| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বোকা মানুষ বলতে চায়
আমি একজন বোকা মানব, সবাই বলে আমার মাথায় কোন ঘিলু নাই। আমি কিছু বলতে নিলেই সবাই থামিয়ে দিয়ে বলে, এই গাধা চুপ কর! তাই আমি ব্লগের সাহায্যে কিছু বলতে চাই। সামু পরিবারে আমার রোল নাম্বারঃ ১৩৩৩৮১

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা পুরনো জমিদার বাড়িগুলোর প্রতি আমার আগ্রহ অনেক দিনের। সেই আগ্রহ থেকেই বহু বছর ধরে সুযোগ পেলেই খুঁজে বেড়াই একেকটি জমিদার বাড়ী। কোনটা একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, কোনটায় মানুষ বসবাস করছে, কোনটা আবার সংস্কারের নামে নিজের পুরনো চেহারাই হারিয়ে ফেলেছে। তারপরও এই পুরনো দালানগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে কেমন যেন একটা ভালো লাগা কাজ করে। মনে হয়, কত শত বছরের কত গল্প জমে আছে এই ইট-পাথরের শরীরে।
২০২৩ সালে টাঙ্গাইল ভ্রমণে তেমনই একটি বাড়ী দেখার সুযোগ হয়েছিল—পাকুল্লা জমিদার বাড়ী।
টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্লায় এর অবস্থান। মহেড়া জমিদার বাড়ীর নাম মোটামুটি সবাই জানলেও তার কাছাকাছি থাকা এই ছোট্ট জমিদার বাড়ীটির নাম অনেকেই হয়তো শোনেননি। আমারও আগে খুব বেশি জানা ছিল না। জমিদার বাড়ী নিয়ে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে নামটা পেয়েছিলাম, তাই সুযোগ যখন হলো, ভাবলাম দেখে আসা যাক।
আর গিয়ে প্রথম দর্শনেই মনে হলো—আরে! এ তো বেশ সুন্দর!
পাকুল্লা জমিদার বাড়ী খুব বিশাল কিছু নয়। বরং আকারে ছোটখাটো বলেই বোধহয় বাড়ীটাকে বেশ আপন আপন লাগে। মূল দোতলা ভবনের লালচে রঙের সঙ্গে দরজা-জানালা আর প্রধান ফটকের পেস্টেল রঙের ব্যবহার প্রথমেই চোখে পড়ে। বিশেষ করে সদর দরজাটা বেশ সুন্দর। পুরনো দিনের নকশা আর রঙের মিশেলে দূর থেকেই নজর কাড়ে।
পরে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে জানলাম, প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী পাকুল্লা জমিদার বাড়ীটি বাংলা ১১৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। হিসাব করলে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়। সেই হিসেবে আমি যখন ২০২৩ সালে বাড়ীটির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন এর বয়স পৌনে তিনশ বছরের কাছাকাছি। বিভিন্ন জায়গায় একে প্রায় ২৭০ বছরের পুরনো জমিদার বাড়ী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভাবা যায়! প্রায় তিনশ বছর ধরে একটা বাড়ী দাঁড়িয়ে আছে!
আমরা মানুষ কয় বছরই বা বাঁচি? অথচ এই বাড়ীর সামনে দিয়ে কত প্রজন্ম চলে গেছে। ব্রিটিশ আমল, জমিদারি প্রথার উত্থান-পতন, দেশভাগ, পাকিস্তান আমল, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশ—কত সময়ের সাক্ষী এই দালান।
মূল ফটক পেরিয়ে বাড়ীর ভেতরে গেলে চোখে পড়ে বদরুন্নেছা মহল। পিলারগুলোর গায়ে রয়েছে নানান নকশা আর কারুকাজ। খুব জাঁকজমকপূর্ণ কিছু নয়, কিন্তু পুরনো স্থাপত্য যারা পছন্দ করেন, তারা ঠিকই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এগুলো দেখবেন। অন্তত আমি দেখেছি। পুরনো দালানে গেলে আমার আবার দেয়াল, দরজা, জানালা, পিলার এসব খুঁটিয়ে দেখার বদঅভ্যাস আছে। :-)
বাড়ীর সামনে রয়েছে খোলা আঙিনা। একপাশে কাছারিঘর। পুরনো জমিদার বাড়ীতে কাছারিঘর খুব পরিচিত একটা ব্যাপার। জমিদারির হিসাব-নিকাশ, খাজনা আদায় এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালিত হতো এসব জায়গা থেকে।
তবে পাকুল্লা জমিদার বাড়ীর কাছারিঘর নিয়ে একটা মজার তথ্য পাওয়া যায়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, জমিদার পরিবারে সন্তান জন্ম নিলে নবজাতক এবং তার মাকে নাকি চল্লিশ দিন আলাদা একটি অংশে থাকতে হতো। চল্লিশ দিন পর তারা অন্দরমহলে প্রবেশ করতে পারতেন। এটি নাকি ছিল ওই পরিবারের একটি প্রথা। কথাটা কতটা দলিলভিত্তিক ইতিহাস আর কতটা লোকমুখে টিকে থাকা গল্প, সেই বিষয়ে নিশ্চিত কিছু পাইনি। তাই পাঠক নিজ দায়িত্বে বিশ্বাস করবেন। :-) তবে পুরনো বাড়ীর সঙ্গে এমন দুয়েকটা গল্প না থাকলে জমিদার বাড়ী ঘোরার মজাই বা কোথায়?
কাছেই একটি পুরনো কুয়া এবং সভাঘরের কথাও জানা যায়। বাড়ীর পেছনের দিকে ছিল রান্নাঘর, আর সীমানা প্রাচীরের পাশে বাগান। সব মিলিয়ে এটি শুধু একটা দোতলা বাসভবন ছিল না; বরং জমিদার পরিবারের বসবাস এবং তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের জন্য গড়ে ওঠা পূর্ণাঙ্গ একটি বাড়ী ছিল।
পাকুল্লার যে জিনিসটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো, জায়গাটায় মহেড়া জমিদার বাড়ীর মতো পর্যটনকেন্দ্রিক চাকচিক্য নেই। মহেড়া অবশ্যই দারুণ সুন্দর, বিশাল এবং দেখার মতো জায়গা; কিন্তু পাকুল্লার সৌন্দর্য অন্য জায়গায়। এখানে একটা পুরনো বাড়ীকে তার চারপাশের স্বাভাবিক পরিবেশের মাঝেই দেখতে পাওয়া যায়।
হইচই নেই, বিশাল পর্যটকের দল নেই, চারদিকে দোকানপাটের মেলাও নেই।
তাই একটু সময় নিয়ে বাড়ীটার দিকে তাকানো যায়।
আমার কাছে জমিদার বাড়ী ঘোরার মূল আকর্ষণই এটা। একটা পুরনো দালানের সামনে দাঁড়িয়ে বর্তমান থেকে কয়েকশ বছর পেছনে চলে যাওয়ার চেষ্টা করা। এই বারান্দা দিয়ে কারা হেঁটে যেতেন, এই উঠানে কেমন ব্যস্ততা ছিল, কাছারিঘরে কত মানুষ আসতো, সন্ধ্যার পর বাড়ীটা দেখতে কেমন লাগতো—এসব উল্টাপাল্টা প্রশ্ন মাথায় ঘুরতে থাকে।
যাই হোক, পাকুল্লা জমিদার বাড়ীর পাশেই রয়েছে পাকুল্লা শাহী জামে মসজিদ। ফলে হাতে সময় থাকলে সেটিও দেখে নেয়া যায়। জায়গা দুটির অবস্থান খুব কাছাকাছি। আর পুরো দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা করলে এর সঙ্গে মহেড়া এবং করটিয়া জমিদার বাড়ী জুড়ে নেয়া যায়। টাঙ্গাইল আসলে জমিদার বাড়ীর দিক থেকে বেশ সমৃদ্ধ একটা জেলা। শুধু পরিচর্যা এবং সংরক্ষণের জায়গাটাতেই আমাদের বরাবরের ব্যর্থতা। এই জায়গায় এসে পুরনো সেই আক্ষেপটা আবারও ফিরে আসে।
আমাদের দেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ঐতিহাসিক বাড়ী, মন্দির, মসজিদ, রাজবাড়ী কিংবা জমিদার বাড়ী বছরের পর বছর অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিছু স্থাপনা আবার সংস্কার করতে গিয়ে এমনভাবে রঙচঙে করা হয় যে পুরনো স্থাপত্যের আসল সৌন্দর্যই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এগুলো হতে পারতো আমাদের ইতিহাস জানার একেকটা জীবন্ত পাঠশালা।
পাকুল্লা জমিদার বাড়ী দেখে বের হওয়ার সময়ও কথাটা মাথায় ঘুরছিল। খুব বিশাল নয়, আহামরি জাঁকজমকও নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘোরার মতো জায়গাও নয়। কিন্তু লালচে দোতলা বাড়ী, সুন্দর সদর দরজা, বদরুন্নেছা মহলের কারুকাজ, পুরনো কাছারিঘর আর প্রায় তিনশ বছরের ইতিহাস—সব মিলিয়ে জায়গাটা আমার ভালো লেগেছিল। যারা টাঙ্গাইলের দিকে যাবেন, বিশেষ করে মহেড়া বা করটিয়ার জমিদার বাড়ী দেখতে যাবেন, তারা চাইলে পাকুল্লাকেও তালিকায় রাখতে পারেন। ছোট্ট একটা জমিদার বাড়ী। কিন্তু গল্পটা অনেক পুরনো। আর সেই পুরনো গল্পের টানেই তো এই বোকা মানুষটা সুযোগ পেলেই ছুটে যায় পুরনো ইট-পাথরের খোঁজে...
"বাংলার জমিদার বাড়ী" সিরিজের আগের পোস্টগুলোঃ
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০১)
পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি -বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০২)
মহেড়া জমিদার বাড়ি - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০৩)
লাখুটিয়া জমিদার বাড়ি - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০৪)
দুবলহাটি জমিদার বাড়ি - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০৫)
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর রাজবাড়ি - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০৬ )
তেওতা জমিদার বাড়ী - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০৭)
দালাল বাজার জমিদার বাড়ী - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০৮ )
দত্তপাড়া জমিদার বাড়ীর খোঁজে - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ০৯ )
ভৌতিক সন্ধ্যায় কামানখোলা জমিদার বাড়ী প্রাঙ্গনে - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ১০ )
কালের সাক্ষী - শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ী (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ১১)
খুঁজে পেলাম 'ইসহাক জমিদার বাড়ী' - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ১২)
বলিয়াদি জমিদার বাড়ী - চারশত বছরের ইতিহাস (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ১৩)
ভুলে যাওয়ার পথে কাশিমপুর জমিদার বাড়ী - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ১৪)
করটিয়া জমিদার বাড়ী (টাঙ্গাইল) (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ১৫)
কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ির খোঁজে (বাংলার জমিদার বাড়ি - পর্ব ১৬)
মুরাপাড়া জমিদার বাড়ীর আঙ্গিনায় (বাংলার জমিদার বাড়ি - পর্ব ১৭)
"ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ী" যেখানে যেতে যেতে রাত হয়ে যায়
(বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ১৮)
হাবড়া জমিদার বাড়ী - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ১৯)
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ী - (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ২০)
সদাসদী জমিদার বাড়ী - গোপালদী, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ২১)
নাগরপুর জমিদার বাড়ি - টাঙ্গাইল (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ২২)
বালাপুর জমিদার বাড়ি - নরসিংদী (বাংলার জমিদার বাড়ী - পর্ব ২৩)
©somewhere in net ltd.