| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই অভূতপূর্ব। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) যন্তর মন্তর অভিযান পণ্ড করতে নরেন্দ্র মোদির সরকার যে তাণ্ডব চালাল, তা পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আন্দোলন ঠেকানোর জন্য দিল্লিকে পুরোপুরি অচল করে দেওয়া হয়েছিল। ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৩৫ হাজার পুলিশ, র্যাফ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন, সাতস্তরীয় ব্যারিকেড, ৩ হাজার সিসি ক্যামেরা, দিল্লির ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা এবং দিল্লিগামী ২৫০টি দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল করার মতো এমন নজিরবিহীন ঘটনা সুদূর অতীতেও কেউ দেখেনি।
জার্মানি থেকে উড়ে আসা জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, চার রাজ্যের সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রী—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনারাই বিজয়ন, মানিক সরকার ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে শুরু করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে যেভাবে আটক করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে এই তরুণ প্রজন্মকে ভয় পাচ্ছে মোদি সরকার। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল হয়ে এবার দিল্লির রাজপথে তরুণদের এই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে বলা হচ্ছে ‘জেনজি ২.০’ আন্দোলন।
তরুণদের এই জাগরণ আজ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার এক প্রান্তে সীমাবদ্ধ নেই। শ্রীলঙ্কার সরকার পরিবর্তনে তরুণরাই মূল ভূমিকা রেখেছিল। ঠিক একইভাবে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভুত্থানে ছাত্র ও তরুণ সমাজের ব্যাপক ও রক্তক্ষয়ী অংশগ্রহণ ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। নেপালের তরুণেরাও তাদের দেশে আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকার পরিবর্তন করেছে এবং বর্তমানে তাদের দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণ প্রজন্মই। রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই জেনজি প্রজন্ম যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেভাবে বুক চিতিয়ে লড়তে জানে, দিল্লির যন্তর মন্তরের ঘটনা তারই সর্বশেষ প্রমাণ।
কিন্তু এই সাফল্যের গল্পের ঠিক উল্টো পিঠে বাংলাদেশের দিকে তাকালে এক গভীর হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই মেলে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর আজ দেড়-দুই বছর পার হতে না হতেই সেই সম্মুখ সারির ছাত্র ও তরুণ নেতারা আজ চরমভাবে ইমেজ সংকটে নিমজ্জিত!
আজ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে একটাই অভিযোগ—মব কালচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ঘুষ, নারী কেলেঙ্কারী আর ক্ষমতার অপব্যবহার—এমন কোনো অপরাধ নেই যার সাথে এদের নাম জড়িয়ে যায়নি। আজ দেশের সাধারণ মানুষ জুলাই যোদ্ধা বা এই তরুণ নেতাদের কথা শুনলে বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এমনটা কেন হলো? কারণটা জলের মতো পরিষ্কার। আন্দোলনের সুফল ভোগ করতে গিয়ে এই তরুণেরা মদমত্ত হয়ে পড়েছিল ক্ষমতার স্বাদে। তাদের মূল প্ল্যান বা টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছিল—অনির্বাচিতভাবে এই ক্ষমতাকে অনির্দিষ্টকাল ধরে নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখা এবং অবাধে ক্ষমতার অপব্যবহার করা।
আজ আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মাহদী, আয়াশ, তানভীর, নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী, হান্নান মাসউদ কিংবা সারজিস আলমের মতো নামগুলো শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। অথচ এই তরুণেরাই একদিন দেশবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এক নতুন ধারার রাজনীতি ও সংস্কারের। তারা বলেছিল টোকাইতন্ত্র বা পুরনো রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি তারা ভেঙে চুরমার করে দেবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই সমস্ত সোনালী স্বপ্ন আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তারা নিজেদের সেই আদর্শকেই জবাই করেছে, যার জন্য রাজপথে রক্ত দিয়েছিল হাজারো সাধারণ ছাত্র-জনতা।
দিল্লিতে যখন অভিজিৎ দিপক, অজিঙ্ক শিন্ডে বা ধ্রুব রাঠিদের হাত ধরে তরুণরা নতুন এক প্রতিরোধের ইতিহাস লিখছে, রাহুল গান্ধী যখন তাদের পিঠ চাপড়ে বলছেন—‘আমি তোমাদের নিয়ে গর্বিত’, ঠিক তখনই আমাদের দেশের তরুণ নেতৃত্বের এই পতন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আন্দোলন সফল করা এক জিনিস, আর ক্ষমতা টিকিয়ে রেখে সততা বজায় রাখা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।
ক্ষমতা যখন মানুষের নীতি এবং আদর্শকে গিলে খায়, তখন তা শুধু ব্যক্তির পতন ঘটায় না, বরং গোটা একটা জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের অর্জনকে ছারখার করে দেয়। দিল্লির রাজপথের এই ‘জেনজি ২.০’ আন্দোলন হয়তো মোদির মসনদ কাঁপিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের তরুণেরা ক্ষমতাকে যেভাবে কলুষিত করেছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ট্র্যাজিক শিক্ষা হয়ে থাকবে।
©somewhere in net ltd.