| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
(সত্যজিৎ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও ক্ষমা প্রার্থনা পুর্বক)
এক,
লালমোহন বাবু যে সক্কাল সক্কাল বাসায় হানা দেবেন তা জানতাম। কাল রাতের খবরে যেটুকু শুনেছি তাতেই সন্দেহ হয়েছিল কেসটা ফেলুদা নেবে।
জটায়ু চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, বুঝলেন মশাই,নতুন বইটা মানে “বেআক্কেলে বরিশেলে” ভালই চলছে। এখনি আসতাম না। শুধু পরপর এতগুলো কম বয়সী ছেলে খুন হলো দেখে চলে এলুম। সংবরণ করতে পারলুম না।তিন দিনে সাত খুন ! ভাবা যায় ?
ফেলুদা শুধু বলল, আপনার গাড়িটা পাওয়া যাবে?
-স্বাচ্ছন্দ্যে!
-একবার কুষ্টিয়ার ওদিকে যাব ভাবছি। ওখানে দুটো ছেলে খুন হয়েছে। ওরা দুই ভাই। বাকি পাঁচ জনের বাড়ী রংপুরের পীরগাছা, ঝিনাইদহের কোঁটচাদপুর, ময়মনসিংহের নান্দাইল, সাতক্ষীরার হাড়িয়াভাংগা আর নড়াইলের লোহাগড়া।
লালমোহনবাবু ত্রিশ সেকেন্ড চোখ বড় বড় করে থেকে বললেন, আপনার জিবহার জয় হোক! এতগুলো জায়গার নাম ব্রেক না কষে একধারসে বলে গেলেন কীভাবে??
দশটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে গেলাম।
দুই,
ছেলে দুটোর বাড়িতে কান্নার রোল। ফেলুদা ছেলে দুটোর পড়ার ঘরে ঘোরাঘুরি করে খান তিনেক ডায়রী পাওয়া গেল ।ওদের বাবার অনুমতি নিয়ে সেগুলো হস্তগত করলো ফেলুদা । আসার সময় শিলাইদহের রবীন্দ্রকুঠী দেখে আমরা চলে আসলাম ।
জটায়ু সারা রাস্তা গুম মেরে ছিলেন।ফেলুদাও চুপ। “কিছু পেলে?” -আমি জিজ্ঞাসা করেও উত্তর পেলাম না । ফেলুদা নির্বিকার চারমিনার ধরিয়ে টেনে যাচ্ছে।
দৈনিক সোনার বাংলা একটা রিপোর্ট ছেপেছে । হুবহু তুলে দিলাম খানিকটা –
সাত শিক্ষার্থী খুনের ঘটনার কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ । জানা গেছে এরা সবাই গত ২০১৪ সালের এইস এস সি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ প্রাপ্ত ।এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আজগর আলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিমাই ভট্টাচার্্য আলাদা ভাবে শোক প্রকাশ করেছেন ।
ব্যাস এটুকুই ।
তিন,
বাড়ি এসে সারা রাত ফেলুদা ডায়রি পড়েছে। সকালের দিকে একটা ফোন পেয়ে কোথায় যেন বেরিয়েছে। চিরকুট রেখে গেছে। তাতে লেখা, বিকেলের মধ্যে ফিরছি।রংপুরের ট্রেনে সন্ধ্যার দুটো টিকিট কেটে রাখিস।
বিকেলে ফেলুদা হাজির। বলল, চল বেরোতে হবে।
ট্রেনে চেপে পরদিন রংপুর পৌঁছে খুন হওয়া ছেলেটার বাড়ি খুঁজে বের করা হল।নাম রায়হান হাসান। ছেলেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য চান্স পেয়েছে । শুনে খুব খারাপ লাগলো। বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি । ওখান থেকে বাড়ি ফিরে এসে একটাই চিন্তা হতে লাগলো, ফেলুদা কি কিছু ধরতে পেরেছে? কথাটা ফেলুদাকে বলতেই ফেলুদা একটা প্রিন্টেড কাগজ ধরিয়ে দিলো ।
দেখি, তাতে খুলনার KUET (KHULNA UNIVERSITY OF SCIENCE AND TECHNOLOGY) এর কম্পিউটার সাইন্স ইঞ্জিনিয়ারিং(CSE) বিভাগের ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়া । এর মধ্যে রংপুরের রায়হানের অবস্থান খুঁজে পেলাম ।ফার্স্ট মেরিট লিস্টে ৪৯ সিরিয়াল। ছেলেটার জন্য মায়া হল, দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও পড়তে পারল না বেচারা। দক্ষিন বঙ্গে কুয়েটের CSEই সবচে ভাল বলে জানতাম। তাছাড়া প্রতিযোগীতার বাজারে চান্স পাওয়াটাও রীতিমত কপালের ব্যাপার।
চার,
পরদিন সকালে দুধলাল সুইটস এর কালোজাম মিষ্টি নিয়ে লালমোহনবাবু হাজির।
ওঁর নাকি এই মিষ্টি ভাল লাগে। কয়েকদিন ধরে বলছেন, আনবেন। আজ চলে এসেছে। চেখে দেখি মোক্ষম জিনিস। জটায়ু নিজেই একসাথে দুটো কালোজাম মুখে পুরে আরামে চোখ বুজে রইলেন। ফেলুদা খেয়ে বলল, নট ব্যাড।
কেসের কি অগ্রগতি মশাই?-জটায়ুর প্রশ্ন।
ফেলুদা বলল, ছেঁড়া সুতো গুলো প্রায় জুড়ে গেছে । পুরোটা জুড়ে গেলে তবেই বলতে পারবো রহস্য টা কি। আজ একবার বেরোতে হবে । তোপসে, সাইকোপ্যাথ বানান পারিস ?
আমি বললাম, p s y c h o p a t h .
ফেলুদা বলল, গুড। সাইকোপ্যাথ এ যেমন p উহ্য থাকে, তেমনি এই কেসে একজন উহ্য রয়েছে। তার সন্ধান মিললে তবেই রহস্যটার জট খুলবে ।চল, উহ্য মানুষটার সাথে দেখা করে আসি। তোপসে, তুই রেজাল্টশীট টা সঙ্গে নে।
জটায়ুর গাড়ি ছাড়া আমাদের গতি নেই। মাগুরা পৌছালাম দুপুর নাগাদ। সেখানে গিয়ে সোজা থানায়। থানার ওসি মাহতাব খান ফেলুদার বন্ধু মানুষ। চা টা খেয়ে ওসিকে দিয়ে সাকিব নামের এক ছেলের খোঁজখবর করা হলো। ঘন্টাখানেক বাদে সাকিবকে পাওয়া গেল বাড়িতে। ঘিজিমিজি মার্কা স্কেচ করতে ব্যাস্ত সে ।তার শখ নাকি ছবি আঁকা। আলিশান বাড়ি ওদের। সাকিবের মা নেই। বাবার সাথে কথা হলো।
ফেলুদা ওসি সাহেব কে বলল, সাকিবের নিরাপত্তার জন্য যেন দুজন পুলিশ দেওয়া হয়। কারন, নেক্সট ভিক্টিম নাকি সে-ই হতে পারে।
বাড়ি ফেরার পথে ফেলুদা জানালো, সাকিব নাকি কুয়েটের এডমিশন টেস্টে CSE তে ৫৫ তম হয়েছে।
পাঁচ,
এখনো পর্যন্ত ফেলুদা ওই রেজাল্ট শিটটা নিয়ে পড়ে আছে। জটায়ু বাড়ি চলে গেছেন। পরদিন সকালে মাগুরা থানা থেকে ফোন আসলো, সাকিব নাকি আত্মহত্যা করেছে! লাল মোহন বাবুকে খবর দেয়া হয়েছে। উনি আসলেই মাগুরা যেতে হবে।
মাগুরা গিয়ে প্রথমেই পুলিশের ভীড় ঠেলে আমরা ঢুকলাম সাকিবের ঘরে। ওসি মাহতাব আমাদেরকে সুইসাইড নোট টা দেখালেন। তাতে সুন্দর করে লেখা, “আমার মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী।”
ফেলুদা ঘেটে ঘুটে সাকিবের একটা পকেট ডায়রী পেলো। কেন যে সেটা চোরের মত কাউকে না বলে পকেটস্থ করলো তা বুঝলাম্ না।
বাড়ি ফিরে চৌযবৃত্তির কারণ জিগেস করলাম ফেলুদাকে। ফেলুদা বলল, যা ভাবছিলাম , তাই। কেস মীমাংসিত।
আমি বলে উঠলাম, সাকিবই কি মার্ডারার?
ফেলুদা কিছু না বলে ঘনঘন মাথা নাড়তে লাগলো। সেই মাথা নাড়ানোর মানে “হ্যাঁ” নাকি “না” সেটা বোঝা দায়।
জটায়ু হা করে চেয়ে আছেন। আমিও উদগ্রীব। শেষমেশ ফেলুদা হেঁয়ালি ভাংলো- রেজাল্টশীট টা ভালো করে দ্যাখ, কুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্সে সীট আছে ৫০ টা। সাকিব ৫৬ তম । খুন হওয়া ছেলেগুলোর অবস্থান ৪৯-৫৫ পর্যন্ত। ছেলেগুলোকে সরাতে পারলে সাকিব ভর্তি হতে পারতো।
জটায়ু বলল, তাই বলে খুন? তাছাড়া এতগুলো ছেলের ঠিকানা সে পেলো কী করে মশাই?
-কুয়েটের ওয়েবসাইটে। সেখানে বিস্তারিত ঠিকানা দেওয়া আছে । পকেট ডায়রীতে সবই লেখা আছে। আর তোপসে খেয়াল করেছিস? সাকিবের ড্রয়ারে কিছু ওষুধ ছিল। ওগুলো ঘুমের ওষুধ। সাকিব আসলে একজন সাইকোপ্যাথ।ওর পকেট ডায়রি পড়ে আমার তাইই মনে হয়েছে।
আমি বললাম, তাহলে ও নিজেই কেন মরতে গেল?
-ঐ যে মানসিক রোগ! সাইকোপ্যাথ দের চিন্তাভাবনা উল্টে পাল্টে যায়। হয়তো মানসিক অশান্তিতেই এই কাজ করেছে ছেলেটা।
আমাদের আর কিছু জানার ছিল না। এই এডমিশন টেস্ট গুলো দিন কে দিন অমানবিক টেস্টে পরিণত হচ্ছে। সাইকোপ্যাথ না হয়ে উপায় কি!
©somewhere in net ltd.