| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমিতে লবণাক্ততার বৃদ্ধি আমাদেরকে শঙ্কিত করে তুলেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের অবকাঠামো এমনিতেই দুর্বল। এখানকার মানুষ নানারকম প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা করে অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে, যা পৃথিবীতে বিরল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বারবার বিপর্যস্ত হচ্ছে। আবার নতুন করে লবণাক্ততা বৃদ্ধি মানে সেখানে প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি হওয়া। ফলে এর প্রতিক্রিয়ায় সুপেয় পানির অভাব তীব্র হবে, সাথে সাথে কৃষি এবং চিরচেনা গাছপালার বদলে ভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এই বিরূপ পরিবেশের সাথে ধীরে ধীরে উপকূল অঞ্চলের মানুষের অভিযোজন করে টিকে থাকতে হবে।
শুকনো মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হয় বলে এ সময়ে নদ-নদীর পানি প্রবাহ কমে যায়। তখন পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি নদ-নদী দিয়ে উজানে স্থলভাগের দিকে চলে আসে। এভাবে সময় অতিক্রমের সাথে সাথে উপকূলীয় অঞ্চল লোনাপানির মাধ্যমে লবণাক্ত হয়ে ওঠে। আবার সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রের লোনাপানির মাধ্যমে প্লাবিত হয়েও মৃত্তিকাকে লবণাক্ত করে থাকে। এই লবণাক্ত মৃত্তিকার পিএইচ ৭.০ থেকে ৮.৫ এর মধ্যে হয়ে থাকে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) সম্প্রতি ‘স্যালাইন সয়েলস অব বাংলাদেশ’ নামে একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। এই জরিপে উপকূলীয় অঞ্চলের ৬২ শতাংশেরও বেশি কৃষিজমিতে লবণাক্ততার উল্লেখ রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১৬ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর এর মধ্যে ১০ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমি যথাক্রমে অতি আংশিক, আংশিক, মাঝারী, প্রবল ও অত্যধিক মাত্রায় লবণাক্ত। জরিপ থেকে জানা যায় সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, যশোর, নড়াইল, মাদারীপুর জেলার কিছু নতুন নতুন কৃষিজমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত হয়েছে। লবণাক্ততার অব্যাহত বৃদ্ধিতে “সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, দেশের খুলনার দাকোপসহ দক্ষিণাঞ্চলে সাগরের লোনাপানি ভূভাগের অনেক ভিতর পর্যন্ত ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়েছে। এ সমস্যা উপকূলীয় অঞ্চল থেকে যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর এবং কুমিল্লা পর্যন্ত উত্তর দিকে বিস্তৃত হয়েছে” (বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উইকিপিডিয়া)। সবচেয়ে মারাত্মক লবণাক্ততা আক্রান্ত জেলাগুলি হল খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী। এসআরডিআই উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার যে কারণগুলি চিহ্নিত করেছে তা হল উজান থেকে পানি প্রত্যাহার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, চিংড়ি চাষে লোনা পানির ব্যবহার, স্লুইসগেট ও পোল্ডারের ক্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত সাগরের লবণাক্ত পানির প্রবেশ ইত্যাদি।
অধিক অর্থের প্রয়োজনে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিজমিতে কৃষির বদলে লোনা পানিতে চিংড়ি চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উক্ত অঞ্চলে কৃষিজমি, চারণক্ষেত্র ও বনায়নের জায়গা ব্যাপকহারে কমে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েকটি জেলা। আইলায় কৃষিজমি লোনাপানিতে ডুবে থাকার কারণে লবণাক্ত জমির পরিমাণ আরো সম্প্রসারিত হয়েছে ।
লবণাক্ত দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় এক পঞ্চমাংশ। শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা সর্বাধিক থাকে এবং বর্ষাকালে লবণাক্ততা হ্রাস পায়। লবণাক্ত মৃত্তিকা ফসলের জন্য উপযোগী নয় বলে সাম্প্রতিক সময়ে ফসল উৎপাদন মারাত্মক হ্রাস পেয়েছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা লবণাক্ত পানির মাধ্যমে আনুমানিক সাড়ে ৮ লক্ষ ফসলি জমি উর্বরতা হারিয়েছে। কম বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা দিনে দিনে আরো প্রকট হয়ে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। “বদলে যাচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের জীবনযাত্রা” পটভূমিতে সাগর সারওয়ার লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে উল্লেখ করেছেন “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে গেছে উপকূলবর্তী গ্রামগুলোর কৃষিব্যবস্থা। এক সময়ের দুই বা তিন ফসলি জমিগুলো এক ফসলি হয়ে গেছে। যে ফসল চাষ করা হয় তা থেকেও আশানুরূপ ফসল আসে না। এতে স্থানীয় অনেক কৃষক তাদের পূর্ব পুরুষের পেশা ত্যাগ করে অন্য দিকে ঝুঁকে পড়ছে।”
লবণাক্ত পানি থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমিকে রক্ষার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা জরুরী। এসআরডিআই জরিপে লবণাক্ততা দূরীকরণ ও প্রভাব মোকাবেলায় যে বিষয়গুলির দিকে নজর দিতে বলেছে তা হল, উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন বাঁধ নির্মাণ করা, নির্মিত বাঁধগুলিতে পানি ওঠানামা করার জন্য স্লুইসগেটের ব্যবস্থা করা, বৃষ্টির পানি নদীতে নামার জন্য নালার ব্যবস্থা করা, সেচের জন্য অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা, আবাদকৃত ধানের জাত নির্বাচন, মিষ্টি পানিতে চাষযোগ্য গলদা চিংড়ির চাষ সম্প্রসারণ, মাটির উপরিভাগ থেকে পানি সরানো জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাখা ইত্যাদি। জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রেখে অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ উপযোগী উচ্চফলনশীল বীজ উদ্ভাবন করেছেন। এই বীজ পরিবেশ উপযোগী হওয়ায় সহজেই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় বন্যা, খরা ও লবণসহিষ্ণু জাতের ধান উপকূলীয় অঞ্চলের বিরূপ পরিবেশের উপযোগী হবে। শুধু ধান নয়, বিভিন্ন প্রোটিন জাতীয় শস্য নিয়েও গবেষণা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে শস্যবিন্যাস ও শস্যপর্যায়ের কথাও ভাবতে হবে। উন্নত দেশের মত আমাদের দেশেও কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন। তবে মাটি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন কারিগরী প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেই কৃষি জমিতে লবণাক্ততার বিরূপ প্রতিক্রিয়া রোধ করা সম্ভব ।
লেখকঃ প্রভাষক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, সরকারি এম এম কলেজ, যশোর।
ইমেইলঃ [email protected]
©somewhere in net ltd.