| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আব্দুল্লাহ নাহিদ
যদি নিজে নিজের ‘বিবেক’কে বড় মনে কর তবে শত্রু সৃষ্টি হবে আর যদি ‘হৃদয়’কে বড় কর তবে বন্ধু বৃদ্ধি হবে।
আল-কুরআনের আলোকে তাওরাত,যাবূর,ইনজীল বনাম ‘পবিত্র বাইবেল’ পর্ব -১
১. ভূমিকা
আল্লাহর কিতাবসূহে বিশ্বাস করা মুমিনের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুরআন ও হাদীসে বিষয়টি বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন কারীমে একস্থানে মহান আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا آَمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآَخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالا بَعِيدًا
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহে, তাঁর রাসূলে, তাঁর রাসূলের উপর যে গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন তাতে এবং যে গ্রন্থ তিনি পূর্বে অবতীর্ণ করেছেন তাতে ঈমান আন। এবং কেউ আল্লাহ, তাঁর ফিরিশতাগণ, তাঁর গ্রন্থসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং পরকালকে অবিশ্বাস করলে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে।”
পূর্বে অবর্তীণ গ্রন্থসমূহের মধ্যে তাওরাত, যাবূর ও ইনজীলের নাম কুরআন ও হাদীসে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। এ সকল আয়াত ও হাদীসের ভি্িত্ততে সকল মুসলিম সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহ তাঁর নবী মূসা (আ)-কে ‘তাওরাত’, দায়ূদ (আ)-কে ‘যাবূর’ এবং ঈসা (আ)-কে ‘ইনজীল’ নামক কিতাব ওহীর মাধ্যমে প্রদান করেন। এ গ্রন্থত্রয় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ওহী ও মানব জাতির পথের দিশারী ছিল।
২. খৃস্টান ধর্মগুরুদের প্রচারণা ও দাবি
এ গ্রন্থত্রয়ের উল্লেখ ও প্রশংসার পাশাপাশি এগুলির বিকৃতির বিষয়ে কুরআন ও হাদীসে সুনিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ মুসলিমগণ এ সকল বিষয়ে সচেতন নন। এই অসচেতনতার সুযোগ গ্রহণ করছে খৃস্টান পাদরি ও প্রচারকগণ। তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে পরিচিত ‘পবিত্র বাইবেলের’ মধ্যে সংকলিত কিছু পুস্তককে ‘তাওরাত’, ‘যাবূর’ ও ‘ইঞ্জিল’ নামে মুদ্রণ করে মুসলমানদের মধ্যে প্রচার করেন। বিশেষত সরলপ্রাণ মুসলিমদেরকে ধর্মান্তর করতে তারা এগুলিকে ব্যবহার করেন। পাদরিগণ তাদের নিকট সংরক্ষিত বিকৃত, পরিবর্তিত ও বানোয়াট গ্রন্থগুলিকে ‘তাওরাত’, ‘যাবূর’ ও ‘ইঞ্জিল’ নামে সরলপ্রাণ মুসলিমদের কাছে উপস্থিত করে প্রথমত তাদের মনে এগুলি পাঠের কৌতুহল সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয়ত এগুলিই কুরআন বর্ণিত প্রকৃত তাওরাত, যাবূর ও ইনজীল বলে দাবি করে বিভিন্ন কৌশলে এগুলির সকল কথা সত্য বলে গেলাতে চেষ্টা করেন।
তারা বিভিন্ন মিথ্যার ধুম্রজাল সৃষ্টি করে দাবি করেন যে, কুরআনে যেহেতু এ পুস্তকগুলির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, এগুলির প্রশংসা করা হয়েছে, এবং এগুলির বিধান পালন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেহেতু প্রমাণ হয় যে, কুরআন ইহূদী-খৃস্টানদের নিকট সংরক্ষিত ‘তাওরাত’, ‘যাবূর’ ও ‘ইনজীল’ নামের পুস্তকত্রয়কে বিশুদ্ধ ও সঠিক বলে নিশ্চিত করেছে। কাজেই যে ব্যক্তি কুরআন বিশ্বাস করে তার জন্য এ তিন পুস্তকের সকল কথা সঠিক বলে বিশ্বাস করা জরুরী। অন্তত মুসলিমরা )-এর যুগ পর্যন্ত ইহূদী-খৃস্টানদের হাতে যে কিতাবগুলিমানতে বাধ্য যে, মুহাম্মাদ ( ছিল সেগুলি পুরো বিশুদ্ধ ছিল। আর এর পরে এ সকল গ্রন্থে কোনো পরিবর্তন বা বিকৃতি ঘটেছে বলে মুসলিমগণ প্রমাণ করতে পারবে না। কাজেই কিতাবীদের নিকট বিদ্যমান এ সকল পুস্তকের সবই সঠিক বলে মানতে মুসলিমরা বাধ্য।
সকল খৃস্টান গবেষক একবাক্যে স্বীকার করেন যে, প্রচলিত ইনজীলের পুস্তকগুলি সবই মানব রচিত এবং অগণিত বিকৃতি ও ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা। তবে মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার জন্য তারা দাবি করেন যে, বাইবেলে কোনো ভুল নেই, তার প্রমাণ কুরআনে এগুলির প্রশংসা করা হয়েছে এবং এগুলিতে বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের প্রসিদ্ধ পাদরি ও প্রচারক ড. কার্ল গোটালেব ফান্ডার (ঈধৎষ এড়ঃঃধষবন চভধহফবৎ, উ. উ.) রচিত ‘মীযানুল হক্ক’ (ইধষধহপব ড়ভ ঞৎঁঃয) পুস্তকটি এ জাতীয় অগণিত দাবিতে পরিপূর্ণ। পরবর্তী খৃস্টান প্রচারকগণ সকলেই এ পুস্তকের উপর নির্ভর করেন। আমাদের দেশে বাংলাভাষায় রচিত তাদের প্রচারমূলক প্স্তুকগুলিও একই কথা প্রচার করে।
মি. ফান্ডার বলেন:”It is clear form the Quran itself that “the Book” that is to say the Bible cxisted among “the People of the Book” in Muhammad’s time and was not ‘a name devoid of thing named’. This is evident from many passages, of which we content ourselves with quoting only a few.”
মি. ফান্ডার তার দাবির স্বপক্ষে যে সকল আয়াত উদ্ধৃত করেন সেগুলির মধ্যে রয়েছে:
(১) মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَسْتُمْ عَلَى شَيْءٍ حَتَّى تُقِيمُوا التَّوْرَاةَ وَالإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ
“বলুন, হে কিতাবীগণ, তাওরাত, ইন্জীল ও যা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে (আল-কুরআন) তোমরা তা প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত তোমাদের কোনো ভিত্তিই নেই।”
মি. ফান্ডার দাবি করেন যে, এ আয়াত প্রমাণ করে যে, ) তাঁর সময়ে ইহূদী ও খৃস্টানদের মধ্যে বিদ্যমান তাওরাত ও ইঞ্জিলকেমুহাম্মাদ ( বিশুদ্ধ বলে স্বীকার করেছেন এবং তাদেরকে তা প্রতিষ্ঠা করতে আহ্বান করেছেন।
(২) মহান আল্লাহ বলেন:
وَقَالَتِ الْيَهُودُ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَى شَيْءٍ وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ كَذَلِكَ قَالَ الَّذِينَ لا يَعْلَمُونَ مِثْلَ قَوْلِهِمْ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ
“ইহূদীরা বলে, ‘খৃস্টানদের কোনো ভিত্তি নেই’, এবং খৃস্টানগণ বলে, ‘ইহূদীদের কোনো ভিত্তি নেই’; অথচ তারা কিতাব পাঠ করে! এভাবে যারা কিছুই জানে না তারাও অনুরূপ কথা বলে। সুতরাং যে বিষয়ে তাদের মতভেদ আছে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার মিমাংসা করবেন।”
)-এর যুগে কিতাবগুলিতার মতে, এ আয়াত প্রমাণ করে মুহাম্মাদ ( বিশুদ্ধরূপে বিদ্যমান ছিল। কারণ ‘তারা কিতাব পাঠ করে’ কথাটি বর্তমান কালের। এতে বুঝা যায় যে, তাঁর সময়ে কিতাবীগণ যা পাঠ করত তা ছিল বিশুদ্ধ কিতাব। যে কিতাব থেকে সঠিক তথ্য তারা জানতে পারত, অথচ তা সত্ত্বেও তারা অজ্ঞদের মত কথা বলত।
(৩) মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন:
فَإِنْ كُنْتَ فِي شَكٍّ مِمَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ فَاسْأَلِ الَّذِينَ يَقْرَءُونَ الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكَ لَقَدْ جَاءَكَ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ
“আমি তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তুমি সন্ধিগ্ধচিত্ত হও তবে তোমার পূর্বের কিতাব যারা পাঠ করে তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর; তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার নিকট সত্যই এসেছে। তুমি কখনো সন্ধিগ্ধ চিত্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”
মি. ফান্ডার দাবি করেন যে, পূর্ববর্তী কিতবাগুলি যদি বিকৃতই হতো তবে আল্লাহ তাঁর নবীকে সে সকল পুস্তক পাঠকারীদের থেকে সত্য তথ্য লাভের জন্য নির্দেশ দিতেন না।
(৪) ইহূদীরা দাবি করত যে, উটের গোশত হারাম। বিষয়টি তাদের বানোয়াট ব্যাখ্যা মাত্র, তাওরাতে তা ছিল না। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
كُلُّ الطَّعَامِ كَانَ حِلا لِبَنِي إِسْرَائِيلَ إِلا مَا حَرَّمَ إِسْرَائِيلُ عَلَى نَفْسِهِ مِنْ قَبْلِ أَنْ تُنَزَّلَ التَّوْرَاةُ قُلْ فَأْتُوا بِالتَّوْرَاةِ فَاتْلُوهَا إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
“তাওরাত অবতীর্ণ হওয়ার ইসরাঈল (ইয়াকূব) নিজের জন্য যা হারাম করেছিলেন তা ব্যাতীত বনী ইসরাঈলের জন্য যাবতীয় খাদ্যই হালাল ছিল। বল: ‘যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তওরাত আন এবং পাঠ কর।”
-কে বিব্রত করার জন্য তাঁর কাছে বিচার প্রার্থনা(৫) ইহূদীগণ রাসূলুল্লাহ করে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:
وَكَيْفَ يُحَكِّمُونَكَ وَعِنْدَهُمُ التَّوْرَاةُ فِيهَا حُكْمُ اللَّهِ ثُمَّ يَتَوَلَّوْنَ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَمَا أُولَئِكَ بِالْمُؤْمِنِينَ
“তারা কিভাবে তোমার উপর বিচারভার ন্যস্ত করবে যখন তাদের নিকট রয়েছে তাওরাত, যার মধ্যে আল্লাহর আদেশ বিদ্যমান? তার পরও তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তারা মুমিন নয়।”
(৬) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
وَلْيَحْكُمْ أَهْلُ الإِنْجِيلِ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فِيهِ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
“ইনজীল অনুসারিগণ যেন আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে বিধান দেয়। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারা ফাসিক (সত্যত্যাগী)।”
এ সকল আয়াতকে ভিত্তি করে মি. ফান্ডার ও )-এর সময়ে ইহূদী-খৃস্টানদেরঅন্যান্য পাদরি ও প্রচারক দাবি করেন যে, মুহাম্মাদ ( নিকট যে বাইবেল বা তাওরাত, যাবূর ও ইঞ্জিল বিদ্যমান ছিল তা ছিল বিশুদ্ধ। আর যেহেতু সে সময়ের পরে বাইবেলে কোনোরূপ বিকৃতি প্রবেশ করেছে বলে মুসলিমগণ প্রমাণ করতে পারে না, সেহেতু মুসলিমদেরকে মানতে হবে যে, মূসা (আ), দাঊদ (আ) ও ঈসা (আ)-এর উপর অবতীর্ণ কিতাবগুলি অবিকৃত অবস্থায় বর্তমান যুগে বিদ্যমান।
বস্তুত তাদের এ সকল দাবির অসারতা, বিভ্রান্তি ও অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণের জন্য দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। সংক্ষেপে আমরা নিম্নের বিষয়গুলি আলোচনা করব। প্রথমেই আমরা দুটি বিষয়ের প্রতি )-এর যুগের পরে বাইবেলে আরপাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রথমত, মুহাম্মাদ ( কোনো বিকৃতি হয় নি বলে পাদরিগণ যে দাবি করছেন তা একেবারেই বাতুল। এর পরেও বাইবেলের মধ্যে বিকৃতি সাধিত হয়েছে বলে প্রমাণিত। দ্বিতীয়ত, বাইবেল অবিকৃত বলে প্রমাণিত হলেও খৃস্টান ধর্মগুরুদের কোনো বিশেষ লাভ হয় না, কারণ ত্রিত্ববাদ, অবতারবাদ ইত্যাদি খৃস্টধর্মের মূলনীতি কোনোভাবেই প্রচলিত বাইবেলের মধ্যে উল্লেখ করা হয় নি।
মুলঃ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর
পি-এইচ. ডি. (রিয়াদ), এম. এ. (রিয়াদ), এম.এম. (ঢাকা)
অধ্যাপক, আল-হাদীস বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
©somewhere in net ltd.