নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

কুমির নিয়ে গবেষণা করছি

কার্জন আরিফ

কার্জন আরিফ › বিস্তারিত পোস্টঃ

আমাদের ঘড়িয়াল

২৮ শে এপ্রিল, ২০১২ দুপুর ১:০০

ঘড়িয়াল (Gharial or Gavial) বিরল প্রজাতির মিঠাপানির কুমির। বৈজ্ঞানিক নাম Gavialis gangeticus. ঘড়িয়াল (Gharial) বা মেছো ঘটওয়ালা কুমির হল লম্বা তুণ্ডযুক্ত(snout)কুমীর জাতীয় জলচর সরীসৃপ প্রানী। মেছো ঘটওয়ালা কুমির বেশ লম্বা হয়।

বাংলাদেশে এরা ঘড়েল, বাইশাল বা মেছো কুমির নামেও পরিচিত। এ ছাড়া এদের লম্বা-নাক কুমির, নাকা, নাকার ইত্যাদি নামেও ডাকা হয় এদের।

এরা অত্যন্ত প্রাচীন প্রাণী। প্রায় দুই হাজার মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে বসবাস করছে এরা। ১৮ কোটি বছর আগে ট্রিয়াসিক যুগে ‘অর্কোসোউরিয়ান ডাইনোসর’ নামে যে সরীসৃপ পৃথিবীতে বাস করত সেখান থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে ঘড়িয়ালের আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশের বুকে আজও ওরিয়েন্টাল অঞ্চলের এন্ডোমিক প্রাণী এই ঘড়িয়াল টিকে আছে।

একসময় এদের বাস ছিল ভারতের ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা, পাকিস্তানের সিন্ধু, মিয়ানমারের কলাদান নদী এবং বাংলাদেশের পদ্মা-যমুনার সঙ্গমস্থলের উচ্চ অববাহিকায়। ঘড়িয়াল এক সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে দেখা গেলেও এখন প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে।

একদল বন্যপ্রাণী গবেষক ১৯৯০ সালের দিকে সর্বশেষ পদ্মার উচ্চ অববাহিকায় একটি মাত্র ঘড়িয়ালের সাক্ষাৎ পেয়েছিল। আবাসস্থল ধ্বংস আর খাদ্য সংকটে ঘড়িয়ালরা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে সেই অনেক আগেই। আর তাই আজ ঘড়িয়াল এক বিপন্ন প্রাণী এবং ইতিমধ্যেই এরা বিলুপ্তপ্রায় মহাবিপদাপন্ন প্রাণী হিসেবে আইইউসিএন এর লাল বইয়ে (Red Data Book of IUCN) নাম লিখিয়েছে, অর্থাৎ দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে পৃথিবীতে বর্তমানে মাত্র ২০০টির মতো বুনো ঘড়িয়াল রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন ঘড়িয়াল বা মেছো ঘটওয়ালা কুমির হলো কুমির জাতীয় জলচর সরীসৃপ। এরা বেশ লম্বা হয়। ঘড়িয়াল মোহনার কুমিরের মতো আগ্রাসী নয়।

অবিকল কুমিরের মতো দেখতে মনে হলেও ঘড়িয়াল একেবারে নিরীহ । কুমিরের সাথে ঘড়িয়ালের পার্থক্য শুধু চোয়ালটি। কুমিরের চোয়াল ভোঁতা খাটো অন্যদিকে ঘড়িয়ালের চোয়াল লম্বাটে শুঁড়ের মতো। শুঁড়ের অংশের ওপরের দিকে ৫০টি এবং নিচে ৪৮টি ছোট অথচ তীখ্ন ধারালো দাঁত রয়েছে। লম্বায় এগুলো শুঁড়সহ ২০ ফুটের কাছাকাছি। অত্যন্ত লম্বা চোয়ালের জন্য ঘড়িয়াল অন্যান্য কুমির থেকে আলাদা।

পুরুষ ঘড়িয়ালের ওপরের চোয়ালে, নাকের ঠিক ওপরে, কলস বা ঘড়া আকৃতির একটি পিণ্ড থাকে। এ কারণেই সম্ভবত ঘড়িয়াল নাম। লম্বা চোয়ালটি বাদ দিলে এরা দেখতে অন্যান্য কুমিরের মতোই।

পিঠ ও লেজ কাঁটাযুক্ত শক্ত আঁশে মোড়ানো। সরীসৃপ হলেও এদের হূৎপিণ্ড চার প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট, মানুষের ন্যায়।

লম্বায় ৪.৫-৭.০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত, পুরুষ ঘড়িয়াল আকারে স্ত্রী ঘড়িয়ালের চেয়ে মিটার খানেক বড় হয়। এদের চোয়াল ০.৮-১.০মিটার লম্বা। পুরুষের চোয়ালে ঘড়া থাকলেও স্ত্রীর তা থাকে না। আর বাচ্চা পুরুষ ঘড়িয়ালের বয়স এক বছর না হওয়া পর্যন্ত ঘড়া চোখে পড়ে না। এদের চোখ অপেক্ষাকৃত বড়। হাতে পাঁচটি ও পায়ে চারটি করে আঙুল ও নখর রয়েছে। গায়ের রং কালচে ধূসর হলেও বাচ্চাগুলো কিছুটা উজ্জ্বল রঙের। সদ্যজাত বাচ্চারা শুঁড়সহ ২২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়।



চৈত্র মাস ঘড়িয়ালের প্রজনন ঋতু। এ সময় স্ত্রী ঘড়িয়াল বালুতে ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ গর্ত করে একসঙ্গে ৪০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ঘড়িয়াল নদীর বালিয়াড়িতে ডিম পেড়ে বালি দিয়ে ঢেকে রাখে।

কচ্ছপ-কুমিরের মতোই ডিম ফোটায় এগুলো। ক্যাপসুল আকৃতির ধবধবে সাদা ডিমগুলো লম্বায় প্রায় ১২ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। গায়ের রং কালচে ধূসর হলেও বাচ্চাগুলো কিছুটা উজ্জ্বল রঙের।কচ্ছপ-কুমিরের মতোই ডিম ফোটায় এগুলো। ডিমের ওজন প্রায় ২৫০ গ্রাম। ৬০ থেকে ৭৫ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চাগুলো লম্বায় ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার হয়।

বালুচরে রোদ পোহাতে এরা বেশ পছন্দ করে। রোদ পোহানোর সময় সাধারণত বিশাল হাঁ করে থাকে। যদিও এরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, কিন্তু মানুষ এদের ক্ষতি করতে মোটেও ছাড়ে না।

বাচ্চাদের প্রধান শত্রু বড় ঘড়িয়াল, কুমির, শিকারি পাখি, বোয়ালজাতীয় রাক্ষুসে মাছ ইত্যাদি।

বাচ্চারা বছর তিনেকের মধ্যেই প্রায় ১ দশমিক ৫৩ মিটার লম্বা হয়। নদীর প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের এই প্রাণীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ ফিট আর ওজন প্রায় ১৫০ কেজির উপর। মেয়ে ঘড়িয়ালের চেয়ে পুরুষটি আরও লম্বা হয়। চার-পাঁচ বছরে প্রজননক্ষম হয়। এরা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বছর বাঁচে।

ঘড়িয়ালের প্রধান খাদ্য মাছ । আঁশবিহীন মাছ, বিশেষ করে বোয়াল, আইড়, গুঁজি, পাঙাশ, চিতল, বাগাইর, শোল-গজার বেশি পছন্দ করে এরা। লম্বা চোয়াল মাছ ধরার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। মাছ প্রধান খাবার বলে এরা মেছো কুমির নামে পরিচিত। এরা মাছ, সাপ, ব্যাঙ ছাড়া অন্যকিছু খায় না। (কালেভদ্রে জলজ পাখি খায়) অর্থাৎ এরা মৎস্যভূক প্রাণী।

বলা হয়ে থাকে নদী ভাল আছে তখনই বলা যায় যখন নদীতে ঘড়িয়াল থাকে। কিন্তু বর্তমান দেশের নদ-নদী থেকে কুমির আকৃতির এ প্রজাতিটি বিলুপ্তির পথে। এক সময় এদেশের তথা গোটা উত্তরবঙ্গে ঘড়িয়াল খুবই ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাণী বলে পরিচিত ছিল।

বন অধিদফতরের বন সংরৰক (বন্যপ্রাণী) তপন কুমার জানিয়েছেন, ঘড়িয়াল এদেশে এখন বিলুপ্তপ্রায় মহাবিপদাপন্ন এক সরীসৃপ। এক সময় পদ্মা ও যমুনা নদীতে প্রচুর ঘড়িয়ালের আনাগোনা ছিল। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ ও জলজ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এদের অসত্মিত্ব নেই বললেই চলে।

বর্তমানে রাজশাহী শহর সংলগ্ন পদ্মা নদীতে মাঝে মধ্যে দেখা মেলে বলে জানা গেছে। তবে এদের বিচরণ ক্ষেত্র রাজশাহী হতে আরিচা এলাকা পর্যনত্ম বিসত্মৃত।

বন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা চিড়িয়াখানায় ৪টি, রাজশাহী চিড়িয়াখানায় ৩টি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, কঙ্বাজারে ১টি ঘড়িয়াল আছে।

ঘড়িয়াল খুবই ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাণী। মূলত পদ্মা-যমুনাতেই এর বড় আস্থানা। বাংলাদেশ ছাড়াও উত্তর ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্থানে এদের দেখা মিলতো।

তবে এখন পাকিস্থান ও ভুটানে কোন ঘড়িয়াল নেই। শুধু ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের কয়েকটি নির্দিষ্ট নদীতে ঘড়িয়ালের দেখা মেলে। বাংলাদেশে ঘড়িয়ালের আবাস প্রধানত, যমুনা নদীর ফুলছড়ি ঘাট থেকে নগরবাড়ী ঘাট পর্যন্ত এবং পদ্মা নদীর চারঘাট থেকে গোদাগাড়ী পর্যন্ত।

দলিল-দস্তাবেজ মতে, বর্তমানে ভারতের চম্বল, গীতা, সন, মহানদী, কেন, রামগেঙ্গা, ইয়ামুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে প্রায় ১৬০টি এবং নেপালের নারায়ণী, কার্নালি, বাবাই ও কোশি নদীতে প্রায় ৪০টির মতো ঘড়িয়াল বসবাস করছে।

দেশী-বিদেশী অনেক গবেষকরা জোর দিয়েই বলছেন ঘড়িয়াল বাংলাদেশ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। আমাদের দেশে ঘড়িয়াল বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষণাও করা হয়েছে। কিন্তু কোন তথ্যের উপর ভিত্তি করে তারা বলছেন তার প্রমাণ তারা দিতে পারেননি।

বিগত কয়েক বছরে পদ্মা নদীতে মোট ছয়টি ঘড়িয়ালের বাচ্চা ও একটি মা ঘড়িয়ালের সন্ধান পাওয়া গেছে। গত বছর রাজশাহীর পদ্মা নদীতে দুটি (০২) দুই মাস বয়সী বাচ্চা ঘড়িয়াল ধরা পড়েছিল। এর একটিকে ঢাকা ও অন্যটি রাজশাহী চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু দুটিই শেষ পর্যন্ত মারা যায়।

অতি সম্প্রতি ১২ অক্টোবর ২০১১ মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার কবিরপুর চরে পদ্মা নদীতে জেলেদের জালে ২ দশমিক ৫ ফুট লম্বা একটি ধরা পড়ে। পরে বাচ্চা ঘড়িয়ালটিকে ঢাকা বা রাজশাহী চিড়িয়াখানায় কিংবা কোন সাফারী পার্কে না রেখে শেষ পর্যন্ত যেখান থেকে ধরা হয়েছিল সেখানেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি ভালো কাজ হয়েছে। কারণ প্রকৃতিই তার আসল জায়গা।

যাহোক, বার বার বাচ্চা ঘড়িয়াল ধরা পড়ার অর্থ হলো প্রকৃতিতে বাবা-মা অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক ঘড়িয়ালও রয়েছে। অর্থাৎ এখনো আমাদের দেশ থেকে ঘড়িয়াল বিলুপ্ত হয়নি। কাজেই ঘড়িয়াল যে আমাদের দেশে এখনও টিকে আছে তা বলার অবকাশ রাখেনা।

কিন্তু এরা যেহেতু এ দেশে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী, তাই এদের রক্ষা করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

১৯৭০ সালের এক গননায় দেখা গেছে গোটা দুনিয়ায় মাত্র দুইশত (২০০) ঘড়িয়াল টিকে আছে। ১৯৭৪ সালে তা ৫০-৬০ এসে দাঁড়ায়। গোটা দুনিয়ায় এখন পর্যন্ত যে ক’টি ঘড়িয়াল টিকে আছে(আনুমানিক ২০০) তার প্রায় সবই এখন ভারতে এবং অল্পকিছু আছে নেপালে।

ঘড়িয়াল বাচানোর জন্য ভারত সরকার বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারাচাম্বাল, গীতা, সোন, মহানদীসহ বেশ কয়েকটি নদীতে ঘড়িয়াল প্রজননের জন্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষনা করে। এর মধ্যে তারা সুফলও পেয়েছে।

ঘড়িয়াল একটি নদীর প্রাণ। একটি নদীর সুস্থ থাকা অনেকাংশে নির্ভর করে ঘড়িয়ালের টিকে থাকার উপর। আমাদের পদ্মা-যমুনায় এখন মাছের পপুলেশন একবারেই হ্রাস পাওয়ার পেছনে ঘড়িয়াল না থাকা অন্যতম দায়ী। ঘড়িয়াল নদীর জীববৈচিত্র্য তথা ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স রক্ষা করে।

এরা আঁশবিহীন কাঁটাযুক্ত বড় মাছ যেমন আইর, বোয়াল, গজার, বাগাড়, পাঙ্গাস সহ অন্যান্য বড় মাছ খায়। ফলে এই রাক্ষুসে মাছগুলোর প্রজনন খুব বেশী বৃদ্ধি পায় না বলে ছোট মাছগুলো সহজেই টিকে থাকতে পারে। এছাড়া ঘড়িয়াল পচা জৈব পদার্থ খেয়ে নদী পরিষ্কার রাখে।

ঘড়িয়াল কখনও মানুষ বা গৃহপালিত পশুকে আক্রমণ করে না। তবে প্রজনন কালে অর্থাৎ যেখানে তারা ডিম পারে সেখানে গেলে তারা তাড়া করে। বাংলাদেশে ত্রিশ বছর আগেও পদ্মা, যমুনা ও তাদের শাখা নদীগুলোতে ঘড়িয়ালের বিচরণ ছিল বেশ। নদীর চরগুলোতে ডিম পেরে বাচ্চা ফুটাতো। বর্তমানে ঘড়িয়াল দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ঘড়িয়াল নদীর উপকারী বন্ধু তা বুঝে উঠার আগেই এদেশের মানুষ তাদের প্রায় হারিয়ে ফেলল।

নদীমাতৃক বাংলাদেশ থেকে ঘড়িয়াল হারিয়ে যাবার অন্যতম কারণ হল নদীতে ঘড়িয়ালের খাবার ও ডিম পারার জায়গার পর্যাপ্ত অভাব। প্রায় সব চরেই মানুষের বিচরণ হওয়ায় ঘড়িয়াল বাচ্চা ফুটানোর জায়গা পাচ্ছে না। জেলেদের চাপ নদীতে বেড়ে যাবার কারনে ঘড়িয়ালের বাচ্চা ঘন ঘন জেলেদের জালে আটকা পড়ে। আর জালে আটকা পড়া ঘড়িয়ালের বাচ্চা খুব কমই নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়।

এদেশে ঘড়িয়াল নিয়ে গবেষণাও কম হয়েছে। দেশে বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন প্রজাতি নিয়ে কাজ করছে সেন্টার ফর এ্যাডভান্স রিসার্চ ইন ন্যাচারাল রিসোর্সেস এ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (ক্যারিনাম) নামের একটি বেসরকারী সংস্থা। কারিনাম ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্পিসিস কনজারভেশন, ইকোসিস্টেম ম্যানেজমেন্ট, ন্যাচারাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, ইমপ্যাক্ট অফ ক্লাইমেট চেঞ্জ অন বায়োডাইভারসিটি এবং রিনেউয়েবল ইনার্জি নিয়ে গবেষণা এই সংস্থার প্রধান কাজ।

বন মন্ত্রালয়ের অনুমতিক্রমে ইতিমধ্যেই কারিনাম পদ্মা ও যমুনাতে ঘড়িয়াল জরিপ শুরু করেছে। সমপ্রতি তারা পদ্মা নদীর চারঘাট থেকে হাকিমপুর, গোদাগাড়ি (ভারতীয় সীমানার কাছাকাছি মহানন্দা নদীর মুখ) এবং যমুনা নদী ফুলছড়ি/গাইবান্ধা থেকে ফাইসার চর (চিলমারী-র উত্তরে) জরিপ করেছে।

কারিনাম এখন মাঠপর্যায়ে প্রজননখ্খম ঘড়িয়াল ও তাদের আবাস্থলের দিকে নজর রাখছে এবং সাধারণ মানুষকে বাংলাদেশের যে কোন জায়গায় ঘড়িয়াল সম্পর্কে কোন তথ্য থাকলে তা জানানোর জন্য অনুরোধ করছে।

সংস্থার নির্বাহী প্রধান ডক্টর এস এম এ রশীদের তত্ত্বাবধানে একটি ঘড়িয়াল সার্ভে প্রকল্পও রয়েছে। বর্তমানে যে দু’চারটি ঘড়িয়াল টিকে আছে তা বাঁচাবার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

তিনি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ঘড়িয়াল নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য রৰা করে। বিশেষ করে নদীতে ঘড়িয়াল থাকলে সেখানে মাছ থাকে। কারণ ঘড়িয়ালের প্রধান খাদ্য হলো রাৰুসে মাছ।

তিনি বলেন, নদীতে ঘড়িয়াল থাকলে বলা যায় নদী ভাল আছে। কিন্তু দেশের প্রধান নদ-নদী থেকে মেছো কুমির নামে পরিচিত এ প্রজাতিটি এখন বিলুপ্তির পথে।

তিনি আরও জানান পদ্মা ও যমুনা নদীতে বড়জোর একজোড়া প্রাপ্তবয়স্ক ঘড়িয়াল থাকতে পারে। এদের থেকে যে বাচ্চা হচ্ছে সেগুলো মাঝে মধ্যে জেলেদের জালে আটকা পড়ছে। জানা গেছে, নদীতে অবাধে মাছ শিকার, মাছ ধরার জন্য বিশেষ ধরনের নেট ব্যবহার, ঘড়িয়ালের আবাসস্থল বিনষ্ট ও নদীতীরে ডিম পাড়ার উপযুক্ত বালুময় বেলাভূমিসমূহে গো-চারণ ও ডিম নষ্ট করার কারণে প্রকৃতি থেকে ঘড়িয়াল হারিয়ে যাচ্ছে।

এদের রক্ষা করার জন্য ভারত ও নেপালের মতো আমাদের দেশেও ক্যাপটিভ ব্রিডিং প্রোগ্রাম নেয়া জরুরী।

বাংলাদেশের অন্যতম কুমির গবেষক হলেন ড. এস এম এ রশীদ। ( He is a wildlife biologist and works for Centre for Advanced Research in Natural Resources and Management (CARINAM). He is also a member of the Crocodile Specialist Group of the Species Survival Commission of World Conservation Union (IUCN).

তার প্রচেষ্টায় ও তত্নাবধানে লোনা পানির কুমিরের খামার (বাংলাদেশের প্রথম ক্যাপটিভ ব্রিডিং লোনা পানির কুমিরের খামার) গঠন করে সাফল্য এসেছে শতভাগ।

এখন ঘড়িয়াল বাঁচাবার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছেন সেন্টার ফর এ্যাডভান্স রিসার্চ ইন ন্যাচারাল রির্সোসেস এ্যান্ড মানেজমেন্টের (ক্যারিনাম) হয়ে। মোহাম্মাদ বিন জায়েদ স্পিসিস কনজারভেশন ফান্ড (Mohamed Bin Zayed Species Conservation Fund)এর সহযোগীতায় এরই মধ্যে গোটা পদ্মা ও যমুনায় ঘড়িয়াল সংরক্ষণে কাজ শুরু করেছে ক্যারিনাম।

শীতকালীন শুমারিতে মোট ৭টি ঘড়িয়ালের সন্ধান দিয়েছেন তারা। এছাড়া ঘড়িয়ালের জন্য মূল্যবান জায়গাগুলি সনাক্ত করা হয়েছে। এখন সরকার ও স্থানীয় জনগনের সহযোগীতা পেলে গড়ে তোলা হবে ঘড়িয়াল অভয়ারণ্য। বিশাল পদ্মা-যমুনার ছোট ছোট পাঁচ-ছয়টি জায়গায় ঘড়িয়াল ছেড়ে দিলেই নদীর প্রাণ ঘড়িয়াল বাঁচানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন ক্যারিনাম প্রধান ড. এস এম এ রশীদ।

ঘড়িয়ালের জন্য মূল্যবান জায়গাগুলি হল গোদাগারীর হাকিমপুর থেকে আশারিয়াদহ, পবার গোহামবনা থেকে রাজশাহী খানপুর, বগুড়ার সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশ্যা, গাইবান্দার লালসামার ও কুড়িগ্রামের তিস্তা নদীর হরিরামপুর চর।

সম্প্রতি ক্যারিনামের গবেষনা থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে ঘড়িয়াল হরিয়ে যাবার অন্যতম কারন হিসেবে দেখা গেছে :

** প্রায় ৮০ ভাগ আটকে পড়া ঘড়িয়ালের বাচ্চাকেই মেরে ফেলা হয়। আর বাকি ২০ ভাগ চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ বছর যে ৬টি ঘড়িয়ালের বাচ্চা জিবীত পাওয়া গেছে তার ৪টি চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে পর্যাপ্ত যত্নের অভাবে ঢাকা ও রাজশাহী চিড়িয়াখানার ঘড়িয়াল ছানাগুলো মারা পড়ে।

** নদীতে অবাধে মাছ শিকার, মাছ ধরার জন্য বিশেষ ধরনের নেট ব্যবহার, নদীতীরে ডিম পাড়ার উপযুক্ত বালুময় বেলাভূমিসমূহে গো-চারণ ও ডিম নষ্ট করার কারণে প্রকৃতি থেকে ঘড়িয়াল হারিয়ে যাচ্ছে।

** ঘড়িয়াল হরিয়ে যাবার অন্যতম আরও একটি কারণ হল ভারতের সাথে আমাদের পানি বন্টন। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে একদম পানি না থাকার কারণে ঘড়িয়ালরা টিকতে পারেনা।

** ফারাক্কা বাঁধ ও জলজ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে ঘড়িয়ালের আবাসস্থল বিনষ্ট হওয়া।

** এছাড়াও জলবায়ুর বিপর্যয়ে উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এর প্রভাবও ঘড়িয়াল টিকে থাকার জন্য হুমকি বলে গবেষকরা বলছেন।



আমরা আর ঘড়িয়ালকে হারাতে দিতে চাইনা। ক্যারিনামের নির্বাহী প্রধান ডক্টর এস এম এ রশীদের তত্ত্বাবধানে ঘড়িয়াল টিকিয়ে রাখার জন্য/ তার ঘড়িয়াল বাঁচাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন :

** এর জন্য সরকারকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।

** এই মুহূর্তে অন্তত একটি/দুটি হলেও ঘড়িয়াল অভয়ারণ্য ঘোষণা করা খুবই জরুরী।

** সাথে সাথে গবেষণার পাশাপাশি সবাইকে পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে হবে।

** আর এ জন্য সরকারের পাশাপাশি প্রকৃতি ও প্রাণী সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে হবে।

** এ ছাড়া জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তাদেরকে বোঝাতে হবে এখন ঘড়িয়াল এদেশে বিলুপ্তপ্রায় এক জলচর সরীসৃপ, বর্ত্.মানে যে কয়টা আছে তাদেরকে টিকিয়ে রাখতে হবে।

** বিশেষ করে জেলে ও ঘড়িয়ালের আবাসস্থলের নিকটবর্তী এলাকার লোকজনকে বোঝাতে হবে, জালে আটকা পড়লে বা কোনোভাবে ঘড়িয়াল সামনে পড়লে যেন তাকে পিটিয়ে না মারা হয়।

আবারও বলব:

• আজ ঘড়িয়াল এক বিলুপ্তপ্রায় মহাবিপদাপন্ন প্রাণী।

• নদীতে ঘড়িয়াল থাকলেই নদী ভাল থাকে।

আর তাই ঘড়িয়ালকে সংরক্ষণ করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।



[email protected]

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২৮ শে এপ্রিল, ২০১২ দুপুর ১:০১

কার্জন আরিফ বলেছেন: নদীতে ঘড়িয়াল থাকলেই নদী ভাল থাকে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.