| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত হয়ে আসছে শ্রমজিবী খেটে খাওয়া মানুষেরা। শত লড়াই সংগ্রামে এনে দিতে পারেনি তাদের অধিকার। তাদের নিকট থেকে যখন যেভাবে ইচ্ছা কাজ আদায় করে প্রাপ্য মজুরী হতে বঞ্চিত করা যেন মালিক শ্রেনীর কাজ। শ্রমিকের গায়ের ঘাম ও সীমাহীন পরিশ্রমের বিনিময়ে মালিকের সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠত।সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাড়ভাঙা শ্রম দিয়েও শ্রমিক তার ন্যায্য মূল্য পেতেন না। শ্রমিকশ্রেণী উৎপাদনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও মুনাফা লুটে নেয় মালিক শ্রেণী। মালিকেরা উপযুক্ত মজুরি তো দিতেনই না, বরং তারা শ্রমিকের সুবিধা-অসুবিধা, মানবিক অধিকার ও দুঃখ-কষ্ট পর্যন্ত বুঝতে চাইতেন না। পরিবার-পরিজন নিয়ে শ্রমিকের কাটত দুর্বিষহ জীবন। এভাবে মালিকের সীমাহীন অনাচার, অর্থলিপ্সা ও একপেশে নীতির ফলে শ্রমিকদের পুঞ্জিভুত হতে থাকে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও দ্রোহ। বিশ্ববাসীর কল্যানের দূত হযরত মুহাম্মদ (স
ফিরিয়ে দিলেন শ্রমিকের অধিকার। তিনি ঘোষনা করলেন, ‘শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকাবার আগেই তার মজুরী দিয়ে দাও’। তিনি আরো বলেছেন, ‘মজুরদের সাধ্যের অতীত কোন কাজ করতে তাদের বাধ্য করবে না। অগত্যা যদি তা করাতে হয় তবে নিজে সাহায্য কর।’ আল্লাহর নবী (সা) অন্য এক হাদীসে বলেছেন, ‘মজুর চাকরদের অপরাধ অসংখ্যবার ক্ষমা করা মহত্ত্বের লক্ষণ।’ মহানবী (সা) আরো বলেছেন, ‘অসদাচরণকারী মালিক বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। তার মধ্যে একজন হ’ল যে শ্রমিকের নিকট থেকে পূর্ণ শ্রম গ্রহণ করে, অথচ তার পূর্ণ মজুরী প্রদান করে না।’ মহানবী (সাঃ) শ্রমিকদেরকে যথারীতি খাদ্য ও পোষাক দেয়া এবং শ্রমিকদেরকে তাদের শ্রমার্জিত সম্পদ হ’তেও অংশ দেয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায় না। ওমর (রাঃ) সরকারী কর্মচারীদেরকে নির্দেশ দিতে গিয়ে বলতেন, ‘সবচেয়ে ভাল এবং সৎ শাসনকর্তা সে-ই যার অধীনে সাধারণ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তার সাথে থাকে। আর সবচেয়ে খারাপ শাসনকর্তা সেই, যার প্রজা-সাধারণ অভাব ও অশান্তিতে দিন যাপন করে। হাযম (রহঃ) বলেন, ‘মালিকের জন্য উচিৎ শ্রমিকের নিকট থেকে ততটুকু কাজ নেওয়া, যতটুকু সে সামর্থ্য অনুযায়ী অনায়াসে সুষ্ঠুভাবে করতে পারে। এমন কোন কাজ করতে তাকে বাধ্য করা যাবে না, যার ফলে তার স্বাস্থ্যহানি ঘটে অথবা তার ক্ষতি হয়। ইসলামের এ সুমহান আদর্শ যতদিন বিশ্ববাসি মনে প্রাণে গ্রহণ করেছিল ততদিন পৃথিবীতে দুঃখ-কষ্ট, অশান্তি ছিলনা, মালিক শ্রমিক ভাই ভাই হিসেবে ছিল। খোলাফায়ে রাশেদার ত্রিশ বছর তারই জ্বলন্ত প্রমান। কেবল মাত্র ইসলামই মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু বিশ্ববাসি যখন ইসলামের আদর্শকে বাদ দিয়ে নিজেদের গড়া পথ অনুযায়ী চলতে শুরু করল তখনই আবার তাদের উপর নেমে আসল অমাবস্যার তীমির অন্ধকার। নির্যাতিত নিপীড়িত শ্রমিকরা বঞ্চিত হল তাদের অধিকার থেকে। নির্যাতন আর নিষ্পেশন এমন পর্যায় পৌঁছেছিল যে ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠায় আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল। এরপর মালিক শ্রেণীর নির্যাতন নিষ্পেশন আরো বেড়ে গিয়েছিল। দাবি আদায়ে শ্রমিকদের ফাঁসিতেও ঝুলতে হয়েছিল। কিন্তু আজো কি তাদের ন্যয্য দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? এক বাক্যে স্বীকার করা যাবে, হয় নি। আমাদের এই দেশেই প্রতিবছর শত শত শ্রমিককে জীবন বিষর্যন দিতে হচ্ছে; কখনো আগুনে পুড়ে কখনো বিল্ডিং এর নিছে চাপা পড়ে আবার কখনো রাষ্ট্রিয় বাহিনীর গুলিতে। কাউকে আবার হতে হচ্ছে পঙ্গু। রাত দিন পরিশ্রম করে নিজের প্রাপ্য মজুরীরর জন্য তাদের অনশন করতে হচ্ছে। তবুও তারা তাদের অধিকার ফিরে পাচ্ছে না। এইতো কিছুদিন আগের কথা তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ডে নিহত হল শত শত শ্রমিক, তার পরেই রানা প্লাজা ধ্বসে হাজার হাজার শ্রমিক নিহত হওয়ার কিছুদিন পরেই পলমল গ্রুপের আসওয়াদ গার্মেন্টে অগ্নিকান্ড। নিহতদের মধ্য হতে অল্প কিছু লোককে নামে মাত্র ক্ষতি পূরণ দেয়া হয়েছিল। আর যারা পঙ্গু হয়ে আছে আজ তাদের কোন খোঁজ নেই! সেইসব পরিবার আজ কিভাবে চলে যাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি নিহত হয়েছে অথবা পঙ্গু হয়ে আছে! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই অমানবিক ব্যবস্থার মূলে কুঠারাগাত হেনে ঘোষণা করেন, ‘আমি মুমিনের অভিভাবক। তাদের মধ্যে হ’তে কেউ মৃত্যুবরণ করলে এবং তার উপর কর্য (দেনা) থাকলে আর তা পরিশোধের কোন ব্যবস্থা না থাকে তবে তা পরিশোধের দায়-দায়িত্ব আমার উপর। আর যদি সে সম্পদ রেখে যায়, তবে তার অংশীদারগণ এ সম্পদের অধিকারী হবে’। আবার কোন কোন মালিক কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি করে শ্রমিকের পারিশ্রমিক কমিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চালায়। এটি একেবারে অমানবিক কাজ। শ্রমিককে নির্দিষ্ট মজুরীর বিনিময়ে নিয়োগ করার পর, উৎপাদন ঘাটতি হ’লেও তাদের মতামত ব্যতীত সামান্যতম পারিশ্রমিক কম করা যাবে না। ঘাটতির লোকসান মালিককেই বহন করতে হবে। ওমর (রাঃ) প্রয়োজন ও দেশের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রেখে বেতন নির্ধারণ করে দিতেন। শ্রমিকের নিকট হ’তে ততক্ষণ কাজ করে নেয়া যাবে, যতক্ষণ সে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সক্ষম। সরকার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের সমস্ত প্রয়োজন পূরণ করবে, প্রয়োজন অনুপাতে ভাতা নির্ধারণ এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বিধান করবে। শ্রমিকগণের চাকুরীর নিরাপত্তা বিধান করা তাদের অন্যতম অধিকার হিসাবে গণ্য। মালিকগণ ইচ্ছামত শ্রমিককে চাকুরীচ্যুত করবে কিংবা কথায় কথায় চাকুরী ছাড়ার নোটিশ দিবে এটা চরম মানবতা বিরোধী। শ্রমিকের পেশা পরিবর্তন বা কর্মস্থল পরিবর্তনে অধিকার থাকবে। এতে কারও হস্তক্ষেপ অর্থই তার স্বাধীন সত্তায় বাধা দানের শামিল। শ্রমিকের উপর যেমন মালিকের অধিকার আছে তেমনি মালিকের উপর শ্রমিকেরও অধিকার আছে। আল্লাহর ঘোষনা হচ্ছে, ‘শ্রমিক হিসাবে সেই ব্যক্তি ভাল, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত’ (ক্বাছাছ ২৮/২১৬)। শ্রমিক দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজে অলসতা প্রদর্শন করলে তার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তাদের জন্য দুর্ভোগ, যারা ওযনে কম দেয়। ওযন নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং দেওয়ার সময় কম করে দেয়’ (মুতাফফিফীন ৮৩/১-৩)। শ্রমিক তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে আঞ্জাম দিবে এটা তার কর্তব্য। আর এ কর্তব্য সুচারুভাবে পালন করলে তার জন্য দ্বিগুণ পুণ্যের কথা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘তিন শ্রেণীর লোকের দ্বিগুণ ছওয়াব প্রদান করা হবে। তাদের মধ্যে এক শ্রেণী হ’ল যে নিজের মালিকের হক আদায় করে এবং আল্লাহর হকও আদায় করে’।
শ্রমিক যখন তার হক পুরোপুরি ভোগ করতে পারবে তখন সে কজে আরো উৎসাহিত হবে, আরো আন্তরিক হবে। কাজের গতি অনেক বেড়ে যাবে। দেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। ফিরে আসবে সেই সোনালী দিন যে দিনের অপেক্ষা বিশ্বের শান্তি কামী মানুষ। মালিক-শ্রমিক অসন্তোষে দেশের উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। সরকারকেই দেশের উন্নয়নের স্বার্থে হলেও শ্রমিকের অধিকারের প্রতি যত্নশীল হবে।
©somewhere in net ltd.