নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

অন্ধকারের রসায়নবিদ

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


লেখকের নোট:
এই গল্পের পটভূমি ১৯৭৭ সালের ঢাকায় সংঘটিত জাপান এয়ারলাইন্সের বিমান ছিনতাইয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবলম্বন করে নির্মিত। ঐতিহাসিক ব্যক্তি, স্থান ও ঘটনার পাশাপাশি প্রফেসর রেহান আশরাফ, তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং এই গল্পের সব অপরাধমূলক ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭। বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৫৩ মিনিট।

মুম্বাই বিমানবন্দর থেকে রানওয়ে ছেড়ে উড্ডয়ন করার ঠিক তেরো মিনিট পর, জাপান এয়ারলাইন্সের DC-8 বিমানটি মেঘের ঘন সাদা স্তর কেটে ক্রমশ উঁচুতে উঠছিল। বিমানের ফার্স্ট ক্লাসের জানালার পাশে শান্ত হয়ে বসে ছিলেন একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। তিনি কবজি ঘুরিয়ে একবার ঘড়ির দিকে তাকালেন।

তারপর তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল খুব সামান্য এক চিলতে হাসি। এমনই এক অস্পষ্ট হাসি, যা ঠিক পাশের আসনে বসে থাকা যাত্রীরও চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা।

ধূসর রঙের পরিপাটি ব্লেজার, ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্ট, আর চোখে সরু পাতলা ফ্রেমের চশমা। কোলে রাখা একটি বহু পুরোনো চামড়ার ব্রিফকেস। তাঁকে দূর থেকে দেখলে যে কেউ ধরে নেবে—তিনি কোনো আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গম্ভীর অধ্যাপক।

লোকটির নাম—প্রফেসর রেহান আশরাফ।

কাগজে-কলমে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। কিন্তু রেহানের আসল পরিচিতি বা বিশেষত্ব শুধু কেমিস্ট্রির রসকষহীন সূত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর আসল ক্ষমতা লুকিয়ে ছিল মানুষের আচরণের জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্যাটার্ন ধরে ফেলার মধ্যে।

একজন মানুষ ঠিক কোন মুহূর্তে মিথ্যা বলবে, কখন সে চরম আতঙ্কে ভাঙতে শুরু করবে, কখন একটু সময় কেনার জন্য ছটফট করবে, আর কখন নিজের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে এমন সব অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নেবে—যা পাঁচ মিনিট আগেও তার কাছে অসম্ভব বলে মনে হতো—এসবই রেহানের নখদর্পণে।

রেহান মানুষের মস্তিষ্ককে কেমিস্ট্রির ল্যাবের কোনো জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো দেখতেন। একটি বাড়তি উপাদান যোগ করলে অন্যটির মেজাজ বদলে যায়; চাপ বাড়ালে বিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বদলে যায়; তাপমাত্রা ওঠানামা করলে সম্পূর্ণ ফলাফলই নতুন রূপ নেয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম—সঠিক অনুঘটক ও উপযুক্ত সময় না পাওয়া পর্যন্ত কোনো Reaction-ই পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয় না।

তিনি দ্বিতীয়বার ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে বিমানের ভেতরের শান্ত আবহাওয়াটা আচমকা বদলে গেল। কয়েকজন যাত্রী ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। ককপিটের বন্ধ দরজার সামনে শুরু হলো কয়েকজন তরুণের অস্বাভাবিক ও হিংস্র নড়াচড়া। দেখতে দেখতে গোটা বিমানটির নিয়ন্ত্রণ চলে গেল একদল সশস্ত্র ছিনতাইকারীর হাতে।

সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে পরদিনই পুরো বিশ্ব জানতে পারবে—এটি জাপানিজ রেড আর্মির (Japanese Red Army) ঘটানো এক ভয়াবহ ও দুঃসাহসিক বিমান ছিনতাই।

কিন্তু পর্দার পেছনের আসল সত্যটা ছিল আরও অনেক বেশি অদ্ভুত ও জটিল।

রেহান আশরাফ মোটেও ছিনতাইকারীদের প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দেওয়া কোনো কমান্ডার ছিলেন না। এমনকি বিমানের ভেতরের অধিকাংশ ছিনতাইকারী দলের সদস্য জানতও না—চুপচাপ জানালার পাশে বসে থাকা এই প্রবীণ মানুষটি আসলে কে!

তারা কেবল এটুকু জানত, অন্ধকারের অচেনা কোনো মাস্টারমাইন্ড বহু আগেই এই অভিযানের সম্ভাব্য প্রতিটি পরিস্থিতি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ছক কষে রেখেছেন।

কখন ও কোথায় চাপের পরিমাণ বাড়াতে হবে, কতক্ষণ সম্পূর্ণ নীরব থেকে প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে পিষে মারতে হবে, ঠিক কোন মুহূর্তে দাবি তুলে ধরে অচলাবস্থা তৈরি করতে হবে, আর কীভাবে সময়কে নিজের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে—সবটাই সেই অচেনা ছকে লেখা ছিল।

রেহান কখনো নিজের নাম বা আসল পরিচয় প্রকাশ করতেন না। তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় পরিচয় বলতে কিছু নেই—পরিচয় হলো স্রেফ একটা অপ্রয়োজনীয় 'রাসায়নিক খাদ' (Impurity)। মিশ্রণে খাদ যত কম থাকবে, চূড়ান্ত বিক্রিয়া তত বেশি বিশুদ্ধ ও নিখুঁত হবে।

কলকাতায় রানওয়ে পাওয়ার প্রাথমিক চেষ্টা যখন ব্যর্থ হলো, তখন বিমানটির গতিপথ বদলে সোজা ঘুরে গেল পূর্বদিকের আকাশ—ঢাকার দিকে।

ঘন মেঘের বুক চিরে ঢাকার আকাশে বিমানটি চক্কর কাটতে লাগল। নিচে তখন তেজগাঁওয়ের তৎকালীন ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কন্ট্রোল টাওয়ারে ততক্ষণে জিম্মি বিমানের খবর পৌঁছে গেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত ঝুঁকি বিবেচনায় কোনোভাবেই হাইজ্যাক হওয়া বিমানটি নামাতে রাজি হচ্ছিল না।

কিন্তু বিমানটির ককপিট থেকে রেড আর্মির সদস্যরা ওয়্যারলেসে বারবার স্পষ্ট বার্তা পাঠাতে থাকল—তাদের ফুয়েল প্রায় শেষ, অবতরণ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো বিকল্প তাদের হাতে খোলা নেই।

অবশেষে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিশাল DC-8 বিমানটি বিকট শব্দে ঢাকার রানওয়ে স্পর্শ করল। বিমানটি থেমে যাওয়ার সাথে সাথে পুরো ঢাকা বিমানবন্দরকে ঘিরে ফেলা হলো এক অভেদ্য নিরাপত্তা বলয়ে। পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, বিমানবাহিনী আর কন্ট্রোল টাওয়ারের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজ নিজ পজিশন নিলেন।

বিমানের ভেতরের থমথমে পরিবেশে বসে প্রফেসর রেহান আশরাফ জীবনের প্রথমবার জানালার কাচ দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। দূরে রানওয়েতে দ্রুত ছুটে বেড়ানো সশস্ত্র জোয়ান ও নিরাপত্তা কর্মীদের দৌড়াদৌড়ি দেখে তিনি খুব মৃদু ও ঠাণ্ডা স্বরে নিজের মনেই বললেন—

“এখন আসল পরীক্ষা শুরু হলো।”

সময় বাড়ার সাথে সাথে বিমানবোর্ডের সাথে কন্ট্রোল টাওয়ারের মূল আলোচনা ও যোগাযোগ শুরু হলো।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ নিজে কন্ট্রোল টাওয়ারের মাইক হাতে নিয়ে ছিনতাইকারীদের সাথে দর-কষাকষি শুরু করলেন। বাইরে থেকে পুরো দৃশ্যপট দেখে মনে হচ্ছিল—দুটি চরম শক্তিশালী পক্ষের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে।

কিন্তু বিমানের ভেতরে—

রেহান আশরাফ নিঃশব্দে নিজের সিটে বসে ছিলেন। তাঁর সামনে আধুনিক কোনো ভারী কম্পিউটার বা ইকুইপমেন্ট নেই। শুধু কোলের ওপর খোলা একটি ছোট চামড়ায় বাঁধানো নোটবুক। তার পাতায় পাতায় আঁকা কয়েকটি সংখ্যা, কিছু বিশেষ সময়, কয়েকটি ছদ্মনাম আর কিছু জটিল প্রশ্ন।

তিনি ফাউন্টেন কলমটা বের করে পাতায় একটা নতুন লাইন লিখলেন—

“কতক্ষণ পর্যন্ত ভয়কে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব?”

এক মুহূর্ত থেমে, ঠিক তার নিচে আরেকটা বাক্য যোগ করলেন—

“মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো অলৌকিক আশা আঁকড়ে ধরে রাখে, ঠিক ততক্ষণই সে যুক্তির ভাষা শোনে।”

এমন সময় দলের এক সহযোগী অত্যন্ত সাবধানে রেহানের কাছাকাছি এসে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, “প্রফেসর, আমাদের মূল দাবিগুলো কন্ট্রোল টাওয়ারে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

রেহান তাঁর খাতা থেকে চোখ তুললেন না। একইভাবে বরফশীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “ওদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী?”

“তারা জানিয়েছে, মেসেজটি সরাসরি জাপান সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হচ্ছে।”

“খুব ভালো,” রেহান হাতঘড়ির কাঁটার দিকে তাকালেন। “এখন শুধু চুপচাপ অপেক্ষা করো। সময়কে তার কাজ করতে দাও।”

ছিনতাইকারীদের মূল দাবি ছিল পরিষ্কার—নগদ ৬০ লাখ মার্কিন ডলার মুক্তিপণ এবং জাপানের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি থাকা তাদের কয়েকজন শীর্ষ সহযোগীর নিঃশর্ত মুক্তি।

সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলো। সেই ডেডলাইন পার হলো, আবার নতুন করে সময় বাড়ানো হলো। বাইরে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল টানটান উত্তেজনা ও আতঙ্ক।

কিন্তু বিমানের ভেতরে বসে রেহান আশরাফ এক মুহূর্তের জন্যও বিন্দুমাত্র তাড়াহুড়ো বা অধৈর্য প্রকাশ করলেন না। কারণ তাঁর কাছে এই মুহূর্তে টাকার চেয়েও অনেক বেশি দামি উপাদান ছিল—সময়।

রেহান তাঁর দীর্ঘ গবেষণায় জেনেছেন, যেকোনো জিম্মি সংকটে 'সময়' কোনো নিষ্ক্রিয় বিষয় নয়, সময় নিজেই এক জীবন্ত চরিত্র। সময় যত গড়িয়ে যাবে—

সরকারের ভেতরের রাজনৈতিক ও মানসিক চাপ তত বাড়বে;
বন্দিদের পরিবারগুলোর মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে;
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার চাপ ও কূটনৈতিক সংকট তীব্রতর হবে;


আর শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে।

প্রতিটি পক্ষ ধীরে ধীরে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক পয়েন্টে এসে পৌঁছাবে, যেখান থেকে তাদের পক্ষে আগের কঠোর সিদ্ধান্তে অনড় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

রেহান নোটবুকটা আস্তে করে বন্ধ করলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সহযোগীর দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, “সাধারণ মানুষ মনে করে নেগোশিয়েশন বা আলোচনা মানে হলো অনবরত কথা বলে যাওয়া। কিন্তু সত্যিটা হলো—নেগোশিয়েশন মানে হলো সঠিক মুহূর্তের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা।”

২৯ সেপ্টেম্বর।

পরদিন সকাল হতেই ঢাকার প্রতিটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিমান ছিনতাইয়ের খবর প্রধান শিরোনাম হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। বিমানবন্দরের বাইরে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, বিভিন্ন দূতাবাসের প্রতিনিধি আর সশস্ত্র বাহিনীর কড়া পাহাড়া।

ঠিক সেই সময়, বিমানবন্দর থেকে বেশ কিছুটা দূরে, সাধারণ এক চায়েব দোকানে বসে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে এক লোক শান্ত মনে চা খাচ্ছিলেন।

তিনি স্বয়ং প্রফেসর রেহান আশরাফ।

তাঁর নজর কিন্তু পত্রিকার প্রধান পাতায় ছাপা হওয়া বিমান ছিনতাইয়ের চটকদার শিরোনামে ছিল না। তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলেন ভেতরের পাতার এক কোণে ছাপা হওয়া মাত্র দুই লাইনের একটি ছোট্ট খবর—“সংকট নিরসনে আলোচনা অব্যাহত।”

তিনি খবরের কাগজটা যত্ন করে ভাঁজ করে পাশে রাখলেন। তারপর নিজের পকেট থেকে ছোট নোটবুকটা বের করে একটি মাত্র শব্দ লিখলেন—Stable (স্থিতিশীল)।

সবকিছু এখনো তাঁর আগে থেকে কষে রাখা রাসায়নিক হিসাবের সীমানার ভেতরেই নিখুঁতভাবে ঘটছে। তবে রেহানের পরিকল্পনার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কখনোই কোনো নির্দিষ্ট একটা ফলাফল মেলানোর চেষ্টা করতেন না। তিনি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিলেন না; তিনি কেবল সম্ভাবনার শত শত মানচিত্র তৈরি করে রাখতেন।

১ অক্টোবর
জাপান থেকে উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদল জরুরি ফ্লাইটে ঢাকায় এসে পৌঁছাল। একই সাথে এলো জাপান এয়ারলাইন্সের শীর্ষ কর্মকর্তারাও। ঘটনার জটিলতা বহুগুণ বেড়ে গেল।

দাবি, পাল্টা দাবি, জিম্মিদের একের পর এক তালিকা তৈরি, মুক্তিপণের টাকার ব্যাগ নিশ্চিত করা—এসব নিয়ে কন্ট্রোল টাওয়ারে এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদের সাথে জাপানি কর্মকর্তাদের অবিরাম বৈঠক চলতে লাগল।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে জাপানের পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাজিমে ইশিই নিজেই ওয়্যারলেসে ছিনতাইকারীদের সাথে জাপানি ভাষায় সরাসরি কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি এক অভূতপূর্ব প্রস্তাব দিয়ে বললেন—সব জিম্মি যাত্রীদের ছেড়ে দিয়ে বদলে তাকে যেন জিম্মি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

কিন্তু বিমান থেকে সেই আবেগঘন প্রস্তাব সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করা হলো।

বাইরের আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও বিশেষজ্ঞরা ততক্ষণে নিশ্চিত ধরে নিয়েছেন—এই ভয়াবহ সংকট হয়তো এবার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং এর শেষ পরিণতি হবে এক রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ।

বিমানের ভেতরে জানালার পাশে বসে রেহান সবকিছু শুনছিলেন। একপর্যায়ে দলের এক অস্থির সহযোগী তাঁর পাশে এসে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “প্রফেসর! বাইরে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, অথচ আপনি এখনো এতটা শান্ত কীভাবে আছেন?”

রেহান চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে তার দিকে তাকালেন। “কারণ, এই মুহূর্তে আমাদের নতুন করে আর কিছুই করার নেই।”

লোকটি তাজ্জব হয়ে বলল, “কিছু করার নেই মানে?”

“হ্যাঁ,” রেহান হালকা ও অর্থপূর্ণ হাসলেন। “রাসায়নিক বিক্রিয়ার সব উপাদান যখন ঠিকঠাক পাত্রে ঢেলে দেওয়া হয়, তখন কেমিস্টের আর কিছু করার থাকে না। এখন পাত্রের ভেতরে থাকা মানুষগুলো পরিস্থিতির চাপে পড়ে নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে।”

২ অক্টোবর ভোর।

ঢাকা বিমানবন্দরকে ঘিরে থাকা দীর্ঘ উত্তেজনার মধ্যেই, হঠাৎ করে পুরো দেশের সামরিক অঙ্গনে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী দাবানল ছড়িয়ে পড়ল।

মুহূর্তের মধ্যে তেজগাঁও বিমানবন্দর ও তার আশেপাশের সিকিউরিটি স্ট্রাকচার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। টার্মিনাল ভবনের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করল। বাইরে গুলির শব্দ, সেনাসদস্যদের ছোটাছুটি, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—পরের কয়েক মিনিটে কী ঘটতে চলেছে, তা বোঝার ক্ষমতা কারো ছিল না।

বিমানের ককপিটে বসে রেহান রেডিও তরঙ্গে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক অভ্যুত্থানের বিশৃঙ্খল খবরটি শুনলেন।

তিনি কয়েক মুহূর্ত একদম স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে জানালার বাইরের ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে স্রেফ একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন—

“Interesting!”

পাশে থাকা চমকে ওঠা সহযোগীটি কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “প্রফেসর... দেশের এই অভ্যুত্থান কি আমাদের মূল মাস্টারপ্ল্যানের অংশ ছিল?”

রেহান ধীরস্থিরভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালেন। “না।”

“তাহলে? এখন আমাদের কী হবে?”

রেহান পকেট থেকে নোটবুকটা বের করে চট করে বন্ধ করলেন। “জীবনের সবকিছু আগে থেকে পরিকল্পনা করে সাজানো যায় না।” এক সেকেন্ড থেমে, বেশ গম্ভীর গলায় বললেন—

“কিছু বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম এই পৃথিবী নিজেই তৈরি করে। আর একজন বুদ্ধিমান মানুষের কাজ হলো—সেই অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলাকে কীভাবে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে হয়, তা বুঝতে পারা।”

টানা ১০৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা স্নায়ুচাপের পর, অবশেষে জটিল আলোচনার বরফ গলতে শুরু করল। নির্ধারিত মুক্তিপণের টাকা এবং জাপানে বন্দি সহযোগীদের হস্তান্তরের বিনিময়ে ধাপে ধাপে জিম্মি যাত্রীদের মুক্ত করা শুরু হলো।

একে একে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত যাত্রীরা বিমান থেকে নেমে রানওয়েতে পা রাখলেন। কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কেউ ভয়ে নির্বাক, কেউ বা প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরছেন।

রানওয়েতে থিকথিক করছে নিরাপত্তাকর্মী আর গোয়েন্দাদের নজরদারি। কিন্তু এই মহা বিশৃঙ্খলা ও ভিড়ের মাঝে—একজন অতি সাধারণ যাত্রীকে কেউ আর আলাদা করে খেয়াল করল না।

প্রফেসর রেহান আশরাফ।

তাঁর নাম কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধীর তালিকায় ছিল না, সংবাদপত্রে তাঁর কোনো ছবি ছাপা হয়নি। বিশ্বের কোনো ডাকসাইটে গোয়েন্দা সংস্থাও ঘুণাক্ষরে টের পেল না যে—এত বড় একটি আন্তর্জাতিক সংকটকে আড়াল থেকে পরিচালনা করা মূল মস্তিষ্কের মালিকটি রানওয়ে পেরিয়ে ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছেন!

২ অক্টোবর রাত।

দীর্ঘ ১০৫ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট পর DC-8 বিমানটি অবশেষে ঢাকার মাটি ছেড়ে উড়াল দিল। বিশ্ববাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, আর ঢাকা শহর আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার অপেক্ষায় রইল।

কিন্তু পুরো ঘটনার আড়ালে একটি নিখুঁত প্রশ্ন অদৃশ্য রয়ে গেল—প্রফেসর রেহান আশরাফ এখন কোথায়?

পরদিন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সমস্ত যাত্রীর নথি ও হিসাব মেলাতে বসল। পাসপোর্ট, নাম, টিকিটের নম্বর, জিম্মি তালিকা, ছিনতাইকারীদের বিবরণ—সবকিছু টেবিলের ওপর সাজানো হলো।

হঠাৎ তালিকার একদম শেষভাগে এসে একজন তরুন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থমকে গেলেন। তিনি পাশে থাকা সহকর্মীকে ডেকে বললেন, “এই নামটা একটু ভালো করে দেখো তো।”

সহকর্মী ফাইলে চোখ রেখে বললেন, “কোন নামটা? প্রফেসর রেহান আশরাফ?”

“হ্যাঁ। তিনি তো ফার্স্ট ক্লাসের বৈধ যাত্রী হিসেবে মুম্বাই থেকে উঠেছিলেন।”

“হ্যাঁ, কাগজে তো তাই দেখাচ্ছে। সমস্যা কোথায়?”

“সমস্যা হলো, মুক্তি পাওয়া জিম্মিদের তালিকায় বা পালিয়ে যাওয়া ছিনতাইকারীদের তালিকায়—কোথাও তাঁর পরবর্তী কোনো আপডেট নেই! তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন?”

পুরো ঘরে কয়েক মুহূর্তের জন্য এক ভারী নীরবতা নেমে এলো।

কাগজপত্র আবার হন্যে হয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা হলো। কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেল না। কেউ উড়িয়ে দিয়ে বলল, হয়তো ফ্লাইটের বিশৃঙ্খলায় তালিকার বানান ভুল হয়েছে। কেউ বলল, হয়তো তিনি অন্য কোনো নামে অন্য দেশে নেমে গেছেন।

ধীরে ধীরে ফাইলটি বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক সপ্তাহ পর তদন্তের হাজার হাজার পৃষ্ঠার ধুলোবালি ও কাগজপত্রের স্তূপে ঘটনাটি চাপা পড়ে গেল।

তবে টোকিওর একজন অত্যন্ত তরুণ ও তীক্ষ্ণধী গোয়েন্দা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লাল কালিতে একটি প্রশ্ন চিরকালের জন্য লেখা রয়ে গেল—

Who was Rehan Ashraf?

ঠিক সেই রাতেই, পুরান ঢাকার একটি নির্জন, পুরোনো লাল-ইটের বাড়ির অন্ধকার বেসমেন্টে একটি আলোর বাল্ব জ্বলে উঠল।

বাড়িটি বাইরে থেকে দেখলে অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও সাধারণ মনে হয়। দোতলায় পুরোনো ধুলো জমা আসবাবপত্র, জানালায় মাকড়সার জাল। কিন্তু নিচে মেঝের গোপন দরজা খুললেই দেখা মেলে—একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ গোপন ল্যাবরেটরি।

কাচের নানারকম টেস্টটিউব, ফ্লাস্ক, জটিল সায়েন্টিফিক যন্ত্রাংশ, দেওয়ালজুড়ে লেখা কেমিক্যাালের সংকেত, আর ঘরের মাঝখানে একটি বিশাল কাঠের টেবিল।

রেহান দরজার ভারী তোপ লাগিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। গায়ের ব্লেজারটা খুলে হ্যাঙ্গারে রাখলেন, চোখে থাকা চশমাটা খুলে সযত্নে টেবিলের ওপর রাখলেন।

তারপর দেওয়ালের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কয়েক সেকেন্ড নিজের প্রতিবিম্বের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। কোনো জয়ের উল্লাস নেই, কোনো অহংকার বা মুচকি হাসি নেই। কেবল এক গভীর আত্মবিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন—

“কোথায় কোথায় আমার সমীকরণে ভুল হতে পারত?”

তিনি টেবিলে গিয়ে বসলেন এবং ছোট নোটবুকটি খুললেন। প্রথম পাতায় লেখা ছিল—

Experiment 01

ঠিক তার নিচে তিনটি শব্দ লিখলেন: Result: Successful.

তারপর কলমের মুখটা কয়েক সেকেন্ড শূন্যে আটকে রেখে নতুন একটি লাইন যোগ করলেন—
Unexpected variable: Dhaka.

তিনি কিছুক্ষণ লেখাটির দিকে তাকিয়ে থেকে পাশে সতর্কবাণী হিসেবে লিখলেন—
Do not underestimate chaos.

রেহান আশরাফের কাছে কোনো অপরাধ বা ষড়যন্ত্র আবেগীয় বিষয় ছিল না। তাঁর কাছে অপরাধ ছিল স্রেফ একটি নিখুঁত গাণিতিক Equation, একটি কেমিক্যাল Reaction, একটি সুসংগঠিত System।

এখানে সামান্য একটি Variable বদলে দিলে পুরো ফলাফলের রূপ বদলে যেতে বাধ্য।

তিনি প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতেন, “একজন ভালো রসায়নবিদ শুধু এটাই জানে না যে কীভাবে একটা বিক্রিয়া ঘটাতে হয়; সে সমানভাবে এটাও জানে যে একটা চলমান বিক্রিয়াকে ঠিক কোন মুহূর্তে থামিয়ে দিতে হয়।”

কিন্তু তাঁর নিষ্পাপ ছাত্ররা কখনো বুঝতে পারেনি—এই সাধারণ বৈজ্ঞানিক কথার পেছনে তাদের প্রফেসরের জীবনের অন্য এক ভয়ংকর দর্শন লুকিয়ে আছে।

রেহান মানুষের মনের প্রতিটা অনুভূতিকে রাসায়নিক উপাদান হিসেবে দেখতেন। ভয়, লোভ, ক্ষমতা, অহংকার, আত্মরক্ষা আর আশা—এসবই তাঁর কাছে ছিল একেকটি Powerful Reagent।

তবে মহাবিশ্বের সবকিছু হিসাব করতে পারলেও, তিনি একটি মাত্র জিনিস কখনো আগে থেকে হিসাব করতে পারতেন না—মানুষের অপ্রত্যাশিত ভালোত্ব ও আত্মত্যাগ।

আর সেই কারণেই তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় কোনো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশ ছিল না; তাঁর আসল ভয় ছিল এমন কোনো সাধারণ মানুষকে নিয়ে, যে নিজের স্বার্থ বা যুক্তির হিসাবের বাইরে গিয়ে হঠাৎ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভালো সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে!


রাত যত গভীর হতে থাকল, ঢাকার বাইরে বৃষ্টির শব্দ তত স্পষ্ট হয়ে উঠল। ল্যাবের ছোট্ট জানালায় বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে।

রেহান টেবিলের কোণে থাকা একটি পুরোনো মনিটর ও টার্মিনাল চালু করলেন। কালো স্ক্রিনে সবুজ অক্ষরের কোড ভেসে উঠল। তিনি একটি এনক্রিপ্টেড ফাইল ওপেন করলেন।

সেখানে কোনো দেশের নাম নেই, কোনো ব্যক্তির নাম নেই। শুধু বড় অক্ষরে লেখা—

PROJECT ATOM-7

রেহান কয়েক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর পুরোনো চামড়ার ফাইলটি খুললেন। ভেতরে একটি গোপন সামরিক মানচিত্র, কিছু দুর্লভ বৈজ্ঞানিক খবরের কাটিং আর একটি বিশাল সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনার ছবি।

ছবিটি হাতে তুলে নিতেই রেহানের চোখের দৃষ্টিতে প্রথমবারের মতো এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল। সেটা সাধারণ কোনো লোভ বা উত্তেজনা নয়, সেটা ছিল চরম বৈজ্ঞানিক কৌতূহল।

তিনি খুব নিচু ও গম্ভীর স্বরে বললেন, “আমাদের প্রথম পরীক্ষায় আমরা মানুষের ভয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে সফল হয়েছি।”

এক মুহূর্ত থামলেন। “দ্বিতীয় পরীক্ষায় আমাদের দেখতে হবে...”

তিনি বাক্যটি শেষ করলেন না। কম্পিউটারের স্ক্রিনে নতুন একটি অটোমেটেড লাইন ভেসে উঠল—

SIMULATION READY.

রেহান চেয়ারে কিছুটা হেলান দিয়ে বসলেন। তারপর শান্ত হাতে কম্পিউটার স্ক্রিনের পাওয়ার বাটনটি বন্ধ করে দিলেন।

“না।”

তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। “এখনই নয়। সময় এখনো সম্পূর্ণ পাকেনি।”

দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েও তিনি শেষবারের মতো পেছনে তাকালেন। অন্ধকারের মধ্যে শুধু কম্পিউটারের লাল ইন্ডিকেটর আলোটি একাকী মিটমিট করে জ্বলছিল।

রেহান এক চিলতে রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, “আগে দেখে নিই, পৃথিবীর ইতিহাসে আমাকে কতটুকু মনে রাখা হয়।”

বেসমেন্টের ভারী দরজার লকিং সাউন্ডের সাথে সাথে ঘরটি অন্ধকারে ডুবে গেল।

পরদিন সকাল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের একটি পুরোনো অ্যাকাডেমিক ভবনে প্রাত্যহিক কেমিস্ট্রি ক্লাস শুরু হয়েছে। কাঠের বোর্ডে সাদা চকে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
Chemical Equilibrium

শ্রেণীকক্ষে সব ছাত্র প্রস্তুত হয়ে বসে আছে। ঠিক সময়মতো দরজার হাতল ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন প্রফেসর রেহান আশরাফ।

পরিপাটি ধূসর ব্লেজার, চোখে চশমা, হাতে মোটা বই। মুখে সেই চিরচেনা শান্ত ও নিখুঁত হাসি।

সামনের বেঞ্চের এক ছাত্র দাঁড়িয়ে পরম শ্রদ্ধায় বলল, “Good morning, Sir!”

রেহান হালকা মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, “Good morning. বসো।”

তিনি ডায়াসের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চকটি হাতে নিয়ে বোর্ডের দিকে ঘুরলেন এবং সাম্যাবস্থার সূত্রের নিচে নতুন একটি লাইন লিখলেন—

Every reaction seeks equilibrium.

সব ছাত্র দ্রুত খাতায় নোট নিতে শুরু করল। রেহান কয়েক সেকেন্ড বোর্ডে লেখা বাক্যটির দিকে নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর খুব স্বাভাবিক, অথচ গভীর এক কণ্ঠে বললেন, “কিন্তু ছাত্ররা, সর্বদা মনে রাখবে...”

তিনি ধীরে ধীরে ঘুরে ছাত্রদের দিকে তাকালেন। চশমের কাচের পেছনে তাঁর চোখের গভীরে যেন এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত ও গা হিম করা এক আলোর ঝলকানি দেখা গেল।

“কিছু Reaction কখনো শেষ হয় না।”

বাইরে ততক্ষণে ভোরের মিষ্টি সোনালী রোদের আলো বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

আর শহরের অন্য প্রান্তে, কোনো এক ধুলো জমে থাকা অন্ধকার ঘরের কোণে, বন্ধ কম্পিউটারের স্ক্রিনে রক্তিম অক্ষরে আবার ভেসে উঠেছে—

PROJECT ATOM-7
STATUS: WAITING.

(চলবে...)

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩

আলামিন১০৪ বলেছেন: ওয়াও জাস্ট ওয়াও। আপনার লিখায় যাদু আছে। আপনার বই বেরোলে খবর দিয়েন। গাঁটের পয়সা উসুল।

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৪

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: ভাই আমি খুবই নগন্য একজন মানুষ। বই প্রকাশ করার কোনো ইচ্ছা, সময় এবং সাহস আমার নেই। গল্পটি পড়ে আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুব ভালো লাগছে।
মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

২| ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: “কিছু Reaction কখনো শেষ হয় না।”
........................................................................
তেমনি মহাকাশে কিছু গতি হারায়ে যায়না ।

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৭

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: মহাকাশের বিষয় আষয় মাথার উপর দিয়ে গেলো।

মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.