্তিয়ান, রোমান, বাইজান্টাইন এবং ইসলামি যুগেও উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র ছিল।
যিশুর জন্মের আগে বেথলেহাম একটি ছোট গ্রামীণ শহর হিসেবে পরিচিত ছিল, যা পরে ধর্মীয় তীর্থস্থলে রূপান্তরিত হয়।
বেথলেহাম শুধু ধর্মীয়ভাবে নয়, প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিক থেকেও মনোরম শহর। পাহাড়, সবুজ উপত্যকা এবং ঐতিহাসিক রাস্তা শহরের সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে।
শহরে ঢুকেই চোখে পড়লো প্রাচীন পাথরের রাস্তা, ছোট ছোট চত্বরে বাজার, ফুটপাতে নানান রকম দোকান। নজর কাড়লো কয়েকটি গির্জা।পাথরের দেয়াল, ঘণ্টা টাওয়ার , ক্রুশের ছায়া আর মসজিদের গুম্বুজ। পথে যেতে যেতে নজর কাড়লো মুসলিম ও খ্রিস্টানদের সহাবস্থান,মসজিদ আর চার্চ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে যেন শতাব্দীর সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে । রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখলাম ফিলিস্তিনের পতাকা পতপত করে উড়ছে, লাল, সবুজ, কালো আর সাদা রঙের সেই পতাকা যেন এই ভূমির মানুষের হৃদস্পন্দন। বাতাসে দোলায়মান পতাকাগুলো শুধু রঙের নয়, তারা যেন ইতিহাসের ক্ষত, আশার আলো, আর অবিনশ্বর প্রতিজ্ঞার প্রতীক।কোথাও দোকানের ছাদের ওপরে, কোথাও ছোট্ট চায়ের স্টলের সামনে, কোথাও আবার পাহাড়ি গ্রামের প্রবেশমুখে,ফিলিস্তিনের পতাকা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
দেখলাম রাস্তাঘাট পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত।আমাদের গাড়ি এসে থামলো একটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে যেখানে রাস্তার ধারে হস্তশিল্পের দোকান, ক্রিসমাসের তারকা, যিশুর ছবি, গিফট আইটেম, দেখলাম একই দোকানে মুসলিম এবং খৃস্টানদের ধর্মীয় জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে, স্থানীয় খাবারের সুগন্ধ আমাদেরকে মুগ্ধ করলো।বেথলেহাম বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেলেও কিন্তু এই শহর এখনও শান্তি এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের প্রতীক। মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় শহরের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতা রক্ষা করছে, এবং পর্যটকরা এখানে এসে ইতিহাস, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধন উপভোগ করতে পারেন।
গাড়ি থেকে নামতেই দেখা হলো দাড়িওয়ালা একজন সুঠাম দেহের তরুণের সাথে। আমাদের ড্রাইভার বললেন ওনি হচ্ছেন সাদি বেথলেহামে আপনাদের গাইড। তিনি আপনাদেরকে যীশুর জন্মস্থান সহ দর্শনীয় স্থান গুলো দেখাবেন। আমরা তাকে সালাম দিয়ে বললাম হ্যালো শেখ সাদি? শুনে মন্তাহির এবং সাদি দুজনেই হা হা করে হেসে উঠলেন। হাসার কারণ জিগ্যেস করলাম, মন্তাহির বললেন পরে বলবো এখন আপনারা যান তার সাথে। নানান দেশের নানান রঙের মানুষের ভীড়ে আমরা হাঁটছি সাদির সাথে। সাদি আমাদেরকে স্থানীয় জীবনযাত্রা এবং এই এলাকা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিচ্ছেন। মুলত এমাদ ভাই আর বেলাল ভাই তার সাথে কথা বলছেন। সাদি বললেন বেথলেহেমে খ্রিষ্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে। ম্যাঞ্জার স্কোয়ারে অবস্থিত ওমর মসজিদ এবং চার্চ অব দ্য ন্যাটিভিটি (যীশুর জন্মস্থানের গির্জা) পাশাপাশি অবস্থিত, যা দুই ধর্মের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক।
আমি চোখ কান খোলা রেখে চারপাশ দেখছি। সড়কে হলুদ টেক্সি গুলো নজর কাড়লো, ঢালু এবং পাথর-বিছানো রাস্তা দিয়ে আমরা হাঁটছি। বোঝা গেলো এটা ব্যস্ত এলাকা।সারি সারি দোকানপাট, সাজানো,মশলা, অলংকার, কাঠের খোদাই, ধর্মীয় উপহার, পোশাক ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। পাথরের দেওয়ালে ঝোলানো রঙিন কাপড়, কাঠের তৈরি ক্রস, জলপাই কাঠের খোদাই, ছোট ছোট ফানুস, , মধু, আর হস্তশিল্পের অলংকারে ভরা। দেখলাম একটি দোকানে কাঁচের আলমারিতে সাজানো আছে চমৎকার সিরামিক প্লেট, স্থানীয় নকশার স্কার্ফ, জেরুজালেমের প্রতীক ছাপা ম্যাগনেট। দোকানের ভেতর থেকে হালকা আরবি গান বাজছে, দরজায় দাঁড়ানো হিজাব পড়া সহাস্য তরুণী বললেন ওয়েলকাম হাবিবী। চারপাশে নানারকম মানুষ। বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন রঙের, বিভিন্ন ভাষার। কারও মাথায় হিজাব, কারও গলায় ঝুলছে ক্রস, কেউ আবার একেবারে সাধারণ আধুনিক পোশাকে। স্থানীয় লোকদেরকে দেখলেই বোঝা যায়। হাঁটতে হাঁটতে উপলব্ধি হলো বেথলেহামের রাস্তায় মানুষকে ধর্ম দিয়ে আলাদা করা যায় না। সবাই একই সুরে, একই রঙে মিলেমিশে আছে,ঠিক এই দোকানগুলোর মতো যেগুলোতে ইতিহাস, বিশ্বাস ও জীবনের রঙ একসাথে ঝুলে রয়েছে। এখানে মানুষের হাসি, হাঁটার ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর, দোকানের সামনে জড়ো হয়ে আড্ডা দেওয়া, সবই এই শহরের স্বাভাবিক জীবন বলে মনে হলো।
রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট ক্যাফে, বেকারি ও রেস্টুরেন্ট বাতাসে আরবীয় কফি, খেজুর, মুসখান, হুমুসের গন্ধ ভাসছে । রেস্টুরেন্ট গুলোর সামনে ছোট ডেলিভারি ভ্যান দাঁড়ানো।
রাস্তার মোড়ে এসে আমরা একটু দাঁড়ালাম, দেখতে পেলাম এখানে একটি ভবনের দেয়ালে ফিলিস্তিনের কিংবদন্তি নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের একটি বিরাট ছবি শোভা পাচ্ছে। আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে সবাই গ্রুপ ছবি তুললাম। তারপর চললাম নেটিভিটি চার্চের দিকে। রাস্তা পেরিয়েই চোখে পড়লো চার্চ অব দ্য নেটিভিটি, যিশু খ্রিষ্টের জন্মস্থান। দেখলাম নেটিভিটি চার্চের বাইরে অসংখ্য তীর্থযাত্রী। কেউ নীরবে প্রার্থনা করছে, কেউ গাইডের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। বাতাসে ধূপের গন্ধ, প্রাচীন পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মানুষের পায়ের শব্দ। সব মিলেমিশে যেন এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য তৈরি হয়েছে এখানে।
আমাদের গাইড সাদি আমার সঙ্গীদেরকে চার্চের ইতিইাস এবং খৃস্টানদের কাছে এই জায়গা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা বর্ণনা করছেন। এমাদ ভাই পলক সাদিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন সে উত্তর দিচ্ছে। আমি তাদের পিছনে পিছনে থেকে এই স্মরনীয় মুহূর্তকে ক্যামেরায় বন্দি করছিলাম- আর অন্যান্য গ্রুপের গাইডদের মুখে শুনছিলাম এবং দেখলাম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষের চোখে মুখে বিস্ময় আর উচ্ছাস।
এই চার্চ অফ দ্য নেটিভিটি খৃষ্ট ধর্মালম্বিদের সবচেয়ে প্রাচীন গির্জা। এটি মূলত কনস্টানটাইন দ্য গ্রেট দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ৩২৫-৩২৬ সালে তাঁর মা হেলেনার জেরুজালেম এবং বেথলেহমে ভ্রমণ করার খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি তৈরি করেছিলেন। ৩৩৯ খ্রিস্টাব্দে এটি পুরোপুরি গির্জা হিসাবে চালু হলেও বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে গির্জাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই গির্জাটি ৩২৬ সালে কনস্টানটাইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হলেও
১৩৫ খ্রিস্টাব্দে, রোমান সম্রাট হ্যাড্রিয়ান এখানে যীশুর জন্মস্থানে গুহার উপরে গ্রীক পুরানের সৌন্দর্য এবং বাসনার দেবী আফ্রোদিতির প্রেমিক অ্যাডোনিসের উপাসনা করার জায়গা বানিয়েছিলেন। অনেকের ধারণা সেই সময় বিশ্ব থেকে যীশুর স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলার জন্য সেখানে এটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিলো।
পরবর্তীতে ৫২৯ খৃস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান এখানে একটি নতুন বেসিলিকা তৈরি করেছিলেন । এরপর বিভিন্ন সময়ে এর পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন হয়েছে। ২০১২ সালে ইউনেস্কো
নেটিভিটি গীর্জাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে। এবং এটি ‘ফিলিস্তিনে ইউনেসকো’ঘোষিত প্রথম তালিকাভুক্ত কোন স্থান। বহু শতাব্দীর সংস্কারের পরও এর মূল গঠন আজও দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা ছয়জন, সাদির সঙ্গে ধীরে ধীরে চার্চের ভিতরে প্রবেশ করলাম।একটি অত্যন্ত নীচু দরজা দিয়ে আমাদেরকে চার্চে প্রবেশ করতে হয়েছে। সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হলে মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। এই দরজাকে বলা হয় ”ডোর অব হিউমিলিটি” বা “নম্রতার দরজা” ।ভেতরে ঢুকতেই সাদি সামনে দাঁড়িয়ে আস্তে করে ইশারায় সবাইকে থামালেন। তখন ভেতরে প্রার্থনা চলছিলো,মৃদু সুরে ভেসে আসছে স্তোত্রগান, মাঝে মাঝে ধুপ,ধুনোর ঘ্রাণ, আর দূর থেকে শোনা গেলো ঘণ্টাধ্বনি। সাদি আমাদের দাঁড় করিয়ে সামনে গেলেন। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম সেখানে,উঁচু ছাদ, মৃদু আলো, দেয়ালে পুরনো বাইজান্টাইন চিত্রকর্ম। সাদি আমাদের ইঙ্গিত করলেন নীরব থাকতে। মনে হচ্ছিল,চার্চের মূল হলটি ছিল বিশাল, আর তার মধ্যভাগে দেখা যাচ্ছিল দীর্ঘ কাঠের বিম,দেখেই বুঝা গেলো পুরোনো দিনের স্থাপত্য এখনো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভগুলো বেশ মোটা, বয়সের ভাড়ে অনেক জায়গায় সামান্য ক্ষয়ে গেছে। উপরের দিকে ঝুলে থাকা লণ্ঠনগুলো আলো দিচ্ছিল নরম, কমলা,হলুদ আভায়। মোজাইকগুলো ছিল বিশেষ চোখে পড়ার মতো,সোনালি আর নীল রঙে আঁকা বাইবেলের দৃশ্য। আলো পড়ে সেগুলো ঝিকিমিকি করছিল, চার্চের নিচু এক কোণে ছোট ছোট দল গুলোর প্রার্থনা চলছে, কেউ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে, কেউবা মোমবাতি হাতে। আমরা যে জায়গায় যাবো সেটির নাম নেটিভিটি গুহা Grotto of the Nativity
নেটিভিটি গুহাটি একটি ভূগর্ভস্থ স্থানে, সেখানেই যীশুর জন্মস্থান। সেখানে যেতে হলে এই চার্চের ভেতর দিয়ে অন্য স্থানে যেতে হবে। কিছুক্ষণ পরে প্রার্থনা শেষ হলো। মানুষজন নড়াচড়া শুরু করতেই সাদি আবার আমাদের কাছে ফিরে এলেন। এবার তিনি হাসিমুখে, কিন্তু আগের মতোই শান্ত স্বরে বললেন,
“চলুন, এখন আপনাদের গ্রোটোতে নিয়ে যাই।” আমরা ছয়জন তাঁকে অনুসরণ করে চার্চের ভেতর দিয়ে অন্য একটা রুমে গেলাম।
সেখান থেকে গুহার দিকে নামার পথটা ছিল একটু সরু,পাথরের সিঁড়ি, সামান্য নিচু ছাদ, আর মৃদু আলো। সাদি সামনে হাঁটছিলেন খুব ধীরে, মনে হচ্ছিল যেন প্রতিটি ধাপের মধ্যেই কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই পরিবেশের গন্ধ বদলাতে শুরু করল,ধুপের ওপরে যোগ হলো ঠান্ডা পাথরের কাঁচা গন্ধ। শব্দ কমে এলো আরও বেশি, মনে হলো যেন মাটির গভীরে ঢুকে যাচ্ছি আমরা।
গুহার ভেতরে ঢুকতেই মাটির কাছাকাছি একটা ছোট বেদির সামনে গাইড থামলেন। সেখানে আরও কিছু লোকজন ছিলেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। দেখলাম কারও চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সাদি নিচু স্বরে বললেন, “এই জায়গাটাই সেই স্থান, যেখানে যীশুর জন্ম হয়েছিল।”
আধো আলো আধো অন্ধকারে আমরা দেখলাম সেই ঐতিহাসিক স্থানে মৃদু প্রদীপের আলোয় রূপালি তারা-খচিত একটি পাথর,যার ওপর লাতিন ভাষায় খোদাই করা আছে “Here Jesus Christ was born.”
আমাদের আগেই কিছু তীর্থযাত্রী সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ নীরবে মাথা নত করে প্রার্থনা করছিল, কেউ চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে ছিলেন, কেউ আবার খুব আস্তে করে তারকাটাকে ছুঁয়ে দেখছিলেন, মনে হচ্ছিল তারা প্রত্যেকে নিজের মতো করে এই মুহূর্তটা গ্রহণ করছে। আমাদের ঠিক আগে ছিলেন একটি বয়স্ক দম্পতি। তারা আবেগ আপ্লুত হয়ে তারকায় হাত রাখছিলেন। আমরা ছয়জন একটু পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। আমি দেখছিলাম রুপালি তারকার ওপর মোমবাতির আলো পড়ে ঝিলিক দিচ্ছিল, আর গুহার পাথরের দেয়ালগুলো সেই নরম আলোয় আরও প্রাচীন, আরও পবিত্র মনে হচ্ছিল তখন ।
বয়স্ক দম্পতি সরে যেতেই সাদি চোখের ইশারায় বললেন, “এবার আপনারা এগিয়ে আসুন।”
আমরা ধীরে ধীরে তারকার সামনে এগিয়ে গেলাম। আলো খুব কম, কিন্তু ঠিক যতটুকু প্রয়োজন,তারকাটাকে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। আমরা একে একে হাঁটু গেড়ে বসলাম, আর হাত বাড়িয়ে খুব আস্তে করে সেই রূপালি তারকার ঠান্ডা ধাতু স্পর্শ করলাম। মুহূর্তটা যেন কয়েক সেকেন্ড নয়,আরও দীর্ঘ, গভীর কোনো অনুভূতির মতো লাগছিল। খৃস্টানরা বিশ্বাস করেন যীশু যে পাথরের উপর ভূমিষ্ঠ হয়ে ছিলেন সেটি স্বর্গীয় পাথর। তারকা স্পর্শ করার সেই ঠান্ডা অনুভূতি আর গুহার নীরবতার মধ্যে মনে হচ্ছিল এই ছোট জায়গাটা পৃথিবীর কোটি মানুষের স্মৃতি আর বিশ্বাস বহন করে আছে। আর আমরাও আজ সেই আবেগপ্রবণ নিঃশব্দ মুহূর্তের অংশ হলাম।
তারকাখচিত পাথরের ঠিক সামনেই রয়েছে একটি ছোট জায়গা কিছু টাইলস দিয়ে মোড়ানো জানলাম এখানেই ছিলো সেই খেজুর গাছটি যেটি থেকে বিবি মরিয়ম গর্ভাবস্থায় খেজুর খেয়েছিলেন। গুহার ভেতরে তারকা স্পর্শ করার পর আমরা আশপাশ একটু দেখলাম। ছবি এবং ভিডিও করলাম। একসময় সাদি খুব আস্তে করে ইশারা করলেন যে এবার আমাদেরকে বেরুতে হবে। অন্য তীর্থযাত্রীরা সিঁড়ির উপর অপেক্ষা করছেন। আমরা সেই সরু পাথরের সিঁড়ি বেয়ে আবার উপরে উঠতে লাগলাম। সিঁড়ির শেষ ধাপে পা রাখতেই চার্চের ভেতরের গম্বুজটা, লণ্ঠনের আলো আর মোজাইকগুলো আবার সামনে ফুটে উঠল,কিন্তু এবার সবকিছু যেন আরও উজ্জ্বল, আরও গভীর মনে হচ্ছিল।
চার্চের ভেতর থেকে বেরিয়ে যখন সেই ছোট দরজার দিকে হাঁটছিলাম, বাতাসে তখনও মোমবাতির গন্ধ আর স্তোত্রের সুর ভেসে আসছিল। ছোট দরজা দিয়ে মাথা নিচু করে যখন বাইরে বের হলাম, হঠাৎ উজ্জ্বল দিনের আলো চোখে এসে লাগল। বাইরে ছিল মানুষের ভিড়, কোলাহল, সবকিছু ঠিক আগের মতোই। কিন্তু মনে হচ্ছিল আমরা ছয়জন যেন অন্য পৃথিবী থেকে বাস্তবে ফিরে এসেছি।
রাস্তায় এসেই ড্রাইভার মন্তাহিরের সাথে দেখা হলো। তিনি আমাদেরকে গাড়িতে ওঠার তাড়া দিলেন। সাদির সাথে করমর্দন করে সালাম জানিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম। তিনি ও হাসি মুখে সালাম জানিয়ে বিদায় নিলেন। গাড়িতে উঠেই আমরা মন্তাহিরকে জিগ্যেস করলাম প্রথম দেখাতে সাদিকে শেখ সাদি বলায় তিনি কেন হেসেছিলেন? তিনি আবারও হেসে বল্লেন আপনারা মনে করেছেন সে মুসলমান সে তো আসলে খৃস্টান। তাই তাকে শেখ সাদি বলায় আমরা হেসেছি। আমরা আবারও বিস্মিত হলাম, কারণ সাদি যতো সময় আমাদের সাথে ছিলেন অথবা মন্তাহিরের সাথে তার কথাবার্তা এসব কিছুতেই ক্ষুনাক্ষরে ঠের পাওয়া যায়নি তিনি যে খৃস্টান! তাদের দুজনের আচরণে আবারও প্রমানিত হলো বেথলেহাম- জেরুজালেম সহ পুরো ফিলিস্তিনে প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস থেকে সাম্প্রতিক রাজনীতি যতোই কুঠিল হউক না কেন ধর্মীয় সহাবস্থান সতিই বিস্ময়কর। আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে পথের দুধারে লালচে ধূসরের যুগলবন্দিতে ইতিউতি সবুজের থাবা।সোনালী বালুকায় সূর্যের মায়াবী আলোর ঝিকিমিকি। বুঝা যাচ্ছে সুর্য পাহাড়কে আলিঙ্গনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দিকচক্রবালের ধূসর আড়ালে। এখন আমাদের গন্তব্য জেরিকো শহরের পাশে মৃত সাগরের পাড়ের পাহাড়ী উপত্যকায় হজরত মুসা আঃ এর রওজা শরিফ।


দিলু নাসের
লন্ডন




[img|https://s3.amazonaws.com/somewherein/pictures/SyedNaser/SyedNaser-1766684050-6668e76_

মন্তব্য ৫ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৫) মন্তব্য লিখুন

১| ২৫ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১১:৫৬

কামাল১৮ বলেছেন: যীশু একটি কাল্পনিক চরিত্র।

২| ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১২:০৫

সৈয়দ নাসের বলেছেন: আপনি একজন মূর্খ

৩| ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৪:২৮

হুমায়রা হারুন বলেছেন: অসাধারণ পোস্ট।
যা দেখার সৌভাগ্য হয়নি তা আপনার সাথে সাথে দেখে ফেললাম।
আরো ছবি দিয়েন। ৩ নম্বর ছবিটি আসেনি। coding এ error দেখাচ্ছে। তাই দেখতে পাচ্ছি না। একটু ঠিক করে দিয়েন। third bracket ']' মনে হয় বাদ পড়েছে।
অনেক ধন্যবাদ।

৪| ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ১০:০১

রাজীব নুর বলেছেন: যিশু বলে আসলেই কি কেউ ছিলেন??

৫| ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ৯:৫৬

হবা পাগলা বলেছেন: I always make it a point to read your posts, although I rarely have time to leave comments. Thank you very much for sharing what I consider one of the best posts I have ever come across on this blog. Your insights reflect a truly classic mind.

I particularly appreciate the way you have expressed your thoughts on King David. Your timing is impeccable, as I have just begun working on King David’s music, especially focusing on the Psalms.

If you have the time, I would be grateful if you could get in touch with me at [email protected] I would love to share my work with you over the next two months.

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.