| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
আজ ৬ অক্টোবর, জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে—‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’। অথচ বাস্তবতা যেন এই স্লোগানের একদম উল্টো! সরকারি নথিতে যখন সাধারণ মানুষের নাম হয়ে যায় ‘লক্জ্ক্’, ‘ক্জ্ক্ল্জ্’, কিংবা ‘দতককা’—তখন সেটাকে ভুল না বলে চূড়ান্ত প্রহসন বললেও বোধহয় কম বলা হয়। নিজের নাম বা সন্তানের নাম শুধরাতে গিয়ে এখন ঘরে ঘরে যে চরম ভোগান্তি আর আর্থিক অপচয় চলছে, তা দেখলে রক্ত গরম হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
কানিজ ফাতেমা নামের এক অভিভাবক তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দ্বিমুখী (বাংলা ও ইংরেজি) জন্মসনদ তুলতে গিয়ে দেখলেন, পোর্টালে তাঁর ছেলের নাম লেখা ‘ক্জ্ক্ল্জ্’ আর স্বামীর নাম ‘লক্জ্ক্’! এমন আজব আর বিকৃত কাণ্ডজ্ঞানহীন ভুলের শিকার তিনি একাই নন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৪ কার্যালয়ে কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্তে গেলে এমন শত শত ভুক্তভোগীর কান্না শোনা যাবে। মিজানুর নামের একজনের মায়ের নাম বদলে হয়ে গেছে ‘দতককা’, নাছির আহম্মেদের মেয়ের নাম এসেছে ‘LJKLJF’, আরেকজনের সন্তানের জায়গায় লেখা শুধু ‘ইউওইউও’। এমনকি নাম না লিখে ফাঁকা জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে কেবল ‘০’ আর ‘–’!
প্রশ্ন হচ্ছে, এই অদ্ভুতুড়ে ভুলগুলো করল কে? ভুক্তভোগীরা পরিষ্কার জানিয়েছেন—অনলাইনে এই ধরণের নাম তাঁরা কোনোদিন টাইপই করেননি। ভুলের শুরুটা হয়েছিল তৎকালীন নিবন্ধন কার্যালয়গুলোর অদক্ষতা আর অবহেলা থেকে। তিন-চার বছর আগে যখন একসঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় সনদ দেওয়া হতো না, তখন হয়তো কেউ শুধু ইংরেজি সনদ চেয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট অফিস বা কম্পিউটারের দোকানদার আবেদনপত্রের ইংরেজি ঘরটি পূরণ করে বাংলা ঘরে কিবোর্ডে জাস্ট হাত চালিয়ে ইচ্ছেমতো উল্টাপাল্টা অক্ষর টাইপ করে রেখেছিল! এখন যখন সরকার বাংলা ও ইংরেজি দুটো এক পাতায় বাধ্যবাধকতা করেছে, তখন সেই আড়ালে থাকা জঘন্য ভুলগুলো সামনে আসছে।
কিন্তু চরম আশ্চর্যের বিষয় হলো—সরকারি কর্মচারীদের টাইপিংয়ের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের! ভুল শুধরাতে সরকার নির্ধারিত ফি ৫০ টাকা হলেও, অনভিজ্ঞ মানুষরা কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে গুনছেন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল এ বছরের প্রথম আট মাসেই নাম-ঠিকানার ভুল সংশোধন করতে গিয়ে নাগরিকরা সরকারের পকেটে দিয়েছেন সাড়ে ১৭ কোটি টাকা! আর গত বছর এই সংশোধনী খাতেই ভুক্তভোগীদের পকেট থেকে খসেছে প্রায় ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা!
যে ভুল আমি করিনি, যে পাপ নিবন্ধন কার্যালয়ের কর্মচারীদের, তার দায় কেন সাধারণ জনগণ নেবে? কেন দিনের পর দিন একটা সনদের সংশোধনের জন্য কাউন্সিলর অফিস, সিটি করপোরেশন আর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চক্কর কাটতে হবে? ২০২৩ সালে সরকারি বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, কেবল বাংলা সনদের ভুলই ছিল প্রায় ১০ কোটির কাছাকাছি। সে সময় বিনামূল্যে এই ভুল সংশোধন করে দেওয়ার প্রস্তাব উঠলেও, সরকারি কর্মকর্তারা তা স্রেফ নাকচ করে দেন! কারণটা খুব পরিষ্কার—গবেষকরাও মনে করেন, এভাবে অহরহ ভুল বানিয়ে আসলে একশ্রেণির অসাধু চক্র ‘টাকা খাওয়ার ফাঁদ’ পেতে রেখেছে। যত ভুল হবে, মানুষ তত সংশোধনের জন্য ছুটবে, আর দালাল-কর্মচারীদের পকেট তত ভারি হবে!
ঢাকার চিত্রে যদি এই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার ভোগান্তি দেখা যায়, তবে সাভার ও আশুলিয়ার চিত্র কিন্তু আরও বেশি ভয়ংকর আর অন্ধকার!
সাভারের পরিস্থিতি এখন জালিয়াতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সাভার উপজেলা পরিষদের সামনের মার্কেট, সাভার পৌরসভার সামনের বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকানসহ আশপাশের এলাকায় একটা সুসংগঠিত চক্র প্রকাশ্যেই এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিলেই মিলছে জন্মনিবন্ধন সনদ! এই টাকার বিনিময়ে কীভাবে একটি স্পর্শকাতর জাতীয় পরিচয় নথি তৈরি হয়ে যায়, তা সত্যি চিন্তার বাইরে। অনেক সময় দেখা যায়, টাকার বিনিময়ে একই ব্যক্তি একাধিক জন্মনিবন্ধন সনদও বানিয়ে নিচ্ছে!
এই পুরো পেছনের সিস্টেমে যে বিষাক্ত অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা পুরো দেশের নিরাপত্তার জন্যই এক বিরাট হুমকি। টাকা ফেললেই যদি জালিয়াতি করে জন্মসনদ বানিয়ে নেওয়া যায়, তবে কোনো সন্ত্রাসী, দাগি আসামি কিংবা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী খুব সহজেই এ দেশের বৈধ নাগরিক বনে যেতে পারবে। বিভিন্ন ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এই ভুয়া সনদ ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন মারাত্মকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশাসন যেন চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে!
সবমিলিয়ে জন্মসনদ নিয়ে দেশজুড়ে এক চরম নৈরাজ্য চলছে। একদিকে সরকারি ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে সাধারণ পথচারী ও অভিভাবকদের নাভিশ্বাস উঠছে, অন্য প্রশাসনিক জটিলতায় দিন পার করতে হচ্ছে; অন্যদিকে সাভারের মতো জায়গায় টাকার বিনিময়ে জাল সনদের খোলা বাজার বসেছে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কাছে একটাই প্রশ্ন—ডিজিটাইজড সুশাসনের দোহাই দিয়ে জনগণকে আর কতকাল এভাবে হয়রানি করা হবে? নিবন্ধন কার্যালয়ের নিজের করা ভুলগুলো অবিলম্বে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং সহজ উপায়ে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে সাভারসহ সারা দেশের এই জাল জন্মসনদ তৈরির চক্রগুলোকে হাতেনাতে ধরে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। এই কালো সিস্টেম পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলে ‘নির্ভুল নিবন্ধন আর নিশ্চিত সুশাসন’ কেবল দিবাস্বপ্ন আর কাগজের স্লোগান হয়েই থেকে যাবে!
©somewhere in net ltd.