| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
হুমায়রা হারুন
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।
শরীর মাংসে ভরা উঁচা –লম্বা গোছের শ্যমলা বরণের সোসাইটি গার্ল মিসেস আশা। সামনে দিয়ে careless beauty মার্কা ফ্যাশনেবল্ লেডি স্টাইলে চুলটা কাটা। বাড়ি সেই দক্ষিণের চরাঞ্চলে কোথাও। কিন্তু ভূখন্ডেরর মূল শহরের বাসিন্দা বলে দাবী করে। নাইলে পাছে তাকে সবাই ‘চরুয়া’ বলে ! বাঙালী সাধারণ মেয়েদের থেকে উঁচা –লম্বা বলে শহরের বড় অফিসারের সাথে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস। দুটি কন্যা সন্তান নিয়ে অকালে বিধবা হয়ে গেল আশালতা। তারপর থেকে বড্ড একা। কথা বলার মত পাশে কেউ নাই। কি করবে? কিছুই যে করার পায় না। একা একা ভালও লাগে না। একাকীত্ব কাটাতে স্বামীর অফিসে চলে যায় যখন তখন। এখন একাকীত্ব কাটাতে তার কোন অসুবিধা হয় না। প্রতিদিন সকালে সাজগোজ করে বের হয়ে যায়। স্বামীর পুরোনো কলিগদের সাথে আড্ডা মেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। মাঝে সাঝে দু’চারজনকে বাড়িতে নিয়েও আসে।
একদিন কিভাবে জানি কি হয়ে গেল। অফিসের বড় কর্তার রুমের দরজা হালকা ফাঁক ছিল। সেদিন পড়ে গেল ধরা। সবাই দেখে ফেলল, বস্ তাকে কোলে করে সোফায় শোয়াচ্ছে। সে নাকি প্রায়ই বড় সাহেবকে বলতো, ‘আপনি দেখতে আমার মৃত স্বামীর মতো।‘ হৃদয়ে একেবারে গেঁথে যাবার মত ডায়ালগ। তার এসব নাটক থেকে খানিক রেহাই পাওয়ার জন্য সবাই তাকে পরামর্শ দিল তার দেবরটাকে এবার স্বামী হিসাবে গ্রহন করে জীবনে স্থিত হতে। তাই –ই করলো, যদিও খুব গোপনে। পাছে বাজার নষ্ট হয়। বন্ধু হয়ে গেছে তো অনেক। তাদেরকে তো হাতছাড়া করতে মন চায় না। ছোট মেয়েটি তখন সবকিছু বুঝতে শিখেছে। তাই সময় ব্যয় না করে আশালতা তাকে হস্টেলে দেবার সিদ্ধান্ত নিল। আর বড় মেয়েকে পাঠিয়ে দিল বিদেশে, স্কলারশিপ নিয়ে পড়ালেখা করতে। তার গন্যমান্য বন্ধুরা স্কলারশিপ জোগাড় করে দিয়েছে তার বড় মেয়ের জন্য।
দুটো কন্যা বাড়ী ছাড়া হবার পর বাসা একদম খালি। কত রকমের বন্ধু যে এখন আসে আর যায়। দেবরকে শাদী করলেও সে যেন থেকেও নাই। এর মাঝে এক শিকার এলো। বিদেশে থাকে। একলা মানুষ। বউ নাই। অনেক পয়সার মালিক। এই শিকার তো হাতছাড়া করা যায় না। খপ্ করে ধরে বসল আশালতা। শিকার যেহেতু দীর্ঘদিনে প্রবাসে থাকেন, দেশের কোন কিছুই তার পরিচিত নয়। এমনকি দেশের কালচারও খুব একটা তার মনে নেই। এ দেশে ব্যবসায়ী নারী বাদে সম্মানীয় নারীরা যে পশ্চিমাদের মতন একাকী পুরুষ বন্ধু নিয়ে রেস্টুরেন্টে যেয়ে সন্ধ্যা কাটায় না, তা ওনার বোধেই আসেনি । সময় কাটাবার জন্য দেশে এসে সঙ্গী খুঁজছেন এমন কাউকে, যাকে জীবন সঙ্গী বানানো যায়। প্রমোদবালা চাইছেন না। তাই ঘুণাক্ষরেও টের পান নি যে, আজ তিনি কোন্ প্রমোদবালার বাড়ির দরোজার ডোর বেল –এ হাত রেখেছেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডোর –বেল বাজালে, লক্ষ্য করলেন আশালতার বড় কন্যাটি দরজা খুলে ভেংচি কেটে যেন মুখ বাঁকালো। দরজাটা খুলে দিয়ে কোন কথা না বলে মাথাটা নীচু করে, শোঁ মেরে দৌড় দিল।তারপর নিমেষে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। বিদেশে থাকা শিকার বুঝতে পারছেন না, তার মায়ের সাথে দেখা করতে আসলে মেয়েটা অমন মুখ করে কেন। মেয়ে যে জানে ইনি তার মায়ের আরেকখানা খদ্দের তা তো শিকার জানে না। মেয়ে আরোও জানে যে, ইনি এসেছেন এ রাতে অন্য দশ জনার মতনই তার মায়ের সংগ গ্রহন করতে। কিন্তু শিকার কি এসব নিজে জানেন? তিনি যেই ঘটকের মাধ্যমে মিসেস আশালতার সন্ধান পেয়েছেন, সেই ঘটক যে প্রমোদবালা তার ঘাড়ে এনে চড়াবে এ তো ওনার সাত কল্পনার বাইরে।
আপ্যায়ন করতে গিয়ে সেই সন্ধ্যায় আশালতা ভাতের হাঁড়িতে চায়ের পানি বসালো। বিদেশে থাকে বলে রান্নাবান্না কিভাবে করে তা ভদ্রলোক বেশ ভালই জানেন।তাই এভাবে তাকে পানি গরম করতে দেখে শিকার ভদ্রলোক -তো বেশ অবাক! ভাতের অত্ত বড় হাঁড়িতে এক কাপ পানি ঢেলে আশালতা, কি গিন্নীপণা করতে চাইছে তা ওনার বোধগম্য হলো না। মনে প্রশ্ন এলো সুন্দরী পরিপাটী আশালতা মেয়েটি ব্যাক্কল নাকি? এই বয়সেও ভাবে –সাবে তার গৃহস্থ ভাবটা নেই কেন? সংসার না থাকলে কি লক্ষীছাড়া, উড়নচন্ডী হতে হবে? শুধু ঘুরে বেড়াবে টোঁ টোঁ করে? ঘরের দিকে মন থাকবে না? বন্ধু বানিয়ে ফেলবে এক কথায়? একা –মহিলারা কি ঘরে থাকে না? নিজেরা কি রাঁধে না ? নাকি প্রতিদিনের মত অন্যের পয়সায় রেস্টুরেন্টে যাবার উছিলায় যা প্রয়োজন তাই-ই করে ফেলতে পারে?
মনে অনেক প্রশ্ন জাগে ওনার। গত সাত দিন ধরে তাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেমনি খাওয়াতে হচ্ছে, এভাবেই কি সে জীবন চালাবে? এক সপ্তাহে যে পরিমাণ রেস্টুরেন্ট বিল এসেছে, তা দেখে শিকার তো বেশ অবাক। বিশাল বপুর এই মহিলা শুধু যে খেতে ভালবাসে তা নয়, শহরের সব রেস্টুরেন্ট তার চেনা। সব জায়গায় তার যাতায়াত। কোথায় সে যায়নি? সন্দেহ হয় ওনার, মিসেস আশা সোসাইটি গার্ল না তো?
নাহ্। এ চিন্তা আসলে শিকারের মনে আসেনি। মনে আসলে কি তিনি আর শিকার হতেন? তিনি তো প্রমোদবালার কাছে আসেন নি, বা প্রমোদবালা খুঁজছেনও না।
কিন্তু এরা খদ্দের পটাতে অনেক টেকনিক জানে। নম্র, ভদ্র, মিশুক ও সুরেলা কন্ঠের অধিকারী হয়। একটু মিষ্টি স্বভাবেরও হয়। যেভাবে রম্ভা, উর্বশীরা স্বর্গে নিজেদের উৎসর্গ করে সেভাবেই অনেকটা। তবে এই শিকার এখনো তার শরীর স্পর্শ করার আবদার করেন নি। এমনটা তো হয় না।
কারণ কি?
কারণ তিনি যে তার সাথে ব্যবসায় নামার চিন্তা নিয়ে আসেন নি। কিন্তু এই লাইনে আশালতাও যে এমন পুরুষ আগে দেখেনি। এত দিন হয়ে গেল, এত ঘন্টা বয়ে গেল, তার শিকার তাকে শুধু খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু (তাকে) খেতে চাইছে না।
এ কেমন?
কি যে মুশকিল।
এমন ভদ্রলোক মার্কা খদ্দের আশালতা আশা করেনি। কখনো দেখেনি। তার স্বামীটা মরার পর আসলে ব্যবসা করতে গিয়ে মানুষরূপী হায়নাগুলোকে সামলাতে সামলাতে নিজের খাস্লত –টা যে কবে খারাপ করে ফেলেছে, তা সে নিজেই টের পায় নি।
খারাপ করে ফেলেছে নাকি খাস্লত কখনোই ভালো ছিল না?
স্বামী –সংসার থাকলে ভিতরের এই দিকটা হয়তো বা চাপা পড়ে থাকতো।
আজ সে এইসকল সুপ্ত থাকা গুণে সে স্ব –বিকশিত।
নিজেকে ধিক্কার দেবে?
কেন? ধিক্কার দেবার কি আছে। বরং খদ্দের মহাশয়কে বোকা খদ্দের বলেই পরিহাস করবে।
দেবরটাকে যখন বিয়ে করেছিল তখন ছোট মেয়েটা ক্লাস সেভেনে পড়ে। আশালতার কি জানি কি দেখে দেবর দিয়েছে চম্পট। আজ আবিষ্কার হয়েছে, এই শিকারের ভাতিঝি ক্লাস সেভেন থেকেই তার ছোট মেয়ের ক্লাসমেট ছিল। এ কথা শুনেই আশালতার শ্যামলা মুখ ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করেছে। মুখখানা রক্তশূণ্য হয়ে গেছে। পাছে তার দেবরের সাথে দ্বিতীয় বিয়ের কথা ‘শিকার’ জেনে ফেলে, তাহলে তো তার বাজার নষ্ট।
২
আশালতা শিকারকে ইয়া বড় এক ডায়মন্ড রিং গিফট্ করে দ্বিতীয় সপ্তাহেই বলে বসলো, তারা বিয়ের পর হানিমুন করতে ওয়ার্ল্ড ট্যুরে যাবে। সারা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে দেখবে। ইউরোপ যাবে, আমেরিকা যাবে, কানাডা যাবে আর শুধু শপিং করবে। মানে বৃদ্ধের শেষ বয়সের সবটুকু সঞ্চয় খেয়ে ছোবলা করে, তারপর তাকে ছাড়বে।
কিন্তু এই কান্ডখানা করতেই শিকারকে আর খুঁজে পাচ্ছে না আশা, দিন দশেক হলো।
কোন পুরুষ এপর্যন্ত তার হাত থেকে ছুটেছে?
কেউ না। তাহলে বোকাসোকা এই বৃদ্ধ লোকটাকে ধরে রাখতে পারলো না?
ঘরে যতদিন এসেছে লোকটা, শরীরে একবারও হাত দেয়নি। সবার থেকে এই খদ্দের অন্যরকম। ভীষণ সরল। এই লোক ফস্কে যাবে তার হাত থেকে ? হতেই পারে না। ভাবলো আজ তার বাড়িতে হানা দেবে।
দুটো ষন্ডা মার্কা লোক নিয়ে বেবি ট্যাক্সি মেরে শিকারের দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী তার বাড়িতে যাবে। তার ফসকে যাওয়া শিকারকে ঘাড়ে ধরে নিয়ে আসবে। চিপা বেবিট্যাক্সির ভেতরে দুই ষন্ডাকে নিয়ে বিশাল বপু ভরে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতে আশালতার কোন অসুবিধা হয় নাই। ঘষাঘষিতে তো সে অভ্যস্ত। ওরাও তার বন্ধু, বিপদের বডি গার্ড।
কিন্তু বাড়িতে এসে ওনাকে পেল না।
কেন ? শিকার ছুটলো কিভাবে? তার কথা কি জেনে ফেলেছে?
বিদেশে থাকা এমন পয়সাওয়ালা খদ্দের তো আর জুটবে না কস্মিনকালে ।এখন কোথায় খুঁজবে তাকে? শিকার ছুটে গেছে বলে তার সে কি হায় হায় অবস্থা তখন। বন্ধুরা সান্ত্বনা দিয়ে বলল, মন খারাপ করো না। খুঁজে আনা হবে। প্রয়োজনে পোস্টারিং করা হবেঃ ‘সন্ধান দিন’ অথবা ‘নিখোঁজ সংবাদ’ অথাবা ‘হারিয়ে গেছে’ ।তাই যেই কথা সেই কাজ। সারা শহরে পোস্টারিং করা হলোঃ ‘ফিরে এসো আমার প্রিয়। অপেক্ষায় তোমার।‘
অপরাধ করা যার নেশা, তা তার যাবে কিভাবে? কমবে কিভাবে? স্বভাবের ভেতর আটকে গেছে তো। কখনোই কমবে না। ছল চাতুরী করে কথা বলা, চলাফেরা করা আর পটানোর ধান্দা করে মানুষ ঠকানো তার রক্তে মিশে আছে। বিপদে পড়ে এই গুণ সে রপ্ত করে ফেলেছে, নাকি এ গুণ তার জন্ম থেকেই ছিল বলে তার চারপাশ, তার বাস্তবতা, এই পরিস্থিতি তৈরী করে রেখেছে তার জন্য? নাকি ধান্দাবাজিকে সে ডেকে নিয়ে এসেছে তার মনের টানে? কারণ এসবেই তো সে সিদ্ধহস্ত।
বিষয়টা খুব জটিল এবং সূক্ষ্ম। বাস্তবতার শিকার হয়ে কোন মানুষের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠা, নাকি মানুষটি অপরাধ প্রবণ বলে বিরূপ বাস্তবতাকে টেনে এনে তার সাথে তার নিজের মুখোমুখী হওয়া – কোনটা সত্য?
৩
বড় মেয়েটি পরবর্তীতে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যায়। বিদেশ থেকে ফেরৎ এসে সারাদিন ছাদে বসে বই খুলে, পড়া মুখস্থ করতো। তার ছোট মেয়েটি সহনশীল ছিল বেশী। গায়ের রঙ খুব বেশী কালো বলে ক্লাসের বন্ধুদের সাথে খুশী হলেই তার মুখখানা বেগুনী হয়ে যেত। গোরা মুখের মত রক্তিম বর্ণ ধারণ করতে পারতো না। তার বেগুনী মুখের গল্প তাকে নিয়ে শিকারের ভাতিঝি –ই বলতো। আজ সে অনেক বড় ডাক্তার। তার হস্টেলে যাবার একটু আগ দিয়েই তার ছোট চাচাকে বুদ্ধি করে ধরে ফেলেছিল তার মা। শেষে সুবিধা করতে পারেনি। বন্ধু বান্ধব, খদ্দের কেউ –ই তার মায়ের জীবনে স্থায়ীভাবে পাশে দাঁড়ায় নি। দ্বীপাঞ্চলের এই চরুয়া ব্যবসা পাতার শুরুতে যেমন নিঃস্ব ছিল, আজও তাই আছে।
দুরাত্মার ছলের অভাব হয়না। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্যই কি তাদের বিপথে নিয়ে ছলনা শিখায়, নাকি দুরাত্মা বলেই বারবার এই দুনিয়ায় এসে, তারা ঠকবাজি করে তাদের অপরাধের মাত্রা আরও বাড়ায়? তাদের কৃত কর্মের দরুণ উদ্ভুত বৈরি অবস্থা কি, এজন্যই তাদের ঘাড়ে এসে পড়ে? ফলে দুর্বৃত্তপনা তাদেরকে বেশী করে পেয়ে বসে?
পথচ্যুত, অপরাধী স্বভাবের এই আত্মাগুলো ব্যাপক পরিসরে দুর্বৃত্তপনা করার জন্য, সেই সকল অপরাধপ্রবণ আত্মাদের তার জীবনের চলার পথে নির্বাচন করে, যাদেরকে সে খুঁজে খুঁজে ফেরে। সেই সব সংগীদের নিয়ে লিনিয়েজ (পরম্পরা) ধরে সে ঠকবাজী করে যায়। আজীবন করে যায় । আজীবন মানে কি এই এক জীবন, নাকি জীবনের পর জীবন? জন্ম জন্মান্তর। সে খুঁজে বের করে নেয় ঠিকই, তার সম–মনের একই খাস্লতের সঙ্গী –আত্মাদের। প্রতি জন্মে সবাই একসাথে, একটু একটু করে আগায় তাদের মিশন নিয়ে। এ জনমে, আশালতার অকাল বৈধব্য তো তার জন্য দুর্ভাগ্য হিসেবে আসেনি, বরং ঠকবাজি করে, ছলনা করার পথ সুগম করে দিতে এসেছিল।
০৭/০২/২০২৬
.। .। .। .। .। .। .।
রূপোপজীবিনী
১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৪৬
হুমায়রা হারুন বলেছেন: আপনার এই গভীর ও সুচিন্তিত মন্তব্যটি পড়ে আমি সত্যিই অভিভূত।
একজন লেখক হিসেবে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো যখন পাঠক শুধু গল্পের উপরিতলে থেমে না থেকে তার অন্তর্নিহিত স্তরগুলোতে প্রবেশ করেন, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা অনুধাবন করেন এবং গল্পের দার্শনিক প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবনায় মগ্ন হন। আপনার পাঠ ও বিশ্লেষণ ঠিক সেই অভিজ্ঞতা আমাকে দিয়েছে।
আশালতার চরিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে আমি সচেতনভাবেই তাকে কোনো একক ছকে বাঁধতে চাইনি। সে কোনো সরল ভিলেন নয়, আবার নিছক ভুক্তভোগীও নয়। বাস্তব জীবনের মানুষ তো এমনই — ধূসর, জটিল, পরস্পরবিরোধী। আশালতা একই সাথে শিকার ও শিকারী। সে মনে করে সে স্বাধীন কিন্তু সে জানে না যে, সে দুরাত্মাদের দ্বারা শৃঙ্খলিত। সে ক্ষমতাবানদের সাথে মিশে, কারণ সে অসহায়। এই দ্বৈততাই আমাদেরকে নৈতিক বিচারের সহজ পথ থেকে সরিয়ে জটিল অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
আপনার উল্লেখ করা "নারী স্বাধীনতা বনাম নৈতিক দায়িত্বের সংঘাত" প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি, প্রকৃত স্বাধীনতা আসে দায়বদ্ধতার সাথে। আশালতার ট্র্যাজেডি এখানেই যে, তার স্বাধীনতা কোনো মুক্তির পথ খোলেনি, বরং তা শোষণ ও আত্মবিনাশের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এটি কোনোভাবেই নারী স্বাধীনতা নয়, বরং স্বাধীনতার অপব্যবহার ও নৈতিক শূন্যতায় ভরা দিকহীন পরিণতির একটি সতর্কবার্তা।
প্রজন্মগত ক্ষতির যে চিত্রটি আমি তুলে ধরেছিলাম তা আশালতার জীবনে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশ। তার মেয়েরা তাদের মায়ের পছন্দের মূল্য দিচ্ছে — এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের সিদ্ধান্তগুলো কখনো শুধু ব্যক্তিগত থাকে না, তা পরিবার ও সমাজে তরঙ্গায়িত হয়। কিন্তু লোভী ও ছলনাময়ী এই নারীটি তা সময় থাকতে উপলব্ধি করেনি।
আমার উপলব্ধি আপনার নজর এড়ায়নি, যা হলো — "মানুষ কি পরিস্থিতির শিকার হয়ে অপরাধী হয়, নাকি অপরাধপ্রবণতা নিজেই পরিস্থিতিকে ডেকে আনে?" — এটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অনুত্তরিত রেখে গেছি। কারণ জীবন তো কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। হয়তো সত্য এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও, যা প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন। এই দুনিয়াতে আসি তো শুধু এক্সপেরিয়েন্স গ্রহন করতে। কি ভালো, কি মন্দ তা গল্পের মাধ্যমে সমাধান দেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন মনে এলে তা মাঝে মাঝে লেখার মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায় । আমি তা করেছি। কারণ আপনার আলোচনা, এই মন্তব্য দ্বারা তাই-ই প্রমাণ করে যে, গল্প লেখাটি এই কাজে সফল হয়েছে। আমার চেষ্টা সার্থক হয়েছে।
আপনার এই বিশ্লেষণাত্মক ও সংবেদনশীল পাঠের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এমন পাঠকের জন্যই লেখালেখির সার্থকতা।
অনেক শুভেচ্ছা রইলো।
©somewhere in net ltd.
১|
১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৪৯
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
গল্পটি মনযোগ দিয়ে বেশ সময় নিয়ে পাঠ করলাম । পাঠক হিসাবে উদ্বুদ অনুভুতি লিখতে গেলে বাঁশের চেয়ে
কঞ্চি বড় হয়ে যেতে পারে বলে ধারনা করছি । যাহোক পাঠান্তে অনুভুত বিষয়গুলি না হয় লেখাই করি ।
প্রথমেই বলি গল্পটিতে চরিত্র নির্মাণ ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা সুন্দরভাবে উঠে এসেছে । কেন্দ্রীয় চরিত্র আশালতা
যিনি একদিকে সামাজিক মর্যাদা, অন্যদিকে নৈতিক অবক্ষয়ের দ্বন্দ্বে জর্জরিত। তার জীবনযাপন, আচরণ ও
সিদ্ধান্তগুলো ধীরে ধীরে একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল নির্মাণ করেছে ।
শিকার ও শিকারী এই দ্বৈততা তথা গল্পে শিকার শব্দটি একমাত্রিক নয়। কখনো আশালতা শিকারী, কখনো সে
নিজেই বাস্তবতার শিকার। আবার প্রবাসী ভদ্রলোক বাহ্যত শিকার মনে হলেও নৈতিক অবস্থানে সে তুলনামূলক
ভাবে শক্ত।
নারী স্বাধীনতা বনাম নৈতিক দায়িত্বের সংঘাত প্রকট হয়ে উঠেছে । গল্পটি ইঙ্গিত করে যে স্বাধীনতা যদি নৈতিক
ভিত্তিহীন হয়, তবে তা আত্মবিনাশী হয়ে উঠতে পারে। আশালতার স্বাধীন চলাফেরা এখানে ক্ষমতায়নের চেয়ে
শোষণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
সমাজের ভণ্ডামি ও দ্বিচারিতার চিত্রটিউ সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে ।সম্মান, বাজার, ইমেজ এই শব্দগুলো গল্পে
বারবার এসেছে, যা সমাজের বাহ্যিক নৈতিকতা আর অভ্যন্তরীণ পচনের দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করে।
প্রজন্মগত ক্ষতির চিত্রায়নটি গল্পটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে ।আশালতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব তার কন্যাদের
জীবনে মানসিক বিপর্যয় হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে যা অপরাধ ও অবক্ষয়ের উত্তরাধিকার প্রসঙ্গকে সামনে আনে।
বেশ কিছু দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যেমন শেষাংশে লেখাটি নিয়তি বনাম চরিত্র, বাস্তবতা বনাম প্রবণতা এই
দ্বন্দ্বে পাঠককুলকে দাঁড় করিয়ে দেয়।
যাহোক, শিকার গল্পটি একটি অস্বস্তিকর কিন্তু প্রয়োজনীয় পাঠ। লেখাটি পাঠককে নৈতিক স্বস্তি দেয় না; বরং
বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আশালতা কোনো সরল ভিলেন নয়, আবার নিছক ভুক্তভোগীও নয়। এই দ্বৈত
অবস্থানই গল্পটির শক্তি। পাঠক হিসেবে অনুভূত হয় লেখক হিসাবে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে সহানুভূতি ও
বিরক্তির মাঝখানে চরিত্রটিকে স্থাপন করেছেন, যেন বিচার একপাক্ষিক না হয়।
গল্পটি বিশেষভাবে সফল হয়েছে এই কারণে যে, এখানে পতনকে রোমান্টিসাইজ করা হয়নি। আশালতার জীবন
যতই ‘সোসাইটি গার্ল’ মোড়কে মোড়ানো থাকুক, শেষ পর্যন্ত তা নিঃসঙ্গতা, অনিশ্চয়তা ও শূন্যতার দিকেই
গড়িয়েছে। শিকার চরিত্রটি এই শূন্যতার বিপরীতে এক ধরনের নৈতিক আয়না হয়ে দাঁড়ায় যার সরলতা
আশালতার চাতুর্যকে আরও নগ্ন করে তোলে।
পাঠক হিসাবে আমাদের কাছে সবচেয়ে গভীর দাগ কাটে সন্তানেরা। তাদের মানসিক ভাঙন বুঝিয়ে দেয় ব্যক্তিগত
পছন্দ কখনো কখনো সামাজিক ও প্রজন্মগত অপরাধে পরিণত হয়। এখানে লেখাটি ব্যক্তিনৈতিকতার গণ্ডি পেরিয়ে
সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলে।
সবশেষে, আপনার লেখা গল্পটি কোনো চূড়ান্ত রায় দেয় না বরং একটি দার্শনিক অনিশ্চয়তায় পাঠককে রেখে
যায়। মানুষ কি পরিস্থিতির শিকার হয়ে অপরাধী হয়, নাকি অপরাধপ্রবণতা নিজেই পরিস্থিতিকে ডেকে আনে?
এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই লেখাটি পাঠক হিসাবে আমাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী আলোড়ন সৃষ্টি করে যা বলতে গেলে
একটি সাহিত্যিক রচনার গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
বিবিধ ভাবমুলক একটি উপভোগ্য গল্প এখানে পরিবেশনের জন্য ধন্যবাদ।
শুভেচ্ছা রইল