| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
একটি অপরাধ, চারটি মৃত্যু এবং একজন তদন্তকারীর অসমাপ্ত হিসাব
লেখকের নোট: এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। চরিত্র, অপরাধ, তদন্ত ও ঘটনাপ্রবাহ কল্পনাপ্রসূত। বাস্তব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো মিল থাকলে তা অনিচ্ছাকৃত।
নারায়ণগঞ্জ, ১২ মে ২০০৮। রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
কন্ট্রোল রুমের টেলিফোনটা বেজে উঠতেই ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্য রিসিভার তুললেন।
ওপাশ থেকে ভেসে এল এক পুরুষের আতঙ্কিত কণ্ঠ।
“হ্যালো! পুলিশ? আমার বাড়িতে লোক ঢুকেছে! আমার স্ত্রীকে গুলি করেছে! আমি আত্মরক্ষার জন্য একজনকে গুলি করেছি। প্লিজ, তাড়াতাড়ি আসুন!”
“আপনার নাম?”
“শাহেদ চৌধুরী। সিদ্ধিরগঞ্জের চৌধুরী ভিলা। দয়া করে তাড়াতাড়ি আসুন!”
লাইন কেটে গেল।
প্রায় পঁচিশ মিনিট পর ঘটনাস্থলে পৌঁছাল পুলিশ। খবর পেয়ে থানার কর্মকর্তারা অতিরিক্ত তদন্ত সহায়তার জন্য সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।
চৌধুরী ভিলার ড্রয়িংরুমে পড়ে ছিলেন শাহেদের চতুর্থ স্ত্রী শারমিন। কিছুটা দূরে পড়ে ছিল কালো মুখোশ পরা এক অজ্ঞাতপরিচয় যুবক। দুজনেরই মৃত্যু হয়েছে।
বাড়ির মালিক শাহেদ চৌধুরী তখন সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। পরনে হালকা রঙের শার্ট, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। তাঁর ডান হাতে একটি রিভলভার। মুখে আতঙ্কের ছাপ থাকলেও তিনি অস্বাভাবিকভাবে সংযত।
পুলিশের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, “আমরা একটা সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে ফিরেছিলাম। গাড়ি গ্যারেজে রেখে ভেতরে ঢুকতেই দেখি শারমিন মেঝেতে পড়ে আছে। ওই লোকটা আলমারির পাশে ছিল। আমাকে দেখে অস্ত্র তুলেছিল। আমি বাধ্য হয়ে গুলি করি।”
“কতবার গুলি করেছেন?”
“দুবার।”
“ঘটনার পর কাউকে ফোন করেছিলেন?”
“না। আমি এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম যে কিছু বুঝতে পারছিলাম না।”
কিন্তু বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী জানালেন, শাহেদ ঘটনাস্থলে আসা পুলিশের সঙ্গে কথা বলার আগেই নিজের ঘরে কয়েক মিনিট একা ছিলেন। কেন, তা তিনি জানেন না।
পরদিন সকালে মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা সিআইডির কর্মকর্তা আরিয়ান ঘটনাস্থলের প্রাথমিক নথি দেখতে বসেন।
তখনও তিনি জানতেন না, এই একটি রাতের তদন্ত তাঁকে এমন একটি মৃত্যুচক্রের সামনে দাঁড় করাবে, যার শুরু সাত বছর আগে।
আর শেষ কোথায়, তা কেউ জানত না।
আরিয়ান ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন তাঁর সহকর্মী সাব-ইনস্পেক্টর ফারিহা এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষক সাব্বিরকে নিয়ে।
আরিয়ান খুব কম কথা বলতেন। অন্যরা যখন একটি ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজতেন, তিনি তখন খুঁজতেন সেই ব্যাখ্যার দুর্বল জায়গাটি।
ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে কোনো সিদ্ধান্ত দিলেন না। শুধু আলামত সংগ্রহের কাজ পর্যবেক্ষণ করলেন।
শাহেদের লাইসেন্সকৃত রিভলভারটি জব্দ করা হলো। মুখোশধারী ব্যক্তির পোশাক, ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত, সম্ভাব্য গুলির চিহ্ন এবং রক্তের নমুনা আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হলো। মৃতদেহ দুটির ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হলো।
এরপর আরিয়ান শাহেদের বক্তব্যের অনুলিপি পড়লেন।
“দুবার গুলি করেছেন—এটা নিশ্চিত?”
“জি, স্যার,” সাব্বির বলল।
“অস্ত্র পরীক্ষা না করে আমরা কী জানি?”
“এখনও কিছু নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।”
আরিয়ান মাথা নাড়লেন।
“ভালো। তাহলে অনুমানকে প্রমাণ বানানোর দরকার নেই।”
তিনি তদন্তের জন্য তিনটি প্রশ্ন লিখলেন।
প্রথম প্রশ্ন: শাহেদের রিভলভার থেকে সত্যিই কতটি গুলি ছোড়া হয়েছিল?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: মুখোশধারী লোকটি কে এবং শারমিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?
তৃতীয় প্রশ্ন: প্রতিবেশীরা যদি রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে গুলির শব্দ শুনে থাকেন, তবে শাহেদ পুলিশকে ফোন করলেন প্রায় ১১টা ৪৭ মিনিটে কেন?
ফারিহা বলল, “স্যার, লোকটা ডাকাত হলে এত দেরি করা অস্বাভাবিক। আবার নিজের বাড়িতে স্ত্রীকে মৃত অবস্থায় দেখলে মানুষ আতঙ্কেও সময় হারিয়ে ফেলতে পারে।”
“ঠিক,” আরিয়ান বললেন। “দেরি হয়েছে মানেই অপরাধী—এটা ধরে নেওয়া যাবে না। কিন্তু দেরির ব্যাখ্যাটা আমাদের জানতে হবে।”
তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন।
“এই বাড়িতে যা ঘটেছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ঘটনার পর কী ঘটেছে।”
তৃতীয় দিনের সকালে ফারিহা একটি তথ্য নিয়ে আরিয়ানের কক্ষে ঢুকল।
“স্যার, মুখোশধারী ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে। নাম সাদ্দাম মিয়া। কয়েক বছর আগে শাহেদ চৌধুরীর একটি রিসোর্টে কাজ করত। পেশায় গাড়িচালক, মাঝেমধ্যে দেখাশোনার কাজও করত।”
“শাহেদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল?”
“ছিল। তবে সম্পর্কের ধরন এখনও নিশ্চিত নই।”
সাব্বির একটি ফাইল খুলে দিল।
“ঘটনার আগের সপ্তাহে দুজনের মধ্যে অনেকবার ফোনে যোগাযোগ হয়েছে। শুধু কলের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে কিছু বলা যায় না, কিন্তু সময়গুলো লক্ষণীয়। কিছু কল হয়েছে গভীর রাতে, আবার কিছু হয়েছে এমন সময়ে যখন শাহেদ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সামাজিক অনুষ্ঠানে থাকার কথা বলেছেন।”
আরিয়ান তালিকাটি দেখলেন।
“এগুলো একা অপরাধ প্রমাণ করে না। ফোনের অবস্থান, সময় এবং অন্যান্য সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখো।”
সাব্বির আরও জানাল, ঘটনার তিন দিন আগে সাদ্দামের ব্যাংক হিসাবে পাঁচ লাখ টাকা জমা পড়েছে। অর্থের উৎস ছিল একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হিসাব, যার সঙ্গে শাহেদের ব্যবসার যোগাযোগ রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
ফারিহা বলল, “স্যার, টাকা, যোগাযোগ এবং একই বাড়িতে সাদ্দামের মৃত্যু—সবকিছু একসঙ্গে বেশ সন্দেহজনক।”
“সন্দেহজনক, হ্যাঁ। কিন্তু সিদ্ধান্ত নয়।”
আরিয়ান ফাইলটি বন্ধ করলেন।
“আমরা এখনও জানি না সাদ্দাম কেন সেখানে ছিল। সে কি শারমিনকে চিনত? শাহেদ কি তাকে ডেকেছিলেন? টাকা কীসের জন্য দেওয়া হয়েছিল? আগে উত্তরগুলো বের করো।”
সেদিন বিকেলে সাদ্দামের এক পুরোনো পরিচিতের কাছ থেকে আরেকটি তথ্য পাওয়া গেল।
সাদ্দাম মৃত্যুর কয়েক দিন আগে এক বন্ধুকে বলেছিল, তার কাছে এমন কিছু তথ্য আছে, যা প্রকাশ হলে একজন প্রভাবশালী মানুষের বিপদ হতে পারে।
কিন্তু সেই তথ্য কী, তা সে বলেনি।
শারমিনের মা রাশিদা বেগম প্রথমবার আরিয়ানের সামনে বসেছিলেন এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে।
বয়স্ক নারীটি কথা বলতে বলতে বারবার আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিলেন।
“স্যার, আমার মেয়েটা বিয়ের পর খুব বদলে গিয়েছিল। আগের মতো কথা বলত না। কিন্তু আমি কখনো ভাবিনি ওর কোনো বিপদ হতে পারে।”
“শাহেদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?”
“বাইরে থেকে ভালোই মনে হতো। কিন্তু শারমিন মাঝেমধ্যে বলত, ওর স্বামী নাকি সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ব্যাংকের কাগজপত্র, সম্পত্তির দলিল—সবকিছু।”
“জীবনবিমা সম্পর্কে কিছু জানতেন?”
রাশিদা বেগম মাথা নাড়লেন।
“বিয়ের কিছুদিন পর শারমিন বলেছিল, ওর নামে একটা বড় বিমা করা হয়েছে। শাহেদ বলেছিল, ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য। তখন আমরা আপত্তি করিনি।”
আরিয়ান বিমার কাগজপত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করলেন।
সেখানে দেখা গেল, শারমিনের নামে দেড় কোটি টাকার জীবনবিমা করা হয়েছে। শাহেদ চৌধুরী ছিলেন একমাত্র নমিনি।
এছাড়া ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাট, যা একসময় শারমিনের নামে ছিল, বিয়ের কিছুদিন পর মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে শাহেদের নামে চলে যায়।
এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনো একক তথ্যই হত্যার প্রমাণ নয়।
আরিয়ান পুরোনো রেকর্ড যাচাই করার নির্দেশ দিলেন।
কয়েক দিন পর সাব্বির একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং নিয়ে এল।
সেখানে শাহেদ চৌধুরীর নামের সঙ্গে তাঁর আগের স্ত্রী নাসরিনের মৃত্যুর সংবাদ ছিল।
নাসরিন মারা গিয়েছিলেন ২০০৩ সালে। তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে সাপের কামড়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
আরেকটি নথিতে পাওয়া গেল রুমানা নামের এক নারীর মৃত্যুর বিবরণ। তিনি মারা যান ২০০৬ সালে, পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে।
তৃতীয় নামটি লাবণী। ২০০৭ সালের একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে শাহেদও ছিলেন, কিন্তু তিনি বেঁচে যান।
ফারিহা নথিগুলো পাশাপাশি রেখে বলল, “তিনটি আলাদা ঘটনা। তিনটি আলাদা মৃত্যুর কারণ। কিন্তু প্রতিবারই স্বামী একই মানুষ।”
সাব্বির যোগ করল, “আর প্রতিবারই বিমার সুবিধা পাওয়ার তথ্য আছে।”
আরিয়ান তিনটি নথির দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
“আমরা কি জানি, প্রতিটি মৃত্যুতে বিমার টাকা সত্যিই পরিশোধ করা হয়েছিল?”
“প্রাথমিক নথি অনুযায়ী, হয়েছিল। তবে কোম্পানির মূল রেকর্ড আনতে হবে।”
“তাহলে আগে সেটা আনো। আর প্রতিটি মৃত্যুর তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন, ময়নাতদন্তের নথি এবং পরিবারের বক্তব্য সংগ্রহ করো।”
তিনি একটি কাগজে চারটি নাম লিখলেন।
নাসরিন।
রুমানা।
লাবণী।
শারমিন।
তারপর নামগুলোর নিচে একটি শব্দ লিখলেন—
প্যাটার্ন?
প্রশ্নবোধক চিহ্নটি তিনি ইচ্ছা করেই রেখেছিলেন।
পুরোনো মামলার নথি সংগ্রহ করতে গিয়ে আরিয়ানের দল নানা সমস্যার মুখে পড়ল।
কিছু কাগজ আর্দ্রতায় নষ্ট হয়ে গেছে। কোনো প্রতিবেদনে সাক্ষীর পূর্ণ বক্তব্য নেই। একটি মামলার নথিতে ময়নাতদন্তের উল্লেখ থাকলেও বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে না।
নাসরিনের মৃত্যুর সময় পরিবারের কয়েকজন সদস্য সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সাপের কামড়ের ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে ধরে তদন্ত শেষ করা হয়েছিল।
রুমানার পরিবার ময়নাতদন্ত চেয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বক্তব্যে অমিল পাওয়া গেল। এক আত্মীয় বললেন, তাঁরা আপত্তি করেছিলেন; আরেকজন বললেন, পরিবার সামাজিক চাপে দ্রুত দাফনে সম্মত হয়েছিল।
লাবণীর দুর্ঘটনার নথিতে গাড়ির যান্ত্রিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য অনুপস্থিত ছিল। সেই সময়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা অবসর নিয়েছেন।
কোনো নথিই সরাসরি প্রমাণ করছিল না যে শাহেদ তাঁর আগের স্ত্রীদের হত্যা করেছিলেন।
কিন্তু চারটি ঘটনার পাশে একই নাম, একই আর্থিক সুবিধা এবং বারবার সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তনের তথ্য উঠে আসছিল।
আরিয়ান তাঁর দলকে বললেন, “আমরা অতীতকে বর্তমানের অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করব না। আমরা অতীতকে ব্যবহার করব নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে। উত্তর খুঁজতে হবে প্রতিটি মৃত্যুর আলাদা প্রমাণে।”
এই নির্দেশের পর তদন্তের পরিধি বাড়ল।
বিমা কোম্পানির মূল নথিতে দেখা গেল, চারটি পলিসির শর্ত এক ছিল না। প্রতিটির আবেদন, সুবিধাভোগী নির্ধারণ এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াও আলাদা।
কিছু আবেদনপত্রে শাহেদের স্বাক্ষর ছিল। একটি নথিতে শারমিনের স্বাক্ষর যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিল। আরেকটিতে পুরোনো ঠিকানা ব্যবহারের ব্যাখ্যা চাওয়া হলো।
ফারিহা বলল, “স্যার, এই নথিগুলো প্রমাণ করছে না যে তিনি খুনি। কিন্তু তিনি প্রতিটি সম্পর্কের আর্থিক দিক নিয়ে সক্রিয় ছিলেন।”
“সেটা গুরুত্বপূর্ণ,” আরিয়ান বললেন। “তবে মনে রেখো—অর্থের উদ্দেশ্য থাকতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য আর অপরাধ এক জিনিস নয়।”
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ঘটনাটি সম্পর্কে নতুন কিছু তথ্য জানা গেল।
শারমিনের মৃত্যুর কারণ ছিল গুলির আঘাত। সাদ্দামের শরীরেও গুলির আঘাত ছিল। তবে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর সময়ের মধ্যে কতটা ব্যবধান ছিল, তা নির্ধারণে চিকিৎসাগত সীমাবদ্ধতা ছিল। কেবল বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ থেকে নির্ভুল সময় ঘোষণা করা সম্ভব নয়।
শাহেদের রিভলভারটি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল। অস্ত্র ও উদ্ধার করা বুলেটের তুলনামূলক পরীক্ষায় দেখা গেল, শারমিনের শরীর থেকে উদ্ধার করা একটি বুলেট শাহেদের অস্ত্র থেকে ছোড়া গুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাদ্দামের শরীর থেকে উদ্ধার করা অন্য বুলেটটির ক্ষেত্রে ফলাফল একই রকম ছিল না। পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে সেটিকে নিশ্চিতভাবে অন্য কোনো অস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করা গেল না।
আরিয়ান প্রতিবেদনটি পড়ে বললেন, “এটাই আমাদের প্রথম বড় অসংগতি। শাহেদ দাবি করেছেন, তিনি দুবার গুলি চালিয়েছেন। কিন্তু তাঁর অস্ত্রের পরীক্ষার ফল তাঁর বক্তব্যকে পুরোপুরি সমর্থন করছে না।”
সাব্বির বলল, “তাহলে কি তিনি মিথ্যা বলছেন?”
“সম্ভব। আবার পরীক্ষায় অনিশ্চয়তাও থাকতে পারে। আমাদের আরও প্রমাণ দরকার।”
মুখোশের পরীক্ষায় কোনো সিদ্ধান্তমূলক ফল পাওয়া গেল না। কাপড়ে রক্তের চিহ্নের অভাব একাধিক কারণে হতে পারে। এটি একা প্রমাণ করতে পারে না যে মুখোশটি মৃত্যুর পর পরানো হয়েছিল।
তবে মুখোশের ভেতরে থাকা তন্তু এবং সাদ্দামের পোশাকের কিছু উপাদান নিয়ে পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হলো।
এদিকে ঘটনাস্থলের ছবিতে আরেকটি বিষয় নজরে এল। শাহেদের দাবি অনুযায়ী, তিনি আততায়ীকে দেখেই আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালিয়েছিলেন। অথচ ঘরের কিছু আসবাবের অবস্থান এবং তাঁর দেওয়া ঘটনার বিবরণের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল।
এই অসংগতি অপরাধের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, কিন্তু শাহেদের বক্তব্য আবার যাচাই করার যথেষ্ট কারণ ছিল।
সাদ্দামের পুরোনো পরিচিত লোকটি প্রথমে কথা বলতে রাজি হচ্ছিল না। পরে তদন্তকারীদের কাছে জানাল, মৃত্যুর কিছুদিন আগে সাদ্দাম তার কাছে একটি অডিও রেকর্ডিং রেখে গিয়েছিল।
“ও বলেছিল, যদি ওর কিছু হয়, তাহলে যেন রেকর্ডিংটা কাউকে দিই,” লোকটি জানাল। “কিন্তু আমি জানতাম না এটা কাকে দেওয়া উচিত।”
রেকর্ডিংটি তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হলো। এর উৎস, সম্পাদনার সম্ভাবনা এবং কণ্ঠের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হলো।
প্রাথমিকভাবে রেকর্ডিংয়ে সাদ্দামের কণ্ঠ বলে মনে হওয়া একটি বক্তব্য শোনা গেল:
“শাহেদ স্যার আমাকে বলেছে, কাজটা শেষ হলে আরও টাকা দেবে। আমি এখন আর এই ঝামেলায় থাকতে চাই না। আমার ভয় করছে।”
রেকর্ডিংয়ের এই অংশে শারমিনের নাম ছিল না। হত্যার পরিকল্পনার কথাও স্পষ্টভাবে বলা হয়নি।
শুধু এই রেকর্ডিং দিয়ে কাউকে হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।
কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠল।
ফারিহা বলল, “যদি রেকর্ডিংয়ের সময় এবং কণ্ঠের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়, আর্থিক লেনদেন ও কল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে।”
আরিয়ান বললেন, “ঠিক তাই। আমরা রেকর্ডিংকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নয়, যাচাই করার মতো বক্তব্য হিসেবে নেব।”
পরবর্তী বিশ্লেষণে সাদ্দামের পরিচিত কণ্ঠের সঙ্গে রেকর্ডিংয়ের কণ্ঠের মিল পাওয়া গেল। রেকর্ডিংয়ের অস্তিত্ব ঘটনার আগেই ছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হলো।
তবু শাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য আরও কিছু প্রয়োজন ছিল।
সেই প্রমাণ এল একটি আর্থিক নথি থেকে।
সাদ্দামের হিসাবে জমা হওয়া পাঁচ লাখ টাকার সঙ্গে শাহেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হিসাবের সম্পর্ক পাওয়া গেল। প্রথমে অর্থটিকে একটি সাধারণ পাওনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক নথি ও দুই ব্যক্তির যোগাযোগের সময় মিলিয়ে সেই ব্যাখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেল।
আরিয়ান ফাইল বন্ধ করলেন।
“এখন আমাদের কাছে শুধু সন্দেহ নেই। আমাদের কাছে এমন কয়েকটি সূত্র আছে, যেগুলো একে অপরকে সমর্থন করছে। এবার শাহেদের বক্তব্য আবার নিতে হবে।”
জিজ্ঞাসাবাদের দিন শাহেদ চৌধুরী সময়মতো হাজির হলেন।
তিনি আগের মতোই পরিপাটি। কক্ষে ঢুকে আরিয়ানকে সৌজন্যসূচক অভিবাদন জানালেন।
“মিস্টার আরিয়ান, আশা করি এবার আপনারা আমাকে এই দুঃসময় থেকে মুক্তি দেবেন। আমার স্ত্রীকে হারিয়েছি, আর এখন আমাকেই অপরাধী বানানো হচ্ছে।”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি টেবিলে চারটি ফাইল রাখলেন।
“নাসরিন, রুমানা, লাবণী এবং শারমিন। আপনি এই চারজনকেই বিয়ে করেছিলেন।”
শাহেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তদন্তের কী প্রয়োজন? আমি কি একাধিকবার বিয়ে করতে পারি না?”
“অবশ্যই পারেন। একাধিক বিয়ে অপরাধ নয়। জীবনবিমা করাও অপরাধ নয়। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে যদি একই ব্যক্তির আর্থিক সুবিধা জড়িত থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে।”
“আপনি আমাকে কী বলতে চাইছেন?”
“আমি এখনও কিছু বলতে চাইছি না। আমি আপনার ব্যাখ্যা শুনতে চাই।”
আরিয়ান শারমিনের বিমার নথি সামনে রাখলেন।
“আপনার স্ত্রীর নামে দেড় কোটি টাকার পলিসি। আপনি একমাত্র নমিনি। তার আগে সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। এসবের ব্যাখ্যা কী?”
শাহেদ শান্ত গলায় বললেন, “আমরা স্বামী-স্ত্রী ছিলাম। ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক পরিকল্পনা করেছিলাম। সম্পত্তি হস্তান্তরও পারিবারিক সিদ্ধান্ত ছিল।”
“শারমিন কি সম্পূর্ণ বিষয়টি বুঝে সম্মতি দিয়েছিলেন?”
“অবশ্যই।”
“সেটা যাচাই করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট নথি ও সাক্ষ্য পরীক্ষা করছি।”
শাহেদের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল।
“কাগজপত্র সব ঠিক থাকলে আর সমস্যা কোথায়?”
আরিয়ান এবার সাদ্দামের ব্যাংক লেনদেনের নথি সামনে রাখলেন।
“ঘটনার তিন দিন আগে সাদ্দামের হিসাবে পাঁচ লাখ টাকা জমা পড়ে। আপনার প্রতিষ্ঠানের হিসাবের সঙ্গে তার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একই সপ্তাহে আপনাদের মধ্যে বহুবার যোগাযোগ হয়েছে।”
শাহেদ বললেন, “সে আমার পুরোনো কর্মচারী। তার সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ থাকতেই পারে।”
“সেটা সত্যি হতে পারে। কিন্তু আপনি বলেছিলেন, ঘটনার রাতে তার সঙ্গে আপনার কোনো যোগাযোগ ছিল না। আপনার বক্তব্যের সঙ্গে ফোনের নথির কিছু অংশ মিলছে না।”
শাহেদ এবার চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।
“আপনারা কি ভাবছেন, শুধু কয়েকটি ফোনকল আর টাকার লেনদেন দিয়ে আমাকে খুনি প্রমাণ করবেন?”
“না,” আরিয়ান বললেন। “সেজন্যই আমরা আরও প্রমাণ সংগ্রহ করছি।”
তিনি রেকর্ডিংয়ের কথা তুললেন। শাহেদ প্রথমে বললেন, তিনি জানেন না সাদ্দাম কী বলেছে। পরে জানালেন, রেকর্ডিংটি সাজানো হতে পারে।
আরিয়ান তর্কে গেলেন না।
“আপনার বক্তব্য নথিভুক্ত করা হবে। রেকর্ডিংয়ের সত্যতা এবং অন্যান্য প্রমাণ আদালতে যাচাই করা হবে।”
জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হওয়ার আগে শাহেদ একটি কথা বললেন।
“আপনি জানেন, মিস্টার আরিয়ান? মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা ঘটে। সব দুর্ঘটনার পেছনে অপরাধ খুঁজতে গেলে পৃথিবীতে কেউ নিরাপদ থাকবে না।”
আরিয়ান শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আপনি ঠিক বলেছেন। তাই আমরা দুর্ঘটনাকে অপরাধ বলছি না। আমরা শুধু জানতে চাইছি, চারটি আলাদা ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না।”
শাহেদ উঠে দাঁড়ালেন।
কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর চোখ একবার চারটি ফাইলের ওপর পড়ল।
সেই প্রথমবার আরিয়ান লক্ষ করলেন, শাহেদের মুখে শোকের চেয়ে বিরক্তির ছাপ বেশি।
তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আরও স্পষ্ট হলো।
সাদ্দামের ব্যাংক লেনদেন, ফোনের নথি এবং রেকর্ডিংয়ের বক্তব্যের মধ্যে কিছু মিল পাওয়া গেল। শাহেদের দেওয়া ব্যাখ্যার সঙ্গে সেই তথ্যের সবটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
অস্ত্র পরীক্ষার প্রতিবেদনও তাঁর আত্মরক্ষার বিবরণকে পুরোপুরি সমর্থন করেনি।
অন্যদিকে, শারমিনের মায়ের বক্তব্য এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের নথি থেকে বোঝা গেল, বিয়ের পর আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত নেওয়া হয়েছিল। তবে এগুলোও হত্যার স্বতন্ত্র প্রমাণ নয়।
আরিয়ান জানতেন, প্রমাণের স্তূপ যত বড়ই হোক, প্রতিটি অংশকে যাচাই করা জরুরি।
তিনি সাব্বিরকে বললেন, “রেকর্ডিংয়ের যে অংশে টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটাকে ব্যাংক নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখো। কোনো অংশের ব্যাখ্যা না পেলে সেটাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করবে।”
ফারিহাকে বললেন, “সাদ্দামের পরিচিতদের আবার জিজ্ঞাসাবাদ করো। তার আচরণে কোনো পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল কি না, ঘটনার আগে সে কাউকে ভয় পাওয়ার কথা বলেছিল কি না—জেনে নাও।”
এবার তদন্তে উঠে এল আরেকটি তথ্য।
সাদ্দাম মৃত্যুর আগে তার এক বন্ধুকে বলেছিল, শাহেদের সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে। সে কিছু টাকা পাওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু সেই টাকা কীসের জন্য—তা জানায়নি।
এই বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হলো। বন্ধুটির সঙ্গে সাদ্দামের পরিচয়, তাদের যোগাযোগ এবং বক্তব্যের সময়কাল পরীক্ষা করা হলো।
সবশেষে, আরিয়ানের দল একটি সমন্বিত তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করল। সেখানে কোনো একটি সূত্রকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং প্রতিটি প্রমাণের সীমাবদ্ধতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং শাহেদের বক্তব্যের সঙ্গে অসংগতিগুলো আলাদা করে দেখানো হলো।
প্রতিবেদনটি পড়ে আরিয়ান বললেন, “এখন মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার মতো ভিত্তি আছে। বাকিটা আদালতে প্রমাণ করতে হবে।”
শারমিন ও সাদ্দামের মৃত্যুর ঘটনায় সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে শাহেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলো। তদন্তের ফল অনুযায়ী অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলো। সাক্ষীদের বক্তব্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ব্যাংকের নথি এবং অডিও রেকর্ডিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। ডিফেন্স কাউন্সিল প্রমাণের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরল। রাষ্ট্রপক্ষ প্রতিটি সূত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করল।
শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে নয়, আদালতকে প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হলো।
অবশেষে, শারমিনের হত্যা মামলায় আদালত শাহেদকে দোষী সাব্যস্ত করল। সাদ্দামের মৃত্যুর মামলাটিও পৃথক বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগোল এবং সেখানেও প্রমাণ মূল্যায়নের পর রায় ঘোষিত হলো।
আগের তিন স্ত্রীর মৃত্যুর বিষয়গুলো কিন্তু সেখানেই শেষ হয়ে গেল না।
সেগুলোর প্রতিটি নিয়ে পৃথকভাবে নথি পর্যালোচনা, সাক্ষ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলো। নাসরিন, রুমানা ও লাবণীর মৃত্যুকে একসঙ্গে একটি প্রমাণিত হত্যাচক্র বলে ঘোষণা করা হয়নি। সেগুলো ছিল নতুন করে উত্তর খোঁজার অপেক্ষায় থাকা তিনটি পুরোনো মামলা।
রায় ঘোষণার দিন আরিয়ান আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাংবাদিকেরা তাঁকে ঘিরে ধরল।
“স্যার, আপনি কি মনে করেন শাহেদ চৌধুরী একজন সিরিয়াল কিলার?”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আমি কোনো বিশেষণ দিতে এখানে আসিনি। আদালত যে অপরাধগুলো প্রমাণিত বলে গ্রহণ করেছে, সে বিষয়ে রায় দিয়েছে। অন্য মৃত্যুগুলোর তদন্ত আলাদা প্রমাণের ভিত্তিতে এগোবে।”
একজন সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করল, “তাহলে কি আপনার তদন্ত শেষ?”
আরিয়ান দূরের সিঁড়ির দিকে তাকালেন।
“একটি মামলার রায় মানেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নয়। আর সব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া মানেই প্রমাণিত অপরাধকে অস্বীকার করা নয়।”
তিনি আর কোনো কথা বললেন না।
সেই রাতে আরিয়ান নিজের কক্ষে বসে পুরোনো নথিগুলো আবার খুললেন।
নাসরিন। রুমানা। লাবণী। শারমিন।
চারটি নামের পাশে চারটি আলাদা ফোল্ডার। তিনটি ফোল্ডারের ওপর লেখা—পুনঃতদন্তাধীন। চতুর্থটির ওপর লেখা—বিচার সম্পন্ন।
তিনি নাসরিনের ফাইল খুললেন। কয়েকটি পুরোনো ছবি, একটি অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন এবং বিমা পরিশোধের নথি। এরপর রুমানার ফাইল। তারপর লাবণীর।
প্রতিটি ফাইলে এমন প্রশ্ন ছিল, যার উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
সাব্বির দরজায় এসে দাঁড়াল।
“স্যার, এত রাতেও কাজ করছেন?”
আরিয়ান ফাইল বন্ধ করলেন।
“কিছু প্রশ্ন দিনের আলোতে সহজ মনে হয়। কিন্তু উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, অন্ধকারটা আসলে নথির ভেতরেই ছিল।”
“আপনার কি মনে হয়, আগের তিনটি মৃত্যুর পেছনেও শাহেদ?”
আরিয়ান সরাসরি উত্তর দিলেন না।
“আমার মনে হওয়া দিয়ে বিচার হবে না, সাব্বির। প্রমাণ দিয়ে হবে।”
তিনি নাসরিনের ফাইলের ওপর একটি নতুন নোট লিখলেন—
প্রশ্ন: দুর্ঘটনা, নাকি অদেখা কোনো অপরাধ?
তারপর কলম থামিয়ে জানালার বাইরে তাকালেন।
নারায়ণগঞ্জের সেই বাড়িতে এখন আর আগের মতো আলো জ্বলে না। শারমিনের মা প্রতিদিন তাঁর মেয়ের ছবির সামনে বসেন। সাদ্দামের পরিবারও এখনও জানে না, কেন তাদের ছেলে এমন এক রাতে সেই বাড়িতে গিয়েছিল।
আর তিনটি পুরোনো মৃত্যু অপেক্ষা করছে—কেউ যেন তাদের হয়ে প্রশ্ন করে।
আরিয়ান আলো নিভিয়ে দিলেন।
তাঁর কাছে কোনো অলৌকিক ক্ষমতা ছিল না। তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন না, মানুষের মনের ভেতরও পড়তে পারতেন না। তিনি শুধু জানতেন, একটি অনুমান যত আকর্ষণীয়ই হোক, প্রমাণ ছাড়া তা সত্য হয়ে ওঠে না।
কারণ অপরাধের সবচেয়ে নিখুঁত চিত্রনাট্যও শেষ পর্যন্ত মানুষের তৈরি। আর মানুষ যতই নিজের গল্প লুকিয়ে রাখুক, তার ফেলে যাওয়া অসংগতিগুলো একদিন না একদিন প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে।
©somewhere in net ltd.