| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কি দেখার ছিলো কি দেখছি!
পরে বলবো ...
গত শতাব্দীর চারের দশকে স্বল্পসময়ের ব্যবধানে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে রাজনৈতিক-সামাজিক-ঐতিহাসিক বিচারে যাদের গুরুত্ব অপরিসীম৷ ঘটনাগুলো হলো: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, মহামারী, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগ এবং ঠিক তার অব্যবহিত পূর্বের তেভাগা আন্দোলন৷ নীল বিদ্রোহের পর তেভাগার মত বড় কৃষক আন্দোলন বাংলার ইতিহাসে আর দেখা যায় নি৷ প্রাক-আন্দোলন প্রতিটি ঘটনাই বাঙালীর জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টির পাশাপাশি বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল৷ বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময় বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না, ছিল মানুষেরই সৃষ্ট কৃত্রিম খাদ্য-সংকটের ফল৷
শাসককুলের নীতি ও দুবর্ৃত্ত ব্যবসায়ী শ্রেণীর মুনাফা শিকারের উদগ্র লোভ এই বিপর্যয় ডেকে আনে৷ এমন কি উডহেড কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী এই দুর্ভিক্ষে মৃতু্য হয়েছিল পনের লাখ বঙ্গসন্তানের, বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ছিল দ্বিগুণেরও বেশী৷ যুদ্ধকালীন সময়ে দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি পরের বছরই লবণ ও ভয়াবহ বস্ত্র সংকট দেখা দেয়৷ সরকার অন্ন-বস্ত্র ও লবণের সুষ্ঠু বন্টনের জন্য কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু করলেও তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় বরং এই ব্যবস্থা পুনর্বার ব্যবসায়ীদের সামনে অবৈধ মুনাফা শিকারের সুযোগ এনে দেয়৷ আর ব্যবসায়ীরাও তার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করে রাতারাতি অর্থবিত্তে ফুলেফেঁপে ওঠে৷ মন্বন্তরের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসাবে আসে মহামারী৷ আমাশয়, কলেরা, ম্যালেরিয়া ও জ্বর এই চারিটি রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায় লাখ লাখ নিরাশ্রয় মানুষ৷ কিন্তু তখন জীবনরক্ষাকারী ঔষধ নিয়েও চলছে মজুতদার-চোরাকারবারীদের নোংরা খেলা৷ বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, উলি্লখিত চারটি রোগে মৃতের সংখ্যা ১৯৪৩ সালে ৪,২৭,২৮৭ এবং ১৯৪৪ সালে ৪,০০,৮৮৯ জন৷১
এই ধারাবাহিক বিপর্যয় কৃষকদের সংঘবদ্ধ করেছিল ঠিকই কিন্তু এরসাথে ছিল জমিদারী শোষণের দীর্ঘ ইতিহাস৷ ভাগচাষীরা জমিদারের জমি চাষ করে যেটুকু ফসল পেতেন তার প্রায় সবটুকুই শেষ হয়ে যেত হাটতোলা, তোলবাটি, কাকাতাড়ানি, খামারচাছানি, সেলামি ইত্যাদি পনের রকমের কর বা আবওয়াব দিতে৷ একটা কর বাকি বা ফাঁকি হলেই শুরু হত নির্মম অত্যাচার৷ এইসব অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটাতে সংগঠিত হওয়ার জন্য শক্তি জুগিয়েছিল মধ্যচলি্লশের উলি্লখিত ঘটনাপুঞ্জ৷ ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে হায়দ্রাবাদের তেলেঙ্গানায় কৃষক সংগ্রাম শুরু হলো৷ কিন্তু পরের মাসে কলাকাতায় ঘটে গেল ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যদিও তা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না৷ ১৯২৫ সাল থেকে শুরু করে এমন কোন বছর ছিল না_যে বছর ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি৷ এই দাঙ্গার মাঝে হঠাত্ করেই বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্লাউড কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী তেভাগাকে বাস্তবে রূপায়িত করার ডাক দেয়৷
গভীর শ্রেণীচেতনার কারণেই এতসব নেতিবাচক ঘটনার মাঝেও বেগবান কৃষক-আন্দোলন সম্ভব হয়েছিল, যা ছড়িয়ে পড়েছিল দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, খাঁপুর, ঠুমনিয়া, রংপুরের ডোমার, জলপাইগুড়ির হাহাইপাথা, মাল, মঙ্গলবাড়িহাট, মেটেলি, তরাই, ডুয়ার্স, ময়মনসিংহের বহেরাতলি, সুসংখনা, খুলনার বালাবুনিয়া, দাকোপ, যশোরের নড়াইল ও অভয়নগর, ফরিদপুর, হাওড়া, চবি্বশ পরগণা, মেদিনীপুর, মালদহ জেলাসহ ব্যাপক এলাকায়৷ এই আন্দোলনে সংগ্রামী কৃষকের সরাসরি প্রতিপক্ষ ছিল জমিদার ও তার লাঠিয়াল বাহিনীর সাথে সরকারী ঠ্যাঙাড়ে পুলিশবাহিনী৷ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে শতাধিক কৃষককর্মী নিহত হন৷ এমনকি দেশভাগের পরও এই আন্দোলন চলতে থাকে এবং ১৯৪৮-৪৯ সালে ৬৮ জন কৃষক শহীদ হন৷
বাংলার এই কৃষক আন্দোলন নিয়ে ব্যাপক সাহিত্য সৃষ্টি যে হয়েছে এমন নয়৷ মানিক-সমরেশ-গোলাম কুদ্দুস-আবু ইসহাক-নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়সহ প্রায় ১৭ জন সাহিত্যিকের রচিত সাকুল্যে ২১-২২টি ছোটগল্প৷ আব্দুল্লাহ রসুলের আবাদ ও শিশির দাসের শৃঙ্খলিত মৃত্তিকা নামক উপন্যাস দু'খানি বাদ দিলে যা থাকে তা হলো আন্দোলনের সময় তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রচিত কিছু কবিতা আর গান৷ তেভাগা আন্দোলনের গুরুত্ব বিবেচনায় এই সৃষ্টি অপ্রতুল হলেও গুরুত্বপূর্ণ৷ তেভাগা আন্দোলনকে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং আন্দোলনকে চাঙ্গা করতে এইসব গান ও কবিতা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে৷
তেভাগা নিয়ে যাঁরা কবিতা লিখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য, বিষ্ণু দে, প্রবীর মজুমদার, সাধন গুহ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মণীন্দ্র রায়, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, রাম বসু, অমিতাভ দাশগুপ্ত, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, পূর্ণেন্দু পত্রী ও সলিল চৌধুরী৷ এঁদের সাথে নাম-না-জানা একাধিক কবির রচিত পংক্তিমালারও হদিস পাওয়া যায়৷ গান রচয়িতা হিসাবে কমরেড কালী সরকার, বিনয় রায় ও তার বোন রেবা রায়, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, পঞ্চানন দাস, লাল শুকরা ওরাওঁ, জামশেদ আলি চাটি, বনমালী কুণ্ডু, রজনী বর্মণ, পানু পাল, সলিল চৌধুরী প্রমুখ ছিলেন অগ্রণী৷ এঁদের রচিত গান তখন সংগ্রামী কৃষকদের উদ্দীপ্ত করেছে৷ প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে সবাই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে৷ জীবনের অস্তিত্ব সংকটময় হয়ে পড়ায় মানুষ তখন মরিয়া হয়ে উঠেছে৷ তাদের জেগে-ওঠা সংগ্রামী সত্তা শোষকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে শোষিতের ন্যায্য দাবী প্রতিষ্ঠার সংকল্প নিয়ে৷
সুকান্তের 'দুর্মর' কবিতায় সেদিনের উত্তাল দিনগুলোর সংকল্পদৃপ্ত অযুত প্রাণের উদ্দীপ্ত উচ্চারণ প্রতিফলিত হয়েছে৷ আকালের মৃতু্যশোক আর হতাশা মুছে হঠাত্ জেগেওঠা প্রত্যয়ী কৃষক সমাজের মৃত্যঞ্জয়ী প্রতিজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে কবিতাটিতে :
...হঠাত্ নিরীহ মাটিতে কখন
জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান
গত আকালের মৃতু্যকে মুছে
আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ৷
'হয় ধান নয় প্রাণ' এ শব্দে
সারা দেশ দিশাহারা,
একবার মরে ভুলে গেছে
আজ মৃতু্যর ভয় তারা...২
তেভাগা আন্দোলনের এলাকায় অগি্নগর্ভ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল৷ কবিতাটিতে সব প্রতিরোধ চূর্ণ করে সামষ্টিক শক্তির এগিয়ে যাওয়ার ও উত্পাদিত ফসলের অধিকার অর্জনে জীবন বাজি রাখার সংকল্প ব্যক্ত হয়েছে৷
তেভাগা নিয়ে কবি বিষ্ণু দে লিখেছিলেন 'মৌভোগ'৷ ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে খুলনা জেলার মৌভোগে অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মিলন কবিকে এই কবিতা লিখতে প্রেরণা জোগায়৷ কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে অধিকার আদায়ের কঠিন সংকল্প৷
জন্মে তাদের কৃষাণ শুনি কাস্তে বানায় ইস্পাতে
কৃষাণের বউ পঁইছে বাজু বানায়৷
যাত্রা তাদের কঠিন পথে রাখীবাঁধা কিশোর হাতে
রাক্ষসেরা বৃথাইরে নখ শানায়...৩
তেভাগা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে৷ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব কৃষকের সম্মিলিত শক্তির তীব্র সংগ্রাম শোষকদেরকে বিস্মিত করে৷ মাত্র কিছুদিন আগের সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বিপরীতে এই একতা ছিল অসামান্য এক ঘটনা৷ শোষকের চক্রান্ত ব্যর্থ করে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক কাতারে লড়াই করে জীবন উত্সর্গের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে, মানুষে মানুষে ধর্মীয় ব্যবধানটা সাজানো, সেটা শোষকের ষড়যন্ত্রেরই অংশ এবং দুর্লঙ্ঘনীয় নয় মোটেও৷ শ্রেণীচেতনার চেয়ে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না কখনো৷
সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন৷ তাঁর কাব্যচেতনা রাজনীতি-সচেতনতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল৷ তাঁর লেখার নানাছত্রে সেই সচেতনতার পরিচয় মেলে৷ আর চলি্লশের কবি হওয়ার কারণে ঐ সময়ে সংঘটিত ঘটনাপুঞ্জ তিনি ধরতে চেয়েছেন তাঁর কবিতায়৷ তেভাগা আন্দোলনে দিনাজপুর ছিল শক্ত এক ঘাঁটি৷ ঠাকুরগাঁয়ের বালিয়াডাঙ্গির কৃষকনেতা পষ্টরাম সিং-এর স্ত্রী জয়মণি সিং নেতৃত্ব দিয়ে কৃষক আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছেন৷ পষ্টরাম ও জয়মণি রানীশংকৈল এলাকায় কৃষক আন্দোলনের সামনে ছিলেন৷ মুখে বসন্তের দাগ, লম্বা, ছিপছিপে জয়মণি লেখাপড়া জানতেন৷ ফলে তিনি ধীরে ধীরে রাজবংশী মেয়েদের নেত্রী হয়ে ওঠেন৷ তাঁকে নিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন_কবিতা জয়মণি, স্থির হও৷
কে যেন ডাকছে আমায়৷ কে?
_মিছিলের সেই মুখ৷
দিগন্ত থেকে দিগন্তে বাড়িয়ে দিয়েছি হাত৷
সে কি স্বপ্ন ?
সে কি মায়া ?
সে কি মতিভ্রম ?৪
সুভাষ মুখোপাধ্যায়েরই সমসাময়িক কবি মণীন্দ্র রায়৷ তাঁর 'ইয়াসিন মিয়া' ও 'রজবালির স্বপ্ন' কবিতা দু'টিতে তেভাগার স্বপ্ন বিম্বিত হয়েছে৷ বৃদ্ধ রজবালির কৈ মাছের প্রাণ৷ তিনটে বিবি তাকে ছেড়ে গেছে পরপারে, আর সন্তানেরা অন্যত্র৷ সে তবুও রয়ে গেছে ভিটে অাঁকড়ে৷ স্বপ্ন দেখে আজো ন্যায্য হিস্যার ধান৷
কী আশ্চর্য তবু এই একদা চাষীর
স্বপ্নের আহ্লাদ! রাত্রে চোখে যেই ঘুম নেমে আসে,
আর ধমনীর স্রোতে অভীপ্সার রঙে অবিরত
দেখে_নারী নয়_ধান, ধানের পাহাড় চারিপাশে,
মাঝখানে সে রয়েছে স্থির
সোনালি সর্ষের ফুলে নেশাধরা মৌমাছির মতো৷৫
রজবালির স্বপ্ন কোন ব্যক্তির নয়, সমস্ত ভাগচাষীর স্বপ্নই রজবালির চোখে প্রতিফলিত৷ জীবন ফুরালেও স্বপ্ন ফুরায় না৷ রজবালির স্বপ্ন তার একার নয়, অজস্র রজবালির৷
সুভাষ ও মণীন্দ্রের সমসাময়িক কবি রাম বসু৷ সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন তিনি৷ আটপৌরে ভাষায় পীড়িত মানুষের বেদনার স্বরূপটি ধরার সাথে সাথে তেভাগার মত কৃষক আন্দোলনে প্রান্তিক মানুষের দৃঢ় সংকল্পের বাণী প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কবিতায়৷ 'পরাণ মাঝি হাঁক দিয়েছে' কিংবা 'গজেন মালী' কবিতাতে তেভাগার উপস্থিতি স্পষ্ট৷
এবার আমরা ধান তুলে দিয়ে
মুখ বুঁজিয়ে মরব না
এবার প্রাণ তুলে দিয়ে অন্ধকারে কাঁদব না
এবার আমরা তুলসীতলায়
মনকে বেঁধে রাখব না৷
লণ্ঠনটা বাড়িয়ে দাও...
আমাদের বিদ্রোহ মৃতু্যর বিভীষিকার বিরুদ্ধে
এসো বাইরে এসো
আমার হাত ধরে
পরাণ মাঝি হাঁক দিয়েছে৷৬
চলি্লশের আর-এক সাম্যবাদী কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের 'ঘুমতাড়ানি ছড়া', 'শিশুরাষ্ট্র', 'তেলেঙ্গানা' কবিতাতে তেভাগা প্রসঙ্গ এসেছে জোরালোভাবে৷ এঁদের তুলনায় বয়োকনিষ্ঠ ষাটের দশকের কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্য লিখেছেন তেভাগা নিয়ে কবিতা৷ 'তেভাগা' শিরোনামেই তাঁর একটি কবিতা রয়েছে যেখানে খানিকটা স্মৃতিচারণের ঢঙে তেভাগার গৌরবগাথা স্মরণ করতে চেয়েছেন কবি৷
দেশবিভাগের পরও তেভাগা আন্দোলনের জের চলেছিল আরো চার-পাঁচ বছর৷ এসময় স্বাধীন ভারতে কংগ্রেস সরকার তেভাগার দাবীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার পরিবর্তে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করে৷ ১৯৪৮ সালের আক্টোবর মাসে কাকদ্বীপের চন্দনপিড়িতে পুলিশী হামলা হয়৷ সেই হামলায় প্রাণ হারান অহল্যা দাসী নামে সন্তান সম্ভবা এক কৃষকবধূ৷ পুলিশদের পথ দেখিয়ে আনে কংগ্রেস নেতা পরেশ দাস৷ অহল্যা দাসী সজোরে ঝাঁটা কসে দেয় পরেশের মুখে৷ গাঁয়ের আরেক নারী সরোজিনী তার ছোটভাই অশ্বিনীকে কোলে নিয়ে পালাচ্ছিল, হঠাত্ গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে সে৷ তখন অশ্বিনীকে কোলে তুলে নিয়ে ছুটতে থাকে অহল্যা৷ কিন্তু কিছুটা এগুতেই গুলি এসে লাগে তার তলপেটে৷ এক কংগ্রেসী ফৌজ ছুটে এসে সঙ্গিন দিয়ে চিরে দেয় তার গর্ভ৷ এই মর্মস্পর্শী ঘটনাটি প্রবীর মজুমদার, সাধন গুহ ও সলিল চৌধুরীর একাধিক কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে৷ প্রবীর মজুমদার তাঁর 'শোন গো ও দূরের পথিক' কবিতায় লিখেছেন:
...রুধির রাঙ্গা এই প্রাঙ্গণে ধূলিকণার মাঝে,
অহল্যা মার প্রসব ব্যথা আজো জেগে আছে (ভাইরে)
ঘরে ঘরে বধূ যখন সিঁথেয় সিঁদুর পরে,
অহল্যা মার রক্তলেখায় সে দাগ যেন ভরে৷৭
সাধন গুহ তাঁর 'শোন কাকদ্বীপ রে' কবিতায় লিখেছেন :
শোন কাকদ্বীপ রে
এই চন্দনপিড়ি শ্মশানে
অহল্যা মার চিতার আগুন জ্বলেরে৷
আহা কিষাণী মার প্রসব যন্ত্রণা
বাতাসে বাতাসে গুমরিয়া কান্দেরে
সেই অহল্যা মার সন্তান শোন বন্ধু জনম নিল না
বন্ধুরে নতুন শিশু এই ধরণী দেখতে পেল না... ৮
একই বিষয় নিয়ে সংগীতকার সলিল চৌধুরী লিখেছেন সেই বিখ্যাত কবিতা 'শপথ'৷
...এই পৃথিবীর আলো-বাতাসের অধিকার পেয়ে
পায়নি যে শিশু জন্মের ছাড়পত্র
তার দাবী নিয়ে সারা কাকদ্বীপে
কোন গাছে কোন কুঁড়িরা ফোটে নি
কোন অংকুর মাথাও তোলে নি
প্রজাপতি যত আরো একদিন
গু্বটিপোকা হয়ে ছিল
সেদিন রাত্রে সারা কাকদ্বীপে
হরতাল হয়েছিল৷৯
অহল্যা মায়ের এই কাহিনীর ছায়া অবলম্বনে সমরেশ বসু লিখেছেন তাঁর গল্প 'প্রতিরোধ', যা তেভাগার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্প বলে বিবেচিত৷
এই ঘটনার পরও কিছুকাল তেভাগার রেশ চলেছে, কিন্তু ক্রমে ক্রমে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে৷ ১৯৫৩ সালে হাওড়ার বাগনানে প্রাদেশিক কৃষক সভার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়৷ তখনকার তরুণ কবি পূর্ণেন্দু পত্রী 'বাগনান' শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন যেখানে তেভাগার প্রতিবাদী আবেগ প্রকাশ পেয়েছে:
...জন্মদুঃখী কৃষকের দুটি হাতে দোতরার তার
ঢেউ তোলে অস্থির কান্নার
পঞ্জরাস্থি ছিঁড়ে ফেলে
কবিয়াল গায় কবিগান৷
দুর্জয় বক্তৃতা শোনে
আবালবনিতাবৃদ্ধ
মধ্যবিত্ত মজুর কিষাণ৷১০
পূর্ণেন্দু পত্রী তেভাগা নিয়ে আরো কয়েকটি কবিতা লিখেছেন : 'মৃগালা', 'বড়া কমলাপুর', 'কমরেড শিরীষ মণ্ডল', 'শ্যামল ধান', ইত্যাদি৷ হুগলির দ'ুটি গ্রাম মৃগালা ও বড়া-কমলাপুর৷ মৃগালা গ্রামের একতাবদ্ধ মানুষের দৃষ্টান্তস্থাপনকারী সংগ্রামের কাহিনী ধরা পড়েছে 'মৃগালা' কবিতায়৷ সে গ্রামের মানুষ সম্মিলিতভাবে ধান কাটে, পাহারা দেয়, নিজেদের হিস্যা বুঝে নেয় কড়ায়গণ্ডায়৷ তাদের একতা, সাহস, বীরত্বের মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে 'মৃগালা' কবিতায়৷ 'বড়া-কমলাপুর' কবিতায় দুইবছর ধরে গ্রামের মানুষের সাথে পুলিশের চলে-আসা বিরোধ, হামলা, ধরপাকড়, নির্যাতনের মাঝে সংগ্রামী মানুষের অটুট মনোবল, সংগ্রামের স্পৃহা, বেঁচে থাকার ভিন্ন অর্থ অন্বেষণের খবর পাই৷ বড়া-কমলাপুরের পুলিশী হামলা নিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন ছোটগল্প 'ছোটবকুলপুরের যাত্রী', যা সেই সময়কার একটি প্রামাণ্য দলিল৷ পুর্ণেন্দু পত্রী উচিলদার সংগ্রামী ষাটোর্ধ নেতা শিরীষ মণ্ডলকে জীবন্ত করে রেখেছেন 'কমরেড শিরীষ মণ্ডল' কবিতাটিতে৷ তাঁর লেখায় শিরীষ মণ্ডল কোন একটি এলাকার ব্যক্তি বা নেতা থাকেন না, হয়ে ওঠেন একটি প্রতীক, যা দ্রোহ-সংকল্প-একতাকে ধারণ করে একইসাথে:
কমরেড শিরীষ মণ্ডল
তেরশ একুশ-বিশ সনে
লড়েছে লবণ-আন্দোলনে৷
সেই থেকে লড়ায়ের শুরু৷
তেভাগার দাবি নিয়ে আজ
পরেছে নতুন রণ-সাজ
বুকে বজ্র বাজে গুরুগুরু৷১১
এটা লক্ষণীয় যে, এই আন্দোলন সাম্যবাদী চেতনায়-ঋদ্ধ কবিদেরকে যতটা আলোড়িত করেছিল ততটা কিন্তু অন্যদেরকে করে নি৷ শোষণ ও শোষকবিরোধী এমন একটা আন্দোলন অন্যকবিদের মাঝে কেন কোন আলোড়ন তুললো না তা এক কৌতূহলের বিষয়৷ এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক সাহিত্য সৃষ্টি হলো না, যেটাকে আফসোসের বিষয়ই বলতে হবে৷ কারণ যে কোন আন্দোলনে শিল্প-সাহিত্য সবসময় সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করে৷ আন্দোলনকে বেগবান করতে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য৷ আন্দোলনের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে এইসব সাহিত্য রচিত হয়ে থাকে, কেননা পরবর্তী সময়ে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেলে শুরুর আবেগ ও উদ্দীপনার অনেকটাই যায় মিইয়ে৷ ফলে পরে আর কোন উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি নজরে পড়ে না৷ তেভাগার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি৷ পরবর্তীকালে রচিত কবিতার সংখ্যা খুবই অল্প৷ তবে যা লেখা হয়েছে তার মাঝেই ধরা আছে মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস, আবেগ, আত্মত্যাগ, শোষণ নির্যাতন থেকে মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবী আদায়ের তীব্র সংকল্প৷
তেভাগা আন্দোলনের দাবী কবিতার চেয়েও অধিকমাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে গানে৷ কৃষকদের চাঙ্গা রাখতে আন্দোলনের সহশক্তি হিসাবে প্রচুর গান রচিত ও গাওয়া হয়েছে৷ আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন খাঁপুরে একরাতে পুলিশের সাথে কৃষকদের ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়৷ আধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে তীর ধনুক নিয়ে কৃষকরা দুরন্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে৷ খনন-করা পরিখায় পুলিশের ট্রাক আটকে যাওয়ার পর পুলিশ গুলি চালালে কৃষকরা তীরধনুক নিয়ে পাল্টা জবাব দেয়৷ চিয়ারসাই নামের দুঃসাহসী এক কৃষক লাঠি হাতে পুলিশদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ পুলিশ গুলি চালালে গুলি তাঁর কাঁধে লাগে৷ গুলিবিদ্ধ চিয়ারসাই ছুটে গিয়ে ঘর থেকে শাবল এনে ট্রাকের চাকা ফাটিয়ে দেন৷ দ্বিতীয় গুলি এসে তাঁর বুকে লাগে, কিন্তু অসমসাহসী চিয়ার লাফিয়ে ওঠেন পুলিশের ট্রাকে, তৃতীয় গুলি লাগে কপালে, মৃতু্যর কোলে ঢলে পড়েন চিয়ার৷ তাঁর এই অসীম বীরত্বের কাহিনী নিয়ে গান বেঁধেছিলেন কমরেড কালি সরকার৷
ছুটিল চিয়ার সাই হস্তে মোটা লাঠি
জোয়ানমর্দ বাপের বেটা আটত্রিশ ইঞ্চি ছাতি
দোহাতিয়া বাড়ি মারে সৈন্যের মাথায়
বাপ ডাক ছাড়ি সৈন্য টলে পড়ে যায়...
আর এক গুলি চিয়ার সাইয়ের বুকেতে ফোটে
আন্ধার হইল দুনিয়াদারি চেতন গেল টুটে
ক্ষণে অচেতন মর্দ মনেতে চেতন
লাফ দিয়া ট্রাকে ওঠে সিংহের মতন
দুশমনের গুলি ফের লাগিল কপালে
বেহুঁশ হৈল মর্দ রুহু ছেড়ে দিল...১২
বিনয় রায় তাঁর 'অহল্যা মা তোমার সন্তান জন্ম নিল না' গানে অনাগত সন্তানের জন্য হাহাকার করেছেন৷ আর স্বপ্ন দেখেছেন অহল্যা মায়ের সন্তান জন্ম না-নিলেও ঘরে ঘরে যে সন্তান জন্ম নেবে তারা শোষকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেই৷ তিনি শোষকদেরকে দেখেছেন শিশুনিধনকারী কংসরূপে আর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তাদের বধ করতে জন্ম নেবে নতুন শিশু (শ্রীকৃষ্ণ)৷ প্রত্যাশার মর্মবাণীতে পূর্ণ কবিতাটি প্রতিবাদধর্মিতায় অসাধারণ৷
অহল্যা মা তোমার সন্তান জন্ম নিল না
ঘরে ঘরে সেই সন্তানের প্রসব যন্ত্রণা
শত কংস ধ্বংস করে যে শিশু জন্মিবে
মাঠে মাঠে তারই জল্পনা
প্রাণ আর মানে না৷১৩
বিনয় রায় রংপুর অঞ্চলের 'ডাঙ্গুয়ার বধূয়া তুই' জনপ্রিয় গানের সুরে একটি গণসংগীত রচনা করেন যা তখন লোকের মুখে মুখে ফিরত৷
গরিব দেশবাসী গরিব কিষাণ ভাই
তুই খ্যাতত্ করিলিরে ফসল
সেই ফসল কাড়িয়া নিল
মজুতদার শয়তানে,
গরিব কিষাণ ভাইরে...১৪
তেভাগার সময় মন্বন্তরের ভয়াবহ অভিঘাত মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত ছিল৷ মন্বন্তরের সময় রচিত অনেক গানও তেভাগার আন্দোলনের সময় গাওয়া হত৷ মন্বন্তরের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা এই আন্দোলনের প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল৷ আন্দোলনকে চাঙ্গা রাখতে মন্বন্তরের গানও গাওয়া হত৷ বিনয় রায়ের বোন রেবা রায়ের হৃদয়বিদারক গণসঙ্গীত মানুষের মনকে বেদনা ভারাক্রান্ত করলেও পরক্ষণেই আবার দ্রোহী করে তুলতো৷
জলপাইয়া মুঁই নারী, রংপুরে মোর বাড়ি
স্বামী বেচাইল ধনীর ঘরে
ক্ষুধায় পাগল প্রাণ পতিরে
মুই নারী দেহা বেচাইয়া খাই
মহত্ আছেন প্রধান আছেন
সবারইতো মা বোন আছেন
মুঁই অভাগী পুঁছ সবার কাছে
ক্ষুধার জ্বালায় এদেশতে রে
মা-বোন কি হবে কেনা দাসী?১৫
ডুয়ার্সের লাল শুকরা ওরাওঁ তেভাগার এক অবিস্মরণীয় প্রবাদপুরুষ৷ বড় বিরসার ভাতিজা, শহীদ স্বর্ণময়ী ওরাওঁনি ও পোকো ওরাওঁনির ভাই লাল শুকরা ওরাওঁ একজন লোককবি ও গায়ক৷ তাঁর রচিত গান তখন তেভাগার প্রত্যেকটি সভা-সমাবেশে গাওয়া হত৷ তেমনই একটি গান :
হাওয়া চলে সরসর
লাল ঝাণ্ডা উড়ে ফর ফর
চলু কিষাণ চলু মজদুর
নিকালিনা যাব্ কিরে
লড়াইকে ময়দান...১৬
বোন পোকো ওরাওঁনিকে নিয়ে তিনি এইরকম আরো অনেক গান গেয়ে বেড়াতেন৷ লড়াইয়ের ময়দানে যাবার জন্য প্রেরণাদায়ী গান রচনা করেছেন এই লাল শুকরা ওরাওঁ৷ কিন্তু অভিযোগ আছে দেবেশ রায়ের বিরুদ্ধে যে, তিনি তাঁর 'তিস্তাপারের বৃত্তান্ত' উপন্যাসে লাল শুকরাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করেন নি৷ এই প্রসঙ্গে পরিতোষ দত্ত তার একটি লেখায় আফসোস করেছেন, 'দীনবন্ধু মিত্র নীলদর্পণ লিখেছিলেন চাষীকে, লড়াকুকে যোগ্য মর্যাদা দিয়ে৷ আমাদের দেশের এক নামীদামী বহু পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক কিংবদন্তীর নায়ককে করলেন নেশাখোর মাতাল৷'১৭ বিভিন্ন সংগ্রামে অবদান-রাখা মানুষদের অবশ্যই যোগ্য মর্যাদা পাওয়া প্রয়োজন৷ ঐতিহাসিক ঘটনা চিত্রায়নে বস্তুনিষ্ঠতা কাম্য৷ লাল শুকরা ওরাওঁ- এর ছন্দোবদ্ধ গান ছিল সেইসময় জলপাইগুড়ির তেভাগা আন্দোলনের প্রেরণা৷ তেভাগা আন্দোলনে তাঁর অবদানকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশই নেই৷
তেভাগার সময় খুলনা বিভাগের নড়াইলে জোরালো আন্দোলন হয়েছিল৷ এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বামনেতা প্রয়াত নূরজালাল, অমল সেন, রসিক লাল ঘোষ প্রমুখ৷ নূরজালাল তাঁর ত্রিশ বিঘা মত জমি তেভাগায় বগর্া দিয়ে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেন একইভাবে তেভাগায় জমি বর্গা দিতে৷ ১৯৪৬ সালের ১৫ নভেম্বর তার নিজের গ্রাম দুগর্াপুরসহ প্রায় চলি্লশটি গ্রামের মানুষ ও প্রায় দেড়হাজার কৃষক প্রতিনিধি তেভাগা আদায়ের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে৷ নূরজালালের গতিশীল নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলমান চাষীর মিলিত শক্তি তেভাগা আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে৷ সেইসময় পঞ্চানন দাস নামে এক লোককবি তাঁকে নিয়ে দীর্ঘ একটি গান রচনা করেন৷ গানটির কিছু অংশ ছিল এইরকমের:
তেভাগার আন্দোলনে নড়াইল হল অগ্রণী
চন্দ্রবসু এলেন আশু শুনতে পেলাম ইদানি
ভাঙ্গতে এদের কলকাটি
কেউ বাজাচ্ছে দোকাটি
এই আন্দোলন গড়ে তোলার প্রধান নেতা নূরজালাল
এই দলেরই মন ভাঙ্গিতে জুটে গেছে কয় দালাল
হস না তোরা বিমর্ষ
তোদের এই আদর্শ
ভারত জুড়ে বেড়াক উড়ে মজুর চাষীর জয় নিশান
হওরে সবে আগুয়ান৷১৮
তেভাগার সময় রচিত গানগুলো কৃষকদের কোন-না-কোন বীরত্বপূর্ণ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রচিত৷ রংপুরের কৃষক জামশেদ আলী চাটি কৃষকদের হাতে সেখানকার জোতদার কোরামল দাগার প্রহৃত হবার ঘটনা নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক গান রচনা করেন৷ কোরামালের আধিয়ার বাবুরী বর্মণ ধান কাটতে গেলে সাঙ্গপাঙ্গসহ কোরামলও মাঠে যায়৷ কৃষকনেতা মণিকৃষ্ণ সেন বাবুরীকে নিবৃত্ত করতে গেলে কোরামলের লোকদের হাতে প্রহৃত হন৷ এর প্রতিবাদে শত শত কৃষক লাঠি-দা-বল্লম নিয়ে কোরামলকে তাড়া করে৷ বাবুরীর মা নয়নতারা বর্মণ তার পিঠে গাইন দিয়ে আঘাত করে৷ এই ঘটনাই জামশেদ আলি চাটির গানে ধরা পড়েছে:
বিকান থাকি আলুরে কাইয়া
হাতে লইয়া ঘটি
আস্তে আস্তে নিলুরে কাইয়া
মোদের দেশের মাটি
কোন দেশের নাড়িয়া কাইয়ারে
মোরে দেশে আলুরে কাইয়া
মোরে মাটি নিলু
পেটের ভোগে তেভাগা চাইতে
মাথাতে ডাঙ্গালু...১৯
গানটিকে কেউ কেউ অজ্ঞাত কোন শিল্পীর লেখা বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তেভাগা আন্দোলন বইয়ের সম্পাদক ধনঞ্জয় রায় গানটিকে মণিকৃষ্ণ সেনের কাছ থেকে সংগ্রহ এবং চাটি মোহাম্মদের বলে দাবী করেন৷ গানটিতে তেভাগা আন্দোলেনের একটি উল্লেখযোগ্য খণ্ডচিত্র ধারণ করা আছে৷
মালদহ জেলার গোবিন্দ শেঠ ও বনমালী কুণ্ডু তেভাগার উপর অনেক ক'টি গান লেখেন৷ তাঁদের গান তখন ব্যাপক আলোড়ন তোলে এবং তেভাগা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী চাষীদের উদ্দীপ্ত করে৷ গোবিন্দ শেঠ রচিত একটি গান :
ওরে জমিদারের চর আইস্যাছে কাড়ইয়া নিতে ধান
ছাইড়বো না ভাই ঘরের লক্ষ্মী
দ্যাহে থাকিতে প্রাণ......
এ ধান দিমু না,
এ লক্ষ্মী ছাড়মু না
দ্যাহে থাকিতে প্রাণ...২০
বনমালী কুণ্ডু রচিত গানে মহাজনদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে৷ গানগুলিতে কৃষকদের দুর্দশা বর্ণনার মাধ্যমে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের আহ্বান ধ্বনিত৷
শোনরে ভোলা নানা মাঠে নাইকো দানা
ক্যানে দিলি এমন সাজারে
তোর ভূতের বেগার খাটা
ভাত নাই আধ পেটা
হামার খাঁচা হয়্যাছে বুকের পাঁজারে...২১
ঠাকুরগাঁয়ের রজনী বর্মণ এই সময় প্রচুর তেভাগার গান লিখেছিলেন৷ তেভাগার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিলেন এই লোককবি৷ বিভিন্ন সময়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে তিনি তাঁর বীরত্বের পরিচয় দেন৷ রজনী বর্মণ পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার হয়ে জেলখানায় মৃতু্যবরণ করেন৷ তাঁর একটি গানে হাটবাজারে জোতদার জমিদারের তোলবাটি বা বেআইনি খাজনা আদায় ও আবওয়াব উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে৷
কৃষক মজুর ভাই
চল চুড়ামুড়ি বেচিব
বোটি না হয়
আবওয়াব বন্ধ কর
নাই নাই বিধবার বোটি নাই নাই
দশের হাট হামাদের হাট
বেটির চুল ছোবানা জোতদার_
কৃষক মজুর ভাই ভাই৷২২
তেভাগা আন্দোলনের সময় অনেক গান প্রচলিত ছিল যেগুলোর প্রকৃত রচয়িতা কারা তা জানা যায় না৷ আন্দোলনের অর্ধ শতাব্দী পর খোঁজ করেও কোন দিশা পাওয়া যায় নি৷ সেরকম কিছু গান সেইসময় আন্দোলনে সংগ্রামী কৃষকদের প্রেরণা যুগিয়েছে:
১. নালবরণ ঝাণ্ডা
অগি্নরবণ কাইদা
এ ভারত করতে স্বাধীন
সবাই মিলে আগা৷
২. পারই আরনি বাইম আধি হাল
আরনি বাইম আধি হাল
সারা বছর হাল চাষ করে
কিছুই পাওয়া যায়না ওরে কৃষক ভাই
ডালি কুলা শূন্য করে মুই
গুদগুদি নিয়ে ঘরে ফিরে যাই
ওরে কৃষক ভাই২৩
কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাসও তেভাগার গান রচনা করেছেন৷ আসামের শিলচর জেলে বন্দী মাধবীনাথের মৃতু্যতে তিনি লিখেছিলেন:
আমরা তো ভুলি নাই শহীদ একথা ভুলব না
তোমার কলিজার খুনে রাঙ্গাইল কে আন্ধার জেলখানা২৪
তবে তেভাগা নিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও সার্থক গানগুলো রচনা করেছেন গত শতাব্দীর গণসঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ সলিল চৌধুরী৷ তিনি মধ্যচলি্লশ থেকেই মেহনতী মানুষের সংগ্রামকে উপজীব্য করে গান রচনার মাধ্যমে নাচিয়ে দিয়েছিলেন সংগ্রামী মানুষের মন৷ সে সব গানে মানুষের নিজর্ীব চেতনা, ঘুমন্ত বিবেক নতুন দ্রোহে জেগে উঠেছিল৷ কি করে ভোলা যায় সলিলের এই গান?
হেই সামালো হেই সামালো
হেই সামালো ধান হো,
কাস্তেটা দাও শানহো
জান কবুল আর মান কবুল
আর দেবো না আর দেবো না
রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো৷২৫
তেভাগা আন্দোলনের সময় সলিল চৌধুরী আরো লিখলেন_
ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে
জীবন মরণে তোমায় চাই না ভুলিতে৷...
হিমালয় আর নিদ্রা নয়
কোটি প্রাণ চেতনায় বরাভয়
জাগো ক্রান্তির হয়েছে সময়
আনো মুক্তির খরবন্যা...২৬
উল্লেখ থাকে যে, স্বাধীনতার পরও কতিপয় অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলন চলেছে৷ কাকদ্বীপ, বড়াকমলাপুর, ডুবিরভেড়ি ইত্যাদি এলাকায় জোরদার আন্দোলন চলেছে৷ সেখানে কংগ্রেসী পাণ্ডা ও পুলিশ বাহিনীর অত্যাচার ছিল সীমাহীন৷ এসবের প্রতিবাদে সলিল চৌধুরী লিখলেন_
ও আয়রে ও আয়রে
ও ভাইরে ও ভাইরে
ভাই বন্ধু, চলো যাই রে৷
ও রাম রহিমের বাছা_
ও বাঁচা আপন বাঁচা
চলো ধান কাটি আর কাকে ডরি_
নিজ খামার নিজ ভরি,
কাস্তেটা শানাইরে...
ঐ কমলাপুর বড়া
আর কাকদ্বীপ ডোঙ্গাজোড়া
এসেছে ডাক চলনা সবাই সোনা তুলি ঘরে...২৭
গানটিতে প্রতিবাদী বাণী প্রচারের সাথে সাথে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে৷ এছাড়াও আছে সলিলের ভাণ্ডারে_
ও ভাই চাষী ক্ষেতের মজুর যতেক কিষাণ কিষাণীর সজনী
এই বেলা নাও একতারই পথের নিশানী৷
এই রক্ত ঢেলে জমিন চষে পরগাছা পুষিলাম
সেই পরগাছা হইল যে রাজা আমরা তারই গোলাম
এই দেশ জমিনের থেকে এবার আগাছা দাও নিড়ানী...২৮
আরো একখানি গান আছে তেভাগার পটভূমিতে রচিত; রেকর্ডে প্রকাশিত নয় বলে কম জনপ্রিয়, কিন্তু বাণী ও সুরে অসাধারণ:
গুরু গুরু মেঘের মাদল বাজে
তা তা থৈ থৈ মনের ময়ূর নাচে
আষাঢ়ের বরষা এলো
পরশে তারি রুক্ষ মাটি সরস হলরে
আয় লাঙ্গল ধরি মোরা লাঙ্গল চালাই
আয় ফসল বুনি মোরা ফসল ফলাই
আয় আয়রে আয়...২৯
এছাড়াও সলিল চৌধুরী সুকান্তের অনেক কবিতার সার্থক সুরারোপের মাধ্যমে পরিবেশন করে তখনকার অগি্নগর্ভ দিনে আন্দোলনকে শাণিত করেছেন৷ তেভাগার উপর ভিত্তি করে 'এই মাটিতে' শিরোনামে একখানি নাটকও লিখেছিলেন তিনি৷
তেভাগার কবিতা ও গান নিয়ে খুব একটা গবেষণা হয় নি৷ পশ্চিমবঙ্গের অনুরাধা রায় বা ধনঞ্জয় রায় যেটুকু করেছেন সেখানে তাঁদের কাজের মাঝে মতপার্থক্য থাকলেও তাঁদের কারো কাজেই বাংলাদেশের কবিয়াল রমেশ শীলের কৃষক আন্দোলনের গানের উল্লেখ পাই না৷ চলি্লশের দশকের মাঝামাঝি তেভাগার ঠিক আগে রমেশ শীল কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং ১৯৪৪ সালে পার্টি সদস্যপদ লাভ করেন৷ এই কাজে তাঁর অনুপ্রেরণাদাতা ছিলেন বঙ্কিম সেন, কল্পতরু সেনগুপ্ত, সারদাবরণ শীল ও কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশী৷ পাশাপাশি 'জনযুদ্ধ' পত্রিকার ভূমিকার কথাও তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন:
...মুন্সির হাটে হঠাত্ একটি চেনা ছেলের সঙ্গে দেখা৷ হাতে তার একটা কাগজ৷ তার উপর লেখা 'জনযুদ্ধ'৷ ছেলেটি বলল, নিয়ে যান পড়ে দেখবেন৷ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আগাগোড়া পড়লাম৷ দেশের কথা ঠিক এভাবে জানার সুযোগ হয় নি৷ নূতনভাবে গান লেখার একটা দারুণ সাড়া পেলাম৷৩০
দুর্ভিক্ষ, বিশ্বযুদ্ধ ও তেভাগা আন্দোলনের মাঝামাঝি সময়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগাদানের ফলে তেভাগা আন্দোলন তাঁর চিত্তে সাড়া জাগাবে এটাই স্বাভাবিক৷ তাঁর গানে আন্দোলনের চেতনা প্রতিফিলিত হয়েছে :
জাগ জাগ জাগ প্রকৃতির ঢাক
বাজিছেরে ঐ শুন মজুর কিষাণ৷
প্রতিক্রিয়া দল, দলিয়া সকল
তুলে ধর সবে লাল নিশান৷৩১
১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের পর কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে ফসল বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছিল৷ দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ চেহারা থেকে এই প্রতীতী জন্মেছিল যে, ফসলের অপ্রতুলতাই দুর্ভিক্ষের কারণ৷ কিন্তু শোষণ যে তার থেকেও বড় কারণ সেটাও অচিরেই তারা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিল৷ আর তাই ফসলের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবী নিয়ে গড়ে উঠেছিল তেভাগা আন্দোলন৷ ফসল-বাড়ানো, দুর্ভিক্ষ, মজুতদারি নিয়ে রচিত অনেক গান তেভাগা আন্দোলনকে বেগবান করেছে৷ রমেশ শীলের তেমনি দু'টি গানে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বর্ণনার পাশাপাশি ফসল-বাড়ানোর আবেগ প্রকাশ পেয়েছে :
চাষী ভাইরে, ইন্দুরে নিলরে গোলার ধান
ঘরের বাতা ইন্দুরে বড় আন্দুর আইনল ডাকি ( কিরে হৈ হৈয়া)
দিল সব কাজেতে ফাঁকি,
পরান নিবার নাইরে বাকি হিন্দু-মুসলমান....৩২
দেশীয় দালাল-মুত্সুদ্দী ও বিদেশী শোষকদের বিরুদ্ধে সামপ্রদায়িক বিরোধ ভুলে হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত ঐক্য সৃৃষ্টির মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তুলে ধানের অধিকার আদায়ের সংকল্প প্রকাশিত হয়েছে গানটিতে৷ এইরকম আরো একটি গান আছে রমেশ শীলের :
এক হয়ে যা চাষী ভাইরে এক হয়ে যা চাষী
ভাইয়ে ভাইয়ে এক হয়ে থাক কিসের রেষারেষি৷
১৯৪৩ সনে দুঃখ আছেনি মনে৷
ভাইয়ের গোলা ভরা ধানে রইলাম উপবাসী
যারে বলি মজুতদার, সেওতো দেশের ভাই আমার৷
পঁয়ত্রিশ লক্ষ ভাইবোন মারার জীবন দিল নাশি৷৩৩
তেভাগা আন্দোলন ছিল বাংলার ভূমিহীন কৃষক সমাজের অর্থনৈতিক আন্দোলন৷ তিনটি পর্যায়ে এই আন্দোলন সংঘটিত হয়৷ ১৯৩৯-৪০ সালে উত্তরবঙ্গে আধিয়ার আন্দোলনকে তেভাগার সূচনাপর্ব বলা চলে৷ কিন্তু এই আন্দোলন নানা কারণে বেগবান হতে পারে নি৷ দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন আন্দোলন শুরু হলো তখন দ্রুতই তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল এবং প্রচণ্ড গতি লাভ করলো৷ এই আন্দোলনে কৃষক সমাজের মাঝে যে স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ্য করা গেছে তেমনটা খুব কমই দেখা যায়৷ আন্দোলনের সহায়ক-শক্তি হিসাবে শিল্পী-সাহিত্যিকরা কবিতা গান রচনা করে পরিবেশনের মাধ্যমে কৃষক আন্দোলনকে চাঙ্গা করে তোলেন৷ এই গান-কবিতা যাঁরা রচনা করেছেন তাঁদের কেউ কেউ সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণও করেছেন৷ আবার গানরচয়িতাদের অনেকেই লোককবি৷ মাটির সোঁদা গন্ধ তাঁদের রচনায়৷ যেভাবে শক্তহাতে লাঙ্গলের ফলা ধরে কঠিন মাটির বুক চিরে সোনা ফলিয়েছেন তাঁরা সেভাবেই মনের গভীর থেকে স্বপ্নগুলোকে কথায় সুরে মানুষের কাছে প্রকাশ করে নিজেদের ন্যায্য দাবী প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে প্রেরণা যুগিয়েছেন৷
এতকিছুর পরও কিন্তু তেভাগা আন্দোলন সফল হতে পারে নি৷ সে এক মস্তবড় দুর্ভাগ্য বৈকি! নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে রাজনৈতিক অসাধুতাই জয়ী হয়েছে৷ তাই এই বেগবান কৃষক আন্দোলন কৃষকদের জন্য কোন শুভবার্তা আনতে পারে নি৷ কিন্তু তারপরও রয়ে গেছে তেভাগার বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস, চাষীদের সত্-সংগ্রামী প্রচেষ্টার অজস্র-কাহিনী৷ আর রয়ে গেছে তেভাগার গান ও কবিতা৷ এই সৃষ্টিগুলো আমাদের ইতিহাস ও সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদ যা আগামী দিনগুলোতে নানা সংগ্রামে প্রেরণা যোগাবে৷
©somewhere in net ltd.
১|
২৪ শে মে, ২০১২ ভোর ৬:৫৫
মেহ্দী হাসান বলেছেন: Thanks for a great effort but I think few fell really care about this incidents! Anyway you should specifically mention that it happened under British rule, as I think that most of our young people know the historical background of our country, so its import when you reintroduce some historical incidents. I really don’t expect anyone will seriously read about it!!! It’s a lost battle!