নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

কোরআন , হাদিস ও ফিকাহ মতে ইসলামে সঠিক পথ অনুসরণ প্রসঙ্গ কথামালা ( সাময়িক পোস্ট)

১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:১৫


“আল্লাহ অভিন্ন ফিকাহ মানার কথা বললে রাসূল (সা.) কোরআন ও হাদিসের মানার কথা কিভাবে বললেন? “ এই শিরোনামে গতকাল সামুতে প্রকাশিত ব্লগার মহাজাগতিকচিন্তার একটি বিশালাকার পোস্টে কোরানের অসংখ্য আয়াতের সমাহারে থাকা কথামালার পরিপ্রেক্ষিতে কোরান, হাদিস ও ফিকাহ বিষয়ে প্রকৃত অবস্থা সাথে প্রাসঙ্গিক কথামালা তুলে ধরার প্রয়াসে ঐ পোস্টের লেখক মহাজাগতিক চিন্তার প্রতি পুর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমার এই লেখাটির অবতারণা ।

ঐ পোস্টের শিরোনামে থাকা প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে ফিকাহ মানা বনাম কোরআন-হাদিস মানা এই বিতর্কটি অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝির কারণে তৈরি হয়। পবিত্র কোরানের মাত্র গুটি কয়েক মুল্যবান আয়াতের আলোকেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

মূল প্রশ্ন: আল্লাহ কি ফিকাহ মানতে বলেছেন, নাকি কোরআন-হাদিস?
প্রথমে একটি মৌলিক বিষয় বুঝতে হবে। ফিকাহ নিজে কোনো আলাদা ধর্ম নয়। এটি হলো কোরআন ও হাদিস থেকে বিধান বোঝার মানবীয় প্রচেষ্টা।
অর্থাৎ কোরআন হল আল্লাহর সরাসরি বাণী , হাদিস হল রাসূল (সা.)-এর ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগ । আর ফিকাহ হল এগুলো থেকে নিয়ম-কানুন বের করার পদ্ধতিগত ব্যাখ্যা ।

সুরা আল-আন‘আম এর ১৫৩ আয়াতে বলা হয়েছে সোজা পথ কী?
“এটাই আমার সোজা পথ, সুতরাং তোমরা তা অনুসরণ কর এবং অন্য পথ অনুসরণ করো না...” এখানে সোজা পথ বলতে বোঝানো হয়েছে আল্লাহর নির্দেশিত জীবনব্যবস্থা (কোরআন) এবং রাসূল (সা.)-এর প্রদর্শিত পথ (সুন্নাহ) ।
ফিকাহ এখানে অন্য পথ নয়, বরং এই সোজা পথ বুঝে চলার একটি ব্যাখ্যামূলক কাঠামো । সাবধান! অন্য পথ বলতে বোঝায় মনগড়া মতবাদ ,নফসের অনুসরণ বা কোরআন-সুন্নাহ থেকে বিচ্যুতি ।

সুরা আল-জাসিয়ায় ৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে “আল্লাহর আয়াতের পর আর কী?”
“...তারা আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর আর কোন কথায় বিশ্বাস করবে?”
এখানে কিছু মানুষ মনে করে “তাহলে হাদিস বা ফিকাহ মানা যাবে না!”
কিন্তু বাস্তবে কোরআন নিজেই বহু জায়গায় বলেছে রাসূল (সা.)-এর আনুগত্য করা ফরজ যেমন সুরা নিসা এর ৮০ নং আয়াতে বলা হয়েছে “যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।” সুরা আহযাব এর ২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।” সুতরাং আল্লাহর আয়াতের পর আর কিছু নয়” মানে রাসূলকে বাদ দেওয়া নয় বরং রাসূলের কথাও আল্লাহর নির্দেশের অংশ কারণ রাসূল (সা.) নিজের ইচ্ছায় কিছু বলেন না (সুরা নাজম আয়াত ৩-৪)।

সুরা নিসা এর ৫৯ তম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়াত “...তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের...মতবিরোধ হলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও...”
এই আয়াতটি সরাসরি লেখার শুরুতেই জনৈক প্রবন্ধ লেখকের প্রশ্নের উত্তর দেয়, এখানে তিনটি স্তর আছে:-
১) আল্লাহর আনুগত্য (কোরআন) ২) রাসূলের আনুগত্য (হাদিস/সুন্নাহ) ৩) মতবিরোধ হলে তখন আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরে যাওয়া।

তাহলে ফিকাহ কোথায় আসে?এখন বাস্তব সমস্যা হল কোরআন ও হাদিসে সব কিছু স্পষ্ট এক লাইনে দেওয়া নেই, অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন হাদিস আছে , ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ আছে । উদাহরণ হিসাবে বলা যায় নামাজে হাত কোথায় বাঁধবে? আমীন জোরে না আস্তে?
৩ তালাক একসাথে হলে কী হবে? এইসব বিষয়ে সাহাবা (রা.) , তাবেঈন এবং পরবর্তী ইমামরা (যেমন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল) তারা কোরআন-হাদিস বিশ্লেষণ করে নিয়ম নির্ধারণ করেছেন, এটাকেই বলা হয় ফিকাহ।
গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার হল আল্লাহ আমাদের বলেছেন কোরআন মানতে,রাসূল (সা.)-কে অনুসরণ করতে । রাসূল (সা.) বলেছেন তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করতে । ফিকাহ হলো এই দুটিকে বোঝা ও বাস্তবে প্রয়োগ করার একটি পদ্ধতি।

তাহলে চূড়ান্তভাবে ভুল ধারণা কোথায়? “ফিকাহ মানা মানে আলাদা ধর্ম মানা” এটা ভুল, “শুধু কোরআন, হাদিস লাগবে না” এটাও ভুল আর “ইমামদের অনুসরণ মানে কোরআন ছেড়ে দেওয়া” এটাও ভুল। সঠিক বুঝ হল ফিকাহ যার মানে হল কোরআন সাথে হাদিসের ব্যাখ্যা (মানবীয় প্রচেষ্টা)। সহজভাবে বললে কোরআন হল সংবিধান, হাদিস হল বাস্তব প্রয়োগ, ফিকাহ হল আইনবিদদের ব্যাখ্যা।

বিষয়টি এখন চার মাযহাবের পার্থক্য, বা “তাকলীদ করা উচিত কি না” এই দিক থেকেও ব্যাখ্যা করা যায় ।
প্রথমেই জেনে নেয়া যাক চার মাযহাবের পার্থক্য এবং তাকলীদ (মাযহাব মান্য) করা উচিত কি না?

চার মাযহাব কী এবং কেন ভিন্ন? ইসলামের চারটি প্রসিদ্ধ সুন্নি মাযহাব হল ইমাম আবু হানিফা (হানাফি) , ইমাম মালিক (মালিকি), ইমাম শাফিঈ (শাফিঈ) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (হাম্বলি)।

এখন জানা যাক তারা কি আলাদা ইসলাম বানিয়েছেন? না, কখনোই না। তারা সবাই একই উৎস অনুসরণ করেছেন:কোরআন ,হাদিস ও সাহাবাদের মতামত ।

প্রশ্ন আসে তাহলে পার্থক্য কেন?পার্থক্যের মূল কারণগুলো হল:
১) হাদিস পৌঁছানোর ভিন্নতা, সব হাদিস সব ইমামের কাছে একইভাবে পৌঁছায়নি। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় অসংখ্য হাদিসের মধ্যে কিছু হাদিস ইমাম মালিক পেয়েছেন কিন্তু ইমাম আবু হানিফা পাননি ।
২) হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণেও রয়েছে মতবিভেদ । একই হাদিস একজন সহিহ মনে করেছেন , অন্যজন দুর্বল মনে করেছেন ।
৩) এসেছে কিয়াস (যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ) যেখানে সরাসরি নির্দেশ নেই, সেখানে যুক্তি প্রয়োগ, কেউ বেশি ব্যবহার করেছেন (হানাফি) কেউ কম (হাম্বলি)।
৪) রয়েছে শব্দের ব্যাখ্যার পার্থক্য। একটি আয়াত বা হাদিসের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যাক, নামাজে আমীন জোরে না আস্তে?হানাফি মতে আস্তে, পক্ষান্তরে শাফিঈ ,তে জোরে। উভয়েরই হাদিস ভিত্তি আছে। এটি বিরোধ নয়, বরং বৈধ বৈচিত্র্য।

এখন প্রশ্ন আসে তাকলীদ (মাযহাব অনুসরণ) করা কী উচিত? তাকলীদ মানেই বা কী? তাকলীদ হল কোনো আলেম/ইমামের ব্যাখ্যা অনুসরণ করা, নিজে সরাসরি কোরআন-হাদিস থেকে বিধান বের না করা ।

উল্লেখ্য মানুষ ৩ ধরনের :
১) সাধারণ মানুষ (আমাদের বেশিরভাগ) আরবি জানে না, হাদিস যাচাই করতে পারে না, তাদের জন্য তাকলীদ করা প্রয়োজনীয়। প্রমান স্বরূপ সুরা নাহল, আয়াত ৪৩ “যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর।”
২) মাঝারি জ্ঞানসম্পন্ন: কিছু বুঝে কিন্তু পূর্ণ মুজতাহিদ নয়, এরা সাধারণত মাযহাব অনুসরণ করে , প্রয়োজনে দলিল দেখে ।
৩) মুজতাহিদ (উচ্চ পর্যায়ের আলেম): সরাসরি কোরআন-হাদিস থেকে বিধান বের করতে সক্ষম, উনারা তাকলীদ করেন না, নিজেরাই ইজতিহাদ করেন।

অনেকেই বলেন তাকলীদ হারাম এই দাবিটিরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন ।
কিছু মানুষ বলেন “শুধু কোরআন-হাদিস, মাযহাব লাগবে না” কিন্তু এখানে কিছু সমস্যা আছে। যথা বাস্তবতা হলো কোরআন একটি গভীর আরবি ভাষা, হাদিস সংখ্যাতেও হাজার হাজার, যাচাই দরকার, তাহলে প্রশ্ন একজন সাধারন মানুষ কীভাবে ঠিক করবেন কোনটা সহিহ?

আসল সত্য হল সাধারণ মানুষ যদি নিজে মুজতাহিদ না হন তাহলে অবশ্যই কারো ব্যাখ্যা অনুসরণ করবেন, সেটাই তাকলীদ বা ফিকাহ অনুসরণ।

সাহাবাদের যুগেও তাকলীদ ছিল, সাধারণ সাহাবারা বড় ( জ্ঞানী) সাহাবা যথা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস প্রমুখকে জিজ্ঞাসা করতেন। এটাও এক ধরনের তাকলীদ।

ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হল শুধু আমার মাযহাবই ঠিক এটি সংকীর্ণতা ও ভুল, কোনো মাযহাব লাগবে না এটা বিশৃঙ্খলা, তাই এই ধারনাও ভুল ।

সঠিক পথ হল কোরআন + সুন্নাহ , এ দুয়ের সমাহার হল মূল উৎস, মাযহাব হল বুঝার মাধ্যম।মোট কথা হল আল্লাহ বলেছেন তাঁর পথ অনুসরণ করতে (সুরা আনআম আয়াত ১৫৩)। মতবিরোধ হলে কোরআন-রাসূলের দিকে ফিরতে (সুরা নিসা আয়াত ৫৯)। রাসূল (সা.) দেখিয়েছেন কীভাবে পালন করতে হয়, ইমামরা সেই পথকে সহজ করে দিয়েছেন। সহজ কথায় মাযহাব মানা মানে কোরআন-হাদিস ছেড়ে দেওয়া নয় বরং কোরআন-হাদিস বুঝে চলার নিরাপদ উপায়।

এখন আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে যায় তা হল একজন ব্যক্তি কি একাধিক মাযহাব অনুসরণ করতে পারে? বা মাযহাব পরিবর্তন করা কী জায়েজ?

একাধিক মাযহাব অনুসরণ করা সম্ভব কী না তার সংক্ষিপ্ত উত্তর হল সম্ভব কিন্তু শর্তসাপেক্ষ যথা ইচ্ছামতো সহজটা বেছে নেওয়া হলে তা হবে ভুল। বিষয়টি একটু খুলেই বলা যাক । চার মাযহাবই (ইমাম আবু হানিফা,ইমাম মালিক,ইমাম শাফিঈ,ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল) সবাই কোরআন ও সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এক মাযহাব থেকে অন্য মাযহাবে যাওয়া কুফর বা গুনাহ নয়।
কিন্তু সমস্যা তো একটা আছেই আর সেটা হল “তালফীক” (সুবিধা অনুযায়ী মিশিয়ে নেয়া)। উদাহরন হিসাবে বলা যায় অজুতে এক মাযহাবের নিয়ম মানা হল কিন্তু নামাজে আরেক মাযহাবের কারণ যেটা সহজ , এতে কী হয়? এমন একটি আমল তৈরি হতে পারে যা কোনো মাযহাবেই সহিহ নয়।

তাই আলেমরা বলেন সাধারণ নিয়মে একটি মাযহাব অনুসরণ করাই নিরাপদ, তবে প্রয়োজন হলে অন্য মাযহাবের মত নেওয়া যাবে অবশ্যই (যোগ্য আলেমের পরামর্শে)

এখন দেখা যাক মাযহাব পরিবর্তন করা কি জায়েজ? সংক্ষিপ্ত উত্তর হল জায়েজ কিন্তু উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ। কখন জায়েজ সে কথা বলতে গেলে দুটি দিক উঠে আসে :
১) জ্ঞান অর্জনের ভিত্তিতে কেউ গবেষণা করে বুঝলো অন্য মাযহাবের দলিল তার কাছে শক্তিশালী , তখন তিনি মযহাব পরিবর্তন করতে পারেন।
২) বাস্তব প্রয়োজন কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে যেমন উদাহরন হিসাবে বলা যায় চিকিৎসা সমস্যা, ভ্রমণ, বিশেষ পারিবারিক পরিস্থিতি তখন অন্য মাযহাবের সহজ মত নেওয়া যায়।

এখন কখন জায়েজ নয় সেটাও একটু দেখা যাক। সহজের খোঁজে মাযহাব বদলানো জায়েজ নয়। আজ এক মাযহাব, কাল অন্যটা শুধু সুবিধার জন্য, এটাকে বলা হয় নফসের অনুসরণ।

সাহাবা ও সালাফদের দৃষ্টিভঙ্গি : সাহাবাগন যথা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ , আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস তারা ভিন্ন মত দিতেন
মানুষ তাদের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করত কিন্তু তারা ইচ্ছামতো মত মিশিয়ে নিত না।
একটি বাস্তব উদাহরণ, ধরা যাক একজন ব্যক্তি তালাক বিষয়ে এক মাযহাব , নামাজে আরেক , যাকাতে আরেক তথা সবই সহজ দেখে নিচ্ছে। ফল হল একটি নিজস্ব ইসলাম তৈরি হয়ে যায় যা ঝুঁকিপূর্ণ।
ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি হল নিরাপদ পথ হিসাবে একটি মাযহাব অনুসরণ করা (যেমন হানাফি, শাফিঈ ইত্যাদি), তবে অন্য মাযহাবকে সম্মান করতে হবে , প্রয়োজন হলে আলেমের পরামর্শ নিতে হবে ।
মোট কথা হল মাযহাব পরিবর্তন জায়েজ তবে খেলাচ্ছলে নয়, জ্ঞান ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে। একাধিক মাযহাব অনুসরণ সম্ভব কিন্তু নফসের অনুসরণ করে মিশ্রণ করা ঠিক নয় । সবচেয়ে সুন্দর ভারসাম্য হল কোরআনকে মূল, সুন্নাহকে পথ , মাযহাবকে বোঝার মাধ্যম হিসাবে নেয়া ।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে চার মাযহাবের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে শক্তিশালী? বা বর্তমান যুগে একজন মুসলিমের জন্য কোন মাযহাব অনুসরণ করা সহজ/উপযুক্ত?

কোন মাযহাব সবচেয়ে শক্তিশালী এর সংক্ষিপ্ত উত্তর হল একটি মাযহাবকে সবচেয়ে শক্তিশালী বলা সঠিক নয়। কেন সঠিক নয় তার উত্তর হল চারজন ইমামের (ইমাম আবু হানিফা , ইমাম মালিক ,ইমাম শাফিঈ , ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ) সকলেই কোরআন ও সহিহ হাদিসের উপর ভিত্তি করেছেন, সবাই ছিলেন উচ্চমানের মুজতাহিদ।

তাহলে পার্থক্য কী? শক্তিশালী হওয়া নির্ভর করে নির্দিষ্ট মাসআলা (issue)-এর উপর । উদাহরণ হিসাবে বলা যায় একটি বিষয়ে হানাফি মত শক্তিশালী হতে পারে , অন্য বিষয়ে শাফিঈ মত বেশি শক্তিশালী হতে পারে, তাই আলেমরা বলেন মাযহাব নয়, দলিল শক্তিশালী হয়।

গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হল আপনি বা আমি সব হাদিস যাচাই করতে পারি না , সব মতের তুলনা করতে পারি না , তাই আমাদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী খোঁজা নয়, বরং বিশ্বস্ত পথ অনুসরণ করা জরুরি।

তাহলে কোন মাযহাব অনুসরণ করব?
এর সহজ উত্তর হল যে মাযহাব আপনার/আমার এলাকায় প্রচলিত ও শেখা সহজ।
যেমন ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এই তিন দেশে হানাফি বেশি । সৌদি আরব হাম্বলি বেশী , মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় শাফিঈ বেশি ,উত্তর আফ্রিকায় মালিকি বেশি ।এটা গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসায় আলেম, বই ( কিতাব) সব একই মাযহাব অনুযায়ী এতে দ্বন্দ্ব কম হয়, শেখা সহজ হয় ।

এখন প্রশ্ন হল আমি কি নিজে মযহাব বেছে নিতে পারি?” হ্যাঁ পারা যায় কিন্তু শর্ত হল জ্ঞানের ভিত্তিতে হতে হবে, শুধু সহজ দেখে নয়।

বর্তমান যুগে সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তব পরামর্শ হল একটি মাযহাব ধরা এবং সেটার উপর স্থির থাকা যেমন নামাজ , রোজা , যাকাত , দৈনন্দিন আমল। একই সাথে অন্য মাযহাবকে ভুল ভাবা যাবেনা, এগুলো সবই ইসলামের ভিতরে বৈধ মত।

চার মাযহাব হলো একই গন্তব্যে যাওয়ার ৪টি রাস্তা;
গন্তব্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি, রাস্তা ভিন্ন পদ্ধতি। যে কারো জন্য একটি রাস্তা ধরলেই যথেষ্ট কারণ বারবার রাস্তা বদলালে বিভ্রান্তি বাড়ে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে , তা হল আমার মাযহাবই একমাত্র সঠিক এটা ভাবা ভুল । আবার সব মাযহাব বাদ, আমি নিজে বুঝব এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিক পথ হল মধ্যম পন্থা তথা Balanced approach।

মোট কথা কোনো একটি মাযহাব সর্বোত্তম নয়, সবগুলোই কোরআন-সুন্নাহর বৈধ ব্যাখ্যা। কারো একজনের জন্য সেরা মাযহাব হল যেটা তিনি সঠিকভাবে শিখে পালন করতে পারেন। আসল কথা কোরআন হলো মূল উৎস, সুন্নাহ হলো বাস্তব পথ আর মাযহাব হলো বোঝার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।

এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে কথা বলা যায় । তা হল ইমামরা নিজেরা কি বলেছিলেন তাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করতে?
প্রশ্নটির মূল বিষয় চার ইমাম কি বলেছিলেন আমাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করো? আমার কথা কোরআন-হাদিসের চেয়েও বড়? উত্তর হল কখনোই না বরং তারা এর সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলেছেন।

এ সম্পর্কে চার ইমামের স্পষ্ট বক্তব্য:
ইমাম আবু হানিফা বলেছেন আমার কথা যদি কোরআন ও সহিহ হাদিসের বিপরীত হয়, তবে আমার কথা ছেড়ে দাও। এর অর্থ হল ইমামের কথা চূড়ান্ত নয়, দলিল (কোরআন-হাদিস) চূড়ান্ত।

ইমাম মালিক বলেছেন আমি একজন মানুষ; আমি ভুলও করি, সঠিকও করি। তাই আমার মত যাচাই করো। তিনি আরও বলেছেন; রাসূল (সা.)-এর পর প্রত্যেকের কথা গ্রহণ বা বর্জন করা যেতে পারে।

ইমাম শাফিঈ বলেছেন যদি আমার কোনো কথা সহিহ হাদিসের বিপরীত হয়, তাহলে হাদিস গ্রহণ করো এবং আমার কথা ছেড়ে দাও। এর অর্থ হল হাদিস সর্বোচ্চ, ইমামের মত ব্যাখ্যা মাত্র।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন আমাকে অনুসরণ করো না, মালিককে অনুসরণ করো না, শাফিঈকে অনুসরণ করো না; বরং যেখান থেকে তারা নিয়েছেন (কোরআন ও হাদিস) সেখান থেকে নাও।

তাহলে “তাকলীদ” কি ভুল? না, ভুল না কিন্তু বুঝতে হবে দুই ধরনের তাকলীদ:
১) সচেতন তাকলীদ (সঠিক) সাধারণ মানুষ নিজে কোরআন-হাদিস গবেষণা করতে পারে না , তাই বিশ্বস্ত আলেম/মাযহাব অনুসরণ করে , এটি বৈধ এবং প্রয়োজনীয়।
২) অন্ধ তাকলীদ (ভুল দিক) কেউ বলেন ইমাম যা বলেছেন, সেটাই শেষ কথা, দলিল দেখার দরকার নেই। এটি ভুল, কারণ ইমামরা নিজেরাই এটা নিষেধ করেছেন।
আসল ব্যালান্সটা কী? ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান হল :
১) উৎস: কোরআন + সহিহ হাদিস
২) বোঝার মাধ্যম: ইমামদের ব্যাখ্যা (মাযহাব)
৩) চূড়ান্ত মানদণ্ড: দলিল ( যে কোনো ব্যক্তি না )

সাহাবাদের যুগেও একই নীতি:
সাহাবারা যেমন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, মানুষ তাদের কথা অনুসরণ করত কিন্তু কোরআন-হাদিসের বিরুদ্ধে হলে গ্রহণ করত না।মোট কথা হল চার ইমাম কখনোই অন্ধ অনুসরণ করতে বলেননি, বরং বলেছেন আমাদের কথা যাচাই করো কোরআন ও হাদিস দিয়ে। ইসলামের সুন্দর ভারসাম্য হল কোরআন হল মূল সত্য, হাদিস হল ব্যাখ্যা ও বাস্তব প্রয়োগ, ইমাম/মাযহাব হল বোঝার সহায়ক পথ।

আলোচনার এ পর্যায়ে প্রসঙ্গক্রমে আরো একটি বিষয়ের উপর দৃস্টি দিতে পারি তা হল আজকের যুগে সালাফি বনাম মাযহাবি বিতর্ক আসলে কোথা থেকে এসেছে এবং কার অবস্থান কী? বিষয়টা নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যার প্রয়াস নেয়া যায় ।

প্রথমত সালাফি বনাম মাযহাবি আসলে মূলত এ দুটি আলাদা ইসলাম নয় বরং এটি হলো বুঝার পদ্ধতির পার্থক্য ।

সালাফি ধারণা ; সালাফ মানে প্রথম তিন প্রজন্ম (সাহাবা, তাবেঈন, তাবেঈ তাবেঈন)। সালাফি চিন্তা বলে সরাসরি কোরআন ও সহিহ হাদিস অনুসরণ। পরবর্তী ব্যাখ্যার চেয়ে প্রথম যুগের বুঝকে বেশি গুরুত্ব দান।

মাযহাবি ধারণা মুলত চার ইমামের ( ইমাম আবু হানিফা , ইমাম মালিক ,ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল )ফিকাহ অনুসরণ । উদ্দেশ্য হল কোরআন-হাদিসকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য করা ।

এখন কথা আসতে পারে ইতিহাসে বিভাজন কীভাবে তৈরি হলো?
প্রথম যুগে (সাহাবা যুগ) কোনো সালাফি/মাযহাবি নাম ছিল না, সবাই কোরআন-হাদিস অনুসরণ করতেন, ভিন্ন মত থাকলেও সহনশীলতা ছিল । পরবর্তী যুগে সমস্যা দেখা দিল যখন ইসলাম বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ল , হাদিস সংগ্রহ বিশাল হলো , সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি বোঝা কঠিন হলো , তখন ফিকাহ ইমামরা ব্যাখ্যা দিলেন, মাযহাব তৈরি হলো।

আধুনিক যুগে নতুন আন্দোলন শুরু হল ; পরবর্তীতে কিছু আলেম বললেন মাযহাব না, সরাসরি কোরআন-হাদিস । এখান থেকেই একদিকে সালাফি পরিচিতি আরদিকে মাযহাবি পরিচিতি (অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী ফিকাহ অনুসারী)।

প্রশ্ন আসে তাহলে আসল সমস্যা কোথায়? সমস্যা ইসলামে নয়, সমস্যা হলো পদ্ধতির অতিরিক্ত কঠোরতা। দুই পক্ষেই ভুল হতে পারে:
১. কিছু মাযহাবি মনোভাব শুধু আমার মাযহাবই ঠিক অন্য মত ভুল ।
২. কিছু সালাফি মনোভাব মাযহাব অনুসরণ বিদআত, ইমামদের ব্যাখ্যা অপ্রয়োজনীয় ,
তাই এই দুইটাই অতিরিক্ততাপুর্ণ ।

বাস্তব সত্য (Balanced truth) হল কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি; সুরা নিসা এর ৫৯ তম আয়াতে বলা হয়েছে “আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো, এবং মতবিরোধ হলে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরাও” এখানে কোনো দল নেই, মানদণ্ড আল্লাহ ও রাসূল।
ইমামদের অবস্থান: তারা কখনো বলেননি আমাকে অন্ধভাবে মানো, বরং বলেছেন দলিল দেখো , ভুল হলে সংশোধন করো
সালাফদের অবস্থান: তাঁরা সরাসরি কোরআন-হাদিস অনুসরণ করতেন কিন্তু তাঁরা ইমামদের জ্ঞানও ব্যবহার করতেন।
একটি সহজ উদাহরণ হল একই নদীর পানি , কোরআন হল নদীর উৎস ।
হাদিস হল পানির প্রবাহ , ইমাম/মাযহাব হলেন বাঁধ ও খাল (distribution system) ।
সালাফি দৃষ্টিভঙ্গি হল সরাসরি উৎস থেকে পান করো ।
মাযহাবি দৃষ্টিভঙ্গি হল সংগঠিত খাল দিয়ে পান করো ।
লক্ষ্য একই পানি পান করা (সত্য অনুসরণ)।

আধুনিক বাস্তবতা; আজকের যুগে সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি ইজতিহাদ করা কঠিন , হাদিস বিশ্লেষণ জটিল । তাই অধিকাংশ আলেম বলেন মাযহাব হল নিরাপদ কাঠামো তবে কোরআন-হাদিস হতে হবে চূড়ান্ত মানদণ্ড। মোট কথা সালাফি বনাম মাযহাবি আসলে ইসলাম বনাম ইসলাম নয় বরং বোঝার পদ্ধতির পার্থক্য। ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামিক অবস্থান হল কোরআন + সুন্নাহ হল মূল ভিত্তি,
সালাফদের বুঝ হল প্রাথমিক দিক নির্দেশ । মাযহাব দেয় ফিকাহগত সংগঠিত ব্যাখ্যা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল ইসলাম কাউকে দল বানাতে বলেনি। ইসলাম বলেছে সত্য অনুসরণ করো।

আলোচনার এ পর্যায়ে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটু আলোচনা করে নেয়া যাক । তা হল ইসলামে কি দল (sect) তৈরি করা জায়েজ? বা মাযহাব অনুসরণ না করলে কি নামাজ/ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয়?” বিষয়টা কোরআন-হাদিসের আলোকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

ইসলামে “দল বানানো” (sectarianism) কীভাবে দেখা হয়েছে?
মূল নীতি হল ইসলাম মূলত এক উম্মাহ (এক জাতি) হওয়ার কথা বলে, বিভক্ত দল হওয়ার কথা নয়। কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“তোমরা সেই লোকদের মতো হয়ো না যারা তাদের ধর্মকে ভাগ করেছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়েছে।” (সুরা রূম আয়াত ৩২)
আরও স্পষ্ট নির্দেশ এসেছে সুরা আনআম এর ১৫৯ তম আয়াতে “যারা তাদের ধর্মকে টুকরো টুকরো করেছে এবং দলে বিভক্ত হয়েছে তুমি তাদের মধ্যে নও।”

এখন প্রশ্ন আসে তাহলে কি মাযহাব বা মতভেদ হারাম? উত্তর হল না , কারণ মাযহাব হল ফিকাহ বোঝার পদ্ধতি , পক্ষান্তরে দল (sectarianism) হল নিজেদের আলাদা ধর্ম বানিয়ে ফেলা । পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, ফিকাহ মাযহাব বৈধ , এটা অবৈধ নয় ।
কোরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যার পার্থক্য বৈধ, অবৈধ নয়।নিজেকে ভিন্ন ইসলাম বানানো কোন মতেই বৈধ নয় মানে এটা অবৈধ।

এখন প্রশ্ন হল সাহাবাদের যুগে কি মতভেদ ছিল?হ্যাঁ, ছিল। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় কেউ এক ভাবে নামাজ পড়তেন , আবার কেউ আরেকভাবে বুঝতেন, কিন্তু তারা একে অপরকে ভুল দল বলেননি। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ , আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস তারা ভিন্ন মত দিলেও উম্মাহ এক ছিল।

এখন প্রশ্ন হল মাযহাব না মানলে ইবাদত হবে কি?” সংক্ষিপ্ত উত্তর হল হবে , যদি ইবাদত কোরআন ও সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী হয়। ব্যাখ্যায় বলা যায় ইবাদত গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হল ইখলাস (নিয়ত সঠিক) , কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী হওয়া । কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ শর্ত নয়।

কিন্তু বাস্তব সমস্যা দেখা দেয় সাধারণ মানুষ যদি সরাসরি কোরআন-হাদিস থেকে নিজে সিদ্ধান্ত নেয় আর ভুল বুঝে ফেলে, তাহলে ইবাদতে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিজ্ঞ আলেমদের ভারসাম্যপূর্ণ মত হল মাযহাব একটি নিরাপদ গাইড, দলিল চূড়ান্ত মানদণ্ড, সাধারণ মানুষ আলেমদের অনুসরণ করবে।

এ প্রসঙ্গে ইমামদের অবস্থান আবার মনে করা যাক , চার ইমামরই (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ) মূল বক্তব্য ছিল আমাদের কথা কোরআন-হাদিসের বিপরীত হলে তা বাদ দাও।

তাহলে দল তৈরিতে সমস্যা কোথায় হয়? সমস্যা হয় যখন দেখা যায়;
১) দলীয় অহংকার আমরা একমাত্র সত্য অন্যরা ভুল।
২) বিভাজন সৃষ্টি করে মুসলিমদের মধ্যে ঘৃণাভাব আসে ।
৩) মাযহাবকে ধর্ম বানিয়ে ফেলা ইমামকে নবীর সমতুল্য করা ।

সঠিক অবস্থান হল ভিন্ন মত থাকবে কিন্তু উম্মাহ এক থাকবে (সুরা ইমরান আয়াত-১০৩) যেখানে বলা হয়েছে “তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধরো এবং বিভক্ত হয়ো না।”

এ প্রসঙ্গে একটি সহজ উদাহরণ দেয়া যাক । একটি বড় স্কুল, শিক্ষকরা হলেন ইমামগন, পাঠ্য বই হল কোরআন ও হাদিস , ব্যাখ্যার পার্থক্য হল মাযহাব । কথা হল ছাত্ররা একই স্কুলে থাকে কিন্তু ভিন্ন শিক্ষক থেকে শেখে , বাস্তবে তারা আলাদা স্কুল নয়।
মোট কথা হল ইসলামে দলীয় বিভাজন নিষিদ্ধ, কিন্তু ফিকাহগত মতভেদ বৈধ।

ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা হল কোরআন + সুন্নাহ যা মূল ইসলাম, মাযহাব হল বোঝার সাহায্য, মতভেদ হতে হবে গ্রহণযোগ্য তবে বিভাজন ও ঘৃণা নিষিদ্ধ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল ইসলাম আমাদের দল বানাতে নয় বরং উম্মাহ বানাতে এসেছে।

এখন কথা হল কোরআন-হাদিস সরাসরি বুঝে চলা কি সবার পক্ষে সম্ভব?

সংক্ষিপ্ত উত্তর হল না , সব মানুষের জন্য সরাসরি কোরআন-হাদিস থেকে নিজে নিজে বিধান বের করা সম্ভব নয় তবে সবাই কোরআন-হাদিস অনুযায়ী চলতে বাধ্য।
কেন সবার জন্য সম্ভব নয়?
১) ভাষার বিষয় হল কোরআন আরবি ভাষায়, হাদিসও আরবি, অনেক সময় গভীর শব্দ ও প্রসঙ্গভিত্তিক। সমস্যা হল সাধারণ মানুষ আরবি ব্যাকরণ জানে না , শব্দের বহু অর্থ বোঝে না ।
২) হাদিসের জটিলতা: হাজার হাজার হাদিস আছে, এর মাঝে অনেক হাদিস সহিহ , কিছু হাসান , কিছু দুর্বল , প্রসঙ্গ নির্ভর, এগুলো আলাদা করা বিশেষ জ্ঞান ছাড়া সম্ভব নয়।
৩) প্রেক্ষাপট (context) না জানা; একটি হাদিস কখন বলা হয়েছে , কার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে , কী পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে এগুলো না জানলে ভুল বোঝা খুব সহজ।
৪) কোরআনের ব্যাখ্যা ( তাফসির ) দরকার; কোরআন নিজেই বলে এটি স্পষ্ট কিতাব কিন্তু ব্যাখ্যা ছাড়া নয়। অনেক আয়াত সাধারণ , আবার অনেক আয়াত গভীর ব্যাখ্যা-নির্ভর ।

তাহলে সাহাবারা এ ক্ষেত্রে কী করতেন? উত্তর হল সাহাবারা সরাসরি সবকিছু নিজেরা বুঝতেন না, তাঁরা রাসুল(সা.)কে জিজ্ঞাসা করতেন অনেক সময় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ , আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এর মত যোগ্য জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে যেতেন।

এ বিষয়ে কোরআনের নির্দেশ কী? সুরা নাহল এর ৪৩ তম আয়াতে বলা হয়েছে "যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো"। এটি একটি সরাসরি নির্দেশ, অজ্ঞ ব্যক্তিগন আলেমকে অনুসরণ করবে, এটি ইসলামেরই অংশ।

এখন প্রশ্ন আসে তাহলে মাযহাব কেন এসেছে? কারণ হল সাধারণ মানুষ সরাসরি ইজতিহাদ করতে পারে না , ইসলাম বিস্তৃত ও অনেক বিষয়ে জটিল , তাই ইমামরা কোরআন সাথে হাদিস বিশ্লেষণ করেছেন , নিয়ম (ফিকাহ) তৈরি করেছেন । যেমন
ইমাম আবু হানিফা ,ইমাম মালিক,ইমাম শাফিঈ ,ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ।

এখন প্রশ্ন হল তাহলে কি কোরআন-হাদিস মানা কঠিন? উত্তর হল না কোরআন-হাদিস মানা কঠিন নয় বরং পদ্ধতি হলো:
১) সাধারণ মানুষ বিশ্বস্ত আলেম/মাযহাব অনুসরণ করবে।
২) আলেমগন কোরআন-হাদিস থেকে গবেষণা করবেন।
একটি সহজ উদাহরণ হল চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো; কোরআন-হাদিস মেডিকেল বই , আলেম হলেন ডাক্তার আর সাধারণ মানুষ হল রোগী । রোগী নিজে অপারেশন করতে গেলে ক্ষতি হতে পারে, তাই সে ডাক্তারকে অনুসরণ করে।

এখানে একটি মস্ত বড় ভুল ধারণা প্রচলিত আছে আর সেটি হল আমি নিজেই কোরআন-হাদিস পড়ে সব বুঝব
, এরকম ক্ষেত্রে বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ যদি জ্ঞান না থাকে। মাযহাব মানা মানে কোরআন বাদ দেওয়া এটাও একটি ভুল।
ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামিক অবস্থান হল ইসলাম সবাইকে কোরআন-হাদিস মানতে বলে তবে বুঝে চলার জন্য স্তর নির্ধারণ করেছে:আল্লাহ ও রাসূল হলেন মূল আলেম হলেন ব্যাখ্যাকারী । সাধারণ মানুষ অনুসরণকারী ।মোট কথা কোরআন-হাদিস মানা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক, কিন্তু সরাসরি নিজে বুঝে বিধান বের করা সবার জন্য সম্ভব নয় তাই জ্ঞানীদের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।মোট কথা ইসলাম সহজও আবার গভীরও, তাই এটি ভারসাম্য দিয়ে বোঝার বিষয়।

এখন কথা হল আলেমদের ভুল হলে সাধারণ মানুষ কী করবে?
১) সংক্ষিপ্ত উত্তর হল আলেমও মানুষ তারা ভুল করতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হলো যাচাই করা এবং দলিলের দিকে ফিরে যাওয়া (যদি সক্ষম হয়) না হলে অন্য বিশ্বস্ত আলেমকে জিজ্ঞাসা করা।
২)ইসলাম কী বলে? (মূল নীতি) কোরআনে সুরা নিসার ৫৯ নং আয়াত বলে “তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে দায়িত্বশীলদের…” এরপরই বলা হয়েছে “যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতভেদ কর, তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরাও।”এর মানে হল মানুষের কথা চূড়ান্ত নয় , চূড়ান্ত মানদণ্ড হল কোরআন ও সুন্নাহ ।

আলেম ভুল করলে তা কি অস্বাভাবিক? না, অস্বাভাবিক নয়, কারণ আলেমরা ইজতিহাদ করেন (ব্যাখ্যা করেন) , মানবীয় সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকেন , তাই ভুল হতে পারে , সঠিকও হতে পারে ।

তাহলে সাধারণ মানুষ কী করবে?
প্রথম ধাপ হল অন্ধভাবে না মানা। কোনো কথা শুনলে এটার দলিল কী? জিজ্ঞাসা করা উত্তম ।
দ্বিতীয় ধাপ হল একাধিক নির্ভরযোগ্য আলেম, শুধু একজন নয় বরং একাধিক বিশ্বস্ত আলেমের মত দেখা ।
তৃতীয় ধাপ হল দলিলভিত্তিক মত গ্রহণ, যদি কোনো মত সহিহ হাদিস বা শক্ত কোরআনি ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি হয় তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য।
চতুর্থ ধাপ হল নিজের সীমা জানা, যদি নিজে জ্ঞান না থাকে বিতর্কে না যাওয়া বরং শেখা চালিয়ে যাওয়া ।

সাহাবাদের উদাহরণ, সাহাবারা নিজেরাও ভুল হতে পারে এমন বুঝতেন যেমন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ , আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস , মানুষ তাদের মত নিত কিন্তু অন্য দলিল পেলে সংশোধন করত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য হল দুটি চরমপন্থাই ভুল :
১) আলেম যা বলবে তাই চূড়ান্ত এটি অন্ধ অনুসরণ
২) আমি নিজেই সব বুঝব এটি আত্মবিশ্বাসজনিত ভুল।
সঠিক পথ হল কোরআন + সুন্নাহ হতে হবে মানদণ্ড ,আলেম হবেন ব্যাখ্যাকারী, সাধারণ মানুষ হল অনুসরণকারী ও যাচাইকারী (সীমার মধ্যে)।
কোরআনে ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে সুরা নাহল আয়াত ৪৩ “যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।” কিন্তু অন্য জায়গায় বলা হয়েছে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরে যাও। এর অর্থ হল আলেমকে জিজ্ঞাসা করবে কিন্তু সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড আল্লাহ ও রাসূল।মোট কথা আলেমরা ভুল করতে পারেন, তাই অন্ধ অনুসরণ নয়; কিন্তু জ্ঞান না থাকলে যাচাই ও অন্য নির্ভরযোগ্য আলেমের মাধ্যমে কোরআন-সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়াই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ পথ।
ইসলাম বলে না অন্ধ হও, আবার বলে না সবাই নিজে মুজতাহিদ হও বরং বলে শেখো, জিজ্ঞাসা করো, দলিল অনুসরণ করো।

এখন আলোচনার এ পর্যায়ে একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য বাস্তব জীবনে ইসলামী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঠিক ধাপগুলি কী তা একটু পর্যালোচনা করে দেখা যাক ।এটাকে বুঝার সুবিধার জন্য ৫টি ধাপে সাজানো যায় যাতে যে কেও তা প্রতিদিনের জীবনে সহজে প্রয়োগ করতে পারেন।

ধাপ ১: নিয়ত ঠিক করা (ইখলাস)
প্রথম প্রশ্ন:“আমি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সিদ্ধান্ত নিচ্ছি?”
ইসলামে কাজের মূল্য নির্ভর করে নিয়তের উপর যদি নিয়ত ঠিক হয় ছোট কাজও ইবাদত হয়ে যায় ।

ধাপ ২: কোরআন ও সুন্নাহর মূল নির্দেশ খোঁজা, বলা হয় দেখু এই বিষয়ে কোরআনে কিছু আছে কি? সহিহ হাদিসে কিছু আছে কি? আজকাল বিশ্বস্ত বই ( কিতাব) নির্ভরযোগ্য আলেমদের লেকচার, ওয়াজ এগুলো থেকে সহজ ধারণা নেওয়া যায়।

ধাপ ৩: বিশ্বস্ত আলেম/মাযহাব অনুসরণ; যদি নিজে পরিষ্কার বুঝতে না পারে তাহলে নীজের পরিচিত মাযহাব (যেমন হানাফি ইত্যাদি) বা বিশ্বস্ত আলেমের মত অনুসরণ করতে হবে। এখানে আপনি পরোক্ষভাবে অনুসারিত হচ্ছে ইমাম আবু হানিফা , ইমাম মালিক ,ইমাম শাফিঈ ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল মযহাব ।

ধাপ ৪: সন্দেহ হলে যাচাই (double-check) যদি মনে হয় “এটা ঠিক তো?” তাহলে আরেকজন আলেমকে জিজ্ঞাসা করা যায় , নির্ভরযোগ্য সূত্র দেখতে হবে , এটি হল এটি সুন্নাহসম্মত সতর্কতা।

ধাপ ৫: তাকওয়া ও সতর্কতা ; যদি দুইটি মত থাকে তখন যেটা আল্লাহভীতি (তাকওয়া) অনুযায়ী নিরাপদ সেটি বেছে নেয়া , সুরা আনআম এর ১৫৩ তম আয়াতে বলা হয়েছে “এটাই আমার সোজা পথ এটা অনুসরণ করো…”

পুরো ৫ টি ধাপের প্রক্রিয়াটি এক নজরে দেখা যাক:
১) নিয়ত ঠিক করা
২) কোরআন-হাদিস খোঁজা
৩) আলেম/মাযহাব অনুসরণ
৪) যাচাই করা
৫) তাকওয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত

বড় ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে
ভুল ১: “যেটা সহজ, সেটাই নেব”
ভুল ২: “আমি নিজেই সব বুঝব”
ভুল ৩: “একজন আলেমই শেষ কথা”

সবচেয়ে সুন্দর ভারসাম্য হল ইসলাম শেখায় অন্ধ অনুসরণ নয়, অহংকারী স্বাধীনতা নয় বরং জ্ঞান + বিনয় + তাকওয়া।
মোট কথা হল একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য সঠিক পথ হলো নিয়ত ঠিক রেখে, কোরআন-সুন্নাহর আলোকে, বিশ্বস্ত আলেমের সাহায্যে, যাচাই করে এবং তাকওয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এই ধাপগুলি মেনে চললে ইনশাআল্লাহ বিভ্রান্তি কমবে, সিদ্ধান্ত পরিষ্কার হবে, ঈমানও শক্তিশালী হবে।

ছবি সুত্র : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৯:৪০

আলামিন১০৪ বলেছেন: আমি সাধারণত বড় পোস্ট পুরোটা পড়ি না, আপনার এ লিখা পুরোটা পড়লাম। অত্যন্ত সহজবোধ্য ভাষায় কোরআন হাদিসের আলোকে মযহাব/মতভেদ/ফিকহ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন।
আমার মনে হয় বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যতে বিভিন্ন মত থাকলেও জামাআতে নামাজ পড়ার সময় ইমামের অনুসরণ করা উচিত। কিংবা একটি দেশে দুই দিবসে রোজার শুরু/শেষ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সবচেয়ে ভালো হয় পুরো মুসলিম উম্মাহর যদি একটি শরীয়া কাউন্সিল থাকত যারা একটি মাত্র সহজ পথ বাতলে দিত যেটি সব মুসলিম গ্রহল করতে বাে্য থাকত। অন্ততঃ প্রকাশ্যে সবাই একইভাবে ইসলামের বিধি-বিধান পালন করত যাতে শয়তান মুসলিমদের অন্তরে বিভেদের বীজ রোপন করতে না পারে।

একটা উদাহরণ দিই। মুসা (আঃ) এর সময়ে আল্লাহ একটা বিশেষ কারণে গরু জবাই এর আদেশ করল। কিন্তু ইহুদীরা কোন গরু জবাই করবে তা নিয়ে মতভেদ করল, কোন ইমাম বা নেতাকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবার চাইতে মুসা (আঃ) কে বলল আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করতে, কি রং এবং কি বয়সের বা কি লিঙ্গের গরু জবাই করতে হবে। অথচ, তারা যদি একমত হয়ে যে কোন একটি গরু জবাই করত তাহলেই কাজ হয়ে যেত। একমত হতে না পারার কারণে আল্লাহ তাদের কাজ কঠিন করে দিলেন- ঐ গরুর বিস্তরিত বৈশিষ্টের বিষয়ে আয়াত নাযিল করলেন।
আমরা কি মুসা (আঃ) এর ঘটনা ভুলে গেছি? যে বিষয়ে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায় বা সরাসরি উত্তর নাই সে বিষয়ে আমাদের হার্ড হতে হবে কেন? আর কেনই বা এত প্রশ্ন করতে হবে? আমরা কেন কোন এক মতকে গ্রহণ করে একতাবদ্ধ হতে পারি না? কেন আমরা একই ইমামের পিছনে এক এক জন এক এক ভাবে নামাজ পড়ব? আমার মনে হয় এ ব্যাপারে ইসলামী চিন্তাবিদদের ভাবতে হবে। তা না হলে মতভেদের দরুন বা বিচ্ছিন্নতার দরুন আল্লাহর নিকট জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে হবে।

পোস্টের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ নিন। আমার মনে মহাজাগতিক ভাই এবার হয়ত বুঝতে পারবেন।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.