| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
লাইফ স্টাইল
মূল: ফারনান্ডো সরেন্টিনো
অনুবাদ/রূপান্তর:ফজলুল মল্লিক
যখন যুবক ছিলাম। তখন ভালো একটা ভালো পদে ব্যাংকে চাকুরী ছিলো আমার।
এখন খামারের কাজ কিংবা পশুর রাখালী করতে করতে ভাবি সেই তারুণ্য বেলা।
শুধু্ একটা ঘটনা। খুবই তুচ্ছ একটা ঘটনা আমার জীবনধরণ পাল্টে দিলো।
তখন চব্বিশ বছর বয়স আমার। আত্মীয় কিংবা কাছের জন বলতেও কেউ ছিলো না। ক্যানিং এবং এরাওজ এর মধ্য দিয়ে সান্তা ফে এভেনিয়্যু। তার মধ্যে অবস্থান বিশাল ভবনের দশতলায় ছোট্ট একটা বাসা। একাই থাকি।
সেই দিনের ঘটনার সূত্রপাত আমার তাড়াহুড়া। খুব তাড়া করেই ব্যাংকের উদ্দেশ্যে বের হচ্ছিলাম । একেবারে চটজলদি দরজাটা খোলার জন্যে তালায় চাবি ঢুকিয়ে ঘুরাতেই চাবির অর্ধেক ভেঙ্গে রয়ে গেলো ভেতরে।
কিছুক্ষণ স্ক্রুডাইভার আর প্লাস দিয়ে খোঁচাখুঁচির ব্যর্থ চেষ্টার পর, তালার মিস্ত্রীকে ফোন দিই।
মিস্ত্রীর প্রতিক্ষার ফাঁকে ব্যাংকে ফোন দিয়ে জানালাম একটু দেরি হবে।
অল্পক্ষণের মধ্যে মিস্ত্রী হাজির। দরজার ফুটো দিয়ে দেখলাম। বয়সে তরুণ অথচ মাথার চুল বুড়োদের মতো ধবধবে সাদা। বললাম তাকে কিভাবে চাবিটার অর্ধেক ভেঙ্গে তালার ভেতর থেকে গেলো।
শুনে ছেলেটি বিরক্ত হলো যেনো। সংক্ষেপে যা বললো তার অর্থ, 'কাজটা অনেক কঠিন। এর জন্যে অন্তত তিন ঘন্টা সময় লাগবে। আর সেজন্যে আমাকে খরচ...'
অর্থাৎ আমার কাছে চড়া পারিশ্রমিক চাইলো। আমিও কোনো উপায় দেখছি না এছাড়া। আমাকে যে বের হতেই হবে। সুতরাং তাই মেনে নিলিাম।
'কিন্তু এ মূহুর্তে আমার কাছে অত টাকা নেই। তুমি তালাটা ঠিক করে দাও। আমি আগে ব্যাংকে যাই। তারপর তোমার পুরো টাকাটা পরিশোধ করবো।'
আমার কথা শুনে সে এমন চোখে তাকালো যেনো আমি তাকে অনৈতিক কিছুর প্রস্তাব দিচ্ছি।
'আমি খুব দুঃখিত জনাব।' স্পষ্ট জবাব দিলো সে। কিছুক্ষণ পর আবার নিজেই বলতে শুরু করলো, 'আমি একজন আর্জেন্টিনা তালামেস্ত্রী সংঘের সদস্য। আমাদের সংগঠনের একটা সংবিধান আছে। এই সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক ধারার একটি হচ্ছে আর্থিক বিনিময় বাকী রাখার সুযোগ নেই। আপনি যদি আমাদের উৎসাহব্যাঞ্জক দলিলগুলো পড়েন তাহলে জানতে পারবেন আমাদের সংগঠনের কিছু মৌলিক নীতির একটি, কাজ শেষে পারিশ্রমিক বাকী রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।'
আমি তার কথা শুনে মৃদু হাসলাম। তাই অবিশ্বাসের সুরে বললাম, 'তুমি অবশ্যই আমার সাথে ঠাট্টা করছো।'
'না, জনাব। আমাদের আর্জেন্টিনা তালামিস্ত্রী সংঘের ম্যাগনা কার্টায় ঠাট্টা বিদ্রুপ বলতে কোনো বিষয় নেই।
আমাদের ম্যাগনা কার্টায় অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করার মতো কোনো কিছু লেখা নেই। বছরের পর বছর কষ্টসাধ্য পড়াশুনার পর বুঝতে পেরেছি এই সংবিধানের বিভিন্ন অধ্যায়গুলো গূঢ় ও মৌলিক নীতিগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। অবশ্য কেউ কেউ এটা বুঝতে পারে না। কেননা আমরা এর জন্যে প্রতিকী ও রহস্যমূলক ভাষা ব্যবহার করি। সে যাই হোক, আমি বিশ্বাস করি, আপনি আমাদের সংঘ সংবিধানের সুচনা অধ্যায়ের ৭ ধারা বুঝতে পারবেন। সেখানে বলা আছে, "সোনা দ্বার উন্মুক্ত করে আর দ্বার তার অর্চনা করে"।'
'স্যরি, আমি তোমার এমন হাস্যকর কথা গ্রহন করতে রাজি নই। দয়া করে যুক্তির কাছে এসো। দরজাটা খোলো, ভাই। আমি তোমার পাওনা তক্ষুনি দিয়ে দেবো।'
আমার কথা তার মন গলেনি, শুধু শুনলো। বললো, 'আমি খুব দুঃখিত, জনাব। প্রত্যেক পেশায় কতোগুলো নীতিতত্ত্ব থাকে। আমরা তার ব্যতিক্রম নই। আমাদের কাজ বড়ো কঠিন। ভালো থাকুন, স্যার।'
আমাকে হতাশ করে ছেলেটা চলে গেলো।
আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর আবার ব্যাংকে ফোন করে জানালাম, সম্ভবত আজ আমার পক্ষে আসা সম্ভব নয়।
এরপর সফেদ চুলওয়ালা তালা-মিস্ত্রীর কথা ভেবে নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, ঐ লোকটা আসলেই উন্মাদ।
আরেকটা মিস্ত্রীকে ফোন করার আগে ভেবে ঠিক করলাম অন্তত কাজ শেষের আগে টাকার কথা বলবো না। আগে দরজা খুলবে তারপর টাকা।
দুই.
আমি ফোন ডিরেক্টরী বই ঘেটে একটা নাম্বার বের করলাম। কল দিতেই ওপাশে নারী কণ্ঠ-
'ঠিকানা বলুন।'
'৩৬৫৩ সান্তা ফে, বাসা ১০-এ।' আমি দ্রুত বললাম।
এক মূহুর্ত যেনো দ্বিধা করলো নারী কণ্ঠ। তারপর আমাকে পুনরায় ঠিকানা বলতে বললো।
আমি আবার ঠিকানা বললাম।
'অসম্ভব, স্যার। আজেন্টিনা তালামিস্ত্রী সংঘ ইতোমধ্যে ঐ ঠিকানায় যে কোনো ধরণের কাজ করতে নিষেধ করেছে।
এই কথাগুলো শুনে রাগ সামলাতে পারলাম না। গর্জে উঠলাম, 'শুনুন! এমন হাস্য...'
আমার কথা শেষ হওয়ার আগে লাইন কেটে গেলো।
এরপর অন্তত বিশটা কল দিলাম অনেকগুলো তালার দোকানে।
আশ্চর্য! যখনি আমার বাসার ঠিকানা বলি, তক্ষুনি তারা কাজ করতে অস্বিকার করে।
ব্যপারটা আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। আর্জেন্টিনা তালামিস্ত্রী সংঘ, ম্যাগনা কার্টা, মৌলিক ধারা, নীতি তত্ত্ব, প্রতিকী ভাষা, গূঢ় অর্থ...যত্তসব উন্মাদোপনা!
আমি একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। আচ্ছা ঠিক আছে। এবার অন্য কোথাও সমাধানের পথ খোঁজা যাক।
এবার আমাদের ভবনের তত্ত্বাবধায়ককে কল করলাম। খুলে বললাম সমস্যাটি।
'দুইটা বিষয়।' সে জবাব দিলো। 'প্রথমত, আমি জানি না কিভাবে তালা খুলতে হয়। দ্বিতীয়ত, যদিও এ কাজ আমি জানি, কিন্তু আমি করবো না। যেখানে আমার কাজ ভবন পরিচ্ছন্ন রাখা। পাখিরা যেনো বাসা বাঁধতে না পারে তার লক্ষ রাখা।... না, না, একাজ আমার নয়। আপনি অন্য উপায় দেখুন। এমন উদারতা আশা করা বড্ড বেমানান!'
তিন.
এ ঘটনার পর ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। অহেতুক ও নীতিহীন কয়েকটা কাজ করে ফেললাম। প্রথমে এক কাপ কফি, তারপর ধুমপান করলাম। একবার বসি, আবার দাঁড়াই, কয়েক কদম হাঁটি, দুই হাত ধুই, একগ্লাস পানি পান করি। বিচ্ছিন্ন কাজগুলো অস্থিরচিত্তে করতে করতে মনিকা ডিচিয়েভের কথা মনে পড়লো।
আমি তার নাম্বার ডায়াল করে কান পেতে অপেক্ষা করছি।
ওপাশে তার কণ্ঠ শুনে কপট মিষ্টি ও উদসীন সুরে বললাম, 'কি খবর, জান? যাচ্ছে ভালো তো সব?'
প্রত্যুত্তরে মনিকা যা বললো তাতে আমার তনু মন কাঁপতে শুরু করলো।
'সুতরাং তুমি? অবশেষে মনে হলো আমাকে ফোন করার? তাহলে আমি বলতে পারি,তুমি আমাকে ভা..লো..বা..সো। তুমি এখন বলবে, আমি তোমাকে ভালোবসি, সুইটি! কিন্তু তুমি গত দু'সপ্তাহ কোথায় হাওয়া হয়ে গিয়েছো?'
এই মহিলার সাথে তর্ক করা, কিংবা কথার পিঠে কথা বলা আমার সাধ্যের অতীত। বিশেষ করে তার বর্তমান মনস্তাত্মিক হীনতার মাঝে, যেখানে আমি নিজেকে পতিত আবিস্কার করলাম। তবুও বলতে চেষ্টা করলাম কি ঘটনা ঘটছে আমার।
কিন্তু সে আমার কোনো কথাই শুনছে চাইছে না। বার বার অনুরোধ করেছি। কোনো কাজ হয়নি। আমাকে খুব মর্মাহত করলো। খট করে ফোন কেটে দিলো। একটা কথাই শুনলাম শুধু।
'আমি কারো খেলনা নই!'
কানের ভেতর যেনো বোমা ফাটলো। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। মনিকা এমন কথা বলতে পারলো! ভাবতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
হায়রে ভালোবাসা!
হতভম্ব আমি। কি করবো মাথায় ধরছে না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবারও আবোল তাবোল কয়েকটা কাজ করে ফেললাম। তারপর ব্যাংকে কল দিলাম। এবার আশা করছি সাহায্য পাবো। কয়েকজন অধঃস্তন কর্মচারী অবশ্যই এসে দরজা খুলে দেবে।
কিন্তু দুর্ভাগ্য। যেই কল দিলাম, ওপাশ থেকে যার গলা পেলাম, মোটেও প্রত্যাশা করিনি। এনজো পেরেডস, ডাহা মূর্খ লোকটা। ওকে আমি সব সময় ঘৃণা করি।
সে আমার কথা শুনে জঘন্য স্বরে কৌতুক করলো।
'তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, আপনি বন্দি হয়ে আছেন? বের হতে পারছেন না? হুম...আপনি কখনও বের হতে পারবেন না। এই মূহুর্তে ব্যাংক আপনাকে পাচ্ছে না! আফসোস! আফসোস!'
চার.
আমাকে এক জাতীয় গ্রস্ততা ঘিরে ধরলো। নরঘাতী জিদে খটাস করে ফোন রেখে দিলাম। রাগে কাঁপছে শরীর। কোনো উপায় দেখছি না। তবুও আশা। মনে মনে মাইকেল এঞ্জেলো লাপোর্টা। মোটামুটি সুহৃদ। আমার বিশ্বাস তার কাছ থেকে একটা সুন্দর সমাধান পাবো।
কল দিলাম তাকে।
'হু, বলো কি ভাঙলো। চাবি? না তালা?'
'চাবি।' আমি জবাব দিলাম।
'এটা তালার ভেতরে আটকে আছে, তাই তো?'
'হু, অর্ধেক।' আমি তাড়াতাড়ি তার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। বুঝতে পারছি এবার আশাব্যঞ্জক একটা কিছু হবে।
'তুমি কি ভেতরের অংশটি একটা স্ক্রুডাইভারের সাহায্যে বের করার চেষ্টা করোনি?'
'হু, করেছি তো! কিন্তু অসম্ভব!'
'ও...! আচ্ছা, তাহলে এক কাজ করতে পারো।'
'কি! বড্ড আশান্বিত হয়ে উঠছে মনটা।' এবার মুক্তি মিলবে। আনন্দে মনটা আনচান করে উঠলো।
'তাহলে তো একজন মিস্ত্রী দরকার । সে খুলে দেবে।'
আমার মিস্ত্রি! মনটা বিষিয়ে উঠলো। কিন্তু তা প্রকাশ না করে চতুরতার সাথে জবাব দিলাম, 'আমি ইতিমধ্যে কল দিয়েছি।' একটু আগের আশার আলোটা চট করে নিভে গেলো। দমে গেলো মনটা। তার পরিবর্তে বিষম ক্রোধে জ্বলে উঠলো ভেতরটা। তবুও নিজেকে সংযত রেখে মাইকেল এঞ্জেলোর প্রশ্নের জবাবে আবার বললাম, 'কিন্তু তারা আমার কাছে অগ্রীম পরিশোধ চায়।'
'তাহলে তাই করো। অগ্রীম দাও।'
'কিন্তু তুমি তো দেখতে পাচ্ছো আমার হাতে অত টাকা নগদ নেই।'
মাইকেল এঞ্জেলো বিরক্ত হলো, 'তুমি তো দেখছি খরচের ব্যপারে খুব শীর্ণকায়, সমস্যা তোমারই আর তুমি কিনা...'
আমি তৎক্ষনাৎ তার কথার উত্তর দিতে পারিনি। আমার উচিৎ তার কাছে কিছু টাকা ধার চাওয়া কিন্তু তার এমন মন্তব্যে একদম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। এমনকি কোনো কিছু চিন্তাও করতে পারছি না।
দিনটাই এভাবে গেলো।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আরো কয়েক জায়গায় কল দিতে শুরু করলাম। কিন্তু বারবার একই ঘটনা ঘটছে। কোথাও কল যাচ্ছে না। ফোনটাই বিকল হয়ে গেছে। আরেকটি সমস্যা। ব্যাখ্যার অতীত সমস্যা! এবার কিভাবে এটা মেরামত করাবো! যেখানে টেলিফোন করে দরজা খোলা ব্যবস্থা করতে পারছি না, সেখানে টেলিফোন না করে টেলিফোন কিভাবে ঠিক করাই!
ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াই। দেখছি সান্তা ফে এভেনিয়্যু দিয়ে লোকজন হেঁটে যাচ্ছে। চিৎকার করে তাদের ডাকতে লাগলাম।
রাস্তার বিচিত্র আওয়াজ আমার চিৎকারকে চাপিয়ে গেলো। আর কে বা শুনতে পাবে দশ তলা থেকে এমন চিৎকার! শেষ পর্যন্ত একজন দৈবাৎ মানুষ মাথা তুলে তাকালো। অতপর নিজের পথ ধরলো লোকটা।
এরপর, আমি পাঁচটা কাগজ ও চারটা কার্বন কাগজ নিলাম। কাগজগুলো একটার পর একটা সাজিয়ে তাতে লিখলাম-
জনাব/জনাবা,
তালার ভেতর আমার চাবি ভেঙ্গে আটকে আছে। দুদিন ধরে বন্দি আমি। প্লিজ, কেউ আমার মুক্তির জন্যে কিছু করুন।
৩৬৫৩ সান্তা ফে
বাসা ১০-এ।
কাগজ পাঁচটি রেইলিং এর উপর দিয়ে ছুড়ে মারলাম নিচের দিকে। এতো উপর থেকে কাগজগুলো খাড়াভাবে নিচের দিকে পড়তে পড়তে সুক্ষ্ম বিন্দুর মতো লাগছে। কাগজগুলো অদ্ভুদ কুণ্ডলী পাকাতে পাকাতে দীর্ঘক্ষণ অস্থিরতা প্রকাশ করলো। তারপর দুটি পড়লো গিয়ে রাস্তায়, একটা উপর দিয়ে উড়ে একটানা চলতে থাকা গাড়িতে পড়লো। চতুর্থটা পড়লো একটা দোকানের ছাউনির উপর। সবশেষে পঞ্চমটা প্বার্শ রাস্তার উপর পড়লো।
তক্ষুনি একজন ভদ্রলোক এটা তুলে নিলেন। দশতলা থেকে খুবই ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে লোকটাকে। কাগজে কি লিখা আছে পড়লেন। তারপর বাম হাত দিয়ে চোখের উপর ছায়া ফেলে উপর দিকে তাকালেন। আমি তার দিকে সুপ্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালাম।
ভদ্রলোক কাগজটি ছোট ছোট অনেক টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললেন। তারপর রাগান্বিত ভঙ্গিতে নর্দমায় নিক্ষেপ করলেন।
এ চেষ্টাও আমি ব্যর্থ হলাম।
এভাবে বেশ কয়েক সপ্তাহ আমি সকল ধরণের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলাম। শত শত চিরকুট ছাড়লাম বেলকনি থেকে। অনেকে পড়লোই না, অনেকে পড়লো কিন্তু ব্যপারটা সিরিয়াসলি নিলো না।
একদিন, একটা খাম দেখলাম আমার বাসার দরজার নিচ দিয়ে পড়ে থাকতে। টেলিফোন বিলের কাগজ।
টেলিফোন বিল পরিশোধ করতে পারিনি বলে লাইন কেটে দিলো কর্তৃপক্ষ। তারপর এর ধারাবাহিকতায় গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিলো।
প্রথমে, আমি আমার খোরাক অযৌক্তিক উপায়ে খরচ করে ফেললাম। তখন আমার অনুভব হয়েছিলো আমি কি করছিলাম।
আমি বেলকনিতে বৃষ্টির পারি ধরে রাখতে পাত্র রাখতাম।
ফুলদানি থেকে ফুলের গাছগুলো তুলে তাতে টমেটো, মশুর ডাল, এবং অন্যান্য শাকসবজি রোপন করলাম। সেগুলো ভালোবাসা আর শ্রমসাধ্য যত্ন দিয়ে চাষ করলাম। কিন্তু আমার যে প্রাণিজ আমিষ দরকার! সুতরাং কীট পতঙ্গ, মাকড়শার দিকে মনোনিবেশ করি। তাদের বংশ বিস্তারে দক্ষ হয়ে উঠলাম। মাঝেমাঝে, দুর্লভ চড়ুই আর ঘুঘু ধরার জন্যে ফাঁদ পাতলাম।
একদিন, রৌদ্রকরোজ্জ্বল এক মূহুর্তে, একটি ম্যাগনিফায়িং কাঁচ খুঁজে পাই। আগুন জ্বালানোর জন্যে যথেষ্ট কাঁচটি। কয়েকটা কাগজের টুকরোয় সূর্যের আলোর সাহায্যে আগুন ধরালাম।
গ্যাসের চুলার দায়িত্ব দখল করলো বই খাতা, ফার্নিচার, মেঝের কাঠ ইত্যাদি। বেঁচে থাকার স্বার্থে এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।
একটা জিনিস লক্ষ করলাম। কতো দরকারী জিনিস পত্র ছিলো। আজ এসব কিছু নিজের পেটের ক্ষুধা নিবারণের জন্যে আগুনে ভক্ষণ করছে। অতি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর ছাই ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ছে না।
আনমনা আফসোসে নিজেই গলে যাই। বুক থেকে নিজের অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
ছয়.
অভাব কতো ভয়াবহ টের পাচ্ছি। পৃথিবীর সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন আমি। নৈরাশ্যতায় ছেয়ে গেছে মনটা। এখন আমার কাছে অস্তিত্ব একটাই। শুধু নাই, নাই। নাই এর নৈরাজ্যে আমার বসবাস। দিন আসে। রাত যায়। এভাবে সময় পরিক্রমায় জানি না, বাইরে কি ঘটছে! না পারছি খবরের কাগজ পড়তে, না পারছি টেলিভিশন দেখতে। রেডিওটাও বড্ড অলস। বেচারা নিরর্থক পড়ে আছে চোখের সামনে।
ব্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে আছি। জানালা দিয়ে যতটুকু দেখা যায় ওটাই বাইরের জগৎ। ইচ্ছে হলেও এ জগৎ নিজের বলে অধিকার করতে পারি না। তবুও নিজস্ব গণ্ডির বাহিরটা দেখছি। হঠাৎ একটা পরিবর্তন ধরা পড়লো চোখে। একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিতে বিন্দুর মতো। আগে তো ছিলো না এটা! একটা ট্রলিবাস থেমে আছে পথের পাশে। কখন কিভাবে ঘটলো কিছুই জানি না।
আমি তো কবেই সময়ের ধারণা হারিয়ে ফেলেছি। কয়টা, কতক্ষণ, কয় ঘন্টা, দিন, মাস কিছুর জানা নেই।
কিন্তু আয়নাকে আয়না জানি। আয়নার প্রতিবিম্বে মাথায় টাক, লম্বা লম্বা সাদা দাড়ি। আর দেহ সংযোগ জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা। দুর্ঘটনা কবলিত বন্দিত্বে আমি বদলে গেছি।
আহা সময়! আহা আমার যৌবন কাল। জীবনের গৌধূলী লগ্নে বয়স আমার কোথায় এলো। আমি যে বৃদ্ধ!
কি আনন্দ! আমার চিন্তা আমায় ভুলিয়ে দিলো। এখন আমার উচ্চাকাঙ্খার কোনো ভয় নেই।
এক কথায় আমি খুব সুখি। সত্যি ভালো আছি। আরামে আছি।
১৯ শে আগস্ট, ২০১৮ সকাল ১১:৪১
ফজলুল মল্লিক বলেছেন: ধন্যবাদ, পরামর্শের জন্যে।
২|
১৯ শে আগস্ট, ২০১৮ দুপুর ১২:৪১
বিজন রয় বলেছেন: ব্লগে স্বাগতম।
শুভকামনা রইল।
©somewhere in net ltd.
১|
১৮ ই আগস্ট, ২০১৮ সকাল ১১:০০
নাজিম সৌরভ বলেছেন: স্বাগতম সামুতে।
ব্লগে এতো বড় লেখা পোস্ট না করলেই ভালো, ছোট ও আকর্ষণীয় লেখা পোস্ট করলে সবাই পড়বে।