| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শেখ বিবি কাউছার
আমি শেখ বিবি কাউছার, চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অনার্স এবং ঢাকা তেজগাঁও কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করি।বর্তমানে নোয়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে(রাউজান, চট্টগ্রাম) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছি।
বিবি কাউসার শেখ:
প্রযুক্তিনির্ভর এ যুগে আমাদের জীবনযাত্রার মান যে অনেক উন্নত ও সহজ হয়েছে সেটা অস্বীকার করা যাবে না। এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা যে সুযোগ -সুবিধা গুলো পাচ্ছি ইতিপূর্বে সেগুলো ছিল কল্পনাতীত। প্রতিদিন নতুন নতুন অভিনব আবিষ্কার আমাদের ধ্যান- ধারণায় এনে দিচ্ছে আমূল পরিবর্তন।
তবে একবার ভাবুন তো বিজ্ঞান বলেন আর প্রযুক্তিই বলেন এটি কি আমাদের উন্নত মানসিক বা আত্মিক উন্নয়নের নিশ্চিয়তা দিতে পারছে?
না,পারছে না। যদি পারতো তাহলে বিশ্বের উন্নত দেশ বা জাতি গুলোও বিত্তবৈভবের শীর্ষে অবস্থান করেও এমনকি শিক্ষা- সংস্কৃতিতে এগিয়ে থেকেও দেখা যায় এসব দেশের প্রচুর মানুষ মানসিক প্রশান্তির অভাব বোধ করে আসছে। মানসিক প্রশান্তির অভাব যে অর্থ-বিত্ত দিয়ে পূরণ করা যায় না, সেটা আবার অনেকে হয়তো উপলব্ধিই করতে পারে না। তারা মনে করে অর্থ-বিত্তই সুখ বা শান্তি।
আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণত যে শিক্ষায় শিক্ষিত হই তার মাধ্যমে নিজের অন্তরলোককে পুরোপুরি উপলব্ধি কিংবা ভেতরের সেই জ্যেতির্ময় শক্তিটির সন্ধান লাভ সম্ভব হয় না। তার জন্য প্রয়োজন সুফিদের ভাবাদর্শ। কারণ সমাজজীবনে বলেন কিংবা ব্যক্তিজীবনে বলেন মানবিক চর্চার জন্য সুফি ভাবাদর্শ একটি উন্মুক্ত দরজা। যা শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্বারা প্রায় অসম্ভব।
সুফিবাদের একমাত্র মূল যে বিষয় সেটি হল, আপন নফসের সঙ্গে নিজ প্রাণের সাথে, নিজের জীবাত্মার সাথে পরমাত্মা আল্লাহ যে শয়তানটিকে আমাদের পরীক্ষা করার জন্য দেওয়া হয়েছে তার সাথে জিহাদ করে তার থেকে মুক্তি লাভ করা। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো এই দর্শনের মর্মকথা।
সুফিমাত্রই গুরুবাদী।প্রকৃত সুফিরা তাদের দৃঢ় জ্ঞান, আত্মার পবিত্রতা,ভালোবাসা ও সাধনার মধ্য দিয়ে স্রষ্টার সন্ধানে সর্বদা নিয়োজিত থাকেন।
সুফিগনের মতে,হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ) স্বয়ং সুফিদর্শের প্রবর্তক। এর সপক্ষে সুফিগণ হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর একটি হাদিস উল্লেখ করেন যা হলোঃ মানবদেহে একটি অঙ্গ আছে,যা সুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ পরিশুদ্ধ থাকে, আর অসুস্থ থাকলে সমগ্র দেহ অপরিশুদ্ধ হয়ে যায়। জেনে রাখো এটি হলো কলব বা হৃদয়।
কাম,ক্রোধ,লোভ,মদ,মোহ,মাৎসর্য পরিত্যাগ করাই সুফির মৌলিক ধর্ম।
অপরদিকে মানবপ্রেম তথা সৃষ্টির প্রতি প্রেমের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রেমার্জন সুফিবাদের মূল আদর্শ।
বোখারী শরীফের এক হাদিসে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত , “ রাসূলের কাছে আমি দু ‘ধরনের জ্ঞান লাভ করেছি। আমি শুধু এক ধরনের জ্ঞানই তোমাদের কাছে বর্ণনা করেছি। দ্বিতীয় পর্যায়ের জ্ঞান যদি বণর্না করি, তবে তোমরা আমার গলা কেটে ফেলবে।(ইলমে মারেফত,যা আসলে বিশেষ সাধনা ছাড়া উপলব্ধি করা যায় না। তাই তা সাধারণ্যে প্রকাশ শুধু ভুল বোঝাবুঝিই বাড়াবে।)
মাওলা আলি (রাঃ) সম্পর্কে রাসূলে পাক (সাঃ) বলেছেন, “আমি জ্ঞানের শহর,আলি তার দরজা। ” মাওলা আলি (রাঃ)কে প্রদত্ত এই যে গুপ্তজ্ঞান, সুফিসাধকগণ এটাই লাভ করতে চান।
সুফিসাধক মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির নাম শুনে নি এমন মানুষ বিশ্বে খুব কম আছেন। তাঁর অসামান্য পান্ডিত্য তাঁকে মহান সুফিতে পরিণত করেছে।তিনি বহু কিতাব লিপিবদ্ধ করে গেছেন তারমধ্যে ‘মসনবী’ ও ‘দিওয়ান’ তাঁকে অমর করে রেখেছে। যুগে যুগে মাওলানা রুমির জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা, কবিতা এবং উক্তি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।মুসলিম গন্ডি পেরিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন সকল ধর্মের মানুষের মনে। বর্তমানে জালাল উদ্দিন রুমিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি’ এবং ‘বেস্ট সেলিং পয়েট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মানুষের হৃদয়ে আলো জালাতে তিনি যা লিখে গেছেন, তার সবই অমরত্ব পেয়েছে। আধুনিক বিশ্বেও তাই রুমির বলা প্রতিটি কথা বা উক্তি তুমুল আলোচিত।সুফিবাদেও যিনি যোগ করেছেন এক নতুন আলো,যা অন্ধকার দূর করতে সক্ষম। সুফি ভাবাদর্শের খোঁজে তার কাছে তো যাওয়াই যায়।
তিনি বলেন:
“ গতকাল আমি চতুর ছিলাম তাই আমি পৃথিবীকে বদলে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি জ্ঞানী তাই নিজেকে বদলে ফেলতে চাই।”
“ সুন্দর ও উত্তম দিন তোমার কাছে আসবে না; বরং তোমারই এমন দিনের প্রতি অগ্রসর হওয়া উচিত।”
“যারা তোমাকে পছন্দ করে না তাদেরকে নিয়ে ভাবতে যেয়েও না,তাদের নিয়েই সবসময় আনন্দের সাগরে ডুবে থাকো যারা তোমায় পছন্দ করে।”
“যে তার জ্ঞান দিয়ে মনের খারাপ ইচ্ছা গুলোকে জয় করতে পারে সে স্বর্গের ফেরেশতাদের থেকেও বেশি সম্মানিত বলে বিবেচিত হয়।”
বর্তমানে ধর্মের সঠিক ও সুন্দর রূপ না বুঝার কারণে, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যুগে, সামাজিক -রাজনৈতিক নতুন নতুন সংকটের যুগে সুফিবাদী ভাবাদর্শ আধুনিক সভ্য সমাজে বইয়ে দিতে পারে প্রাণরস। কারণ প্রিয় নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “ ধর্মকে সহজ করার জন্যেই আমি প্রেরিত হয়েছি।”
সুফিবাদ উদার ও সমন্বয়ধর্মী চর্চা শিক্ষা দেয় আর শিক্ষা দেয় সব রকম ইতিবাচক সম্পর্কের মধ্যেই আছে ভালোবাসা।
আসুন আমরা সবাই ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ উচ্ছেদ করি, পৃথিবীটাকে সুন্দর করি যাতে আগামী প্রজন্মরা নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারে।তবেই সমাজ, রাষ্ট্রে শান্তি আসবে।
লেখকঃপ্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ নোয়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ রাউজান, চট্টগ্রাম।
শেয়ার করুন 
©somewhere in net ltd.