নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মাহফুজটিপিডি

আমি বই পড়তে ভালোবাসি

মাহফুজটিপিডি › বিস্তারিত পোস্টঃ

মৃত্যু কথা

২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৩ ভোর ৬:১২

ঐশীগ্রন্থ আল কোরানের কয়েকটি স্থানে স্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে, কুল্লু নাফসুন জায়েকাতুল মাউত। বাইবেলে আছে- এভিরিথিং ইজ মোরটাল। বাঙালী কবি যার অনুবাদ করেছেন, জন্মিলে মরিতে হইবে, অমর কে কোথা কবে, চির স্থির কবে, নীর হায়রে জীবন নদে।

বস্তুতপক্ষে আমরা যাহারা এখন পর্যন্ত জীবিত আছি মৃত্যুর বাস্তবতা প্রতি মুহুর্তে দেখিতে পাইতেছি, আমাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অর্থাৎ মৃত্যুর হাত হইতে বাঁচিয়া থাকিবার নিমিত্তে অন্য জীবিত জীব বা প্রাণীকে মৃত্যুর গহ্ববরে ঠেলিয়া দিতেছি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, মনুষ্যকূলমাত্রেই সর্বদা অপর জীবনধারীকে নিধনযজ্ঞে ব্যপৃত রহিয়াছি। বাঁচিয়া থাকিবার জন্য আহারের একান্ত প্রয়োজন, সেই প্রয়োজন মিটাইতে গিয়া অপরকে হত্যা করিতেছি। বাঁচিয়া থাকিবার জন্য, কর্মক্ষম হইবার জন্য পুষ্টির প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের তাগিদে জলচর জীব, স্থলচর প্রাণী, খেচর, কাহাকেও বাদ দিতেছি না, বধ করিতেছি। এক ধর্মের অনুশাসনে যে জীবকে বধ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে অন্য ধর্মের অনুশাসনে সেই প্রাণী বধা করা সিদ্ধ বলিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছে।

আবার দেখ শরীরের পুষ্টি নয়, আত্মরক্ষায় অরিকুলকে ধ্বংস করিবার বিধান সর্বশাস্ত্রেই স্বীকৃত হইয়াছে। বাঁচিয়া থাকিতে সুখ ও শান্তির একান্ত প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন মিটাইতে গিয়া শুধু অপর প্রাণী নহে, মনুষ্য তাহার জ্ঞাতি মনুষ্যকেই নিহত করিতেছে। ধর্মীয় বিধানে এই হত্যাকান্ডকে পূণ্যজনক ঘোষণা করিয়া হত্যাকে উৎসাহ প্রদান করা হইয়াছে। শান্তির নামে অশান্তি ঘটানো হইতেছে। সুখের নামে দুঃখকে ডাকিয়া আনা হইতেছে। আসল কথা- এই মৃত্যু বিভিন্নভাবে জীবনধারীকে পরবারে লইয়া যাইতেছে।

আমি যে এত কথা বলিতেছি, আমাকে একদিন নিশ্চিতভাবেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিতে হইবে। এই মৃত্যু কখন কিভাবে হইবে তাহা যেমন আমি জানি না, তেমনি জানে না পৃথিবীর কোন জন। এই লিখিতেছি- এক্ষুনি যদি আমার প্রাণবায়ু বহির্গত হইয়া যায়, তবে জীবিত লোকেরা বলিবে, হার্টফেল করিয়া মরিয়াছে। কেহ আবার ভাষাটাকে মার্জিত করিয়া বলিবে, হৃৎপিন্ডের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছে। তখন আমার মৃতদেহ দেখিয়া বা এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর শুনিয়া, সকলেই আশ্চর্য হইয়া, বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া বলাবলি করিবে- এই রাতে তাহার সঙ্গে কথাবার্তা কহিলাম আর সকালে দেখি সে আর বাঁচিয়া নাই। তখন আমার এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করিয়া কত তত্ত্বকথা, কত দার্শনিক বাক্য, কতজনে কতভাবেই না বর্ণনা করিবে। কতজনে আবার ভাবাবেগে দুনিয়ার মায়া মোহের প্রতি উদাসীনতার কথা ঘোষণা করিবে। সংসারাসক্তি যে একেবারেই মিছা, একেবারেই অসার, এই তত্ত্বকথাটি ঘুরাইয়া ফিরাইয়া কতভাবে কতবার যে বলিবে তাহার সীমা থাকিবে না।

কিন্তু যদি কোন দূর্ঘটনায়- আজকাল যেমন অহরহ হইতেছে- যেমন, মোটর এক্সিডেন্ট, ট্রেন এক্সিডেন্ট, লঞ্চডুবি, নৌকাডুবি, অগ্নিদগ্ধ হইয়া, ডাকাতের আক্রমণে বা বন্দুকের গুলিতে, প্লেন দূর্ঘটনায়, হিংস্র জন্তুর কবলে পড়িয়া, সর্পাঘাতে, বজ্রাঘাতে, বিদ্রোহী সৈনিকের গুলিতে, কিংবা ক্রুদ্ধ শত্রুর তীক্ষ্ণ অস্ত্রাঘাতে এই রকম হাজারো দূর্ঘটনা আছে - যদি যে কোন একটিতে প্রাণ বিয়োগ হয়, তবে আমার মৃত্যুর আলোচনা অন্যভাবে আলোচিত হইবে। যাহারা আমার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বা সহৃদয়, তাহারা কতই না দুঃখিত হইবে। কত আহাজারি করিবে। এই দুঃখ বা আহাজারিকেই নৈয়ায়িকেরা বা ব্যাকারণবিদেরা নাম দিয়াছে শোক। আমার প্রতি দরদীগণ আমার আত্মীয়-স্বজনগণের নিকট (যদি আত্মীয় স্বজন থাকে) কত শোকবার্তা পাঠাইবে। যদি আমি বিখ্যাত ব্যক্তি হই তবে আমার জন্য সুদৃশ্য খাতা শোক বই নাম দিয়া ততোধিক সুদৃশ্য টেবিলে রাখা হইবে, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ আসিয়া সেই শোক বইয়ে স্বাক্ষর করিবে। আমার জন্য শোক মিছিল বাহির করা হইবে। নগ্নপদে কাতারে কাতারে লোক সকল নীরবে সহরের রাজপথ পরিক্রম করিবে। অবশেষে সহরের কোন একটি ময়দানে গিয়া থামিবে ও শোকসভা করিবে। কত বক্তা জীবনের অনিত্যতা সম্বন্ধে কত সারগর্ভ বক্তৃতা করিবে। কোন কোন বক্তা আমার কর্মজীবন লইয়া কতই না আলোচনা করিবে। আমার মত ক্ষণজন্মা পুরুষ (নারীও হইতে পারে) ভবিষ্যতে আর একটিও জন্মিবে না, আমার অকাল মৃত্যুতে (কাল মৃত্যুও হইতে পারে যদি বয়স ৮০/৯০র কোটা ছাড়িয়া থাকে) দেশ জাতী তথা বিশ্বের যে কত বড় অপূরণীয় ক্ষতি হইল, তাহা করুণ কণ্ঠে বর্ণনা করিবে। আর শ্রোতাগণ আহাজারী করিয়া কেহ রুমালে, কেহ জামার আস্তিনে, পর্দার আড়ালে (যদিও আজকাল পর্দা নাই) শাড়ীর আঁচলে চক্ষু মুছিয়া নাসিকা কুঞ্চন করিবে। অবশেষে কয়েকটি প্রস্তাব পাশ করিবে। সেই সকল প্রস্তুবের মধ্যে একটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিবর্গকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী থাকিবে। অবশেষে আমার আত্মার শান্তি অর্থাৎ মুসলমান হইলে রুহের মাগফেরাত কামনা করিয়া মোনাজাত করিবে আর শ্রোতাগণ আমিন আমিন বলিয়া সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে জোর সমর্থন জানাইবে।

সর্বশেষে শোকমিছিল ও শোক সভায় কে কত ভালো বলিল, কাহার কণ্ঠস্বর আবেগময়, তাহা আলোচনা করিতে করিতে যার যার গন্তব্যস্থলে গমন করিবে।

আর যাহারা আমার বৈরী ছিল, যাহারা আমার প্রভাব, প্রতিপত্তি যশোঃমান, আমার প্রজ্ঞা, আমার খ্যাতি, আমার ধর্মীয় বিশ্বাস, আমার রাজনৈতিক দলীয় মনোভাব, আমার ঐশ্বর্য্য দেখিয়া শুনিয়া ঈর্ষানলে দগ্ধ হইতেছিল, হিংসায় যাহাদের হৃদয় উত্তপ্ত হইতেছিল, যাহারা সর্বক্ষণ আমার জীবনের দোষগুলি খুঁটিয়া খুঁটিয়া বাহির করিত, করিয়া জনসমক্ষে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করিবার জন্য সোচ্চার হইত, আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করিয়া যাহারা আত্মপ্রসাদ লাভ করিত আমার বিপদে যাহারা উল্লসিত হইত, আমার সেই বৈরীগণ আমার এই আকস্মিক মর্মান্তিক মৃত্যুতে যৎপরোনাস্তি আনন্দিত হইয়া উল্লাসে নৃত্য করিবে।

এই উল্লাসের নৃত্য আমি দেখিয়াছি- ১৯৭৫ সনের ১৫ ই আগস্টে। সকালের রেডিওতে ঘোষণা দিল, স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে খতম করা হইয়াছে। বাংলাদেশের জনগণের বুকের উপর জগদ্দল পাথরের মত চাপিয়াছিল, সেই শেখ মুজিবকে খতম করা হইয়াছে। মার্শাল ল জারী করা হইয়াছে। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছেন খন্দকার মুস্তাক আহম্মদ। আপনারা কেহ বাড়ির বাহির হইবেন না। পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত কেহই ঘরের বাহির হইবেন না।

৭॥. কোটি বাংগালীর প্রিয় নেতা মুজিবকে কে বা কাহারা হত্যা করিল? যাহারা হত্যা করিল তাহাদের নিকট শেখ মুজিব স্বৈরাচারী নেতা হইয়া গেল। 'স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়াছে- শুনিয়াই বুঝিতে পারিলাম শেখ মুজিবের জন্য প্রকাশ্যে শোক প্রকাশ করা যাইবে না।

শেখ মুজিবের নৃশংস হত্যাকান্ডের খবর শুনিয়া কিছু মানুষ আনন্দ উল্লাসে নৃত্য করিতে লাগিল। যাহারা মুজিবের অনুসারী ছিল, মুজিবকে যাহারা ভালবাসিত তাহারা শোকে দুঃখে মূহ্যমান হইয়া আত্মগোপন করিল।

আমার বয়স এখন সোয়া দুই কুড়ি বৎসর। সোয়া দুই কুড়ি বৎসরে পৃথিবীর বুকে কত কোটি মানুষের জন্ম হইয়াছে, কে তাহার হিসাব রাখে? কতকগুলি মৃত্যু মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করে। আমার জীবনেও, আমার হৃদয়ে কতকগুলি মৃত্যুর দৃশ্য আমার মনে রেখাপাত করিয়া আছে।

তাহা আমি এক একটি করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়াছি। আজ তাহারই একটি উল্লেখ করিতেছি।



ভাগ্নীর মৃত্যু:

সর্বপ্রথম আমার হৃদয়ের গভীরে যে মৃত্যুর ঘটনাটি রেখাপাত করিয়া আছে সেটা হইল, আমার ভগ্নীর মেয়ে অর্থাৎ আমার ভাগ্নীর মৃত্যু। আমার বয়স তখন, বৎসরের গণনায় ঠিক বলিতে পারিব না, তবে মানুষের বয়সের যে সময়ের কথা স্মরণ থাকে, আমার বয়স তখন তাহাই হইবে। অংকের হিসাবে বলিতে গেলে বোধ করি ৭/৮ বৎসর বয়স হইবে। আমার ভাগ্নির বয়স তখন অনুমান করি আড়াই কিম্বা তিন বৎসর বয়স হইবে। হাটিতে শিখিয়াছে। কথা বলিতে পারে। তাহার কথায় যেন দুনিয়ার সব মধুমাখা থাকে। সকালে খেলা করিতে করিতে জ্বর আসে। ডাক্তার ডাকিবার পুর্বেই দুপুরে প্রাণত্যাগ করে। পরে জানিতে পারিয়াছি এই জ্বরের নাম পারনিসাচ ম্যালেরিয়া। আমি তাহাকে কোলে করিয়া কত সোহাগ করিতাম, হৃদয়ের সমস্ত স্নেহ ভালোবাসা দিয়া আদর করিতাম। আমার চোখের সামনে তাহার প্রাণবায়ু বাহির হইয়া গেল। বুবু এবং বাড়ির সকলে ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। প্রতিবেশী লোকজন আসিয়া জড় হইল। সকলের চোখেই পানি। সেই করুণ দৃশ্যের কথা আজও আমার স্পষ্ট স্মরণ আছে। সেই দিনই প্রথম বুঝিতে পারিলাম, আমিও তো এমনিভাবে মরিয়া যাইতে পারি। আচ্ছা মানুষ মরে কেন?

তারপর হইতে যখনই জ্বরে আক্রান্ত হইয়াছি, তখনই স্মরণ হইত আমার সেই ভাগ্নিটার কথা। তারপর আমার দুই গন্ড বাহিয়া তপ্ত অশ্রু গড়াইয়া পড়িত।

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৩ ভোর ৬:১৯

মাহফুজটিপিডি বলেছেন: পাঠকবৃন্দ, লেখাটি সাধুরীতিতে রচিত।

২| ২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৩ ভোর ৬:১৯

খেয়া ঘাট বলেছেন: পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৩ ভোর ৬:২৫

মাহফুজটিপিডি বলেছেন: পুরানো সেই স্মৃতির কথা স্মরণ হলে আমারও মন খারাপ হয়। আপনার জীবনেও কি এমন কোন মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়?

৩| ২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৩ সকাল ৭:০৮

ব্যতীপাত বলেছেন: 'মৃত্যুকে আমি ভয় করিনা ।কারণ সে আমার কাছে আসতেই পারবে না । আর যখন সে আসবে , তখন তো আমিই থাকবো না-'
গ্রিক দার্শণিক ইপিকিউরাস

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.