নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সময় সীমাহীন

হুমায়রা হারুন

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।

হুমায়রা হারুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

পিছু ডাক

১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:৫১


শাহান যে দিন কলেজে এলো সেদিন এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছিল। কলেজে যেন ডাকাত পড়েছিল। কলেজের আদুভাই তার অত্যাধুনিক অস্ত্রের ঝলকানিতে সারা ক্যাম্পাস আলোকিত করে ফেলেছিল। অগ্নির যে এত স্ফুলিংগ তা ছেলেমেয়েরা কখনো দেখেনি। আর অগ্নির দ্বারা নির্মিত আগ্নেয়াস্ত্রের যে গগনবিদারী শব্দহয় তাও তাদের জানা ছিল না। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা কী ভাবেই বা জানবে? তারা তো পড়াশোনা করতে আসে কলেজে। অস্ত্র নিয়ে খেলা করতে তো নয়।
কিন্তু আদু ভাইয়ের প্রতিবাদও কম গুরুত্ব বহন করত না। তাকে কেন কলেজ কর্তৃপক্ষ পাশ করায় না? ভাইভা-তে শুধু ফেল করিয়ে দেয়। আর কত বছর কাটাতে হবে এই কলেজে? প্রিন্সিপালকে ভয় দেখাবার জন্য আজ তাই বুম বুম করে কয়েক রাউন্ড চালিয়ে দিয়েছে। ক্যাম্পাসের মাঠ জুড়ে বসে থাকা ছেলে মেয়েরা সেই আলোর ঝলকানি দেখেছে। বুম বুম শব্দে হতবিহ্বল হয়ে দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। আদু ভাই তার শৌর্য্য বীর্যের উত্তাপ ছড়িয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছে।
ঘটনাটি আরও স্পষ্ট মনে আছে মনিকার, কারণ সে দিনই তার খালুর বোনের মেয়ে নতুন ভর্তি হয়েছে কলেজে। কথা বলেছে মনিকার সাথে। নাম শাহান। একই শহরে থাকে। কিন্তু তেমন একটা দেখা হয় না। লতানো পাতানো আত্মীয়। চেহারায় চিনে। খালুর বোনের মেয়ে। অনেক ছোটবেলায় একবার এসেছিল মনিকার বাসায়। মনিকার আম্মার সুন্দর মালাটা ছিঁড়ে ফেলেছিল। ছিঁড়ে ফেলেনি। ছিঁড়ে গিয়েছিল ওর হাতে। সেই দিনটার কথাও মনে আছে। তাই শাহানকে তার কেন যেন একটা অলুক্ষণে, অপয়া গোছের মনে হতো।
আর আজ?
কলেজে এলো। প্রথম দিন। আজ আদু ভাইয়ের অস্ত্রের ঝলকানি। আবার সেই অপয়া।
কলেজে তার পরের একদিন শাহানকে একটা সুন্দর, আধুনিক, স্মার্ট ছেলে বন্ধু জোগাড় করে ফেলেছে দেখে বেশ অবাক হল মণিকা। তার পরের সপ্তাহে দেখল শাহান তার মাকে এনে নতুন ছেলে - বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। শাহানের মা তো ছোট খালুর বোন। সেই সূত্রে মনিকা মনে করেছিল তাকে ক্যাম্পাসে দেখলে চিনবে। মণিকা কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু খালা তো আর চিনেই না। তাতে মণিকার বদ্ধমূল ধারণা হলো, খালা বোধহয় এই কয়েক বছরের ব্যবধানে ছোট্ট মনিকার চেহারাই ভুলে গেছে। যেতেই পারে। মনিকা দশ থেকে এখন বিশ বছরের তরুণী। খালা চিনবেই বা কী ভাবে? কিন্তু খালার পাশে দাঁড়ান শাহানও যে চিনে না। তারা বেশ ব্যস্ত। কারণ তার নতুন পরিচিত ছেলেটি এখন তাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু।
সময়ের সাথে সাথে আগ্রহ, প্রয়োজন পাল্টায়। লতানো পাতানো আত্মীয়দের আগ্রহ আর কতই বা প্রবল হবে তার প্রতি? নাকি ফ্যামিলি প্যাটার্নটাই এরকম?
শাহানের বড় বোন ড্যাবড্যাব চোখের। নাম ড্যাবড্যাবি আপা। আপা তো সেদিন পিছন থেকে ডেকে ভাইভা বোর্ডের গিজগিজে বারান্দায় দাঁড়ানো হাজারো ছেলেমেয়ের ভিড়ে মণিকাকে চিনে তার সাথে কথা বলেছিল।
- অ্যাই কেমন আছো?
- আজ তোমাদের ভাইবা?
কত হাসিমুখ!
পরের দিন? ক্যান্টিনে দেখা হলে ড্যাবডেবি আপা তো আর চিনে না। মণিকা এসব ব্যবহারের সাথে পরিচিত ছিল না। ইগ্নোর করা, মানে উপেক্ষা করা, তাও আবার নাকের ডগার উপরে - কীভাবে করতে হয় জানত না। শিখেছে এসব।এদের কাছ থেকে, বাইরের পৃথিবীতে এসে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে। বাইরের পৃথিবী দেখে বাজে কথা, বাজে আচরণ সবকিছু জেনেছে।
শাহান একবার ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় মণিকাকে আসতে দেখে পৃষ্ঠদেশ প্রদর্শন করেছিল। তখন শাহান অনার্স পাস করেছে। একটু বড় হয়েছে। বেশ কয়েক বছর যাবত ক্যাম্পাসে থাকে। তাই কাজটা না বুঝে করেছে এমন তো নয়। মনিকার এতে বেশ উপকার হয়েছিল। কী ভাবে মানুষকে উপেক্ষা করতে হলে পাছা প্রদর্শন করতে হয়, তা তৎক্ষণাৎ শিখে গিয়েছিল। এ সব তো আর বই খাতায় লেখা থাকে না। মানুষকে দেখে শিখতে হয়।
আরও কয়েকদিন পর। মণিকাকে দেখে শাহানের কী যেন মনে হয়েছিল। বড় মায়া জেগে ছিল বোধহয় মণিকার কোনো কথা শুনে, বা তার কোন দুঃখের কাহিনি শুনে। দ্রুত এগিয়ে এসে ডাক দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। মনিকা দ্রুত হেঁটে সেই স্থান ত্যাগ করেছে। সুপারভাইজারকে দেখিয়ে বলেছে, 'স্যার এসে গেছেন যেতে হবে'।
শাহান উপেক্ষা করে। উপেক্ষিত হয় না। সেদিন হয়েছিল তাই তাঁর মনোকষ্ট হয়েছিল বড্ড।
খালুকে জানালে তিনি এসে মণিকাকে জিজ্ঞেস করলেন শাহানের সাথে দেখা হয় ক্যাম্পাসে?
মণিকা কি খালুকে, শাহানের বিরাট পাছার গল্প করতে পারে? খালু বলে কথা। তাই পারে না।
পাশ কাটিয়ে উত্তর দেয়, 'হ্যাঁ, দেখেছি তো।'
শাহানদের বাড়ির পরিবেশ এমনই যে তারা মা বোনেরা সব রকম ব্যবহার তাদের প্রয়োজন মতো করতে পারে। আর আশপাশের সবাই বাধ্য, তাদের পছন্দের মত করে তাদের সামনে নিজেকে পেশ করতে।
তাই না? তাই তো।
তাই খালুর পরিবারে এক দাওয়াতে গেলে মণিকাকে দেখে শাহানের মায়ের সে কী উৎসাহ। এক ঠ্যাং লাফ দিয়ে সামনে এসে পড়ল। তারপর আকর্ণ হাসি হেসে মনিকাকে জিজ্ঞেস করল, 'আমাকে চেন?’
তার ক্রিমিনাল মন খুব ভালই জানে কোনও এক কালে সে মণিকাকে চিনতে পারেনি। ইচ্ছা করেই কি না, কে জানে। তার থেকে তো ভাল আর কেউ জানে না। তবে আজ সে তা উসুল করবে, যেমন করেই হোক – প্রয়োজনে মণিকার ঘাড়ে ধরে। মনিকা ঘাড় পাতলো কি পাতলো না, তা তার বিষয় না। তার সেই এক ঠ্যাং লাফ দিয়ে সামনে এসে পড়লেই তো হল।
আর যায় কই?
মণিকা তখন উত্তর দিতে বাধ্য। বাঁচতে তো হবে এই মহিলার হাত থেকে - মুখের ওপর মুখ রেখে ড্যাব ড্যাব করে প্রশ্ন করবে যখন, তখন?
মনিকা যথাসম্ভব ভদ্রতা বজায় রেখে উত্তর দিল, 'জ্বী, চিনি।' সাথে সাথে দ্বিতীয় কনফারমেশন করে জানতে চাইল, 'তাহলে বলো তো কে?'
খালুর দিকে আঙুল বাড়িয়ে মণিকা বলল, 'ওনার বোন আপনি?'
এবার ক্রুড় এক হাসি তাঁর মুখে।
জিতে গেছে সে।
কথা যখন বলতে ইচ্ছে করেনি, বলেনি। চিনতে যখন প্রয়োজন বোধ করেনি, চিনতে পারেনি, চিনেনি। আজ ইচ্ছে হয়েছে কথা বলার, বলেই ছাড়বে। ঘাড়ে পড়ে হোক আর পিছন থেকে ডেকেই হোক।
পিছু ডাকলে ঘাড় তো ঘোরাতেই হয়। ঘাড় মটকে দিলে আর কি করার থাকে তখন। ইচ্ছা অনিচ্ছা যে শুধু তাদের হাতেই, যারা পিছু ডাকে।

১৩/০১/২০২৬
.।.।.।.।.।.।।।
মণিকার একদিন

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১৪ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৫২

রাজীব নুর বলেছেন: শাহান আর মনিকার গল্প পড়িলাম।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.