| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |

লোকমুখে নিজ এলাকার এক কামিল মুর্শিদের প্রশংসা শুনে অহংকারী যুবকটি গেল তাঁর নিকট থেকে দীক্ষা নিতে।
– আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুম সালাম। বলো, কী উদ্দেশ্যে এসেছো?
– লোকমুখে শুনেছি আপনি মানুষদের আল্লাহর সন্ধান দেন, আমি সেই উদ্দেশ্যে এসেছি।
– হুম। তবে একটা শর্ত আছে।
– কী শর্ত?
– জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিসকে আমার সামনে উপস্থিত করতে হবে। আনতে পারলে তোমাকে দীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করতে পারি।
‘নিকৃষ্ট জিনিস’! যুবক মনে মনে খুশি হলো। এ আর এমন কী কঠিন কাজ। জগৎ জুড়ে কতই না নিকৃষ্ট জিনিস পড়ে আছে, একটা নিয়ে আসলেই হচ্ছে। যুবক সম্মত হলো।
রাতে বিছানায় শুয়ে যুবক চিন্তা করতে লাগলো পৃথিবীতে সবচাইতে নিকৃষ্ট বস্তু কোনটি। অনেক ভেবেচিন্তে সে বের করল কুকুর-ই একমাত্র নিকৃষ্ট কারণ হাদিসে কালো কুকুরকে হত্যা করতে নির্দেশনা আছে।
ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে যুবক বেরিয়ে পড়ল কালো কুকুরের সন্ধানে এবং পেয়েও গেল। নিজের গলার তোয়ালে দিয়ে কুকুরটির গলায় বেঁধে তাকে নিয়ে চলল কামিল মুর্শিদের দরবারে।
– এত জামাই আদর করে আমাকে কোথায় নেয়া হচ্ছে?
কুকুরটির মুখে মানুষের মতো কথা শুনে যুবকটি হতবাক।
– তুমি কথাও বলতে পারো?
– আল্লাহ চাইলে সব পারি। বিষয় কী বল।
– তোমাকে একজন কামিল মুর্শিদের প্রয়োজন যেহেতু তুমি জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট।
– কোন দৃষ্টিকোণ থেকে আমি নিকৃষ্ট?
– তোমাকে হত্যা করার ব্যাপারে হাদিসে নির্দেশনা আছে।
– যদি হত্যাই করতে হয় তাহলে আমাদের সৃষ্টি করল কেন? হাদিসে কালো কুকুর বলতে কি রক্ত মাংসের কুকুরকে বুঝিয়েছে না অন্য কোন কিছু বুঝিয়েছে তোমরা কি সেটা খতিয়ে দেখেছিলে? কুরআনে আছে আসহাবে কাহাফের যুবকদের সঙ্গে একটি কুকুরও ছিল। অন্য কোন প্রাণীও তো থাকতে পারত। নিকৃষ্ট হলে কুকুরের কথা কুরআনে আসলো কেন? আর আমাদের প্রভুভক্তের খ্যাতি জগৎজোড়া। সামান্য কিছু খাবার দিলেই আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকি। সে বিপদে পড়লে তাকে উদ্ধার করার জন্য নিজের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে দিই। এত কিছুর পরও বলবে আমরা নিকৃষ্ট?
যুবকটি হতাশ হয়ে কুকুরটিকে ছেড়ে দিল।
রাতে বিছানায় শুয়ে যুবক আবার গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। বিষয়টিকে যত সহজ মনে করেছিল দেখা যাচ্ছে তত সহজ নয়। সবচাইতে নিকৃষ্ট জিনিস আর কী হতে পারে? পেয়েছি, শূকর। কুরআনে শূকর হারাম করা হয়েছে।
ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে যুবক বেরিয়ে পড়ল শূকরের সন্ধানে এবং পেয়েও গেল। নিজের গলার তোয়ালে দিয়ে শূকরটির গলায় বেঁধে তাকে নিয়ে চলল কামিল মুর্শিদের দরবারে।
– এত জামাই আদর করে আমাকে কোথায় নেয়া হচ্ছে?
শূকরটির মুখে মানুষের মতো কথা শুনে যুবকটি হতবাক।
– তুমিও কথা বলতে পারো?
– আল্লাহ চাইলে সব পারি। বিষয় কী বল।
– তোমাকে একজন কামিল মুর্শিদের প্রয়োজন যেহেতু তুমি জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট।
– কোন দৃষ্টিকোণ থেকে আমি নিকৃষ্ট?
– কুরআনে মহান আল্লাহতালা তোমাকে হারাম ঘোষণা করেছেন।
– আচ্ছা তোমাকে কিছু প্রশ্ন করি। আমি কী?
– তুমি একটি প্রাণী।
– আমার নাম?
– শূকর।
– নামটি কারা রেখেছে? আল্লাহ না তোমরা?
এবার যুবকটি একটু চিন্তিত হল। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে বলল,
– হ্যাঁ, মানুষই রেখেছে তোমার নামটি। কিন্তু কুরআনে তো তোমাকে খিঞ্জির বলা হয়েছে।
– কুরআন আগে এসেছে না আরববাসীরা আগে?
– অবশ্যই আরবেরা।
– তাহলে খিঞ্জির নামটি আরবের লোকেরাই রেখেছে।
– সেটাইতো হওয়ার কথা।
– আমি একটি প্রাণী, বাংলায় তোমরা বলো শূকর, আরবিতে খিঞ্জির আর ইংরেজিতে সোয়াইন। আল্লাহর কাছেও আমার একটি নাম আছে যা তোমরা জানো না। আমাদের উৎপত্তি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে এবং এ অঞ্চলের লোকেরা আগে আমাদের মাংস ভক্ষণ করত কারন আমাদের মাংস অনেক সুস্বাদু। গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়াদের মত আমরা ঘাস খাই না। খোঁজ নিয়ে দেখো আমাদের খাদ্য তালিকা ব্যয়বহুল। মধ্যপ্রাচ্য আগে সবুজ ছিল এবং এর আবহাওয়াও আমাদের উপযোগী ছিল। কিন্তু ক্রমে ক্রমে মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার কারণে আমরা অন্যত্র স্থানান্তরিত হই বিশেষ করে ঠান্ডা অঞ্চল সমূহে। সেখানকার লোকজন এখনো আমাদের মাংস মজা করে ভক্ষণ করে, তাদের তো কোন অসুবিধা হয় না। সাপের মতো আমরা তো কাউকে ছোবল মারি না, বাঘ-ভাল্লুকের মতো কাউকে আঁচড়ও দিই না। তাহলে কোন কারণে আমাদের হারাম করা হয়েছে? কুরআনে খিঞ্জির বলতে কি আমাদেরকেই বুঝিয়েছে না অন্য কোন কিছু ইঙ্গিত করেছে ভালো করে গবেষণা কর। আমরা যদি নিকৃষ্টই হতাম তবে তো কেউ আমাদের মজা করে খেত না।
যুবকটি হতাশ হয়ে শূকরটিকে ছেড়ে দিল।
পরেরদিন সন্ধ্যায় কেউ না দেখে মতো একটি গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে যুবকটি গেল একটি মদের দোকানে। মদের দোকানী যুবকটিকে আগে থেকেই চিনতো।
– তুমি এখানে? শোনো, মদ বেচতে পারলে আমার লাভ কিন্তু তুমি কার পাল্লায় পড়েছ?
– বিশ্বাস করুন আমি কারো পাল্লায় পড়িনি, এটা আমি নিজের জন্যেও কিনছি না।
– তার মানে তোমাকে কেউ ব্যবহার করছে? তুমি কার জন্যে নিচ্ছো এটা?
– একজন কামিল মুর্শিদ আনতে বলেছেন।
– কামিল মুর্শিদ!
দোকানী হতবাক।
– এই তুমি আমার সাথে জোচ্চুরি করো না। কামিল মুর্শিদরা কখনো মদ পান করেন না। তুমি সত্যি করে বলতো আসলে ঘটনা কী।
– কেউ দেখে ফেলবে এই ভয়ে আমি কথাবার্তা গুলিয়ে ফেলছি। আসলে কামিল মুর্শিদ আমাকে জগতের সবচাইতে নিকৃষ্ট বস্তু আনতে বলেছেন। যেহেতু মদ খাওয়া হারাম তাই আমার কাছে মনে হলো এটাই জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস।
– বুঝেছি, পাগলেই পাগল চিনে। কোনটা দেবো, হালকা না কড়া।
ভালো করে গামছা পেঁচিয়ে মদের বোতলটিকে আড়াল করে যুবক ছুটলো কামিল মুর্শিদের দরবারে।
– আমাকে এভাবে কোথায় নিচ্ছো?
– কে কথা বলে?
যুবক হকচকিয়ে গেল।
– সবাই তো আমাকে নিয়ে পান করে। তুমি এত সংগোপনে আমায় নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?
– তুমিও কথা বলতে পারো? তোমাকে একজন কামিল মুর্শিদের প্রয়োজন যেহেতু তুমি জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস। তোমাকে কুরআনে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
– আমাকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে! তাও আবার কুরআনে! এই তুমি ভালো করে কুরআন পড়ে বলছো তো?
– কুরআনের বেশ কিছু স্থানে তোমার হারাম হওয়ার বিষয়ে আয়াত আছে।
– ওগুলো নেশা সম্পর্কিত। নেশা করা অবশ্যই হারাম। মদ কেন হারাম হতে যাবে? হ্যাঁ, মদ যদি নেশার উদ্দেশ্যে পান করো তবে সেটা হারাম। তোমাদের তো নেশার শেষ নেই- খাওয়ার নেশা, অর্থের নেশা, যৌনতার নেশা ইত্যাদি আরো কত কি নেশা আছে সেসব বলছো না কেন। মদ যে উপকারী সেটা তো কুরআনের সূরা নহলে আছে। সেখানে আরো আছে যে খেজুর আর আঙুরফল আমাদের উৎস এবং দুটোই হালাল। হালাল জিনিস দিয়ে তৈরি পানীয় কেন হারাম হতে যাবে? সুদও তো হারাম। উদরে সুদের দানা পড়েনি এমন লোক পৃথিবীতে কয়টা আছে আমাকে দেখাও তো।
যুবক পড়ল মহা ফাঁপরে। মদের বোতল ফেলে সে বাড়ির পথ ধরল।
এবার যুবকটি বের হলো গভীর রাতে, নাকে রুমাল চেপে। হাতে তার বালতি এবং সেখানে মনুষ্য মলমূত্র। যুবকটিকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে। সে যেন তার কাঙ্খিত পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বস্তু পেয়ে গেছে। তবে কিছুক্ষণ পরপর বালতি থেকে আসা মলমূত্রের উৎকট গন্ধে তার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হওয়ার উপক্রম।
– এতো যত্ন করে আমাদের কোথায় নেয়া হচ্ছে?
– ওমা তোমরাও কি কথা বলতে পারো?
– চেয়েছিলাম চুপচাপ তামাশা দেখব কিন্তু কৌতুহল চেপে রাখতে পারলাম না। বলো, কোথায় নিচ্ছ আমাদের?
– একজন কামিল মুর্শিদ আমাকে জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস আনতে বলেছেন।
– নিকৃষ্ট জিনিস! তাই বলে আমাদের!
– হুম। কেন? কোন আপত্তি?
– না.. মানে চিন্তা করছি আমরা কীভাবে নিকৃষ্ট হলাম? তোমাদের পেটে প্রবেশের আগে আমরা তো উৎকৃষ্ট ছিলাম। ছিলাম কোরমা পোলাও বিরিয়ানি ইত্যাদি। তোমাদের পেটে ঢোকার পরেই না আমার নিকৃষ্ট হলাম। উৎকৃষ্ট জিনিসকে নিকৃষ্ট বানিয়েছো তো তোমরাই। তোমরাই সেই কারিগর। এখানে আসলে দোষী কে? আমরা না তোমরা?
রাগে ক্ষোভে যুবকটি বালতি ফেলে কামিল মুর্শিদের দরবারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল।
– আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুম সালাম। তুমি এসেছো? যেটা আনতে বলেছিলাম এনেছো?
– জ্বী এনেছি। এই যে আমি, আমিই পৃথিবীর সবচেয়ে…
এ বলে যুবকটি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
©somewhere in net ltd.