নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

রৌশন

রৌশন › বিস্তারিত পোস্টঃ

অলসতার দেয়ালের ওপারে সফল এক বাংলাদেশ

০৬ ই নভেম্বর, ২০২৫ রাত ১০:৪৩


বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই। নেই স্বপ্নের ঘাটতিও। কিন্তু আমরা আসলে নিজেদের তৈরি খাঁচার ভেতর বন্দী এক জাতি। বাইরে কেউ এসে আমাদের থামায়নি, আমরাই একে অপরকে থামিয়েছি। আমাদের অহংকার, পদমর্যাদার ভ্রান্ত ধারণা আর বিভাজনের অভ্যাস আমাদের এমন এক জায়গায় এনে দিয়েছে, যেখানে সহযোগিতার চেয়ে প্রতিযোগিতা বেশি মূল্য পায়। দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র শাসন আমাদের মানসিকতাকে এমনভাবে বিষিয়ে দিয়েছে যে নতুন সিস্টেম ভাবা, বন্দোবস্ত নিয়ে প্রশ্ন করা কিংবা বদলে যাওয়াকেই আমরা ভয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছি। সেই শাসন আমরা পেছনে ফেলেছি, কিন্তু রেখে যাওয়া মানসিক কাঠামো এখনো আমাদের মধ্যে বহন করছি। প্রাপ্ত বয়স্ক প্রজন্মের অনেকেই পরিবর্তনকে সুযোগ নয় বরং বিপদ হিসেবে দেখে। এখন সেই ভয় কাটিয়ে ওঠা, নতুনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনাই আমাদের সবচেয়ে বড় লড়াই।

আমরা প্রায়ই বলি, “সিস্টেমটাই খারাপ।” কিন্তু সত্যিটা হলো সিস্টেম তৈরি করেছে মানুষ, আপনার-আমার আশেপাশেরই মানুষ, আর সেই মানুষই যখন পরিবর্তনের ভয় পায়, তখন সিস্টেমও জড় হয়ে যায়। আমরা ব্যর্থতার ভয়কে এতটাই বড় করে ফেলেছি যে, সাহস করে এগোনোর জায়গাটাই ফাঁকা পড়ে আছে। ফলে নতুন কিছু করার, শেখার বা ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতাটা হারিয়ে গেছে নিঃশব্দে।

এই ভয় ও জড়তার মূল্য আমরা প্রতিদিন দিচ্ছি অর্থনৈতিকভাবে, সময়ের দিক থেকেও। আমাদের জিডিপির একটি বিশাল অংশ হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো পদ্ধতি, অকার্যকর হার্ডওয়্যার আর স্বয়ংক্রিয়তার অভাবে। সাপ্লাই চেইন, অফিস এবং সরকারি সেবাতে আমরা এখনো অনেক জায়গায় “মানুষ বাড়াও, কাজ চালাও” নীতিতে আটকে আছি। এখনো অনেক ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ডকুমেন্ট লেখার জন্য, হাজিরা নেয়ার জন্য, অনুবাদ করার জন্য আলাদা লোক নিয়োগ করে, খাতায় হিসাব রাখে, ফটোকপি কাগজ ব্যাবহার করে, ইমেইল ব্যাবহার করে না। যেখানে যন্ত্র, সফটওয়্যার ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কাজ করলে ফলাফল হতো বহুগুণ দ্রুত ও নির্ভুল। আমরা প্রতিভাহীন নই, কিন্তু আমরা এখনো আগের মানসিকতায় কাজ করছি, যেখানে সমস্যার সমাধান হয় না, শুধু মানুষ বাড়ানো হয়।

এটা সময়ের দাবি যে আমরা অকার্যকারিতাকে আর “যেমন আছে, তেমনই থাকুক” বলে মেনে নেব না। এখন সময় এসেছে, সুযোগ এসেছে আধুনিকায়নের, স্বয়ংক্রিয়তার এবং উৎপাদনশীলতার প্রতি নতুন সম্মান গড়ে তোলার। সময়, শ্রম ও মেধা এই তিনটিকে আমরা যতদিন সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারব না, ততদিন গতি কাগজ-কলমের গতিতেই আটকে থেকে যাবে।

পরিবর্তন শুরু করতে হলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রয়োজন নিজের কাজের প্রতি কঠোর প্রশ্ন তোলা কোন প্রক্রিয়া অপ্রয়োজনীয়, কোন অংশ মেশিন বা সফটওয়্যারে স্থানান্তর হলে কাজ দ্রুত, সস্তা, আর নির্ভুল হবে। ছোট ছোট পাইলট প্রকল্পে ডিজিটাইজেশন ও প্রসেস অটোমেশন চালু করলেই বোঝা যায় যে দক্ষতার উন্নতি শুধু কাগজে নয়, প্রতিদিনের কর্মক্ষেত্রেও স্পষ্ট।

কিন্তু পরিবর্তন শুধু প্রতিষ্ঠানের দেয়ালের ভেতরেই আটকে থাকতে পারে না। ব্যক্তিগত মানসিকতার পরিবর্তন আরও জরুরি। একজন মানুষ যখন নিজেকে প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নত করে, তখন পুরো সমাজই পরিবর্তিত হতে থাকে। আমাদের শিখতে হবে নিজের সময়কে মূল্য দেওয়া, কারণ ব্যক্তিগত সময়ের অপচয়ই পরে জাতীয় অপচয়ে পরিণত হয়। তাই নিজের দক্ষতা আপডেট করা, নতুন প্রযুক্তি শেখা, কাজ করার পদ্ধতিগুলো আধুনিক করা, নতুন কিছু তৈরী করায় প্রতিদিন সময় দিন। এসবই ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নের অংশ। যদি আমরা প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করেও শেখা, অনুশীলন, উদ্ভাবন বা গবেষণায় সময় দিই, তবে এক বছরের শেষে আমরা আর আগের মানুষ থাকব না। সামনের বছর শুরু করব এমন না ভেবে আজ, এখন থেকেই শুরু করুন।

সমাজের ক্ষেত্রেও একই সত্য। পরিবার, বন্ধু বা কমিউনিটির ভেতর যখন আমরা কেউ ভুল করলে তাকে উপহাস করি বা কোনো নতুন চিন্তাকে তুচ্ছ করি, তখন আমরা সকলে মিলে অগ্রগতির পথ আটকে দিই। সমাজকে শিখতে হবে উৎসাহ দিতে, সহযোগিতাকে শক্তি হিসেবে দেখতে। উদ্ভাবনের আলো নিভে যায় তখনই, যখন চারপাশে মানুষ শুধু সন্দেহ আর সমালোচনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। উৎসাহ ও স্বীকৃতি একটি সমাজকে অনেক বেশি দূরে নিয়ে যেতে পারে, এটিই আমাদের শেখা বাকি।

আমরা এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছি কেউ এসে পথ দেখাবে, কেউ শেখাবে, কেউ বিনিয়োগ করবে, কেউ সাহস দেবে। অথচ পৃথিবী এমনভাবে চলে না। যে জাতি শেখার আগেই শিক্ষক খোঁজে, সে কখনো নিজের গল্পের নায়ক হতে পারে না। উন্নতির ইতিহাসে কেবল তাদের নাম লেখা হয়, যারা নিজের হাতে নিজের পথ বানিয়েছে।

ভালোবাসা, সাফল্য, সম্পদ সবকিছুতে সফলতার ভিত্তি একটাই: দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা। আগে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়, তারপর আসে দুনিয়ার স্বীকৃতি। কেউ হাতে ধরে শেখাবে না, তুমি নিজেই শিখবে, বানাবে, ব্যার্থ হবে, আবার শিখবে, শীঘ্রই জিতবে আর একসময় অন্যরা তোমার কাছেই শিখতে চাইবে, তোমার কাছেই স্বীকৃতি চাইবে।

এ দেশের মুক্তির পথ কোনো নতুন স্লোগানে নয়, কোনো বক্তৃতায়ও নয়। সমাধান একটাই, নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়া। অহংকারের জায়গায় আনতে হবে ঐক্য, দোষারোপের জায়গায় আনতে হবে দায়িত্ববোধ আর ভয়কে বদলে ফেলতে হবে সাহসে। ব্যক্তিগত সাফল্য, সামাজিক সহযোগিতা এবং জাতীয় আধুনিকায়ন যখন এক সুতোয় বাঁধা হয়, তখনই প্রকৃত পরিবর্তন জন্ম নেয়।

বাংলাদেশের আর কারও অনুমতির দরকার নেই। দরকার শুধু এমন মানুষ, যারা কাজ শুরু করবে, গড়বে, নতুন প্রযুক্তি আর দক্ষতাকে কাজে লাগাবে এবং বারবার ব্যর্থ হলেও থামবে না, থামাবে না যতক্ষণ না এই জাতির সম্ভাবনা সম্ভবে পরিণত হয়।

দেয়ালের ওপারে এক বাংলাদেশ আছে যেখানে মানুষ একে অপরকে ঠেলে ফেলে না বরং তুলে ধরে। যেখানে সময়ের মূল্য আছে, কথার গুরুত্ব আছে, কাজের মর্যাদা আছে আর প্রযুক্তি মানুষের পরিশ্রমকে শক্তিতে পরিণত করে। সেই বাংলাদেশই গড়তে হবে আমাদের।

মন্তব্য ২ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ১৬ ই নভেম্বর, ২০২৫ রাত ৯:৫৭

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: যেদিন আমাদের চরিত্রের মাঝে
সততা ,দৃঢ়তা এবং মানবিকতা ফিরে
আসবে,
তখনি আমরা একটি সভ্য ও সমৃদ্ধশালী জাতি
হতে পারব ।

২৪ শে নভেম্বর, ২০২৫ রাত ১০:২৬

রৌশন বলেছেন: সেই দিনের অপেক্ষায় বসে না থেকে সেই দিনটি হয়ে যাক আজই, আমাদের চরিত্রের পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থেকে আমার চরিত্রের মাঝে সততা ,দৃঢ়তা এবং মানবিকতা ফিরিয়ে আনি, আমরা সভ্য ও সমৃদ্ধশালী হওয়ার আগে আমি সভ্য ও সমৃদ্ধশালী হই?

সম্ভব?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.