| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
যেভাবে একটি পাঠশালা হয়ে উঠল বিশ্ববিদ্যালয়
সোমবার , ১৯ অক্টোবর ২০১৫ দৈনিক ভোরের পাতা
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে যাত্রা শুরু হয় ব্রাহ্ম স্কুল নামের একটি পাঠশালার। ব্রাহ্ম আন্দোলনের নেতা দীননাথ সেন, অনাথবন্ধু মৌলিক, পার্বতী চরণ রায়, ব্রজসুন্দর মিত্র প্রমুখের ঐকান্তিক চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় এই স্কুল।
উচ্চমানের পার্থিব শিক্ষার সঙ্গে ব্রাহ্ম ধমের্র মূল মতবাদ সম্পর্কে সাধারণ ছাত্রদের জানানোর জন্য আরমানিটোলায় ব্রাহ্ম সমাজের নিজস্ব প্রাঙ্গণে চালু করা হয় এই অবৈতনিক স্কুল। ব্রাহ্ম স্কুলের প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠাতা অনাথবন্ধু মৌলিক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারের তথ্যমতে ১৮৫৮ সালকে সঠিক হিসাবে ধরা হয়।
আর্থিক সঙ্কটের কারণে ১৮৭২ সালে মালিকানা পরিবর্তন করে ব্রাহ্ম স্কুলের ভার তুলে দেওয়া হয়েছিল বালিয়াদির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর হাতে। তখন জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী ব্রাহ্ম স্কুলের নাম পরিবর্তন করে তাঁর বাবা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে ‘জগন্নাথ স্কুল’ নামকরণ করেন। এরপর থেকেই জগন্নাথ স্কুলের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৪ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ এবং ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজের মর্যাদা লাভ করে।
১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ সময় স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অবনমন করা হয় জগন্নাথ কলেজকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার সাজাতে নিজেদের গ্রন্থাগারের ৫০ ভাগ বই দান করে জগন্নাথ কলেজ। নিউমার্কেট এলাকায় জগন্নাথের সম্পত্তির ওপর নির্মিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল।
১৯৪৯ সালে এ কলেজে আবারও স্নাতক পাঠ্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান পুনরায় কো-এডুকেশন চালু করেন। এর আগে ১৯৪২ সালে কো-এডুকেশন চালু হলেও ১৯৪৮ সালে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
১৯৬৮ সালে পাক সামরিক বাহিনী জগন্নাথ কলেজকেন্দ্রিক স্বাধিকার আন্দোলনকে দমানোর জন্য জগন্নাথ কলেজকে সরকারিকরণ করে শুধুমাত্র বিজ্ঞান কলেজে রূপান্তরিত করে। এর বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগকে সরিয়ে মহাখালীতে নতুন জিন্নাহ কলেজ খোলা হয় (বর্তমান তিতুমীর কলেজ)।
১৯৭২ সালে জগন্নাথে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু হয়। সে সময় দেশের অন্য অনেক কলেজের মতো এই কলেজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষা কার্যক্রম চলতে থাকে।
জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে ২০০৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৮ম জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বিল ২০০৫ সংসদে উত্থাপিত হয় এবং ২০ অক্টোবর একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম খানকে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার সময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোড়কে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য এর আইনে ২৭(৪)-এ একটি ধারা সংযুক্ত করা হয়।
যেখানে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরুর পরবর্তী ৫ বছর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ সরকার বহন করবে। পরবর্তীতে নিজস্ব আয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে চলতে হবে। কিন্তু পাঁচ বছর পর প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুমুল আন্দোলনের মুখে ২৭(৪) ধারা বাতিল করে সরকার। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক ড. মীযানুর রহমান। তিনি এখনও দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৬টি অনুষদ, একটি ইনস্টিটিউট, ৩২টি বিভাগ এবং একটি ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ সেন্টার রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় উনিশ হাজার এবং শিক্ষক সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে লোকপ্রশাসন বিভাগ, কলা অনুষদের অধীনে ড্রামা অ্যান্ড মিউজিক ও ফাইন আর্টস বিভাগ চালু করা হয়। ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ এবং শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট চালু করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সবার নজর কেড়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধার অভাব এবং আবাসিক সুবিধা না থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাইকেই পড়তে হয় ভোগান্তির মধ্যে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি হল দখল করে রেখেছে প্রভাবশালী ভূমিদস্যু। ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে দু’একটি হল উদ্ধার হলেও আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতার কারণে আবাসিক অসুবিধা নিরসনের অগ্রগতি নেই। যদিও ইতোমধ্যে একটি ছাত্রী হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে এবং ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে অবকাঠামোগতভাবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
ক্লাসরুম, সেমিনারসহ নানামুখী সঙ্কটের আবর্তে আটকে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রতিষ্ঠার পর এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও চোখে পড়ার মতো কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। অগণিত সমস্যার মধ্যেও আশার আলো হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঝাঁক মেধাবী শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষক। প্রতিনিয়ত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের অটুট বন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট, বালু আর মাটি শিক্ত শ্রদ্ধা, স্নেহ আর ভালোবাসায়। এরই মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন চাকরি ক্ষেত্রে নিজেদের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেছেন।
©somewhere in net ltd.
১|
২০ শে অক্টোবর, ২০১৫ সকাল ৭:২১
বর্নিল বলেছেন: বর্তমান ছাত্র হিসেবে গর্বিত