| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রতিটা যাযাবরের মত কষ্টের বোঝা কাঁধে নিয়ে ঘর হতে বাহির হলাম যদি সুখ পাখিটার দেখা পাই তবে বলব আমার এই ঝোলাটা নিয়ে উদ্ধার কর।
যাত্রার শুরুতে দেখলাম একটি গাছের নিচে ছেঁড়া জামা পরা একটি লোক তৃপ্তির সাথে রুটি খাচ্ছে। তার কাছে গিয়ে বললাম, "ভাই সুখ দেখেছ?" সে বলল, "পাশের মসজিদ থেকে রোজ দুবেলা রুটি খেতে দেয়। এই গাছের নিচে ঘুমাই আর রুটি খাই। এর চেয়ে সুখ আর কিছুই নেই।"
সন্তুষ্ট হলাম না আমি।
আবার যাত্রা শুরু করলাম। রাস্তার পাশে বেশ দামি গাড়িতে হেলান দিয়ে একটা মোটা লোক আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবলাম ওই গাছের নিচে থাকা মানুষটি যদি সুখী হয় তবে এত মহাসুখী হবে। গিয়ে বললাম, "ভাই খুব সুখে আছেন তাই না?" লোকটি এটা শুনে কেঁদে দিল আর বলতে লাগলো, "আর বলনা ভাই, খোঁদার দেয়া সব কিছু আছে, পরিবার বিদেশ থাকে, অভাব নাই। কিন্তু ব্যবসার জন্য এখানে একা থাকতে হয়। ডায়েবেটিস তাই খুব হিসেব করে খেতে হয়। কাজের মানুষ আছে তবুও খুব কষ্ট হয়। আর কিছুই ভালো লাগেনা। এ জন্মে সুখের দেখা পেলামনা।"
আমি নিরাশ হলাম।
এবার দেখলাম এক পার্কের সামনে ফুটপাতে দুজন বৃদ্ধ দাড়িয়ে আছে। গিয়ে বললাম, "রাস্তা পার করে দেব?" একজন হেসে বলল, "না বাবা। ছেলে আসবে নিতে, পার্কে হাটতে এসেছিলাম।" অন্যজনের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলাম, "আপনারা বুঝি একই পরিবারের?" উত্তর পেলামনা বরং দেখলাম চোখের কোণে পানি। প্রথম বৃদ্ধ মানুষটি উত্তরে বলল, "আমরা ছেলেবেলার বন্ধু। একই সময়ে অবসর নিয়েছি। ওর ছেলে আছে কিন্তু থাকতে হয় ওই বৃদ্ধাশ্রমে। বড় দুঃখী। কিন্তু আমি ছেলেকে নিয়ে বেশ সুখী। এই পার্কে দুজন রোজ দেখা করি।"
অবাক হলাম দুজনে জীবনের একই মোড়ে কিন্তু একজন সুখ আরেকজন দুঃখ।
সেই পার্কেই এক দম্পতির দেখা পেলাম। মহিলাটি দাড়িয়ে ছিল, স্বামীটি পাশে হুইল চেয়ারে। জানতে চাইলাম, "এই যে তোমার পা নেই হাটতে পারনা তাই বুঝি খুব দুঃখ।" আমার কথায় দুজনেই হেসে দিল। লোকটি বলল, "এটা প্রতিবন্ধকতা, দুঃখ কেন? একটি সুখের সংসার আছে, একটি মেয়ে আছে। পাশের কলোনিতে থাকি। রোজ বিকেলে পার্কে দুজন একসাথে বেড়াতে আসি। আমি সুখেই আছি।"
আমি হতবাক হলাম।
আবার যাত্রা শুরু। সামনে একটি অনাথ আশ্রম চোখে পড়ল। আশ্রমের একটি কিশোর কে ডেকে প্রশ্ন করলাম, "বাবা-মায়ের অভাব খুব কষ্ট দেয়, তাই না?" কিশোরটি বলল, "খুব কষ্ট লাগে, দুঃখ পাই। তবে আমাদের দিদিমণি মায়ের মত। অনেক আদর করে। আর এখানে আমার মত সবাই একসাথে থাকি, একসাথে পড়াশুনা-খেলাধুলা করি, অনেক আনন্দ করি।"
মনে হল সুখ-দুঃখ এখানে মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ।
এবার চোখে পড়ল, এক বেঞ্চিতে একটি ছেলে আর দুটি মেয়ে বসে, একটি মেয়ে কাঁদছে। আমি মেয়েটির কাছে জানতে চাইলাম কেন কাঁদছে। মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, "'ও' আমাকে বলেছিল ভালবাসি। কিন্তু সুন্দরী কাউকে পেয়ে বলছে আমি টাকার লোভী, ওকে ভালবাসিনি। এ আমার কত বড় লজ্জা। ঘরে অসুস্থ বাবা তাই মরতেও আমার বাঁধা।"
ছেলেটিকে রেগে বললাম, "এক চড়ে তোমার দাঁত ফেলে দেয়া উচিৎ।" অন্য মেয়েটি বাঁধা দিয়ে বলল, "আরে করছেন কি? আমরা মেয়েটির বন্ধু, সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। মেয়েটি যার কথা বলছে এ সেই ছেলে নয়। এ হল আমার ভালবাসা। আমার জীবনের সুখ। এক হই বা না হই সারাজীবন পরস্পরকে ভালবাসব।"
অপমান নিয়ে বাঁচা এক যন্ত্রণা। বুঝলাম ভালবাসা হয়তো সুখ আনে নয় দুঃখ, তাতে কি যায় আসে একসাথে থাকুক বা আলাদা।
নদীর উপর একটি ব্রিজ দিয়ে হাঁটছিলাম। দেখতে পেলাম একটি যুবক অন্য একটি যুবকের হাত ধরে টানছে। কি হচ্ছে জানার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। জানলাম ওরা বন্ধু। একজন আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে আর অন্য বন্ধু তাতে বাঁধা দিচ্ছে। প্রথম যুবকটি বলল, "আমরা আজ একসাথে ইন্টার্ভিউ দিয়েছি একই ফার্মে। আমাদের পড়াশুনা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে আর রেজাল্টও এক। কিন্তু আমি চাকরিটা পেয়েছি, মামা ফোন দিয়েছিল। ও পায়নি বলে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে।"
দ্বিতীয় যুবকটি কে প্রশ্ন করলাম, "তুমি কি শারীরিক অক্ষম?" উত্তর দিল, "না।" বললাম, "তবে বোধয় অনাথ।" উত্তর দিল, "না।" এবার বললাম, "বুঝেছি, ভালবাসার মানুষ নেই, একা।" উত্তর দিল, "আছে।" বললাম, "বোধয় চাকরী নেই বলে মেয়েটি তোমার কাছ থেকে দূরে।" উত্তর দিল, "না, সে না খেতে পেলেও আমাকে ছেড়ে কোন দিনও যাবেনা।" এবার রেগে বললাম, "এখন আমার ইচ্ছে হচ্ছে তোমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে। আত্মহত্যা কেন করছ?" উত্তরে বলল, "৫বছর ধরে ঘুরছি। টিউশনি আর কত! বাবার কাছে হাত পাততে, বন্ধুদের কাছে ধার নিতে লজ্জা হয়। শিক্ষিত যুবক, নিম্নশ্রেণীর কাজ পারবনা করতে। আর ওই মেয়েটিকে কেন কষ্ট দেব আমি। আত্মহত্যা ছাড়া উপায় কি??"
এবার আমার মায়া হল। মনে পড়ল দেখা হওয়া প্রথম ও দ্বিতীয় লোক দুটির কথা। একজন রুটিতে খুশি আর অন্যজন অভাব নেই তবুও দুঃখী। ছেলেটির সব আছে তবু একটা চাকরির খোঁজ কত বড় দুখের কারণ।
হাঁটেতে হাঁটেতে ভাবছিলাম রংধনুর শুধু তিনটি রং কিন্তু দৃষ্টিকে যখন নাড়া দেয় তখন আমরা সাতটি রং দেখতে পাই। সুখ-দুঃখের রং তেমনি জীবন কে যখন নাড়া দেয় তখন তা বিভিন্ন রঙে প্রকাশিত হয়। কার দুঃখ কত ভারী আর কার সুখ কত আনন্দের তা পরিমাপের মাপকাঠি বিধাতা আমাদের দেননি শুধু অনুধাবন করার বোধ দিয়েছেন। তবে আমি কোন সুখ পাখির সন্ধান করছি! এবার আমি মোড় ঘুরলাম আর বাড়ির দিকে রওনা হলাম তখন আমার সেই গানের কথাগুলো মনে পড়ছিল-
আমার সুখের ঘরে দিয়ে তালা সুখ পিয়াসে মরি
নিজের সাথে খেলি নিজেই নিঠুর লুকোচুরি.........................................।।
©somewhere in net ltd.