নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জলপাই

মানুষের জন্য শুভকামনা

জলপাই দেশি

পাঠক এবং কবিতার বিমুগ্ধ পাঠক

জলপাই দেশি › বিস্তারিত পোস্টঃ

৭২ এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন

০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:২৯

১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়া সম্পর্কে মাঝে মাঝেই আওয়ামী ঘরনার রাজনৈতিক শক্তি ও আইনজীবীরা বলে থাকেন। কিন্তু এখন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পর এ নিয়ে বেশ শোরগোলের সঙ্গে এই কথা শোনা যাচ্ছে। কাজেই এ বিষয়ে কিছু আলোচনার প্রয়োজন আছে। তবে বাংলাদেশে কোন বিষয়ে তথ্যপূর্ণ ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনার বিষয় এই, যারা বর্তমান শাসকশ্রেণীর বিবেক ও দায় মেটানোর দায়িত্বে অধিষ্ঠিত আছেন তারা এসবের কোন পরোয়া করেন না। কাজেই কেউ তাদের গৎবাঁধা কথাবার্তার বাইরে তথ্যভিত্তিক কথা বললে যা বলা হয় সেই বিষয়বস্তুর ওপর কোন আলোচনা না করে, যে বলেছে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন। তাদের এই অভ্যাস ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হয়ে এখন পরিণতি হয়েছে তাদের এক অপরিবর্তনীয় ঐতিহ্যে।

প্রথমেই বলা দরকার, ১৯৭২ সালে যে আইন পরিষদ সংবিধান প্রণয়ন করেছিল সেটা বাংলাদেশের মতো একটি নতুন রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য কোন জাতীয় সংসদ বা সংবিধান সভা ছিল না। তার সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন ইয়াহিয়া নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার দ্বারা (আইউব সরকার প্রণীত সংবিধান তখন বাতিল করা হয়েছিল)। তার কাজ ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে একটি নতুন সংবিধান তৈরি করা। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচ্ছেদ হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ১৯৭০ সালে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের আর কোন আইনগত অস্তিত্ব ছিল না। সেভাবে নির্বাচিত কোন পরিষদ বা পরিষদের সদস্যদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সংবিধান প্রণয়নের কোন এখতেয়ারই ছিল না।

কিন্তু কোন আইনগত এখতিয়ার না থাকলেও ১৯৭০ সালে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদের পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল সংবিধান সভা। এভাবে সংবিধান সভার জন্য নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে কেন সেই পুরনো লোকদের নিয়ে সংবিধান সভা গঠন করা হয়েছিল এটা বোধগম্য নয়। কারণ তখন নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগেরই জয়জয়কার হতো এবং নতুন বিধান সভা কর্তৃক নতুন রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন সব দিক দিয়েই আইনসিদ্ধ ও যুক্তিসঙ্গত হতো। আসলে ১৯৭২ সালের প্রথম থেকেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ যেভাবে বেপরোয়া হয়ে সব কাজ করেছিল এটাও ছিল তারই একটি। এর দ্বারা সব গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বর্জন তো করাই হয়েছিল। তাছাড়া এর দ্বারা একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের প্রতি প্রচণ্ড তাচ্ছিল্যও প্রদর্শন করা হয়েছিল। সংবিধান প্রণয়নের বিষয়ে তাদের ভূমিকাকে যেভাবে খর্ব করা হয়েছিল সেটাও ছিল এক বিস্ময়কর ব্যাপার। কারণ এর দ্বারা ১৯৭২ সালের সংবিধানকে প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে গঠিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সন্তান হিসেবেই জš§ দান করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালের সংবিধানের যে পরিণতি হয়েছিল সেটা এই সংবিধান প্রণয়নকারী জাতীয় সংসদের চরিত্রের সঙ্গে কতখানি সম্পর্কিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল সেটাও এক হিসাবের ব্যাপার। বিশেষত এ কারণে সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর একে একে অতি দ্রুত প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংশোধনীর মাত্র দু’বছরের মাথায় এসেছিল চতুর্থ সংশোধনী, যার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক দল, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে হরণ করে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাকশাল নামে একটি একদলীয় সরকারের অধীনে এক ফ্যাসিস্ট শাসন। সে শাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বেসামরিক হলেও তার আচরণ ছিল একেবারেই সামরিক শাসনের মতো। এটা হওয়ারও কথা। কারণ বাকশালি নামক নতুন সরকারি দলটির দরজা সামরিক বাহিনীর লোকদের জন্যও খুলে দেয়া হয়েছিল। সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফি উল্লাহ, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে। অর্থাৎ সেই সময়েই সামরিক বাহিনীকে দেশের সরকার ও শাসন কাজ পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। কেউ যদি বলেন, সামরিক বাহিনীতে এভাবে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত করার জের হিসেবেই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাহলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কিছু নেই। এটা এক বাস্তব সত্য এবং ঐতিহাসিক ব্যাপার। আওয়ামী লীগ বাকশালে পরিণত হয়ে যে ডালে বসেছিল সে ডালাই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কেটে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। কাজেই অল্প কয়েকমাসের মধ্যেই সেই ডালপালা যেভাবে ভেঙে পড়েছিল তার

জন্য অবশ্য কাউকে দায়ী করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।

এবার আশা করা যেতে পারে ১৯৭২ সালে প্রণীত শাসনতন্ত্রের কথায়। এই শাসনতন্ত্রে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র নীতির চার মূল স্তম্ভ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। সংবিধানের ওপর জাতীয় সংসদ ও তার বাইরে আলোচনা চলার সময় আমি ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় দুটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। এ দুই প্রবন্ধের মধ্যে প্রথমটিতে আমি বলেছিলাম, যেভাবে ও যারা এই সংবিধান তৈরি করেছেন তাতে চার স্তম্ভ বলে বর্ণিত উপরোক্ত চার নীতি অচিরেই পরিত্যক্ত হবে। এখানে প্রথমত উল্লেখ করা দরকার, তৎকালীন সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। তার কারণ যেহেতু সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হয়েছিল সেজন্য তিনি বলেছিলেন, স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে শিক্ষা দানের ব্যবস্থার কথা। যে ব্যবস্থা তখন না হওয়ায় তিনি সংবিধানে স্বাক্ষর দেয়া থেকে বিরত থাকেন। যাই হোক, শুধু বিল নয়, যারা ওই সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন তাদের যে স্পষ্ট ও প্রমাণিত শ্রেণী চরিত্র ছিল তার সঙ্গে সমাজতন্ত্রের কোন সম্পর্ক না থাকার কারণেই আমি বলেছিলাম যে সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা যেভাবে বলা হয়েছে সেটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

গণতন্ত্রের কি অবস্থা দাঁড়িয়েছিল সেটা তো চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেখা গিয়েছিল। যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সামরিক অফিসার এবং কিছু যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানানোর মাধ্যমেই দেখা গিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ নীতির ভবিষ্যৎ। এখন আওয়ামী লীগ ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলছে। এর প্রতিক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবে জামায়াত ইসলামী থেকে নিয়ে অন্যান্য ধর্মীয় দলগুলো স্বাভাবিকভাবে প্রতিবাদ করছে। কিন্তু তাদের ভয় করার কিছু নেই। ধর্মীয় রাজনীতি ও দল নিষিদ্ধ করার যে কথা তারা বলছে এটা নিজেদের নিরপেক্ষতা দেখানোর জন্য, জনগণের সঙ্গে একটা সস্তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। যারা শাসনতন্ত্রে বিসমিল্লাহ রাখা এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ২০০৭ সালের ঘোষিত নির্বাচনের আগে খেলাফত মজলিসের সঙ্গে নির্বাচনী চুক্তি করে, ইসলামবিরোধী কথাবার্তার জন্য যারা ইনডেমনিটি আইন করার বিষয়ে পর্যন্ত সম্মত হয়েছিল, তারা এদেশে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করবে এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কাজেই ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারে।

সংবিধানে সমাজতন্ত্রের যে কথা বলা হয়েছে সেটা যে প্রথম থেকেই একটা প্রতারণার ব্যাপার ছিন এটা আগে বলা হয়েছে। এখন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথাবার্তা জোরশোরই হচ্ছে। এ ব্যাপারে সব থেকে বেশি কথা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে। এ এক হাস্যকর ব্যাপার এবং এর মধ্যে আওয়ামী লীগের করুণ অবস্থার পরিচয়ই পাওয়া যায়। কারণ যারা সংবিধানে বিসমিল্লাহ রেখেছে এবং এর সঙ্গে যারা প্রণীত রাষ্ট্রধর্ম আইন ও বহাল রেখেছে তারা ধর্মনিরপেক্ষতায় ফিরে যাবে এটা কোন গভীর আলোচনার বিষয় নয়। তবু ধর্মনিরপেক্ষতার কথা এখানে বারবার বলার কারণ ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলার সময় ধর্মনিরপেক্ষতার কথা ধুয়োর মতো করে বললেও সমাজতন্ত্রের কথা কেউই বলছে না। সমাজতন্ত্রী নামে যারা পরিচিত, তাদের মধ্যেও ১৯৭২ সালে ফেরত যাওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে না। অথচ সমাজতন্ত্র ১৯৭২ সালের সংবিধানের ঘোষিত চার স্তম্ভের অন্যতম। কাজেই সেই সংবিধানে ফেরত যেতে হলে সমাজতন্ত্রকেও রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ফিরিয়ে আনা দরকার। এ দিক থেকে এখন সমাজতন্ত্রের কি হবে? এ কথা কি কেউ গভীর বা সিরিয়াসলি চিন্তা করে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাতীন ১৪ দলীয় জোট সরকার বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে? এ ধরনের চিন্তা করার মতো কোন লোক যে এখন এই সরকারের মধ্যে নেই এটা স্বীকার করতেই হবে। তাহলে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফেরত যাওয়ার ব্যবস্থা হলে সমাজতন্ত্রের কি হবে? এ প্রশ্ন উত্থাপন খুবই যুক্তিসঙ্গত।

আসলে এখন ১৯৭২ সালে ফিরে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে সেটা এক তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। সমাজ এক চলমান জিনিস। নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে তাকে পথ কেটে কেটে যেতে হয়। কাজেই সমাজে যা ঘটে তার কতগুলো কার্য-কারণ সূত্র থাকে। এই সূত্রেই গাঁথা থেকে সমাজ অগ্রসর হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধান জিয়াউর রহমান উৎখাত করছিলেন, এটা মোটেই ঠিক নয়। ১৯৭২ সালের উচ্ছেদ চতুর্থ সংশোধনীর দ্বারাই ঘটেছিল। এই চতুর্থ সংশোধনী আনা হয়েছিল আওয়ামী-বাকশালি সরকার যেভাবে নানা নীতি নির্ধারণ ও কার্যকর করে চলেছিল সেটা সমাপ্ত করা তাদের দ্বারা সম্ভব হয়নি। সেটা হলে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক ও বিশাল গণঅভ্যুত্থান হতো। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বাকশাল সরকার উচ্ছেদ হওয়ার কারণে সে সম্ভবনা রহিত হয়। তারপর ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক অসমাপ্ত কাজই সম্পন্ন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ যতই শেখ মুজিবের কথা বলে তার নামে নানা অঙ্গীকার করুক প্রকৃতপক্ষে জিয়াউর রহমান নিজের নানা নীতি ও কাজের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, তিনি শেখ মুজিবেরই সর্বপ্রধান ভাবশিষ্য ও অনুসারী। তিনিই আওয়ামী-বাকশালিদের অনেক অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। বর্তমান ১৪ দলীয় জোট সরকার যে সংবিধানে বিসমিল্লাহ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটাও তার এক বড় প্রমাণ।

যাই হোক, এ প্রবন্ধ শেষ করার আগে এটা বোঝা দরকার যে, ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাওযার অর্থ সমাজ ও ইতিহাসকে হুকুম দেয়া ১৯৭২ সালে ফেরত যেতে। কিন্তু এটা এক অলঙ্ঘনীয় সত্য যে সমাজ বা সামাজিক ইতিহাস কোন ব্যক্তি বা দলের হুকুমবরদার নয়।

- বদরুদ্দীন উমর

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.