| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সময় ১৯৭১, দেশ স্বাধীনের প্রাককাল। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত গেরিলারা নামছে। রাত নয়টা। ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। মিশন- ঢাকার সাথে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।
আব্দুল আউওয়াল মাস্টার(আমার চাচা)। যুদ্ধের সময়টাতে অনেকে রাজাকারও বলতো। পাক শাসনকালে উনি পড়াশুনার সময় বেশ কিছু উর্দূও আয়ত্ত করেছিলো। যার জন্যে যুদ্ধের সময় পাকিস্থানিদের সাথে বেশ খাতির জমিয়েছিলেন উনি। বিশেষ করে কয়েকজন মেজরের সাথেও নিয়মিত উঠা বসা ছিলো তার। তাদের মধ্যে কয়েকজন বাড়িতে এসে দাওয়াত খেয়ে গেছে বলেও শুনেছি। আমার চাচার এইরকম আধিপত্যের কারনে আমাদের গ্রামের কেউ নির্যাতনের শিকার হয়নি। এমনকি আমাদের গ্রাম দিয়ে কোন মুক্তিবাহিনি গেরিলা ইন্ডিয়া থেকে নেমে আসে কিনা সেটার দায়িত্বও পরেছিলো আমার চাচার উপর। মধ্যরাত, উত্তরপাড়া দিয়ে গেরিলারা যাচ্ছে, আমার চাচাও পাহারাতে। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার চাচার কানের সামনে এসে ফিসফিস করে করে বললেন আজকে একটা ব্রীজ ডিনামাইট মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে। তাই হলো, পাক গাড়িসহ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হলো। পরদিন রাত নয়টা, আমার চাচা আবারও পাহারাতে, ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে, উত্তরপাড়া দিয়ে আবারও গেরিলারা নামছে ভারী অস্র নিয়ে। এর আগের রাতে ব্রীজ গাড়িসহ উড়িয়ে দেবার ঘটনায় পাক বাহিনীও বেশ সতর্ক। হটাত পাক বাহিনীর একটি দল আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে। আমার চাচা টের পেয়ে মুক্তিবাহিনীকে জানিয়ে দেয়, এবং কিছু মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র রেখেই প্রানভয়ে চলে যায়। আমার চাচাকে সম্পূর্ন একা অবস্থায় পেয়ে ধরে নিয়ে যায় পাক বাহিনী। সারারাত ভর টর্চার চলে। কেউ চিন্তাও করেন নাই যে উনি আবার বেঁচে ফিরে আসবেন। উনার সারা গায়ে রক্তের ছোপ। বুটের লাত্থিতে শরীর অনেক জায়গা ফেটেও গেছিলো। ( বিঃদ্রঃ উনি কিভাবে ফিরে আসছিলেন আমি এইটা জানিনা)
১৬ই ডিসেম্বর বিজয় ঘোষনার পর, আমাদের ফ্যামিলির অনেকেই ভেবছিলো আমার চাচাকে মেরে ফেলবে মুক্তিবাহিনী।(যারা রাজাকার তাদের অনেককেই যুদ্ধের সময় এবং তার পরবর্তীকালে মারা হয়েছিলো)। কিন্তু চাচাকে কোনভাবেই আটকে রাখা যাচ্ছিলোনা। উনি জয় বাংলা, জয় বংগবন্ধু বলে দৌড়ে বের হয়ে গেছিলেন মুক্তিবাহিনীর মিছিলে। কিন্তু কাহিনী হয়ে গেলো উলটো মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার আর কয়েকজন মিলে আমার চাচাকে কাধেঁ তুলে নাঁচতে লাগলেন বিজয়ের জয়ধ্বনিতে।
মুক্তিযোদ্ধের সময়কালীন কেউ জানতোনা আমার চাঁচার ভূমিকা আসলে কি ছিলো। এমনকি পরিবারের মানুষেরাও বুঝতে পারে নাই। যুদ্ধের পরবর্তীকালীন সবাই বুঝতে পেরেছে সে আসলেই দেশের জন্যে কি করেছিলো! নিজের জীবন বাজি রেখে গেরিলাদের ইন্ডিয়া থেকে নেমে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলো!
মুক্তিযোদ্দ্বাদের নিবন্ধনের সময়--- যে যেভাবে পারে নিবন্ধিত হচ্ছে। কিছু রাজাকারও প্রানের ভয়ে নিবন্ধন করছে। আমার চাচাকে বলা হয়েছিলো নিবন্ধন করাতে-- উনি বলেছিলেন "সার্টিফিকেট দিয়ে কি হবে? দেশ স্বাধীন হইছে, স্বাধীন দেশে বাস করবো। আমার দেশ, সবকিছুই ত আমার, এর থেকে বড় পাওনা কি হতে পারে?"
এইরকম করে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই স্বাধীন দেশে বুক ফুলিয়ে চলার স্বপ্নে--- পাকিস্থানের পরাধীনতার শিকল ভেংগে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটও নেননি বা প্রয়োজনবোধ করেননি। তাদের অনেকেই হইতো মারা গেছেন অথবা বেঁচে থেকেও আবারো পরাধীনতার শিকলে জড়িয়েছেন। শ্রদ্ধাবোধ হয় সেসব দেশপ্রেমীদের জন্যে যারা দেশের জন্যে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। আর ঘৃনা হয় তাদের জন্যে যারা স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিয়ে আবার পরাধীনতার শিকল পড়িয়েছেন।
©somewhere in net ltd.