| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ব্যক্তিগত জানলার পর্দার আড়ালে বৃন্দাবন, দুঃখ মুছার ন্যাকড়া, সুখের মাঝে গুঁজে রাখা ন্যাপথালিন। পর্দার সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ বহুদিন ধরে অপেক্ষমান জানলার পর্দা সরার, কপাট খোলার। কিন্তু দুর্বাঘাসের হৃদয়ে আঁকা শিশিরের স্বাদ ভুলে গ্যাছে যে আকাশ বাতাসের টেলিফোনে তার কি ঘুম ভাঙ্গে, জানলার পর্দা সরে, কপাট খোলে? তাই এ আকাশের কথা চিত্রগুপ্তের জানা নাই। এ আকাশ রোদ্দুরহীন মেঘের দূরগামী, গোপন তারায় নির্বাসিত।
প্রায় বারো বছর ধরে ঋতুপর্ণ ঘোষের দেখাশোনা করতেন বিশ্বনাথ মণ্ডল। ঋতুপর্ণ ঘোষ অবশ্য তাকে 'বিশু' বলে ডাকতেন। রাতে শোয়ার আগে তিনি বিশুকে বলেছিলেন, সকালে না ডাকার জন্য। একটু বেশি ঘুমাতে চেয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তবে তাঁর ঘুমটা যে এত বেশি দীর্ঘ হবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। চলে গেলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদ-নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ।
মানবিক সম্পর্ক ও সম্পর্কের নানাবিধ টানাপোড়েন বিপ্রতীপ রেখার ওপর দিয়ে যিনি বাংলা চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন—তাঁর নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ। নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও সুশৃঙ্খল উপস্থাপনের প্রবণতা তাঁর চলচ্চিত্রকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি হয়ে উঠেছেন অনবদ্য। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এই ধ্রুপদি নির্মাতার মৃত্যুকে অকালমৃত্যু বললে ভুল হবে না মোটেও। ক্ষণজন্মা এ নির্মাতা বানিয়েছেন ১৯টি চলচ্চিত্র, পেয়েছেন ১২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সম্মাননা। তাঁর নির্মাণপ্রক্রিয়া এতটাই জীবনঘনিষ্ট ও মৌলিক যে, তা সহজেই চেনা যায় তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষা ও চিন্তাশীলতার প্রেক্ষণবিন্দু দিয়ে।
ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন বহু গুণে গুণান্বিত। তাঁর বাবা একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা ছিলেন। পেশাগত জীবনে ঋতুপর্ণ প্রথমে কাজ করেন বিজ্ঞাপনী সংস্থায়, কপিরাইটার হিসেবে। মাত্র ৫০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। দু-বছরের মাথায় তিনি পারিশ্রমিক পেলেন দশ হাজার টাকা। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র 'হিরের আংটি'। এটি মূলত ছিল শিশুতোষ চলচ্চিত্র। ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রকে মনে রাখতে চাননি। তিনি এ চলচ্চিত্রটিকে প্রস্তুতিকালের চলচ্চিত্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে তিনি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে 'উনিশে এপ্রিল'-এর কথা বলেছেন। এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঋতুপর্ণ ঘোষ ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন, পান প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি সম্পাদনা করতেন চলচ্চিত্রবিষয়ক ম্যাগাজিন 'আনন্দলোক' (১৯৯৭ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত)। 'এবং ঋতুপর্ণ' ও 'ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি' নামের দুটি অনুষ্ঠানও তিনি উপস্থাপনা করতেন। তিনি-চারটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, এর মধ্যে দুটি চলচ্চিত্র অন্য ভাষার—ওড়িয়া ও ইংরেজি। নিজের পরিচালিত 'চিত্রাঙ্গদা' চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষ বাংলার পাশাপাশি হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায়ও সিনেমা বানিয়েছেন। তাঁর সিনেমায় কাজ করেছেন বহু খ্যাতিমান অভিনেতা-অভিনেত্রী। তিনি সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মানবিক সম্পর্কের ওপর।
ঋতুপর্ণ ঘোষ চলচ্চিত্র বানিয়েছেন বিচিত্র বিষয় নিয়ে। তবে তাঁর চলচ্চিত্রে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের নানা বিষয়-আশয় ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা। দৃশ্যমান সম্পর্কের রূপান্তর বা বিলুপ্তি তিনি চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। 'তিতলি' ছবিতে আমরা দেখতে পাই, মা ও মেয়ের সম্পর্কের বহুরূপতা। মেয়ে প্রেমে পড়ে এক সিনেমাস্টারের। অথচ সে জানত না, তার স্বপ্নপুরুষই ছিল তার মায়ের প্রেমিক। সবকিছু জানার পর মা ও মেয়ের পারস্পরিক আচরণ ও সুখীভাবে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা ঋতুপর্ণ ঘোষ সেলুলয়েডে যেভাবে ধারণ করেছেন, তা সত্যিই মুগ্ধকর। আবার, 'আবহমান' ছবিতে তিনি পিতা-পুত্রের সম্পর্কে ভালোবাসা ও দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন। এ ছবির গল্প বলার ভঙ্গি বাংলা সিনেমায় এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। অতীত ও বর্তমানকে পাশাপাশি রেখে সরলরৈখিকভাবে সিনেমার গল্প এগিয়ে যায়। এ সিনেমায় দেখা যায়, চলচ্চিত্রপরিচালক বাবার সাথে এক অভিনেত্রীর সম্পর্ক নিয়ে ছেলের সাথে বাবার এক ধরনের মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। ছেলে বাবার নামে পত্রিকায় স্ক্যান্ডাল ছড়ায়। পরবর্তী সময়ে বাবার মৃত্যুর পরে সেই অভিনেত্রীর সাথে দেখা করে ছেলে। গড়ে ওঠে সুসম্পর্ক। 'উনিশে এপ্রিল' সিনেমায়ও ঋতুপর্ণ ঘোষ ক্যারিয়ার-সচেতন এক মায়ের সাথে তাঁর মেয়ে ও পরিবারের সম্পর্কের চিত্র দেখিয়েছেন। 'অসুখ' চলচ্চিত্রে তিনি দেখিয়েছেন, বাবা ও মেয়ের সম্পর্কের গভীর রসায়ন। মেয়ে অভিনেত্রী। মেয়ের এ পেশা নৈতিকভাবে সমর্থন করতে পারে না বাবা। অথচ, মেয়ের এ পেশা থেকে উপার্জিত টাকা দিয়েই তাঁর বেঁচে থাকার খোরাক জোগাতে হয়। 'উত্সব' সিনেমার গল্পে দেখানো হয়েছে একটি একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন ও সম্পর্কের শিথিলতা। নানাবিধ ব্যস্ততার কারণে পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে না। প্রতি বছর পুজোর ছুটিতে তারা মিলিত হয়ে সম্পর্কের দায় মেটানোর চেষ্টা করে। 'অন্তমহল' সিনেমাটিও একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে। এক জমিদার বাড়ির ঘটনা নিয়ে সিনেমাটি বানানো হয়েছে। এ সিনেমায় হিন্দু ধর্মের নানা কুসংস্কার তুলে ধরা হয়েছে। 'সব চরিত্র কাল্পনিক' সিনেমায় এক কবির সাথে তাঁর স্ত্রীর সম্পর্ক, টানা-পোড়েন দেখানো হয়েছে। কবির মৃত্যুর পর শূন্যতা তৈরি হয় স্ত্রীর মনে। স্মরণসভায় বসে সে ভাবতে থাকে পুরোনো দিনের কথা।
সিনেমা নির্মাণে ঋতুপর্ণ ঘোষের দক্ষতা ও বোধ বাংলা সিনেমাকে কী দিয়েছে বা কতটুকু দিয়েছে ,তা নির্ণয় করছেন অনেকে। অনেক নির্মাতা তাঁদের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের কথা বলছেন। অনেকের সাথে অনেকের কথার মিল আছে, আবার মিল নেই। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত, বাংলা সিনেমার ইতিহাস বলতে গেলে তাঁর নাম বলতেই হবে।
©somewhere in net ltd.