| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
পেশাগত ব্যস্ততার কারণে দ্বিতীয় পর্ব লিখতে কিছুটা দেরি হয়ে গেল। তবে আশা করি অপেক্ষাটা আপনাদের নিরাশ করবে না! আগের পর্বে আমি বলেছিলাম শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে গাজীপুর থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত আমাদের সেই রোমাঞ্চকর নাইট রাইডের গল্প। আজ শোনাবো কক্সবাজার পৌঁছে কলাতলী-সৈকত পেরিয়ে মেরিন ড্রাইভ ধরে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ ভ্রমণ এবং সেখান থেকে নিরাপদে ঢাকায় ফিরে আসার বাকি অংশটুকু।
আমরা গত ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাতে চারটি বাইক নিয়ে গাজীপুর থেকে রওনা দিয়ে পরদিন ২১ অক্টোবর সকাল ১০টায় কক্সবাজার গিয়ে পৌঁছেছিলাম। কক্সবাজার পৌঁছে সবার আগে আমরা সোজা চলে গেলাম কলাতলী সি-বিচে। সমুদ্রের নীল জলরাশির পাড়ে কিছু সময় কাটিয়ে সারা রাত একটানা বাইক চালানোর সমস্ত ক্লান্তি নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেললাম।
এরপরে আমরা সুগন্ধা সি-বিচের হোটেল জোনে চলে এলাম। সৌভাগ্যবশত আমাদের হোটেল রুম আগেই বুক করা ছিল, তাই বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি। সবাই তখন দারুণ ক্লান্ত আর পেটে তীব্র ক্ষিদে! হোটেলেও ঢোকার আগে তাই পেটপুরে একটা হেভি ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম—গরম গরম পরোটা, ডিম, ডাল, গরুর মাংস আর সাথে ধোঁয়া ওঠা চা। পেট ঠান্ডা করে হোটেলে পৌঁছানোর পর দেখি রিসিপশনে রুমের জন্য বেশ কিছু মানুষ অপেক্ষা করছেন। আমাদের হোটেলের চেক-ইন টাইম দুপুর ১টা এবং চেক-আউট সকাল সাড়ে ১১টা।
তাই আমি, শাকিল ভাই, আল-আমীন ভাই আর সালাম রিসিপশনে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এর মাঝে রাকিব ভাইয়ের রাজকীয় Royal Enfield Hunter 350-এর স্টার্ট নিয়ে একটু ঝামেলা দেখা দেওয়ায়, রাকিব ভাই আর শামীম ভাই বাইক নিয়ে সোজা চলে গেলেন কক্সবাজারের রয়্যাল এনফিল্ড শোরুমে সমস্যা ঠিক করতে। যাই হোক, বেলা ১২টার দিকে আমরা রুমের চাবি পেয়ে গেলাম। রুমে ঢুকে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে গোসল সেরে সবাই মিলে এক লম্বা ঘুমে তলিয়ে গেলাম!
ঘুম ভাঙল একেবারে বিকেলে। সবাই চটজলদি তৈরি হয়ে সুগন্ধা সি-বিচে চলে গেলাম বিকেল আর সন্ধ্যাটা উপভোগ করতে। সাগরের হিমেল হাওয়া আর আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ফেনার মাঝে পা ভেজাতে ভেজাতে কখন যে সন্ধ্যা জাঁকিয়ে বসল টেরই পেলাম না। বীচ ও এর আশপাশে প্রচুর মালাই চা বিক্রেতা দেখে আমাদেরও লোভ হলো। সন্ধ্যার ঠিক আগে বীচের কাছের একটা দোকানে গিয়ে ট্রাই করলাম তাদের সেই বিখ্যাত মালাই চা। কিন্তু এক চুমুক দিয়েই আমরা বেহাল দশা—আরে ভাই, এ তো রীতিমতো হরলিক্স গোলানো পানি! মালাইয়ের নামগন্ধও নেই, একদম টাকাটাই জলে গেল!
কক্সবাজার নাইট রাইড ও পেটের ভূরিভোজ
চা খেয়ে মেজাজটা একটু চড়া হলেও আমরা বের হয়ে পড়লাম কক্সবাজার শহরটা নাইট রাইডে এক্সপ্লোর করতে। সবার আগে বাইক নিয়ে চলে গেলাম বাসস্ট্যান্ড এলাকার ক্যাপ্টেন কক্স পেট্রোল পাম্পে। কাল আমাদের মিশন মেরিন ড্রাইভ হয়ে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপ, তাই সব ক’টি বাইকের ট্যাঙ্ক ফুল করে নিলাম অকটেনে। ফুয়েল রিফিল শেষে কক্সবাজার শহরের অলিগলি, বার্মিজ মার্কেট আর লালদিঘির পাড়ে বেশ কিছুক্ষণ চক্কর কাটলাম।
ঘোরাঘুরি শেষে রাত সাড়ে দশটার দিকে শহরের স্বনামধন্য জামান রেস্টুরেন্টে আমরা রাতের ডিনার সারলাম। মেন্যুতে ছিল গরম সাদা ভাত, রূপচাঁদা মাছ, কোরাল মাছ, জম্পেশ গরুর কালা ভুনা আর ডাল। খাওয়া শেষে এক কাপ দুধ চায়ে গলা ভিজিয়ে আমরা সোজা চলে গেলাম লাবণী পয়েন্টে। সমুদ্রের নৈঃশব্দ্য রাতের বেলা এক অন্যরকম মোহ তৈরি করে। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে রাত প্রায় ১২টার দিকে আমরা হোটেলে ফিরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম।
মেরিন ড্রাইভ: বাইকারদের স্বপ্নের পিচঢালা পথ
২২ অক্টোবর ২০২৬। সকাল ৭টা ঠিকঠাক ঘড়ির কাঁটায়। আজকের গন্তব্য—কক্সবাজার থেকে টেকনাফ হয়ে সরাসরি শাহপরীর দ্বীপ। আর যাবো সেই জাদুকরী মেরিন ড্রাইভ ধরে! কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রোডে বাইক রাইড করা যেকোনো বাইকারের জীবনের অন্যতম বড় একটা স্বপ্ন। আমার জন্য অনুভূতিটা আরও বেশি স্পেশাল, কারণ এই রুট নিয়ে আমি এর আগে বেশ কয়েকটি লেখাও লিখেছি। আজ খোদ সেই স্বপ্নের পিচঢালা সড়কে নিজের বাইক নিয়ে রাইড করব—আমার উত্তেজনার পারদ ছিল আকাশছোঁয়া!
হোটেল থেকে সব বাইক বের করে আমরা মেরিন ড্রাইভের উদ্দেশ্যে ছুটলাম। আমাদের এই কাফেলার ফরমেশনটা ছিল এমন—সবার সামনে আমার ছোট্ট জাদুকরি Honda Dream 110, তার পেছনে শামীম ভাইয়ের Suzuki Gixxer 155, এরপরে শাকিল ভাইয়ের Hero Splendor 100 এবং সবার শেষে গর্জন তুলতে তুলতে রাকিব ভাইয়ের Royal Enfield Hunter 350। শামীম ভাইয়ের বাইকের পেছনে বসে থাকা সালাম অ্যাকশন ক্যামেরায় আমাদের পুরো রাইডটা দারুণভাবে ভিডিও বন্দি করে নিচ্ছিল।
মেরিন ড্রাইভের চওড়া রাস্তায় উঠেই আমরা প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপ দেখে একেবারে অভিভূত হয়ে গেলাম! রাস্তার একদিকে বিশাল পাহাড়ের সবুজ চাদর, অন্যদিকে অনন্ত নীল সমুদ্র আর দুই পাশের ছায়াঘেরা গাছপালা। সকালের হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে বাইক ছোটানোর সেই অনুভূতি শরীর ও মন এক নিমেষে জুড়িয়ে দিয়েছিল। হিমছড়ি সি-বিচে কিছুক্ষণ থামলাম, সেখানে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও তুলে আবার সামনের দিকে এগোতে লাগলাম।
কক্সবাজার থেকে টেকনাফের দূরত্ব প্রায় ৭২ কিলোমিটার। আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, মাঝপথে আর কোথাও দাঁড়াবো না, একেবারে টেকনাফে গিয়ে সবার সাথে মিট করব। তাই এই অংশটা সবাই যার যার মতো স্পিড তুলে ড্রাইভ করতে লাগলাম। ইনানীর একটু আগে-পরে একটা লোহার ব্রিজ পার হওয়ার পর আমরা মনের সুখে স্পিডিং শুরু করলাম। রাস্তায় একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, আজকাল বহু ট্যুরিস্ট কক্সবাজার এসে ভাড়ায় মোটরবাইক বা স্কুটার নিয়ে মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য দেখতে বের হয়। রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ ও বিজিবির চেকপোস্ট থাকলেও আমাদের কারো বাইক আটকায়নি।
আমি আর শাকিল ভাই সবার আগে টেকনাফের সাবরাং জিরো পয়েন্টে গিয়ে পৌঁছালাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর শামীম ভাই ও রাকিব ভাইয়ের দলও সেখানে এসে যোগ দিল। সকালে না খেয়েই বের হয়েছিলাম বলে পেটে তখন বেশ ভালোই খিদে চড়েছে। সাবরাং জিরো পয়েন্টের একটা লোকাল হোটেলে (যাদের স্থানীয় ভাষায় বলে ‘ভাতঘর’) বসে গেলাম সকালের খাবার সারতে। পাতে দিলো সাদা ভাত, মাছের তরকারি আর ডাল—খাবারের স্বাদ সত্যি বলতে জঘন্য বললেও কম বলা হয়! তবে পেটের দায়ে খেয়ে নিলাম আর সময় নষ্ট না করে সোজা রওনা দিলাম আমাদের মূল ডেস্টিনেশন—শাহপরীর দ্বীপের উদ্দেশ্যে।
বাংলাদেশের স্থলভাগের শেষ বিন্দু
দ্বীপে যাওয়ার কাঁচা রাস্তার দুই পাশে চোখ জুড়ানো লবণ চাষের জমি দেখা গেল, তবে তখন সিজন না থাকায় মাঠগুলো খালি পড়ে ছিল। অবশেষে আমরা যখন শাহপরীর দ্বীপে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন আমাদের বাইকগুলো এসে থামল সোজা নাফ নদীর বুকের ওপর তৈরি জেটিতে। এটাই হলো আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একদম শেষ স্থলভাগ!
নিজের বাইক চালিয়ে দেশের এই একদম শেষ সীমানায় এসে দাঁড়াতে পারার অনুভূতিটা ঠিক কতটা রোমাঞ্চকর, তা কেবল যারা বাইক নিয়ে এমন লং ট্যুর দেয় তারাই বুঝবে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত গৌরব আর আনন্দের শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল। জেটিতে বেশ অনেকটা সময় কাটিয়ে আমরা বিকেল ৫টার দিকে আবার কক্সবাজার শহরের দিকে ফিরতি পথ ধরলাম। শহরে ফিরে দুপুরের (নাকি বিকালের) খাবার খেয়ে নিলাম। এরপর যে যার মতো একটু কেনাকাটা করে, রাতের বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে হোটেলের পানে ফিরলাম এবং রাতের ডিনার শেষ করে ঘুমাতে গেলাম।
স্মৃতির খাতায় আরেকটি সফল ট্যুর
পরের দিন, অর্থাৎ ২৩ অক্টোবর ২০২৬। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আমি, শামীম ভাই, শাকিল ভাই আর আল-আমীন ভাই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। রাকিব ভাইয়ের ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হওয়ায়, রাকিব ভাই আর সালাম দুপুর নাগাদ কক্সবাজার থেকে রওনা হয়েছিলেন।
আমরা চারজন গতির সাথে পাল্লা দিয়ে একটানা ড্রাইভ করে রাত প্রায় ৯টার দিকে নিজ নিজ বাসায় নিরাপদে পৌঁছে গেলাম। আর রাকিব ভাই ও সালাম ঢাকায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন রাত আড়াইটার দিকে। আর এভাবেই সমাপ্তি ঘটল আমাদের গাজীপুর থেকে কক্সবাজার, টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের সেই রোমাঞ্চকর তিন দিনের দুরন্ত বাইক ট্যুর!
আমার এই রাইডিং স্টোরিটি পড়ার জন্য আপনাদের সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই দেখা হবে নতুন কোনো রোমাঞ্চকর ট্রাভেল স্টোরি নিয়ে!

©somewhere in net ltd.