নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শ্যামল_ছায়া

আমি কেউ না, কিসু না, কারো না......।

শ্যামল_ছায়া › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভয় পেয়েছে রফিক

০৮ ই মে, ২০১৩ রাত ৮:০০

রফিক আজ বাড়ি ফিরছে। প্রায় ১০ বছর পর সে বড়ির পথটি ধরলো। পাঞ্জাবির বাম পাশে শুকনো রক্তের কালসিটে রড় একটা ছোপ পড়ে আছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। ট্রেনের জানালার পাশে বসে উদাস দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে থাকলেও তার চোখে ভাসছে গতরাতের দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের লেলিহান শিখা, হাজারো মানুষের ছোটাছুটি, ইট-পাটকেলে ঢাকা রাজপথ আর অন্ধকারের মাঝে চোখ ঝাপসা করে দেবার মত বিষাক্ত ধোঁয়া। রেলের ঝম-ঝম দুলুলির শব্দের বদলে সে শুনে চলেছে হাজারো মানুষের আত©নাদ, কান্না আর চিrকার আর শেষ না হওয়া কথা নারায়ে তাকবীর....। ভয় পেয়েছে রফিক। খুব ভয় পেয়েছে সে।



রফিকের বয়স ১৪। তার বয়স যখন দু’বছর, তখন তার বাবা মারা যায়। তার মামারা তাকে একটি এতিমখানায় দিয়ে তার মাকে পুনরায় বিয়ে দিয়ে দেয়। গ্রামে তার বাবার কুড়েঘরখানা তখন থেকেই পড়ে আছে।মাদ্রসায় আরবী পড়ে, কোরআন হাদীস মুখস্ত করে আলেম হবার সপ্নে বিভোর ছিলো রফিক। ইসলাম মানে শান্তি। সেই শান্তির খোঁজ করতে করতে কখন যে ১২টা বছর কেটে গেলো বুঝতেই পারলো না। সকালে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে, ঘুম ঘুম চোখে না বুঝে মাথা দুলিয়ে হদীস মুখস্ত করতো সে। সকালের নাস্তা খেয়ে মাদ্রসার জন্য আর সবার সাথে বেরিয়ে পড়তো। প্রথমদিকে সাহায্যের নামে এই ভিক্ষাবৃত্তি ভলো লগতো না তার, কিন্তু ক্রমে ক্রমেই তা গা সওয়া হয়ে গেলো। যে সাহায্য পাওয়া যেতো তার অর্ধেকটা সে আর তার সাথীরা পেতো, আর বাকি অর্ধেকটা হুজুরকে দিতে হতো। হুজুরটা বড় বজ্জাত; শরীরের যেখানে সেখানে হাত দিয়ে টাকা সাচ© করতো, কোনো শরমিন্দা নাই। কিছুদিন হলো সিগারেট খাওয়া শিখেছে সে। বন্ধুরা মিলে মাথার টুপিটা পকেটে গুঁজে সিগারেট কিনে নিয়ে এক টিকেটে দুই ছবি দেখতে হলে ঢুকে যেতো ভর দুপুরে।বড় পর্দায় নারীর শরীর দেখলে শিহরন জাগতো তার। রাস্তায় সাহায্য চাওয়ার সময় মেয়েদের দেখা বুকের সাথে প©দায় দেখা বুক মিলাতে মিলাতে কখনযে বেলা গড়িয়ে বিকাল হয়ে যেতো ঠিক নেই। তাড়াতাড়ি করে মাদ্রাসায় এসে অজু সেরে নামাজ পড়তে যেতো বন্ধুরা মিলে। ইদানিং সবার ঠিকমতো অজু থাকছে না, প্রায়ই ভেঙ্গে যাচ্ছে। পাঁচবার নামাজের আগে তাই অজু সেরে নিতে হচ্ছে।



দুপুরের সিনেমা যেমন ভলো লাগতো ঠিক তেমনি ভালো লাগতো রাতের ওয়াজ। হুজুরেরা মেয়েদের কোন কোন জিনিস ভালো, কোন কোন জিনিস খারাপ তা এমন ভাবে বলে যেনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তবে বেশ কিছুদিন হলো ওয়াজ শুনতে তার ভলো লাগছে না। কোথায় কে যেনো আল্লহপাককে নিয়ে বাজে কথা বলেছে, সারা ওয়াজ জুড়ে তারই গীবত গেয়ে যাচ্ছেন হুজুরেরা। আল্লাহ পাকের নামে বাজে কথা বলা বা কটুক্তি করা আসলেই গুনাহর কাজ। কিন্তু করলো টা কে? তাকে হাতের কাছে পেলে কোরবানীর পশু জবাই করার মত জবাই করে ফেলতো রফিক। ব্লগ নামে কি যেন কম্পিউটার, তার মধ্যে এসব হচ্ছে। ইস্ মাদ্রাসায় যদি কম্পিউটার থাকতো, তবে সে দেখতে পারতো। অবশ্য হুজুররা যে দেখেছে তাও নয়, তারাও শুনেছে। তা সে যাই হোক, যা রটে, তার কিছুটা তো অবশ্যই ঘটে। নিশ্চয়ই কেউ না কেউ করেছে। তার জন্য ব্যবস্থা নিতে আজ সারা মুসলিম জাতি প্রস্তুত। তাকে ধরার জন্য ঢাকায় যেতে হবে। হুজুর বলেছেন, যে সবাই মিলে তাকে ধরতে হবে। সে নাকি ইবলিশের মতই ক্ষমতাবান। সে সরকারের মাথায় চেপে দেশটাই নাকি ধ্বংস করে দিচ্ছে। কিন্তু কই? এই কদিন তো তারাই পুলিশদের ইট মারছে। তাদের সামনে পুলিশতো দাড়াতেই পারছে না। মানুষ মারা গুনাহর কাজ, পুলিশ মারাও কি গুনাহ কাজ? মনে হয় না। গুনাহর কাজ হলে হুজুর বলতেন। তিনি তা বলেননি, বরং পুলিশের মাথায় যে ইবলিশ ভর করেছে তাকে ছাড়াতে বলেছেন। এবার ঢাকায় গিয়ে সরকারের ইবলিশ ছাড়ানো হবে। হুজুর বলেছেন বাসে করে ঢাকা যেতে হবে। কোন টাকা পয়সা লাগবে না। দুপুরে গরুর গোশতের বিরিয়ানী ফ্রি, সাথে প্লাস্টিকের পানি তো আছেই। আর ঢাকা থেকে ফেরার পর সবাইকে তিনি নতুন পাজ্ঞাবী দিবেন। এই সুযোগ কি ছাড়া যায়? কেমন যেন ঈদ ঈদ লাগছে।



রাতে হুজুর সবাইকে ডেকে নিয়ে বললেন, সকালে নামাজ পড়েই রওনা হতে হবে। পথে যদি কোন বিপত্তি আসে তা সরিয়ে দিতে হবে। যে পথে আমরা যাচ্ছি তা ইসলামের পথ। তাই ইবলিশ বাধা দিবেই। এই পথে মারা গেলে শহীদ। বেহেস্তের দরজা তার জন্য খোলা; সাথে সত্তুরটা হূর ফ্রি। আর যদি কেউ আহত হয় তবে সে হবে গাজী। তার সব গুনাই মাফ হয়ে যাবে। কথাগুলো শুনে একটু একটু ভয় পেল রফিক। ঢাকা যেতে রাস্তা খারাপ শুনেছে সে কিন্তু কেউ বাধা দিবে তা তো আগে কেউ বলেনি। অবশ্য বাধা দিলে যদি তাদের হাটানো যায় তবে তো সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। এক টিকিটে দুই ছবি দেখে যেসব নাপাক কাজ করেছে তা সব মাফ হয়ে যাবে, ভেবেই ভাল লাগল তার। সাথে গরুর বিরিয়ানীর কথা মোটেও ভুলতে পারছেনা সে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে দুচোখের পাতা এক হয়ে গেল সে জানে না।



সকালে তাবলীগে যাওয়ার মতই সবাই মিলে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। পিঠে তাবলীগের ঝোলা আর হাতে আড়াই হাতই মূলি বাঁশ। এই বাঁশ কি কাজে লাগবে তা সে জানে না। সারাদিন প্রচন্ড গরমে জান বেরিয়ে যাওয়ার দশা। পথে কোন ঝামেলা হয়নি, শুধু নাস্তা নেওয়ার সময় কাড়াকাড়ি করতে দিয়ে পায়ের চটিটা খুইয়েছে। দুপুরে বিরিয়ানীর প্যাকেট পায়নি, তবে অনেক রকম নাম না জানা শুকনা খাবার পেয়েছে। কিন্তু যে কারণে আসা সেই ব্লগ কই? সেই বড় কম্পিউটারটা কই। ব্লগার কি ছেলে না মেয়ে তা দেখার খুব শখ ছিল তার। কিন্তু তার দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। হুজুররাও কেমন যেন হয়ে গেছে। ওয়াজ বাদ দিয়ে রাজনীতিবিদদের মত ভাষণ শুরু করেছে। ভাষণ শুনতে ভাল লাগে না তার। বিকালে মঞ্চ থেকে ঘোষণা এল আজ ঢাকায় থেকে যেতে হবে। এমনতো কথা ছিল না। ঠিক করলো সবাই থাকলে সেও থাকবে। রাতে মনে হয় বিরিয়ানী দেবে, খেয়ে দেয়ে রাস্তাতেই ঘুমিয়ে পড়বে সে।



যে রাত নামলো ঢাকায়, সে রাতের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলনা রফিক। তখন মধ্য রাত, পুলিশ নাকি লাঠি সোটা, বন্ধুক, কামান, ট্যাঙ্ক নিয়ে তাদের দিকে তেড়ে আসছে। হঠাr সব মুসল্লিরা যে যেদিকে পারে আগুন দিচ্ছে, গাছ কেটে রাস্তার উপর ফেলে রাখছে, যেন পুলিশের গাড়ি আসতে না পারে। সবার মুখে একটাই আওয়াজ ‘নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর’। সময় যতই যাচ্ছে আগুনের শিখা ততই বাড়ছে। তার সহযাত্রীরা পুলিশের দিকে ইট পাটকেল মেরেই চলেছে। হঠাr কারেন্ট চলে গেল। ঢাকাতে নাকি খুব লোডশেডিং হয়? লোডশেডিং হবার আর সময় পেল না। এটাকি ইবলিশ আসার আলামত? নাকি আল্লার গজব? সে হুজুরকে খুজতে থাকল। কিন্তু হুজুর কোথায়, হুজুর নাই। কোথায় যেন পালিয়ে গেছে। হঠাr সে শুনতে পেল বোমার আওয়াজ, কি বিকট শব্দ, কানে তালা লাগিয়ে দেয়। একের পর এক বোমা ফাটতে শুরু করেছে। এপাশ ওপাশ দুপাশেই ফাটছে। অনেক হুজুর লাল টেপ মোড়ানো কৌটায় আগুন দিয়ে ছুড়ে দিচ্ছে আর বিকট শব্দে ফেটে পড়ছে। হঠাr সে দেখল পুলিশের দল আসছে। বন্ধুক উচিয়ে, গুলি করতে করতে। ভয় পেল রফিক প্রচন্ড ভয়। এবার মনে হয় সে শহীদ হতে চলেছে। যে শান্তির ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সে এসেছে, এতো সে ইসলাম নয়! এ যুদ্ধ তো ইবলিশের সাথে নয়! যে পুলিশ তার দিকে এগিয়ে আসছে তার পাকেটের ওপর নাম লেখা হাজী ইসমাইল। রফিকের বাবার নামের সাথে মিলিয়ে নাম। এই হাজী কি নামাজ পড়ে না? মনে হয় পড়ে; কারণ তারও কপালে কালো দাগ দেখা যাচ্ছে। তবে এ কিসের যুদ্ধ! মুসলিম মুসলিম ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ? কিছু একটা গোলমাল আছে যা সে ধরতে পারছে না। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে তার। সে জ্ঞান হারাচ্ছে, চোখের সামনে কালো ধোয়া ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে। ভয় পেয়েছে রফিক, প্রচন্ড ভয়। মনে হয় সে শহীদ হলো।



চোখে পানির ঝাপটা পড়ার পর চোখ খুলে প্রথমে দেখল একটা পকেটের উপর ব্যাচে লেখা একটি নাম। হাজী ইসমাইল। তার পর দেখল হেলমেটের মধ্যে থাকা এক জোড়া চোখকে। ঠোটটা নড়ে উঠল তার; বলছে “হাত উচু করে চলে যাও, এখানে থেকো না, মারা পড়তে পারো”। জীবন ফিরে পাওয়ার স্বাদ এইমাত্র পেল রফিক। জড়িয়ে ধরলো সেই পুলিশকে। যেন বেহেশ্তে তার বাবার কোলেই ফিরে গেল সে। সিদ্ধান্ত নিল সে গ্রামে চলে যাবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার দরকার নেই তার, নিজ গ্রামে গিয়ে থাকলেই শান্তি। গাছের তলে গরমের দুপুরে ঘুমিয়ে থাকাই শান্তি। মাঠে ফসল ফলানোই শান্তি। নামাজ পড়ে বাবা মার জন্য দোয়া চাওয়াই শান্তি। এভাবে রাজপথে মিছিল করে শান্তি আনা যায় না। এভাবে ইট পাটকেল ছুড়ে গুলি পাওয়া যায়, শান্তি নয়। এই শান্তি প্রশান্তির নয়, ভয়ের। ভয় পেয়েছে রফিক, খুব ভয় পেয়েছে সে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.