![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গাজা উপত্যকায় একপথে হাঁটা এখন আর স্বস্তি আনে না; বরং যন্ত্রণা আরও গভীর করে তোলে।
ছবি: সামাহ জাহের জাকুত"
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি, আমি আমার নয় সদস্যের পরিবার নিয়ে গাজার উত্তরে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে বসেছিলাম—এটাই ছিল আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল, এক বছর দুই মাসের লাগাতার বাস্তুচ্যুতি শেষে আমরা এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমরা যুদ্ধবিরতির ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
ওই ঘরটি আমাদের প্রথম আশ্রয় ছিল না, তবে সেটিই ছিল শেষ। ১২ বার বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর, অবশেষে ক্লান্ত শরীর আর ভাঙা মন ওই ঘরটিতেই একটু শান্তি খুঁজে পেল—যদিও সেই শান্তিও টিকল না বেশিক্ষণ।
সংবাদ আসতে শুরু করল—প্রতি মিনিটে ডজন ডজন আপডেট। মনে হচ্ছিল যুদ্ধবিরতি এবার সত্যিই আসন্ন। প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে। মনে হচ্ছিল আমাদের দক্ষিণে থাকা আত্মীয়রা এবার হয়তো ফিরে আসবে, আর আমরা তাঁদেরকে শুধু কাঁপতে থাকা ফোন লাইনের মাধ্যমে নয়, সামনাসামনি দেখতে পারব।
আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম, ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হিমশিম খাচ্ছিলাম, বারবার পেজ রিফ্রেশ করছিলাম, এক চ্যানেল থেকে আরেক চ্যানেলে ঘুরে যাচ্ছিলাম, খুঁজে যাচ্ছিলাম সেই কাঙ্ক্ষিত খবরটি। আমার ভাই সকালে চার্জ দেওয়া ব্যাটারিতে টিভি চালু করল, আর আমরা সবাই একসঙ্গে বসে অপেক্ষা করছিলাম।
আমি জানি না, সেই অপেক্ষাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব। ওটা আনন্দের ছিল না, দুঃখেরও ছিল না।
আমরা কীভাবে আনন্দিত হব, এতকিছুর পর? এত মৃত্যু, এত আহত মানুষ, ধ্বংসস্তূপে পরিণত বাড়ি, এত এত অনাথ শিশু, বিধবা নারী, দাফন না হওয়া মরদেহ, অবসাদ, বারবার বাস্তুচ্যুতি—এসবের পর কেমন করে আমরা খুশি হব?
আবার, আমরা দুঃখিতই বা হব কেন? এটাই তো আমরা চাইছিলাম এতদিন—একটু বিরতি। একটু নিঃশ্বাস।
তা সত্ত্বেও, অপেক্ষাটা ছিল দমবন্ধ করা। হ্যাঁ, আমরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম যুদ্ধ থামবে, প্রিয়জনদের আবার দেখব; কিন্তু মাথার ভেতরে তখনও অগণিত প্রশ্ন ঘুরছিল: এখন আমরা কোথায় যাব? এই বাড়ির মালিকেরা দক্ষিণ থেকে ফিরে আসবে, কিন্তু আমাদের নিজস্ব বাড়ি তো ধুলিস্যাৎ। যদি নতুন আশ্রয় খুঁজেও পাই, এই যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ? নাকি এটা আরেক ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা?
তবুও আমরা অপেক্ষা করছিলাম, দম আটকে, হৃদস্পন্দন বাড়তে বাড়তে, সেই একটি শব্দ শোনার জন্য।
অবশেষে! ঘোষণা এলো। আমি চুপচাপ কেঁদে ফেললাম। বাবা পাশে বসে ছিলেন, মানসিক ও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া—মনে মনে ভাবছিলেন, এখন কী করব? যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ? আর যদি শেষও হয়, এরপর কী হবে? যুদ্ধ থেমেছে হয়তো, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ তো এখন আমাদের বাস্তবতা, আর সেটার মুখোমুখি হতেই হবে।
আমরা শুধু একটা নিঃশ্বাস চাইছিলাম—এই যন্ত্রণার মধ্য থেকে একটুখানি বিরতি, যাতে আবার মানুষ হয়ে বাঁচতে পারি, শুধু দিন গুনে বেঁচে থাকা নয়।
আমরা সেই দিনটিতে আটকে গেছি, যেদিন এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল; আমরা যেন তখন থেকেই আর বড় হইনি, অথচ শতাব্দীর বোঝা আমাদের শরীরে জমেছে।
---
তিনি একবার নাকবা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, কিন্তু এবার না।
অর্থহীন জীবন এক ধরণের ধীরে ধীরে মৃত্যু
সব দিন একরকম মনে হয়। প্রতিটি দিন, যা কেটে যায় জীবন ছাড়াই, অর্থ ছাড়াই, এবং সামান্যতম অর্জন ছাড়াই—তা আমাদের সময় ও শক্তির একটি অংশ চুরি করে নিয়ে যায়, যতক্ষণ না আমরা অনুভব করি যে আমরা বুড়িয়ে গেছি—বয়সের কারণে নয়, বরং শক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে; কারণ আমাদের জীবন প্রাণহীন হয়ে গেছে।
গাজায় প্রতিটি জন্মদিনই যেন এক ধরনের মিথ্যা। আমরা সাধারণত বলি, "এই বছরটা ধরো না।"
আমরা এখন একটিমাত্র শব্দের স্বপ্ন দেখি—একটি শব্দ যা হয়তো এই যন্ত্রণা শেষ করতে পারে, স্থানচ্যুতি থামাতে পারে, বোমার শব্দ থামাতে পারে, খাদ্যের প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারে। একটি শব্দ যা আবার আমাদের দিনগুলোতে অর্থ ফিরিয়ে আনতে পারে।
হ্যাঁ, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছিল, কিন্তু যন্ত্রণার যেন কোনো বিরতি ছিল না। তা যেন আরও জোরে ফিরে এল, ঠিক যেন গাজা আর কষ্ট আত্মার দুই সঙ্গী, যাদের কখনো আলাদা হবার নিয়তি নেই।
এই অর্থহীন জীবনযাপন—এটা সত্যিই প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। আমার দাদা মারা গিয়েছিলেন এই "যুদ্ধের" মধ্যেই, মার্চ ২০২৪-এ। তিনি মারা গেলেন কারণ তিনি এমন এক জীবন সহ্য করতে পারছিলেন না যার কোনো মানে নেই। তিনি নিরন্তর স্থানচ্যুতি সহ্য করতে পারেননি। তিনি সহ্য করতে পারেননি নিজের ঘর আর নিজের কক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা।
যুদ্ধের সময়, যখন তিনি এখনো তাঁর নিজ ঘরে ছিলেন, তখন তিনি অপেক্ষাকৃত ভালো ছিলেন। প্রতিবার যখন আমাদের সরে যেতে হত, তিনি অস্বীকার করতেন। শেষ পর্যন্ত, আমার চাচা তাঁকে বললেন যে সেই এলাকা দখল করা হবে এবং সবাইকে চলে যেতে হবে—তবেই তিনি বাকিদের সঙ্গে ঘর ছাড়লেন।
আমার দাদা ছিলেন একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক, সদয় ও মৃদুভাষী। তিনি আমাদের জন্য ধাঁধা লিখতেন আর আমরা সেগুলো মেলাতে চেষ্টা করলে হাসতেন। তিনি সবসময় একটি কেকের বাক্স রাখতেন, যেন আমরা গেলেই সেটা দিয়ে আপ্যায়ন করতে পারেন। একবার আমরা পেস্ট্রি বানাচ্ছিলাম—তিনি বারবার এসে হাসিমুখে আমাদের দেখছিলেন। আমি তাঁকে একটা দিলে তিনি হেসে উঠলেন এবং আমার জন্য দোয়া করলেন। তিনি আমাদের চারপাশে জড় করে রাখতেন।
যা তাঁকে সত্যিই বিশেষ করে তুলেছিল, তা হলো তাঁর নিজের ঘর, নিজের কক্ষ, নিজের পাড়া ও নিজের মানুষের সঙ্গে গভীর এক আত্মিক সম্পর্ক। আমার দাদী ও চাচা একই কথা বলেছিলেন যখন তিনি মারা যান: তিনি ঘর ছেড়ে থাকতে পারেননি, কারণ তাঁর কাছে জীবনের আর কোনো মানে ছিল না। তাঁর দিনগুলো প্রাণহীন হয়ে গিয়েছিল, এবং প্রতিটি নতুন দিন তাঁর শরীর ও মনকে দুর্বল করে তুলেছিল—যতক্ষণ না তিনি চলে গেলেন।
তিনি প্রথম নাকবার (১৯৪৮ সালের নিপীড়ন) সময় বেঁচে ছিলেন, কিন্তু এই “যুদ্ধ,” আমাদের দ্বিতীয় নাকবা, ছিল এমন এক অভিজ্ঞতা যা তিনি আর সহ্য করতে পারেননি।
যুদ্ধবিরতির পরপরই, আবার “যুদ্ধ” ফিরে এল।
বোমার শব্দ আবার কানে এল। ভয় আবার ফিরে এল।
আমি সাতটি যুদ্ধ পেরিয়ে এসেছি; ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ১২ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছি।
আমি আমার ঘর ধ্বংস হতে দেখেছি দু’বার—প্রথমবার ২০০৮ সালে যখন আমি ছোট ছিলাম, এবং আবার ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে।
একই অ্যাপার্টমেন্ট, একই ভবন, গাজা শহরের সেই সুন্দর আল-কারামা পাড়ায় যেখানে আমি গত দশ বছর ধরে এক জীবন গড়ে তুলছিলাম।
গাজায়, সবকিছু এক চোখের পলকে বদলে যেতে পারে—আর জীবনের পুরো চেহারাটাই ওলটপালট হয়ে যায়।
আমরা তখন নিজেদের ঘরে বসে ছিলাম, হঠাৎ করে চলে এল সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ।
আমার পরিবার যা পারলাম, হাতে তুলে নিয়ে ছুটে পালালাম।
আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল একটি বিয়ের হল—অন্ধকার, ঠাণ্ডা, আর নীরব।
মনে হল, সেই জায়গাটা আমাদের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিই।
দুই ঘণ্টা আমরা সেখানে কাটালাম, অপেক্ষায়। তারপরই মিসাইল এসে গুঁড়িয়ে দিল আমাদের পাড়া।
তারপর আবার পালানো—আমার দাদার বাড়িতে।
মধ্য গাজার আল-নুসাইরাত ক্যাম্পে।
পুনরায় উত্তরে ফেরা।
আরেক দফা বাস্তুচ্যুতি: বেইত লাহিয়ায় বিমান হামলা থেকে পালানো, জাবালিয়া শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয়, আবার পালানো—আইডিএফের (ইসরায়েলি বাহিনী) আগ্রাসনের কারণে।
আমার জীবনের ছন্দ এখন হয়ে গেছে: পালাও, ফিরে এসো, শোক করো, আবার পালাও।
ইসরায়েলের সাহায্য অবরোধ এখন চতুর্থ মাসে গড়িয়েছে—খাবার পাওয়া দুষ্কর।
যুদ্ধাঞ্চলে বেঁচে থাকার ভয় আমাদের চেতনা খেয়ে ফেলছে।
যুদ্ধবিরতির তিন সপ্তাহ পর, এক ট্যাক্সি করে আমরা গেলাম আমার খালার সঙ্গে দেখা করতে—তিনি সদ্য দক্ষিণ থেকে ফিরে এসেছেন।
তিনি জাবালিয়া ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন—আমার শৈশবের জায়গা।
প্রথা অনুযায়ী, আমি গাড়ির পেছনের জানালার পাশে বসলাম।
আমার বাবা হঠাৎ জানালার বাইরে ইশারা করে বললেন, “ওটা শাদিয়া আবু ঘাজালাহ স্কুল।”
ওটা শাদিয়া স্কুল? আমার স্কুল?
স্কুলের চারপাশের রাস্তাগুলো ছিল ধ্বংসস্তূপ আর নর্দমার গন্ধে ভরা।
স্কুল ভবনের একাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে, আর ক্লাসরুমগুলো ঠাসা শরণার্থী পরিবারে।
প্রতিটি জানালায় ঝোলানো কাপড়।
স্কুলের মাঠে, খালি পায়ে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলছে।
তারপর আমরা পৌঁছলাম জাবালিয়া ক্যাম্পে।
পুরো রাস্তা আমি কোনো জায়গা চিনতেই পারিনি।
যেখানে আমি বড় হয়েছি, সেই জায়গাতেই আমি হারিয়ে গেলাম।
জানালা দিয়ে আসা বাতাসও অচেনা লাগল।
এটা সেই গাজা নয়, যাকে আমি চিনতাম।
তারা আমার ভূখণ্ডকে এক শ্মশানে রূপ দিয়েছে, এক অচেনা জনপদে।
---
গাজায় এখন অধিকাংশ স্কুল আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে, চারপাশ ঘেরা শত শত তাঁবুতে।
ছবি: সামাহ জাহের জাকুত
যে রাস্তাগুলো একসময় জীবনে ভরা ছিল—যেখানে চলত গাড়ি, জ্বলত আলো, ছিল রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, গ্রন্থাগার, ভবন—সব এখন ধুলোয় মিশে গেছে।
রাস্তাগুলো এখন তাঁবু আর ধূলিকণায় পরিণত।
দালানগুলো নেই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ক্ষতবিক্ষত হয়েছে মানুষের ভেতরের কাঠামো।
এমনকি আমাদের হাঁটার ভঙ্গিও বদলে গেছে; তা এখন ধীর, ভারী।
এই “যুদ্ধ” আমাদের কাছ থেকে স্বাভাবিক হাঁটার স্বাধীনতাও কেড়ে নিয়েছে।
এখন হাঁটাও যন্ত্রণাদায়ক।
প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে, আমরা কী হারিয়েছি।
“বাড়ি”—যেমনটা আমি একসময় চিনতাম, সেটা আর নেই।
যে ঘরেই যাই, যে রাস্তাতেই হাঁটি—তাঁবুতে বসবাসরত মানুষ দেখি; খালি পায়ে ভিক্ষা করে বেড়ানো শিশু দেখি; মানুষ ভিড় করছে টেকিয়াহ-তে (চ্যারিটি রান্নাঘর) এক প্লেট খাবারের আশায়।
এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে বেঁচে আছি আমি:
গাজায় কখনও এতটা শেকড় ছড়ানো অনুভব করিনি, আর কখনও এতটা বিচ্ছিন্নও হইনি।
©somewhere in net ltd.