| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জারাহ
পড়তে ও লিখতে পছন্দ করি।
কান্না-হাসির ব্যাপারটা আমার কাছে তখন নিতান্তই স্থুল। শরীরে ব্যথা পেয়ে বা গুরুজনের শাসনে মানুষ কাঁদে, এছাড়া অন্যকোন কারণে কেউ কাঁদে বলে আমার জানা ছিলো না। এই অবধি জ্ঞান নিয়ে মায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুল ধরে চা-বাগানের এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজারের বাংলোতে যেদিন প্রথম এলাম, সেদিন একগাল হেসে আমাদের স্বাগত জানিয়ে, আমাকে প্রায় টেনে নিয়ে বাসায় উঠালো যে মানুষটি তার নাম বারিন।
আমাদের আগে যারা এবাসায় থেকেছেন তাদের মধ্যে কেউ বারিনকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেই থেকে এ বাসাই তার স্থায়ী ঠিকানা। বয়স অনুমান করা যায়না- চল্লিশ কিংবা সত্তর হতে পারে। মাথার চুলগুলো নিকষ কালো, তার গায়ের রংয়ের মতোই। খাঁকি হাফপ্যান্ট আর সাদা ছেঁড়া গেঞ্জি তার নিত্য পোশাক। বয়সের কারণে হাসলে মুখের চামড়ায় কয়েকটি ভাঁজ পড়তো। এজন্য ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হাসতো যখন, তখন বয়স কিছুটা ঠাহর করা যেতো।
চাই বা না চাই, আমরা বাসায় আসার দিন থেকেই সে আমাদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। বাসার সকলের ফরমায়েশ করা তার প্রধান কাজ। সকলের মনের কথা যেন পড়তে পারতো, না চাইতেই প্রয়োজন পূরণ করতো। আমার নাম জানতো কিনা জানিনা, ভাগ্নি বলে ডাকতো। চারশব্দের বাক্যে আটবার ভাগ্নি বলতো।
আসার দিন থেকেই বারিনের “ভাগ্নির জন্য কিছু করার চেষ্টা” অত্যাচারে রূপ নিলো। মাঠ-ঘাট ঝোপঝাঁড় খুঁজে নিয়ে আসতো কচুর লতি, হেলেঞ্চা শাক, ঢেঁকিশাক, কলমি শাক। মা ধমক দিতেন – কি রে বারিন, তুই আবার ঝোপ-জঙ্গল তুলে বাসায় এনেছিস? হেসে বলতো – রাগ হইওনা দিদি ঠাকরাইন।ভাগ্নি খাইবো, বাইটামিন আচে। একদিন ভোরে কুক্কুরু কু শব্দে ঘুম থেকে উঠে দেখি ১০/১২টি মুরগী ছোট উঠানে বেঁধে রেখেছে। মাকে দেখে অপ্রস্তুত হেসে বললো – রাগ হইওনা দিদি ঠাকরাইন। তুমি টেকা দিবায় কইয়া হরিয়ার মুরগী কিনিয়া আনলম। ভাগ্নি ডিম খাইবো।
ভাগ্নিদের জন্য তার নানা ফন্দি ফিকির আর বহুবিধ আয়োজনে আমরা বিশেষ করে মা অতিষ্ঠ হয়ে বাবাকে নালিশ করলেন। বাবা হেসে বলেন – বাদ দাও।ওর মধ্যে সুপ্ত পিতৃতৃষ্ণা আমার মেয়েতে জেগে উঠেছে।
বারিনের সুপ্ত পিতৃস্নেহের পুরোটা আমাদের মাঝে ঢেলে দিয়ে কয়েক বছর পার করলো সে।
একদিন ভোরে ফুলের বাগানে কাজ করার সময় কাশতে কাশতে বেহুঁশ হয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর জানা গেল যক্ষা। বাবা সিলেট যক্ষা হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। দুইমাস চিকিৎসার পর মারা গেলো বারিন। চা বাগানের তত্বাবধানে আনা হলো তার লাশ। কিন্তু তার জাতের লোকের মধ্যে এক পঞ্চায়েত টাইপ শ্রমিক বাগড়া দিয়ে বললো তারা বারিনের লাশ নেবেনা কারণ সে মুসলমানের ঘরে গরু খেয়েছে। বাবার অনেক দৌড়ঝাপের পর তারা আপোষ করে লাশ গ্রহন করলো।
চিতায় উঠলো বারিনের লাশ। দাউ দাউ চিতার আগুন জ্বললো। এদিকে অন্ধকার ঘরে একা আমি হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করি। ব্যথাটা যেন কলজে মুচড়ে দিলো।বিশাল এক ঢেউ যেন গড়িয়ে-পাকিয়ে বুক থেকে গলায় উঠে চোখ দিয়ে বেরিয়ে এলো। ছটফট করতে করতে অনুভব করলাম আমি কাঁদছি। প্রথমবার আমি বুঝলাম মানুষ কাঁদে ব্যথায় – সে ব্যথা হৃদয়েও হয়। 
©somewhere in net ltd.