নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অদ্ভুত ছেলেটি

মেহেদী আনোয়ার

জানিনা

মেহেদী আনোয়ার › বিস্তারিত পোস্টঃ

৭১ পরবর্তি বাংলাদেশ ( ৬ষ্ঠ পর্ব)

১৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৫৪

১০ ই জানুয়ারি ১৯৭২
শেখ মুজিব ঢাকায় পৌছেন অপরাহ্নে। শেখ মুজিবকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তেজগাঁও বিমানবন্দরে লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে অভ্যর্থনা দেয়ার জন্য তাজউদ্দীন সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিল। মন্ত্রিসভার সবাই উপস্থিত ছিলেন। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ঢাকায় উপস্থিত সব সেক্টর কমান্ডারকে এক সারিতে গ্যাংওয়েতে দাঁড় করানো হয়েছিল।
অভ্যর্থনার মুহূর্তটি ছিল খুবই ভাবাবেগপূর্ণ। সবাই উদ্‌গ্রীব হয়ে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখার জন্য, তাঁর সাথে করমর্দনের জন্য। ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খলই ছিল। প্লেন গ্যাংওয়েতে এসে থামার পর দরোজা খুলে দিলে শেখ মুজিবকে সরাসরি দেখামাত্র লক্ষ লোক জয়বাংলা ! ধ্বনি দেয়।ঠিক সেই মুহূর্তে আকস্মিকভাবে দুই ছাত্রনেতা খসরু ও মন্টু এবং শেখ মুজিবের এক দেহরক্ষী খাকি পোশাকে কোমরে পিস্তল বহন করে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে শেখ মুজিবকে আলিঙ্গন করে। এক্ষেত্রে সেদিন রাষ্ট্রীয় প্রটোকল রক্ষা করা হয়নি। দাপট ছিল ছাত্র নেতৃবৃন্দেরই। এ ঘটনা অশোভন এবং অমর্যাদাকর ছিল। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের মর্যাদাও ক্ষুণ্ণ করা হয়েছিল।
সেদিনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণেও এমন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। নবীন রাষ্ট্রে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ও স্বল্পশিক্ষিত এই ছাত্রনেতাদের প্রভাব যে অটুট থাকবে তার আভাস পাওয়া গেল।

আনন্দে আত্মহারা লাখো মানুষ বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত তাকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানায়। লাখো মানুষের ঢল চারিদিকে। প্রাণপ্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার জন্য সবাই ব্যাকুল। আবেগ-উদ্বেল জনতার ভেতর দিয়ে খোলা ট্রাকে মহানায়ক রেসকোর্সের ময়দানের দিকে যাত্রা করেন। অপ্রয়োজনীয়ভাবে খোলা ট্রাকে উদ্যত অস্ত্র হাতে তাকে ‘পাহারা’ দেয়ার বাহাদুরি নিচ্ছিলেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি শহুরে গ্রুপ। এর মধ্যে দু'জনের একজন ছিলেন রুপালি পর্দার নায়ক খসরু, অন্যজন মঞ্চের নাসিরুদ্দিন ইউসুফ, যারা ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে অভিনয় শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে নাটক আর সিনেমার পর্দাকেই অধিক আকর্ষণীয় বলে মনে করেছিলেন।

জনতার ভিড় ঠেলে সেদিন ধীর গতিতে ট্রাকটি রেসকোর্সে পৌছতে সময় নিয়েছিল আড়াই ঘণ্টা। মানে আজকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত সেদিন যেতে এত দীর্ঘ সময় লেগেছিল। মহাজ্যামের শহরে বসবাসকারী আজকের প্রজন্মের অনেকের কাছে এটা অস্বাভাবিক মনে না-ও হতে পারে। এই সময়ের মধ্যেই ট্রাকে পাশে দাঁড়ানো আনন্দে উদ্বেল অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কানের কাছে মুখ নামিয়ে শেখ মুজিব বলেছিলেন, “তাজউদ্দীন, আমি কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হবো। শেখ মুজিবকে বহনকারী ট্রাকটি উৎফুল্ল জনস্রোতের মধ্যে দিয়ে যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেই ট্রাকের সামনে ছিল সামরিক পোশাকপরা একদল লোক, যাদের হাতে ছিল দু'টি ছবি। একটি ছবি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর, আরেকটি ছিল ইন্দিরা গান্ধী এবং শেখ মুজিবের যৌথ ছবি; যেখানে সংস্কৃত ভাষায় লেখা ছিল মুণ্ডক উপনিষদের মন্ত্র, যা ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতিবাক্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে: “সত্যমেব জয়তে”, তার মানে- সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী।

বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সামনে ভাষণ দেন তিনি। সেদিনকার রেসকোর্স ময়দান ছিল লোকে-লোকারণ্য। কুয়াশা না কাটতেই জনস্রোত বয়ে আসছিল দূর-দূরান্ত থেকে, তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে একনজর দেখার জন্য। মাঠের উত্তরে মেয়েদের গেট দিয়ে প্রবেশ করছিলেন এক সত্তরোর্ধ্ব 'বৃদ্ধা। । আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকরা বৃদ্ধাকে ঢুকতে বাধা দিলো। বৃদ্ধা তার মলিন ব্লাউজের ভেতর থেকে সযত্নে রাখা এক টুকরো শুকিয়ে যাওয়া রক্তমাখা কাপড় বের করে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, 'লৌ (রক্ত) আনছি লৌ (রক্ত), আর (আমার) লৌ (রক্ত) নিয়া আসছি, সেক সাবেরে দিমু।' বৃদ্ধার নাম করিমুন্নেছা, তার দুই ছেলে- আরাফাত আর কালাচান। দু'জনই ছিল আদমজী পাটকলের শ্রমিক। পাকিস্তানি বাহিনী তার এই দুই সন্তানকেই গুলি করে হত্যা করে। তার দুই প্রিয় সন্তানের বক্ষ বিদীর্ণ করে বাংলার শ্যামল মাটির ওপর দিয়ে যখন রক্তস্রোত বয়ে যাচ্ছিল তখন শেখ মুজিবের আহ্বানের কথা মনে হয়েছিল এই বৃদ্ধার— 'রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ্।'
করিমুন্নেছা জানতেন, একদিন শেখ মুজিব স্বাধীন দেশে ফিরে আসবেন। তিনি পুত্রশোক ভুলে তার সন্তানের রক্তমাখা এই কাপড় সযত্নে তুলে রেখেছিলেন আত্মত্যাগের অকাট্য প্রমাণ প্রাণাধিক প্রিয় নেতার হাতে তুলে দেবার জন্য। আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। করিমুন্নেছা পুত্রের 'লৌ' (রক্ত) দিয়ে অর্ঘ্য তুলে দেবেন তার প্রিয় নেতার হাতে। করিমুন্নেছা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করেন, 'কোন সুমায় আইবো। তারে দেখলে আমার সব দুক শেষ অইবো। ২৮ শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠেছিলেন কোটি- কোটি বঞ্চিত মানুষের স্বপ্নের নেতা, যার অলৌকিক স্পর্শে তাদের সব দুঃখের অবসান হবে বলে তারা বিশ্বাস করেছিল।

রমনা রেসকোর্স ময়দানের জনসভাস্থলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য সকাল থেকেই মানুষের ঢল নেমেছিল। নতুন রাষ্ট্রের আনকোরা, অনভিজ্ঞ মন্ত্রীরা মঞ্চে উঠলেন। শেখ মুজিবের সাথে ড. কামাল হোসেনও মঞ্চে উঠলেন। কামাল হোসেন মঞ্চে উঠে দাঁড়ালে জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবাদ জানায়। সে সময় শেখ মুজিব শেখ আব্দুল আজিজ, যিনি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং পরে মুজিব সরকারের তথ্য, কৃষি ও যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন, তাকে বললেন—
কামাল সম্পর্কে জনতাকে কি বলবো?
তুমি যেটা ভালো মনে করো সেটাই বলো, বললেন আব্দুল আজিজ। উল্লেখ্য, শেখ আব্দুল আজিজ শেখ মুজিবকে 'তুমি' বলেই সম্বোধন
করতেন।
ড. কামাল হোসেন আমার সাথে জেলে ছিল- এটা বলবো?
তা-ই বলো। শেখ আব্দুল আজিজ ছোট করে উত্তর দিলেন।
শেখ মুজিব উত্তেজিত ও ক্ষিপ্ত জনতাকে বললেন-
আপনারা গোলমাল করবেন না- কামাল হোসেন আমার সাথেই জেলে ছিল।
কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় কামাল হোসেন মুক্ত অবস্থায় পাকিস্তানেই অবস্থান করছিলেন। ২৯ এ প্রসঙ্গে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত কামরুদ্দীন আহমেদ লিখেছেন, '... ঢাকায় যেদিন মুজিব ফিরে এলেন তার প্রথম কর্তব্যকাজ মনে হলো ড. কামাল হোসেনকে বাংলাদেশের বিরোধিতার অভিযোগ ও মুক্তিবাহিনীর সন্দেহ থেকে মুক্ত করা- যা তিনি প্রথম দিনকার জনসভায় বিচক্ষণতার সঙ্গেই করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১৭ মিনিট জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেদিন জনতার উদ্দেশে শেখ মুজিব ঘোষণা দেন, 'রক্ত দিয়ে হলেও আমি বাঙালি জাতির এই ভালোবাসার ঋণ শোধ করে যাবো।'

কাঁদতে কাঁদতে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন। দেশ গড়ার কাজে ‘উদ্বুদ্ধ করেন’ সবাইকে। দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে দেশ শাসনের জন্য যে নেতার প্রয়োজন ছিল সেই শূন্যস্থান তিনি পূরণ করলেন দেশে ফিরে। তার জন্যেই সমগ্র জাতি প্রতীক্ষা করে ছিল।
রেসকোর্সের জনসভায় তিনি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন । ভাষণে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'বিশ্বকবি তুমি বলেছিলে-
“সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।”,,
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তুমি দেখে যাও, তোমার আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। তোমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত করে আজ ৭ কোটি বাঙালি যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে। হে বিশ্বকবি, তুমি আজ জীবিত থাকলে বাঙালির বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে।'
ভাষণের একপর্যায়ে বলেন, 'আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল । আমি প্রস্তুত হয়ে ছিলাম। বলেছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, মুসলমান একবার মরে, দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু যদি এসে থাকে আমি হাসতে হাসতে যাবো। আমার বাঙালি জাতিকে অপমান করে যাবো না। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না এবং যাবার সময় বলে যাবো, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।
শেখ মুজিব রেসকোর্স ময়দানে সেদিন বলেছিলেন, ‘এই বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা, এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র, এই বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।' শেখ মুজিবকে ফিরে পাওয়ার উন্মাদনায় সেদিন কারো মাথায় আসেনি, ধর্মনিরপেক্ষ— এই রাষ্ট্রীয় নীতির কথা কেউ এর আগে শোনেনি। তিনি বলেছিলেন, 'আজ আমার কারো বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নেই। একটা মানুষকেও তোমরা কিছু বলো না। অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দেবো। আইনশৃঙ্খলা তোমাদের হাতে নিও না।'

এই বক্তৃতায় তিনি অবাঙালিদের উদ্দেশ করে বলেন, 'যারা বাংলা জানে না, তোমাদের বলছি, তোমরা আজ থেকে বাঙালি হয়ে যাও।' যে বাঙালি জাতিবাদী আন্দোলনের ফল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল বলে দাবি করা হয়, সেই ‘বাঙালি’ বলতে শেখ মুজিব ঠিক কী বোঝাতে চাইতেন- বাংলাদেশের সীমান্ত বেষ্টনীতে সীমিত জনগোষ্ঠী ও খুবই সংকীর্ণ জাত্যাভিমানী বাঙালি গোষ্ঠী?
অবশ্য এর পাশাপাশি তিনি দৃঢ়কণ্ঠে এক অজানা-অজ্ঞাত-কল্পিত বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘তাদের নির্মূল করবেন, নিঃশেষ করবেন'। এমন ভীতিকর ভাষাও ব্যবহার করেন।

সেদিন ঢাকা শহরে মুজিব অনুসারীরা একটা নতুন শ্লোগান দেয়— ‘বিশ্বে এলো নতুন বাদ, মুজিববাদ-মুজিববাদ' ।৩৩ শেখ মুজিবের অতি উৎসাহী অনুসারীরা ‘মুজিববাদ' কী জিনিস তা স্পষ্ট করার প্রয়োজন বোধ করেননি। কয়েকদিন পরে সাংবাদিকেরা বাংলাদেশে শেখ মুজিবের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তাকে মুখোমুখি জিজ্ঞেস করেন, 'মুজিববাদ' কী? তিনি স্মিতহাস্যে প্রশ্নকারী সাংবাদিকের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেন: আমি এখন বলতে পারবো না ।

শেখ মুজিবুর রহমান নিজে পরবর্তী সময়ে 'মুজিববাদ-এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বটে, তবে মুজিববাদ কী জিনিস তা তিনি মোটেই পরিষ্কার করতে পারেননি। ‘মুজিববাদ” ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন: যদি ‘মুজিববাদ'কে একটি আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা ব্যাখ্যা করা উচিত দার্শনিকদের। তবে আমি 'মুজিববাদ' বলতে নিজে কী বুঝেছি সেটা বলতে পারি।
প্রথমত, আমি বিশ্বাস করি- গণতন্ত্রে, জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বিজয়ে, চিন্তায়, স্বাধীনতায়, কথা বলার অধিকারে, যা কিছু মানবজীবনকে মহীয়ান করে তোলে।
গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসের পাশাপাশি আমি এটাও মনে করি, গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য সমাজে যে শর্ত উপস্থিত থাকবে, তা হচ্ছে সমাজকে শোষণ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। এই কারণেই গণতন্ত্রের পাশাপাশি আমি সমাজতন্ত্রের কথা বলি।
আমি এটাও মনে করি, বাংলাদেশে যতগুলো ধর্মের লোক আছে তাদের সমান অধিকার থাকা উচিত। আমি এটাকেই ধর্মনিরপেক্ষতা বলি। অর্থাৎ নিজের বিশ্বাসকে লালন করার অধিকার।
পরিশেষে জনগণকে বাংলার সমগ্র পরিবেশ থেকে, বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা ও লোকসংস্কৃতি থেকে উদ্দীপনা সংগ্রহ করতে হবে। এই উদ্দীপনার জন্য বাঙালিরা সোনার বাংলা গড়ার স্বার্থে একসঙ্গে কাজে সামিল হবে। আমি এটাকেই জাতীয়তাবাদ বলে বুঝি।
শেখ মুজিবের আগমন উপলক্ষে পরের দিন ছিল সরকারি ছুটি। সেদিন তাজউদ্দীনের সঙ্গে তার সংক্ষিপ্ত আলাপ হয় সরকার গঠন সম্পর্কে। তাজউদ্দীন নিজ থেকেই শেখ মুজিবকে জানান, তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার, মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে চলেছে, দেশে কী কী ঘটেছে, মানুষের মনোজগতে কী কী পরিবর্তন হয়েছে, কী কী প্রত্যাশা আর স্বপ্ন জন্ম নিয়েছে, এসব বিষয়ে কিছু জরুরি কথা বলতে চান। দুর্ভাগ্য, সেই সব কথা বলার সুযোগ তাজউদ্দীনের আর কখনো আসেনি। তিনিও তাজউদ্দীনের কাছে একবারও জানতে চাননি, নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে চলেছিল। জানতে চাননি প্রবাসী সরকারের কথা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকার কথা।
শেখ মুজিবের প্রথম সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৪ জানুয়ারি। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বাংলাদেশকে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা বলেন। তিনি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকলকেই 'বাঙালি' বলে অভিহিত করে বলেন, অবাঙালিদের অবশ্যই ‘বাঙালি' হতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কোনো বিশেষ চুক্তি হবে কি-না এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমাদের বন্ধুত্বের চুক্তিটি আমাদের হৃদয়েই নিহিত আছে। এখানেই ঘোষণা দেন, তিনি আর আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকবেন না, যদিও এই প্রতিশ্রুতি তিনি পরে আর রক্ষা করেননি।


মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের তরুণ সমাজ, বিশেষত উচ্চশিক্ষার্থী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি কিংবা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধে সত্যিকারের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছাত্রসমাজের একাংশ সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির চেতনায় শামিল হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এই শিক্ষিত ও শিক্ষার্থী তরুণরা স্বদেশ পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্র গড়ে তোলার কাজে তাদের সেই চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তব ও প্রায়োগিক প্রতিফলন দেখতে চাইলো। বিশ্বজোড়া তখন সমাজতন্ত্রের জয়-জয়কার! এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকা এবং সমগ্র পূর্ব ইউরোপ জুড়ে তখন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক মতবাদ-মতাদর্শের ঢল বয়ে চলেছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাফল্য এবং পশ্চাদপদ গণমানুষের প্রগতির পথে ধারাবাহিক অগ্রযাত্রা সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিধি-ব্যবস্থার প্রতি হৃদয় কাঁপানো ভালোবাসাপূর্ণ আবেগ তৈরি করেছিল প্রায় সারা দুনিয়ায়। নব্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশেও তার ঢেউ এসে লেগেছিল।
১৯৫০-এর দশকে শুরু হয়ে '৬০-এর দশকে এসে তদানীন্তন পূর্ব বাঙলা কিংবা পূর্ব পাকিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণচীনের উদ্যোগে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যাপক প্রচার-পরিচিতির বদৌলতে এদেশের শিক্ষিত ও শিক্ষার্থী তরুণ-তরুণীরা এই রাজনৈতিক ধারার সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। এরও বহু আগে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ওই শতাব্দীর মধ্যবর্তীকালে প্রধানত দুইজন মহাপুরুষ সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন শিরাজী এবং কাজী নজরুল ইসলাম, তাঁদের জীবনব্যাপী সাধনা-সংগ্রাম ও প্রচারণায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের, বিশেষত অবহেলিত ও পিছিয়েপড়া মানুষকে প্রগতির মহাযাত্রায় বৈষম্যহীনভাবে শামিল করার লক্ষ্যে তরুণ ও যুবসমাজকে প্রস্তুত করে তুলেছিলেন। যুদ্ধজয়ী তরুণ ও যুবসমাজ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছিল, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই তাদেরকে মুক্তির সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। আর সে জন্য তাদের নানামুখী তৎপরতা, প্রয়াস-প্রচেষ্টা কিছু কম ছিল না ।

কিন্তু ক্ষমতাসীন মহল শুরুতেই তাদের শত প্রতিশ্রুতি আর মন ভোলানো অঙ্গীকার জলাঞ্জলি দিয়ে কায়েমি স্বার্থবাদী চরিত্রে আত্মপ্রকাশ করলো রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে। দুনিয়াজোড়া হতভাগ্য আর পিছিয়ে থাকা মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তনের জোয়ার এনেছিল যে দুই মহাপুরুষের চিন্তাধারা- সেই কার্ল মার্কস্ আর মাও সেতুং-এর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মতবাদ ও মতাদর্শের প্রতি অত্যন্ত অসম্মানজনকভাবে নেতিবাচক উক্তি ও প্রচারণা চালাতো শাসকদলের ছাত্র সংগঠন।
শাসকগোষ্ঠী তখন রাষ্ট্রক্ষমতাকে চিরস্থায়ীভাবে দখলে রাখার স্বপ্নে বিভোর- হাজির করেছিল 'মুজিববাদ' নামের অন্তঃসারশূন্য, তাৎপর্যহীন শ্লোগান; যার কোনো ওজনদার কিংবা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তারা জাতির সামনে পেশ করতে পারেনি।
অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে ছাত্র সংগঠন 'মুজিববাদ'-এর নামে কায়েমি গোষ্ঠীর গণবিরোধী ভয়ঙ্কর তৎপরতার পরিণাম সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিল মানুষকে। তারা মুজিববাদকে পূঁজিবাদের নতুন রূপ বা সংস্করণ হিসেবেও উপস্থাপন করেছিল। রাজধানী ঢাকাতে দেয়াল-লিখনীতে ফুটে ওঠে সেই সব রাজনৈতিক আন্দোলন-তৎপরতার চিত্র।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.