নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মৃত্যুঞ্জয় একটি মুক্ত চিন্তার প্ল্যাটফর্ম—যেখানে বাংলাদেশ, তার মানুষ, সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে আলোচনা করা হয়।

মৃত্যুঞ্জয়

মৃত্যুঞ্জয় › বিস্তারিত পোস্টঃ

জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ । সংবিধান সংস্কারে যে ৪৮ প্রস্তাব নিয়ে গণভোট

০৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪১




জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসন-পুলিশ সংস্কার এবং দুর্নীতি কমানোর জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা।

জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫-এ সংবিধান সংস্কার বিষয়ে যে ৪৮টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে সেগুলো হলোঃ

সংবিধান সংস্কারে যে ৪৮ প্রস্তাব নিয়ে গণভোট


১। ভাষাঃ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহৃত অন্য সব ভাষাকে দেশের প্রচলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হবে।

২। বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয়ঃ বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ বর্ণিত ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন’ বিধানটি নিম্নোক্তভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে : “বাংলাদেশের নাগরিকগণ ‘বাংলাদেশি’ বলিয়া পরিচিত হইবেন।

৩। সংবিধান সংশোধনঃ সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে; তবে প্রস্তাবসহ সুনির্দিষ্ট কতগুলো অনুচ্ছেদ যথা—৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যা অনুচ্ছেদ ৫৮ক, ২ক পরিচ্ছেদ (৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮ঙ অনুচ্ছেদ) হিসেবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে।

৪। সংবিধান বিলুপ্তি ও স্থগিতকরণ ইত্যাদির অপরাধঃ সংবিধানবিষয়ক অপরাধ ও সংবিধান সংশোধনের সীমাবদ্ধতাবিষয়ক বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক এবং ৭খ বিলুপ্ত করা হবে।

৫। ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলিঃ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০(২) সংশোধন করা হবে এবং এ সংশ্লিষ্ট পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল সংবিধানে রাখা হবে না।

৬। জরুরি অবস্থা ঘোষণাঃ (জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’-এর পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতার হুমকি, মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ভিত্তি করা হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণায় মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধীদলের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে এবং নাগরিকের জীবনের অধিকার ও বিচার-দণ্ড সম্পর্কিত মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

৭। মূলনীতিসমূহঃ সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ উল্লেখ থাকবে।

৮। সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদাঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশ একটি বহু-জাতি-গোষ্ঠী, বহু-ধর্মী, বহুভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ, যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।

৯। মৌলিক অধিকারগুলোর তালিকা সম্প্রসারণঃ নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সেগুলোর সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রস্তাবগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হবে, যাতে রাজনৈতিক দলের নেতারা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধিরা সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও আইনি বিধানাবলি পরিবর্তন করতে পারেন।

১০। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী আইনসভার উভয় কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৪)-এ বর্ণিত যোগ্যতাগুলো এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পদে থাকতে পারবেন না।

১১। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্বঃ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট কিছু সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সদস্যদের স্বাধীনভাবে নিয়োগ দিতে পারবেন।

১২। রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়াঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে প্রেরণ এবং উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

১৩। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে তিনি ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। সংশ্লিষ্ট আইনে এরূপ বিধান রাখা হবে যে এরূপ কোনো আবেদন বিবেচনার আগে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করা হবে।

১৪। প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদঃ একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যতবারই হোক সর্বোচ্চ ১০ দশ বছর থাকতে পারবেন, এ জন্য সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।

১৫। প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না।

১৬। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাঃ সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য স্পিকারের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, ডেপুটি স্পিকার ও দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে ৫ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হবে।

১৭। আইনসভা গঠনঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশে একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে, যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) সমন্বয়ে গঠিত হবে।

১৮। উচ্চকক্ষের গঠনঃ উচ্চকক্ষ ১০০ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। সদস্যরা নিম্নকক্ষ নির্বাচনে পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন। মেয়াদ হবে ৫ বছর। রাজনৈতিক দলগুলোর উচ্চকক্ষ প্রার্থী তালিকায় কমপক্ষে ১০% নারী প্রার্থী রাখা বাধ্যতামূলক।

১৯। উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও ভূমিকাঃ উচ্চকক্ষ মূলত নিম্নকক্ষের আইন পর্যালোচনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্যান্য বিল উচ্চকক্ষের অনুমোদনের জন্য যাবে, তবে উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না। দুই মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত না দিলে বিল অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। সংবিধান সংশোধন বিল উচ্চকক্ষেও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করতে হবে।

২০। উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতাঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নিম্নকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতার অনুরূপ হবে।

২১। জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বঃ জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে ১০০ আসনে উন্নীত করা হবে।

২২। জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পদ্ধতিঃ জাতীয় সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন বহাল থাকবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো ধাপে ধাপে সাধারণ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের হার বৃদ্ধি করবে। লক্ষ্য হলো সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী তালিকায় ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।

২৩। ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে মনোনয়নঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে আইনসভার উভয় কক্ষে একজন করে ডেপুটি স্পিকার সরকারদলীয় সদস্য ছাড়া অন্য সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত করা হবে।

২৪। সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতিঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে।

২৫। জাতীয় সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোটদানঃ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০-এর বিদ্যমান বিধান পরির্বতন করে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় সংসদের সদস্যরা কেবল অর্থবিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

২৬। আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনসভায় অনুমোদনঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এরূপ আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের পর আইনসভার উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদন (রেটিফাই) করা হবে।

২৭। প্রতি জনশুমারি বা ১০ বছর পর পর সীমানা পুনর্নির্ধারণঃ প্রতি জনশুমারি বা সর্বোচ্চ ১০ বছর পরপর সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। এ কাজে সহায়তার জন্য আইন অনুযায়ী একটি অস্থায়ী বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা হবে এবং তার গঠন ও কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হবে।

২৮। আপিল বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগঃ প্রধান বিচারপতি নিয়োগে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। সাধারণ নিয়ম হিসেবে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিই প্রধান বিচারপতি হবেন; তবে কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের তদন্ত চলমান থাকলে তিনি বিবেচিত হবেন না।

৩০। আপিল বিভাগের বিচারকসংখ্যাঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে ‘আপিল বিভাগের বিচারকসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রধান বিচারপতির চাহিদা মোতাবেক, সময়ে সময়ে, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগ করা যাবে।

৩১। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠন করা হবে।

৩২। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত বিধানঃ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

৩৩। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে।

৩৪। বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণঃ রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে, তবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে প্রধান বিচারপতি, সময়ে সময়ে, যে সার্কিট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন তার পরিবর্তে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

৩৫। বিচারকদের পদের মেয়াদ ও তাঁদের অপসারণঃ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬-এ বর্ণিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা ও এর এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে।

৩৬. বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণঃ অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৬ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করা হবে।

৩৭। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে সংবিধানের অধীনে সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা ইউনিটের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করা হবে।

৩৮। নির্বাচন কমিশন নিয়োগঃ নির্বাচন কমিশন নিয়োগে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে বাছাই কমিটি; স্বচ্ছ অনুসন্ধান ও সংসদীয় আইনের মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত।

৩৯। ন্যায়পাল নিয়োগঃ দেশে একজন ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি ও আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে; মেয়াদ হবে ৫ বছর এবং যোগ্যতা, ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।

৪০। সরকারি কর্ম কমিশন নিয়োগঃ সরকারি কর্ম কমিশনকে পুনর্গঠন করে ৩টি কমিশন করা হবে। প্রতিটি কমিশনে চেয়ারম্যান ও ৭ জন সদস্য থাকবে। স্পিকারসহ সংসদীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হবে এবং কমিশনের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও অপসারণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

৪১। মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগঃ মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগে সংসদীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। স্বচ্ছ অনুসন্ধান ও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করে রাষ্ট্রপতি ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দেবেন। পদটির স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও অপসারণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

৪২। দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়োগঃ দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান করা হবে। বিচার বিভাগ, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংসদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ করা হবে। কমিশনে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে, মেয়াদ হবে ৪ বছর এবং অপসারণে সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকবে

৪৩। সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধান সংশোধনঃ সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনুপার্জিত আয় রোধ করা হবে। রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে যাতে সকল ধরনের শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষের সৃজনশীল ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে।

৪৪। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচনঃ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

৪৫। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনাঃ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। জাতীয় পরিকল্পনার বাইরে স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কাজে তাদের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।

৪৬। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অধীনে ন্যস্ত করাঃ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অধীনে কাজ করবেন এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি বিভাগগুলো স্থানীয় সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করবে

৪৭। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল সংগ্রহঃ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্বভাবে তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। তবে নির্ধারিত সীমার বেশি তহবিলের প্রয়োজন হলে তা আইনসভার উচ্চকক্ষের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে।

৪৮। সংসদ, সংসদীয় কমিটি ও সদস্যদের অধিকার, অধিকার সীমা ও দায় সম্পর্কিত আইন প্রণয়নঃ সংসদীয় কমিটি ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার, সেই অধিকারের সীমা এবং দায়-দায়িত্ব আইন দ্বারা নির্ধারণ করা হবে।

সংবিধান সংস্কার, গণতন্ত্রের বিকাশ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণের মতামতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসন-পুলিশ সংস্কার এবং দুর্নীতি কমানোর জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা।

জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫-এ সংবিধান সংস্কার বিষয়ে যে ৪৮টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে সেগুলো হলোঃ

সংবিধান সংস্কারে যে ৪৮ প্রস্তাব নিয়ে গণভোট


১। ভাষাঃ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহৃত অন্য সব ভাষাকে দেশের প্রচলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হবে।

২। বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয়ঃ বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ বর্ণিত ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন’ বিধানটি নিম্নোক্তভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে : “বাংলাদেশের নাগরিকগণ ‘বাংলাদেশি’ বলিয়া পরিচিত হইবেন।

৩। সংবিধান সংশোধনঃ সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে; তবে প্রস্তাবসহ সুনির্দিষ্ট কতগুলো অনুচ্ছেদ যথা—৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যা অনুচ্ছেদ ৫৮ক, ২ক পরিচ্ছেদ (৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮ঙ অনুচ্ছেদ) হিসেবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে।

৪। সংবিধান বিলুপ্তি ও স্থগিতকরণ ইত্যাদির অপরাধঃ সংবিধানবিষয়ক অপরাধ ও সংবিধান সংশোধনের সীমাবদ্ধতাবিষয়ক বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক এবং ৭খ বিলুপ্ত করা হবে।

৫। ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলিঃ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০(২) সংশোধন করা হবে এবং এ সংশ্লিষ্ট পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল সংবিধানে রাখা হবে না।

৬। জরুরি অবস্থা ঘোষণাঃ (জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’-এর পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতার হুমকি, মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ভিত্তি করা হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণায় মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধীদলের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে এবং নাগরিকের জীবনের অধিকার ও বিচার-দণ্ড সম্পর্কিত মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

৭। মূলনীতিসমূহঃ সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ উল্লেখ থাকবে।

৮। সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদাঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশ একটি বহু-জাতি-গোষ্ঠী, বহু-ধর্মী, বহুভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ, যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।

৯। মৌলিক অধিকারগুলোর তালিকা সম্প্রসারণঃ নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সেগুলোর সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রস্তাবগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হবে, যাতে রাজনৈতিক দলের নেতারা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধিরা সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও আইনি বিধানাবলি পরিবর্তন করতে পারেন।

১০। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী আইনসভার উভয় কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৪)-এ বর্ণিত যোগ্যতাগুলো এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পদে থাকতে পারবেন না।

১১। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্বঃ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট কিছু সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সদস্যদের স্বাধীনভাবে নিয়োগ দিতে পারবেন।

১২। রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়াঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে প্রেরণ এবং উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

১৩। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে তিনি ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। সংশ্লিষ্ট আইনে এরূপ বিধান রাখা হবে যে এরূপ কোনো আবেদন বিবেচনার আগে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করা হবে।

১৪। প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদঃ একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যতবারই হোক সর্বোচ্চ ১০ দশ বছর থাকতে পারবেন, এ জন্য সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।

১৫। প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না।

১৬। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাঃ সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য স্পিকারের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, ডেপুটি স্পিকার ও দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে ৫ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হবে।

১৭। আইনসভা গঠনঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশে একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে, যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) সমন্বয়ে গঠিত হবে।

১৮। উচ্চকক্ষের গঠনঃ উচ্চকক্ষ ১০০ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। সদস্যরা নিম্নকক্ষ নির্বাচনে পাওয়া ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন। মেয়াদ হবে ৫ বছর। রাজনৈতিক দলগুলোর উচ্চকক্ষ প্রার্থী তালিকায় কমপক্ষে ১০% নারী প্রার্থী রাখা বাধ্যতামূলক।

১৯। উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও ভূমিকাঃ উচ্চকক্ষ মূলত নিম্নকক্ষের আইন পর্যালোচনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্যান্য বিল উচ্চকক্ষের অনুমোদনের জন্য যাবে, তবে উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না। দুই মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত না দিলে বিল অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। সংবিধান সংশোধন বিল উচ্চকক্ষেও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করতে হবে।

২০। উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতাঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নিম্নকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতার অনুরূপ হবে।

২১। জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বঃ জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে ১০০ আসনে উন্নীত করা হবে।

২২। জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পদ্ধতিঃ জাতীয় সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন বহাল থাকবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো ধাপে ধাপে সাধারণ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের হার বৃদ্ধি করবে। লক্ষ্য হলো সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী তালিকায় ৩৩% নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।

২৩। ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে মনোনয়নঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে আইনসভার উভয় কক্ষে একজন করে ডেপুটি স্পিকার সরকারদলীয় সদস্য ছাড়া অন্য সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত করা হবে।

২৪। সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতিঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে।

২৫। জাতীয় সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোটদানঃ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০-এর বিদ্যমান বিধান পরির্বতন করে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় সংসদের সদস্যরা কেবল অর্থবিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

২৬। আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনসভায় অনুমোদনঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এরূপ আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের পর আইনসভার উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদন (রেটিফাই) করা হবে।

২৭। প্রতি জনশুমারি বা ১০ বছর পর পর সীমানা পুনর্নির্ধারণঃ প্রতি জনশুমারি বা সর্বোচ্চ ১০ বছর পরপর সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। এ কাজে সহায়তার জন্য আইন অনুযায়ী একটি অস্থায়ী বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা হবে এবং তার গঠন ও কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হবে।

২৮। আপিল বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগঃ প্রধান বিচারপতি নিয়োগে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। সাধারণ নিয়ম হিসেবে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিই প্রধান বিচারপতি হবেন; তবে কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের তদন্ত চলমান থাকলে তিনি বিবেচিত হবেন না।

৩০। আপিল বিভাগের বিচারকসংখ্যাঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে ‘আপিল বিভাগের বিচারকসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রধান বিচারপতির চাহিদা মোতাবেক, সময়ে সময়ে, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগ করা যাবে।

৩১। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠন করা হবে।

৩২। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত বিধানঃ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

৩৩। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে।

৩৪। বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণঃ রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে, তবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে প্রধান বিচারপতি, সময়ে সময়ে, যে সার্কিট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন তার পরিবর্তে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

৩৫। বিচারকদের পদের মেয়াদ ও তাঁদের অপসারণঃ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬-এ বর্ণিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা ও এর এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে।

৩৬. বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণঃ অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৬ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করা হবে।

৩৭। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনঃ সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে সংবিধানের অধীনে সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা ইউনিটের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করা হবে।

৩৮। নির্বাচন কমিশন নিয়োগঃ নির্বাচন কমিশন নিয়োগে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে বাছাই কমিটি; স্বচ্ছ অনুসন্ধান ও সংসদীয় আইনের মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত।

৩৯। ন্যায়পাল নিয়োগঃ দেশে একজন ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি ও আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে; মেয়াদ হবে ৫ বছর এবং যোগ্যতা, ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।

৪০। সরকারি কর্ম কমিশন নিয়োগঃ সরকারি কর্ম কমিশনকে পুনর্গঠন করে ৩টি কমিশন করা হবে। প্রতিটি কমিশনে চেয়ারম্যান ও ৭ জন সদস্য থাকবে। স্পিকারসহ সংসদীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হবে এবং কমিশনের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও অপসারণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

৪১। মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগঃ মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগে সংসদীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। স্বচ্ছ অনুসন্ধান ও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করে রাষ্ট্রপতি ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দেবেন। পদটির স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ও অপসারণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

৪২। দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়োগঃ দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান করা হবে। বিচার বিভাগ, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংসদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ করা হবে। কমিশনে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে, মেয়াদ হবে ৪ বছর এবং অপসারণে সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকবে

৪৩। সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধান সংশোধনঃ সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনুপার্জিত আয় রোধ করা হবে। রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে যাতে সকল ধরনের শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষের সৃজনশীল ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে।

৪৪। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচনঃ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

৪৫। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনাঃ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। জাতীয় পরিকল্পনার বাইরে স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কাজে তাদের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।

৪৬। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অধীনে ন্যস্ত করাঃ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অধীনে কাজ করবেন এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি বিভাগগুলো স্থানীয় সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করবে

৪৭। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল সংগ্রহঃ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্বভাবে তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। তবে নির্ধারিত সীমার বেশি তহবিলের প্রয়োজন হলে তা আইনসভার উচ্চকক্ষের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে।

৪৮। সংসদ, সংসদীয় কমিটি ও সদস্যদের অধিকার, অধিকার সীমা ও দায় সম্পর্কিত আইন প্রণয়নঃ সংসদীয় কমিটি ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার, সেই অধিকারের সীমা এবং দায়-দায়িত্ব আইন দ্বারা নির্ধারণ করা হবে।

সংবিধান সংস্কার, গণতন্ত্রের বিকাশ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণের মতামতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.