| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আ্যাডোনিস.
close your eyes and try to see
স্বর্গ কাননের মাঝে একটা ছোট্ট সরোবর।সেই সরোবরের পানিতে দু পা ডুবিয়ে বসে আছেন "শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন"।তার চোখ সরোবর ছাড়িয়ে চলে গেছে দূরে বহুদূরে।তিনি তাকিয়ে আছেন কিন্তু কিছুই দেখছেন না।দেখলে উনি বুঝতে পারতেন তার পাশে স্বর্গের দুজন দূত হাজির হয়েছেন।দূতদ্বয়ের মুখ থমথমে কারণ শিল্পাচার্য কিছুক্ষণ আগে স্বর্গের একটি নিয়ম ভেঙ্গেছেন।
স্বর্গে সবার মন উৎফুল্ল থাকার কথা এবং সবাই এখানে আনন্দে থাকলেও শিল্পাচার্য হঠাৎ করেই যেনো বিষাদের সাগরে ডুবে গেছেন।বিষাদ শব্দটি শুধুই মর্ত্যলোকের জন্য।স্বর্গলোকে এর স্থান নেই।ঈশ্বরের ইচ্ছায় দুজন দূত তার এই বিষাদের কারণ জানার জন্য তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
.
দূতদ্বয় তাদের কিন্নরকণ্ঠে একত্রে বললেন,হে ভাগ্যবান স্বর্গের বাসিন্দা আপনি এতো প্রাচুর্যের মাঝে থেকেও ব্যথিত হৃদয়ে বসে আছেন কেনো??
শিল্পাচার্য আনমনা ভাব কাটিয়ে দূতদ্বয়ের দিকে তাকালেন তারপর বিমর্ষ স্বরে বললেন,আমি আমার পূর্বজীবনে অনিচ্ছাকৃত একটি ভুল করেছি।সেই ভুল আমাকে এখন কষ্ট দিচ্ছে।
-স্বর্গ সকল ভুল এবং কষ্টের ঊর্ধ্বে।আপনার সেই ভুল নিশ্চয় খুব বড় কিছু ছিলো না।বড় কিছু হলে আপনি এখানে থাকতেন না।তারপরও আপনি বলুন আপনার ভুলটির কথা।ঈশ্বর নিশ্চয় ই আপনাকে সাহায্য করবে।
-আমি দুর্ভিক্ষের উপর একটি ছবি একেছিলাম।ছবিটির নাম "ম্যাডোনা ৪৩"।ঐ ছবিটির কথা মনে হলে আমার এখন দুঃখ হয়।বর্তমানের মানুষেরা এখন অবশ্যই আরো আধুনিক এবং মানবিক হয়েছে।তারা এখন অবশ্যই নিজেদের স্বার্থ নয় মানুষের কথা আগে ভাবে।আমার খারাপ লাগে তখন,যখন এই যুগের কোনো মানুষ ছবিটির দিকে তাকিয়ে ভাবে সেই সময়ের মানুষেরা কত নিষ্ঠুর ছিলো যে এক অবলা নারী, কুকুর আর কাকের সাথে ডাস্টবিনে খাবার খুজছে।এটা অবশ্যই এই যুগে অসম্ভব একটা ব্যাপার।আমি সেই সময়ের সকল সামর্থ্যবান মানুষদের পরোক্ষভাবে সমালোচনা করেছি।যেটা আসলে ঠিক হয়নি।সেই সময়ে অনেক হৃদয়বান মানুষও ছিলো যাদের কথা আমার ছবিতে বলা হয়নি।
-স্বর্গের বাসিন্দা আপনি এখন কী করতে চান??
-আমি একবার পৃথিবীতে যেতে চাই আর দেখতে চাই সেই সময়ের মানুষের সাথে এই সময়ের মানুষের মিল বা অমিল আসলে কতটুকু।আমার ছবিটির অর্থ কি ঠিক আছে নাকি সেটা এই সময়ের উপযুক্ত নয়।
-কিন্তু স্বর্গের কোনো লোকের যে পৃথিবীতে যাবার নিয়ম নেই।
-তাহলে ঈশ্বর যেনো আমার ছবির সেই রোগা নারীটিকে তার বাচ্চাসহ একঘণ্টার জন্য পৃথিবীতে পাঠান।যদি এই নারীকে একের অধিক কোনো ব্যক্তি নিজের স্বার্থের চিন্তা না করে সাহায্য করে তাহলে বুঝবো আমার ছবি এই সময়ে ভুল বার্তা দিচ্ছে আর যদি কেউ সাহায্য না করে তাহলে বুঝবো ১৯৪৩ এর চেয়ে এই আধুনিক যুগের সময়টা শুধু এগিয়েছে,মানুষের মানবিকতা এগুতে পারেনি।
.
স্বর্গের মানুষের যৌক্তিক ইচ্ছা কখনো অপূর্ণ থাকেনা।এক ঘন্টার জন্য কঙ্কালসার এক নারী যার পরনে ময়লা,ছেড়া ও দুর্গন্ধময় এক শাড়ি এবং যার বুকে তার চেয়েও রোগা এক শিশু এমন দুজনকে ব্যস্ত শহরের রাস্তায় হাঁটতে দেখা গেলো।মহিলাটির চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।ক্ষুধার যন্ত্রনায় সে হাঁটতে পারছে না।তার কোলের শিশুটি কাঁদছে ট্যা-ট্যা করে।মহিলাটির ডান হাত ভিক্ষুকদের মতো সামনে সামনে যাচ্ছে।সুশ্রী চেহারার মানুষেরা ডাস্টবিনের গন্ধ গায়ে লেগে থাকে মানুষটি থেকে পালানোর চেষ্টা করছে।ভিক্ষুকদের মতো বাড়িয়ে রাখা তার হাতের দিকে তাদের তাকানোর মতো সময় তাদের হাতে নেই।
.
শহরের অভিজাত এক রেস্তোরাঁ।স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে ভেতরে ভোজনবিলাসে মেতে থাকা মানুষগুলোর দিকে মহিলাটি অপলক তাকিয়ে আছে।তার কোলের শিশুটি এখন আর কাঁদছে না।কোনো শব্দই এখন আর সে করছে না।শুধু মাঝে মাঝে তার মায়ের জট বেঁধে যাওয়া চুলে সরু পাট কাঠির মতো আঙুল দিয়ে টান দিচ্ছে।মহিলাটি কাচের দরজাতে টোকা দিলো।ঠকঠকঠক..একবার.. দুবার..তিনবার..অনেকবার..।কেউ দরজাটা খুললো না।তার চোখের সামনে একটি ছেলে রোস্ট খেয়ে হাড়টি বোনপ্লেটে রেখে দিয়েছে।মহিলাটি রোস্ট চায়না সে চায় ঐ ফেলে দেওয়া হাড়টি।কেউ ফেলে দেবার আগেই সে হাড়টি চায়।কাচের দরজাতে গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সে গুতা দেয়।একটুখানি খুলতেই তার কঙ্কালসার দেহ ছোট্ট ফাক গলে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ঢুকেই এক দৌড়ে সেই ছেলেটির টেবিলে রাখা হাড়টি হাতে নিয়ে চিবুতে থাকে।
ঘটনাটি এতো দ্রুত ঘটলো যে প্রথমে কেউ ই কি হচ্ছে ধরতে পারেনি।যখন বুঝতে পারলো তখন সবাই টেবিল থেকে চিৎকার করে উঠে এদিক সেদিক পালাতে লাগলো।এক মেয়ে দুর্গন্ধে পাশের বেসিনে গিয়ে হড়বড় করে বমি করে দিলো।
মহিলাটি হাড় চিবুচ্ছে।তার মুখ প্রশান্তিতে ভরে আছে।মুখের নরম হয়ে আসা হাড়ের একটু অংশ সে তার বাচ্চার মুখে পুরে দিলো।বাচ্চাটির চোখ বন্ধ কিন্তু সেও হাড় চিবুচ্ছে।হঠাৎ মহিলাটির পিঠে কেউ একজন সজোরে লাথি বসিয়ে দিলো।মহিলাটি সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো।তার কোল থেকে তার বাচ্চা ছিটকে পড়লো মেঝেতে।বাচ্চাটি ছিটকে পড়েও কাঁদেনি।তার মুখ তখনো নড়ছে।মহিলাটি লাথি খেয়েও শব্দ করেনি।তার হাতে তখনো শক্ত
করে হাড়ের টুকরোটি ধরা আছে।
.
একটা কদমগাছ।গাছের নিচে বিশাল এক ডাস্টবিন।সেইই ডাষ্টবিনে একদল কাক উড়ে বেড়াচ্ছে।কয়েকটা কুকুর অলস ভঙ্গিতে বসে আছে।ডাষ্টবিনের পাশদিয়ে যাবার সময় সভ্য মানুষেরা নাকে রুমাল বা সুগন্ধি টিস্যু চেপে রাস্তা পার হচ্ছে।সেই দুর্গন্ধের মাঝে বসে বসে নিজের আঙুল চাটতে সেই মহিলাটি।তার আঙুলে তখনো কয়েকদিন আগের পঁচা পোলাওের টুকরা লেগে আছে।তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে।রক্তের দিকে তার মনোযোগ নেই তার মনোযোগ আবর্জনার স্তূপে।সে মনেমনে প্রার্থনা করছে যেনো সে আরেকটা পঁচা খাবারে প্যাকেট পেয়ে যায়।
তার কোলে শুয়ে আছে তার বাচ্চা।বাচ্চাটির মুখ হা হয়ে আছে।সে নড়ছে না।কিছুক্ষণ পরপর সে তার মায়ের চুলে হেঁচকা টানও দিচ্ছে না।তার গায়ে অনেকগুলা নীল মাছি বসে আছে।মাছিগুলো তাদের খাবারের সন্ধান পেয়ে আনন্দিত।
.
একটা রিকশা ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে চলে গেলো।রিকশায় স্কুল ড্রেস পরা মেয়েটি তার বাবার হাতে শক্ত ঝাকুনি দিয়ে বললো,বাবা দ্যাখো ওইই আন্টিটা ডাস্টবিনে বসে আছে।স্কুলের মিস বলেছে,ডাষ্টবিনে যারা থাকে তারা খুবই গরিব হয়।তাদেরকে সাহায্য করা উচিত আমাদের।বাবা চলো আমরা ওকে সাহায্য করি।
বাবা হেসে তার মেয়ের গালটি টিপে বললেন,ঠিক আছে মা অন্য আরেকদিন করবো।ওরা তো আর পালিয়ে যাচ্ছেনা।
ঠিক সেই মুহূর্তে কুকুরগুলি একসাথে ডেকে উঠলো আর কাকেরা একসাথে কা-কা করে এলাকা মাথায় করে ফেললো।তাদের চোখের সামনে থেকে সেই রোগা মহিলা আর তার মৃত বাচ্চা হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
.
স্বর্গের দূত শিল্পাচার্যের কাছে জানতে চাইলেন তার অভিমত।শিল্পাচার্য তখন এক নিঃশ্বাসে তার বক্তব্য শেষ করে তার স্বর্গপ্রাসাদে চলে গেলেন।তিনি বলেছিলেন,"মানুষের পেটে জন্মালেই কেউ মানুষ হয় না।মানুষ হতে হলে পশুর মতো নয় মানুষের মতো আচরণ শিখতে এবং করতে জানতে হয়"।
©somewhere in net ltd.