| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দিলু নাসের
পবিত্র আল-আকসা মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নজর কাড়লো এই ডাল-পাতাহীন বৃক্ষটি। বিস্তৃত প্রাঙ্গণে মানুষের কোলাহলের মাঝখানে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটি দেখে মনে হলো সে যেন কোনো নিঃশব্দ ধ্যানে মগ্ন । তার শরীরে নেই সবুজের আড়ম্বর, নেই জীবনের বাহ্যিক সৌন্দর্য, তবু সে দাঁড়িয়ে আছে নিজের অস্তিত্বের সাক্ষ্য হয়ে, মনে হলো, এই বৃক্ষটি কেবল একটি গাছ নয়, যেন এই আলোচিত ভূমির দীর্ঘস্মৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
এই বৃক্ষটি এমন এক জায়গায়, যেখানে অসংখ্য নবী ও রাসুলের পদছাপ পড়েছে। এখান দিয়ে হেঁটেছেন আল্লাহর প্রিয় মানুষেরা এবং অনেক দাম্ভিক শাসক। এখানে বাতাসে, প্রাচীন বৃক্ষশাখে যেন নবীদের প্রার্থনার রেশ এখনও লেগে আছে, পাথরের স্তব্ধতায় লুকিয়ে আছে তাদের পদচিহ্ন।
এই আল আকসা প্রাঙ্গণ কোনো একক ধর্মের ইতিহাসে আবদ্ধ নয়, এটি বহু ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের স্মৃতিবাহী ভূমি। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী যেখানে হেঁটেছেন ইবরাহিম আঃ দাউদ,সুলাইমান জাকারিয়া, ইয়াহইয়া ও ঈসা আঃ, এবং সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সঃ মিরাজের প্রাক্কালে এখানে এসেছিলেন।
তাই এই আল-আকসা মুসলমানদের কাছে শুধু একটি মসজিদ নয়, এটি ওহির স্মৃতি, মিরাজের প্রস্তুতির ভূমি, মুসলমানদের প্রথম কেবলা।
পবিত্র কুরআনের সুরা ইসরায় এই জায়গাটি সম্পর্কে এরকম বলা হয়েছে -
“পবিত্র ও মহীয়ান তিনি যিনি তাঁর বান্দাহকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি। তাকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
ঠিক সেই একই জায়গাটিকে ইহুদি ঐতিহ্যে দেখা হয় নবীদের উপাসনা ও প্রাচীন উপাসনালয়ের স্মৃতিতে, আর খ্রিস্টান বিশ্বাসে এটি জড়িয়ে আছে ঈসা আঃ এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে। ভিন্ন ভিন্ন সময়, ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় এখানে উচ্চারিত হয়েছে প্রার্থনা,কিন্তু আকাশের দিকে তাকানোর ভঙ্গিটি ছিল এক। তবে এই প্রাঙ্গণের প্রতিটি পাথর আর ধূলিকণা শুধু ধর্মীয় ইতিহাস বহন করেনা, বরং এখান থেকেই শুরু হয়েছে মানব বিশ্বাসের বহুমাত্রিক যাত্রা।
এই জায়গা বহুবার সংঘর্ষে ক্ষতবিক্ষত হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে একই আশ্রয় খোঁজার আকুলতা। তাই আল-আকসার এই প্রাঙ্গণ কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, এটি ইতিহাস, বিশ্বাস আর সভ্যতার এক জীবন্ত দলিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ভূমি বহন করে চলেছে প্রার্থনার ধ্বনি, অশ্রুর নীরবতা আর প্রতিরোধের অব্যক্ত ভাষা।
এখানে এখনও চারপাশে কোলাহল , ইসরাইলী অস্ত্রধারী নিরাপত্তা রক্ষীদের সতর্ক অবস্থান, এর মাঝেও মানুষ নামাজে দাঁড়াচ্ছেন, ছবি তুলছেন, কিন্তু এই বৃক্ষটি যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অতন্দ্র প্রহরী। সে দেখেছে এখানকার উত্থান-পতন, দেখেছে জৌলুস আর অবহেলা, তবু আজও মাটির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি সে। আমার মনে হলো, এই বৃক্ষ আর আল-আকসার মধ্যে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে।
ডাল–পাতাহীন এই বৃক্ষটি যেন কালের অতলে হারিয়ে যাওয়া সেই সময়ের প্রতীক। বহু ঝড় তাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, বহু রক্তাক্ত সময় তার সৌন্দর্য কেড়ে নিয়েছে, তবু সে শিকড় ছাড়েনি। নবীদের মতোই সে জানে, ধ্যান জৌলুসে নয়, স্থিরতায়। পবিত্রতা আলোয় নয়, বরং ধৈর্যে উদ্ভাসিত হয়।
পাতাহীন এই বৃক্ষটি আমাকে মনে করিয়ে দিলো সব সৌন্দর্য রঙে প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো টিকে থাকাটাই সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। আল-আকসাও আজ হয়তো আগের মতো জৌলুসে ভরা নয়, তবু তার পবিত্রতা অম্লান, তার অস্তিত্ব অস্বীকার করার শক্তি কারও নেই। এই বৃক্ষের মতোই, আল-আকসা দাঁড়িয়ে আছে,ক্ষতবিক্ষত, নীরব, কিন্তু অবিচল।
এই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ইতিহাস শুধু বইয়ে লেখা থাকে না, কখনো তা একটি মরা গাছের শরীরেও লেখা থাকে,যে গাছ কথা বলে না, তবু অনেক কিছু বলে যায়।
দেখলাম আমার চোখের সামনে আল-আকসার বিবর্ণ গুম্বুজ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে,রোদে পোড়া, সময়ের ভারে রঙ হারানো, তবু অটল। সামনে ছড়িয়ে থাকা প্রাঙ্গণের প্রাচীন নিস্তব্ধ পাথর স্তম্ভগুলো শতাব্দীর ইতিহাস বহন করে এখনও দাঁড়িয়ে আছে । স্তম্ভ গুলো ক্ষয়প্রাপ্ত অলঙ্করণ আর ভাঙা প্রান্ত নিয়ে যেন সময়ের নিরব সাক্ষী হয়ে আছে। তারা দেখেছে এখানে প্রার্থনা, সংঘর্ষ, দেখেছে শান্তি আর অশান্তির পালাবদল। তারা এখনো বহন করে চলেছে,নির্যাতিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর এক অবিচল প্রত্যয়ের চিহ্ন।
এই পাথর স্তম্ভ গুলোর গায়ে লেগে আছে বহু যুগের রক্ত, অশ্রু আর উত্থান-পতনের চিহ্ন, তাদের সামনে এখানে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের পায়ের ছাপ পড়েছে, বদলেছে ক্ষমতা, বদলেছে শাসন, বদলেছে বিশ্বাসের ভাষা। এই প্রাঙ্গণের ইট-পাথরে লেগে আছে বহু মানুষের রক্ত আর উত্থান-পতনের ইতিহাস। প্রার্থনার পাশাপাশি এখানে লেখা হয়েছে আত্মত্যাগের কাহিনি, যা সময় কখনোই মুছে দিতে পারেনি।
পৃথিবীর তাবৎ ধর্মীয় স্থাপনা থেকে এই জায়গাটি একেবারেই আলাদা, এই ছায়া সুনিবিড় চত্তর কোনো জৌলুস প্রদর্শন করে না। এখানে বিবর্ণ গুম্বুজ, দেয়াল গুলো ক্ষতচিহ্নে ভরা, তবু আল আকসার উপস্থিতি তিন ধর্মের মানুষের কাছে গভীর ও অবিসংবাদিত। এখানকার ইট-পাথর এই সবকিছুই মানব ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রার নীরব বাহক।
লন্ডন ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
©somewhere in net ltd.
১|
০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:১৬
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: সবকিছুই মানব ইতিহাসের দীর্ঘ যাত্রার নীরব বাহক।
//////////////////////////////////////////////////////////////////////////////////
একে ঘিরেই দীর্ঘ যুদ্ধের ইতিহাস থাকবে সেটাই আমরা জানি,
যদি সরাসরি আপনার দেখার সৌভাগ্য হয়,
অবশ্যই অনবদ্য ,
আমরা দেখার ইচ্ছা পোষন করলেও দেখার সুযোগ নেই ।