নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

১০০ টাকায় গরুর মাংস-ভাত: ভাইরাল মিজানের গল্প ও খুলনা শহরের এক পুরনো স্মৃতি

৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৮

গত বছর জুলাই-আগস্টের দিকে কিছুদিনের জন্য নিজের হোম টাউন খুলনাতে ছিলাম। নিরালা আবাসিক এলাকার মূল সড়কে প্রবেশের সময় ডান পাশে বেশ বড়সড় একটা খাবারের হোটেল চোখে পড়ত। একজন বয়োবৃদ্ধ মহিলা হোটেলটি চালাতেন, সাথে তাঁর ছেলেও বসত—অফিশিয়ালি নাম যাই হোক না কেন, দেখতে অনেকটা আমাদের পরিচিত 'ভাবির হোটেল'-এর মতোই। খাবার-দাবার বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, খদ্দেরের আনাগোনাতেও জমজমাট।

আমি মাঝে মাঝে সেখানে খেতে যেতাম। একদিন গিয়ে দেখি হোটেলের দেয়ালে একদম নতুন একটা পোস্টার টানানো হয়েছে—

বিশেষ অফার: এখন থেকে লাঞ্চ ও ডিনারে থাকছে সেট মেন্যু!
ভাত + ডাল + ভর্তা + গরুর মাংস = ১২৫ টাকা
ভাত + ডাল + গরুর মাংস = ১০০ টাকা


পোস্টারটি দেখে আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম। আজকের এই দুর্মূল্যের বাজারে মাত্র ১০০ টাকায় কীভাবে আনলিমিটেড ভাত, ডাল আর এক বাটি গরুর মাংস দেওয়া সম্ভব? গরুর মাংসের কোয়ালিটি বা সাইজ কেমন হতে পারে, তা নিয়ে মনের কোণে একটা প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল। যদিও সেই বিশেষ সেট মেন্যু আমার আর চেখে দেখা হয়নি, তাই খাবারের স্বাদ বা এর পেছনের লাভ-ক্ষতির রহস্য আমার কাছে আজও অজানাই রয়ে গেছে।

তবে সম্প্রতি ঢাকার আগারগাঁওয়ের তালতলার ‘ভাইরাল মিজান’-এর খবরটা পড়ে খুলনার সেই ১০০ টাকার মাংস-ভাতের স্মৃতির পাতাগুলো আবার নতুন করে মনে পড়ে গেল।

যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত, তাঁরা হয়তো এতদিনে ‘ভাইরাল মিজান’-এর নাম জেনে গেছেন। ঢাকার আগারগাঁওয়ের তালতলার ফুটপাতে ১০০ টাকায় পেট পুরে ভাত ও গরুর মাংস বিক্রি করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফুটপাতের এই সাধারণ ব্যবসায়ী আজকে কোনো সাধারণ জায়গায় থেমে নেই—তিনি এখন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নিত্যদিনের খোরাক।

ছোটবেলায় বরিশালের এক গ্রাম থেকে মায়ের সাথে ঢাকায় এসেছিলেন মিজান। মা অন্যের বাসায় কাজ করতেন, কখনো ফুটপাতে তরকারি বা ভাত বিক্রি করে সংসার টেনেছেন। বড় হয়ে মিজান নিজে রিকশা চালিয়েছেন, ফল বিক্রি করেছেন, এমনকি তালতলায় রিকশার গ্যারেজও ছিল তাঁর। বছর দুয়েক আগে সেই গ্যারেজ ছেড়ে মায়ের পথ ধরে ফুটপাতে ভাত বিক্রি শুরু করেন। আর গত বছর যখন থেকে ১০০ টাকায় গরুর মাংস-ভাত দেওয়া শুরু করলেন, তখন থেকেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—মিজান এত পরিচিতি কীভাবে পেলেন?
কোনো টিভি চ্যানেল বা খবরের কাগজে তাঁর বড় কোনো বিজ্ঞাপন ছিল না। তাঁর এই জনপ্রিয়তার মূল কারিগর হাজারো স্মারর্টফোনের ক্যামেরা।

ক্যাব (CAB)-এর হিসাব অনুযায়ী, ১০ বছর আগেও ঢাকায় যে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৩০০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায়। আর সাধারণ রেস্তোরাঁয় এক বাটি মাংস আর ভাত খেতে খরচ হয় প্রায় ২৫০ টাকা। সেখানে নিম্নবিত্ত দিনমজুর ও রিকশাচালকদের জন্য মিজানের ১০০ টাকার থালি হয়ে দাঁড়ায় এক আশীর্বাদ।

আর এই ‘নিম্নবিত্তের হাহাকার’কেই পুঁজি করল ফেসবুক, টিকটক আর ইউটিউবের কনটেন্ট নির্মাতারা। মিজানের দোকানের সামনে প্রতিদিন স্যুট-টাই পরা ক্রিয়েটর থেকে শুরু করে সাধারণ টিকটকারদের ভিড় জমতে লাগল। মিজানের কড়া মেজাজ, ক্যামেরা দেখে গালাগাল কিংবা খদ্দেরের রিভিউ—সবই ভিউ আর টাকার গ্যারান্টি এনে দিল।

মিজানের এই জনপ্রিয়তা কেবল লাইক-ভিউতে আটকে থাকেনি, রূপ নিয়েছে এক অদ্ভুত ঘটনায়। গত আগস্টে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যাওয়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর চড়াও হওয়ায় তাঁর ১৫ দিনের জেল হয় এবং দোকান উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর দেখা গেল নজিরবিহীন দৃশ্য! সমর্থক ও ক্রিয়েটররা তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিল। সেই কারামুক্তির ভিডিও ইন্টারনেটে দেখা হলো ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি বার!

সম্প্রতি মঙ্গলবার সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানে দ্বিতীয়বারের মতো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মিজানের রান্নার চুলা ও কাঠ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, প্রতিবার উচ্ছেদের পরও তিনি কীভাবে আবার ফিরে আসেন? উত্তরটা সহজ—সোশ্যাল মিডিয়া তাঁকে এমন এক ‘জনপ্রিয়তার পুঁজি’ দিয়েছে, যা তাঁকে সাধারণ হকার থেকে একপ্রকার 'আনটাচেবল' করে তুলেছে।

মিজানের এই গল্প বা আমার খুলনা শহরের নিরালা মোড়ের সেই হোটেলের কথা চিন্তা করলে একটা গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে।

ভিউয়ের বন্যায় আমরা হয়তো মিজানকে ‘নায়ক’ বানিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মূল সমস্যাটা আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। কেন আজও সাধারণ মানুষকে ১০০ টাকায় একটু মাংস-ভাত খাওয়ার জন্য ফুটপাতে ধুলোবালি মেখে লাইন দিতে হবে? কেন প্রথাগত বাজারব্যবস্থা সাধারণ মানুষের পাতে সাশ্রয়ী দামে পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে পারছে না?

সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক বা কৃত্রিম জনপ্রিয়তা কখনোই সঠিক নীতি বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সনদ হতে পারে না। তবে তালতলার ফুটপাত কিংবা খুলনার নিরালার সেই রাস্তার মোড়ে আজ এক নির্মম সত্য স্পষ্ট—দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য আজও পেট পুরে একবেলা গরুর মাংস দিয়ে ভাত খাওয়াটা এক যুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধের সুযোগেই জন্ম নেয় ‘ভাইরাল মিজান’-দের গল্প।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.