| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ব্যক্তিগত জানলার পর্দার আড়ালে বৃন্দাবন, দুঃখ মুছার ন্যাকড়া, সুখের মাঝে গুঁজে রাখা ন্যাপথালিন। পর্দার সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ বহুদিন ধরে অপেক্ষমান জানলার পর্দা সরার, কপাট খোলার। কিন্তু দুর্বাঘাসের হৃদয়ে আঁকা শিশিরের স্বাদ ভুলে গ্যাছে যে আকাশ বাতাসের টেলিফোনে তার কি ঘুম ভাঙ্গে, জানলার পর্দা সরে, কপাট খোলে? তাই এ আকাশের কথা চিত্রগুপ্তের জানা নাই। এ আকাশ রোদ্দুরহীন মেঘের দূরগামী, গোপন তারায় নির্বাসিত।
হুমায়ূন আহমেদের পৃথিবীতে না থাকার এক বছর পূর্ণ হলো। তিনি সমসাময়িক বাংলা কথাসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ। মূলত কথাসাহিত্যিক হলেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত। তিনি মোট আটটি সিনেমা বানিয়েছেন। ৫০টিরও অধিক গান তিনি লিখেছেন, যার অধিকাংশই সিনেমার প্রয়োজনে। টেলিভিশনের জন্য তিনি বানিয়েছেন অসংখ্য নাটক। হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়, তিনি বাংলাসাহিত্যে পাঠক সৃষ্টি করতে পেরেছেন। তবে এ কথাও নিদ্বির্ধায় বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদ সিনেমাপ্রেমীদের হলমুখী করেছেন। যখন বাংলা সিনেমার দুরাবস্থা তখন তাঁর সিনেমা দেখতে মানুষ হলে ফিরেছে। হুমায়ূন আহমেদ হচ্ছেন সেই ম্যাজিক মাস্টার, যিনি যেখানেই হাত রেখেছেন সেখানেই সোনা ফলেছে; কাগজে কলমে এমনকি সেলুলয়েডে।
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম ছবি 'আগুনের পরশমণি'। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে এমন সিনেমা বিরল। একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে তিনি যুদ্ধের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ফুটিয়ে তুলেছেন নিখুঁতভাবে। যুদ্ধ চলাকালে স্বাধীনতাকামী মানুষেরর স্বপ্ন ও সম্ভাবনা, হানাদারদের পৈশাচিক উল্লাস এবং গণমানুষের দীর্ঘশ্বাস সেলুলয়েডে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অথচ এ ছবির অর্থ সংগ্রহের জন্য লেখককে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় ছবি 'শ্রাবণ মেঘের দিন'। আবহমান গ্রামীণ জীবনের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এ ছবিতে। গ্রামীণ মানুষের জীবনবোধ, আবেগ, চিরায়ত বিশ্বাস এ ছবিতে স্পষ্ট হয়েছে। বঞ্চিত মানুষের জীবন দর্শন ও ফোস্কা পড়া সমাজ ব্যবস্থার উপস্থিতি এ সিনেমাকে প্রাণবন্ত করেছে। সবশেষে হূদয়বিদারক সমাপ্তি দর্শকদের ব্যাথিত করে। বিচ্ছিন্নতা মানুষের জীবনে এক ধরনের অতৃপ্তি সৃষ্টি করে, সেই অতৃপ্তিতে দর্শক নিজেদের অতৃপ্তি খুঁজে পায়, ফলে যে অনুভূতি তৈরি হয় তা অবশ্যই মর্মস্পর্শী হলেও খানিকটা তৃপ্তিরও বটে। ছবিতে স্বল্প পরিসরে মুক্তিযুদ্ধের কথা এসেছে। ছবির গানগুলো ছবিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
'দুই দুয়ারী' সিনেমা আবর্তিত হয়েছে একজন রহস্যমানবকে কেন্দ্র করে। রহস্যমানব হঠাত্ করে এক পরিবারে আবির্ভূত হয়। রহস্যমানব সুপার ন্যাচারাল ক্ষমতা দিয়ে করতে থাকে একের পর একটা সমস্যার সমাধান। রহস্যমানবের আগমন ঘটে যেমন রহস্যজনকভাবে, ঠিক তেমনি তার বিদায়ও হয় রহস্যজনকভাবে। হঠাত্ একদিন গান গাইতে গাইতে সে চলে যায়। তার চলে যাওয়ায় কোনো ধরনের শূন্যতা তৈরি হয় না, তৈরি হয় অন্তহীন রহস্যের শিহরণ।
'শ্রাবণ মেঘের দিন' সিনেমার মতো 'চন্দ্রকথা' সিনেমাটিও গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে নির্মিত। সাদামাটা এক গ্রামের মেয়ের নাম চন্দ্র। তার জীবনের গল্পই 'চন্দ্রকথা'। 'ও আমার উড়াল পঙ্খীরে' শিরোনামে এ সিনেমার একটা গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে এ সিনেমাটি 'শ্রাবণ মেঘের দিন' সিনেমার মতো দর্শক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত হুমায়ূন আহমদের দ্বিতীয় ছবি 'শ্যামল ছায়া'। যুদ্ধের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকা একদল মানুষের জীবন নিয়ে সিনেমাটি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর কিছু মানুষ জীবন বাঁচাতে একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আশ্রয় নেয়। নৌকা নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে এগোতে থাকে। মানুষের স্বপ্ন, বেদনা ও মৃত্যুভয়ের চিত্র—এ সিনেমায় ফুটিয়ে তুলেছের অত্যন্ত সুনিপুণভাবে।
উচ্চবিত্ত এক কিশোরী মেয়ের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে 'আমার আছে জল' সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ মানব সম্পর্কের অন্তর্মুখী শূন্যতাকে এ সিনেমায় তুলে ধরেছেন। সিনেমার প্রতিটি চরিত্রের ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতি 'একান্ত ব্যক্তিগত' করে রাখে সারাক্ষণ, অথচ তারা প্রত্যেকে একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে। মানুষ অসহায় হয়ে পড়লে মৃত্যুতে নিজের আশ্রয় খোঁজে। ছবিটির শেষ হয়েছে আত্মহত্যা দিয়ে।
'নয় নম্বর বিপদ সংকেত' হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত একটি আলোচিত ছবি। এ ছবি নিয়ে একটি মহল বেশ সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছিল। অনেকে অভিযোগ করেছিল, এ ছবিতে কোনো মেসেজ নেই, এ ছবি অত্যন্ত নিম্নমানের। এ অভিযোগের জবাব হুমায়ূন আহমেদ দিয়েছেন। তিনি এ ছবিটিকে একটি হাসির ছবি বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, এ ছবি দেখে মানুষ হাসুক। মানুষের জীবনে হাসির অনেক দরকার। 'নয় নম্বর বিপদ সংকেত' ছবিটি দেখে দর্শক হেসেছে, মুগ্ধ হয়েছে, হাসতে হাসতে হল থেকে বের হয়েছে। নাক সিটকানো সসব লোকেদের দিকে আঙুল না তুলে বলতে চাই, সিনেমা দেখে মানুষ হাসলেই কি সিনেমা নিম্নমানের হয়ে যায়?
হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ ছবির নাম 'ঘেটুপুত্র কমলা'। অনেকের মতে, এটিই হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠ ছবি। আর যদি ছবির বিষয়বস্তুর কথা বলা হয়, তাহলে বলা যায়, এটি একটি নতুন ভাষার চলচ্চিত্র। ঘেটুদের নিয়ে এর আগে কোনো সিনেমা তৈরি হয়নি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। এ ছবিটি শুরু করার সময় তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, এরপর আর ছবি বানাবেন না। সত্যিই তিনি আর ছবি বানাবেন না, বানাতে পারবেন না। কারণ তিনি তো এখন 'না ফেরার দেশে', 'ছবি না বানানোর দেশে'।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস নিয়েও বেশ কয়েকটি সিনেমা হয়েছে। এর মধ্যে মোরশেদুল ইসলাম বানিয়েছেন দুটি চলচ্চিত্র। প্রথমটির নাম 'দূরত্ব'। পুতুল উপন্যাস অবলম্বনে এ শিশুতোষ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয়টি হলো 'প্রিয়তমেষু'। 'প্রিয়তমেষু' দেখে হুমায়ূন আহমেদ মুগ্ধ হয়েছিলেন। মোরশেদুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানিয়ে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর মুগ্ধতার কথা নিয়ে একটা লেখাও লেখেন। হুমায়ূন আহমেদের 'অনিল বাগচির একদিন' উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম তাঁর পরবর্তী সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা করছেন। এছাড়াও বেলাল আহমেদ বানিয়েছেন 'নন্দিত নরকে', আবু সাইয়িদ 'জনম জনম' উপন্যাস অবলম্বনে বানিয়েছেন 'নিরন্তর', শাহ আলম কিরন বানিয়েছেন 'সাজঘর', তৌকির আহমেদ বানিয়েছেন 'দারুচিনি দ্বীপ'।
হুমায়ূন আহমেদ জ্যোত্স্না ও বৃষ্টি খুব পছন্দ করতেন। তাঁর প্রতিটি সিনেমায় জ্যোত্স্না ও বৃষ্টি আছে। তিনি চেয়েছিলেন, কোন এক জ্যোত্স্না রাতে যেন তাঁর মৃত্যু হয়। প্রকৃতি তাঁকে এ ব্যাপারে কোনো সাহায্য করেনি। কে জানে, হয়তো প্রকৃতিও আমাদের মতো প্রস্তুত ছিল না তাঁর মৃত্যুর জন্য। সিনেমাপাগল এ লেখক বেঁচে থাকুক তাঁর লেখায়-সিনেমায়, বৃষ্টিতে-জ্যোত্স্নায়। শঙ্খ ঘোষের কবিতা দিয়ে শেষ করতে চাই—
'আমার মতো বাতাস জানে ডানা
আমার মতো সূর্য জানে ফুল,
তোমার চোখে নিদ্রা হলো টানা
মরণমুখী সূর্য আর জাগনলোভী চাঁদে
আকাশ পরে স্নিগ্ধ দুটি দুল।'
©somewhere in net ltd.