নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মঞ্জুর চৌধুরী

আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ, আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’ পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ ফিং দিয়া দিই তিন দোল; আমি চপলা-চপল হিন্দোল। আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা, আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা! আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর; আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর! বল বীর - আমি চির উন্নত শির!

মঞ্জুর চৌধুরী › বিস্তারিত পোস্টঃ

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "বন্যা"

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৪৭

বন্যা
মঞ্জুর চৌধুরী



বন্যার তিন দিন পরেও মুনতাসির তার বাঁ পায়ের জুতাটি খুঁজে পায়নি।

জুতাটি নিয়ে অবশ্য তার কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। মানুষ যখন স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হারিয়ে ফেলে, তখন একটি জুতা হারানোর শোক করার মতো বিলাসিতা তার থাকে না। তবু ভোরবেলা ঘুম ভাঙলে। অবশ্য যদি নদীর গর্জন, হেলিকপ্টারের শব্দ আর মানুষের কান্নার মাঝখানে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকাকে ঘুম বলা যায়!
মুনতাসির প্রথমে নিজের খালি পায়ের দিকে তাকাত।

পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটি অর্ধেক উঠে গেছে। গোড়ালিতে শুকিয়ে কালো হয়ে থাকা রক্ত। কাদার ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের তলা কেটে গেছে অসংখ্য জায়গায়। সে এসব অনুভব করত না। শুধু অবাক হয়ে ভাবত, তার একটি পা এখনো জুতা পরে আছে, অন্যটি নেই।

যেন শরীরের অর্ধেক জানে সে বেঁচে আছে, বাকি অর্ধেক এখনো পরিবারের সঙ্গে নিখোঁজ।

অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রটি বানানো হয়েছে পাহাড়ের ওপর একটি স্কুলে। নিচের বাজার আর নেই। নদীর ধারে দাঁড়ানো দোতলা হোটেল, পাথরের দোকান, চায়ের স্টল, প্রার্থনার পতাকায় মোড়ানো ছোট্ট সেতু, সবকিছুর জায়গায় এখন কাদা, গাছের গুঁড়ি, ভাঙা টিন আর পাথরের এক বিশাল ধূসর সমতল।

দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়ের বুকের ওপর কেউ ভেজা সিমেন্ট ঢেলে দিয়েছে।

স্কুলের একটি ক্লাসরুমে পঁয়ত্রিশজন মানুষ গাদাগাদি করে থাকে। ব্ল্যাকবোর্ডে এখনো নেপালি হরফে আগের সপ্তাহের অঙ্ক লেখা

৭ × ৮ = ৫৬

তার নিচে কেউ সাদা চক দিয়ে নিখোঁজ মানুষের নাম লিখতে শুরু করেছে। নামের পাশে বয়স, পোশাক, শেষ কোথায় দেখা গেছে।

মুনতাসির প্রথম দিন তিনটি নাম লিখেছিল।

তাহমিনা রহমান, বয়স ৩৮। গায়ে সরিষা রঙের জ্যাকেট।

নাওয়াফ রহমান, বয়স ১১। নীল গেঞ্জি।

ইরা রহমান, বয়স ৭। লাল জুতা। সবুজ ফ্রক।

পরদিন এসে সে লেখাগুলো আবার গাঢ় করে দিয়েছে।

তার পরদিন দিন সকালে দেখল, বৃষ্টির পানি জানালা দিয়ে এসে বোর্ডের নিচের দিকটা ভিজিয়ে দিয়েছে। ইরার নামের শেষ অক্ষরটি গলে সাদা অশ্রুর মতো নিচে নেমে এসেছে।

মুনতাসির হাতের তালু দিয়ে অক্ষরটি মুছে আবার লিখল।

তারপর নিচে যোগ করল, ওরা একসঙ্গে আছে।

কেন লিখল, সে জানে না। হয়তো নিজেকেই বোঝানোর জন্য। হয়তো উদ্ধারকারীদের। কিংবা সেই নদীকে যে হঠাৎ দানব হয়ে সবকিছু গিলে খেয়েছে।



তারা নেপালে এসেছিল আট দিনের ছুটিতে।

তাহমিনা বলেছিল, “সারাজীবন কি শুধু ঢাকা শহরের জ্যাম দেখেই কাটিয়ে দিব? একটু পাহাড়, একটু সমুদ্র দেখার কি ইচ্ছা হতে পারেনা?”

ইরা সঙ্গে সঙ্গে মায়ের পক্ষ নিয়ে বলেছিল, “আমি পাহাড় দেখব। বরফও দেখব। ইয়াক দেখব।”

নাওয়াফ মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই বলেছিল, “ইয়াক দেখে কী হবে?”

ইরা বলেছিল, “তোমাকে দেখেও তো কিছু হয় না। তবু প্রতিদিন দেখি।”

সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল সেই মুহূর্তেই।

কাঠমান্ডুতে পৌঁছানোর পর ইরা প্রতিটি প্রার্থনার চাকা ঘুরিয়েছিল। বাঁদর দেখে চিৎকার করেছে, মোমো খেয়ে খিধা মিটিয়েছে এবং পাঁচ মিনিট পরপর জানতে চেয়েছে এভারেস্ট কোথায়। পাহাড়ের যে-কোনো বরফঢাকা চূড়া দেখলেই সে বলত, “ওইটা?”

মুনতাসির বলত, “না।”

“ওইটা?”

“সেটাও না।”

“তাহলে এভারেস্ট কোথায় আছে?”

সেই ভ্রমণের প্রতিটি ছবি এখন মুনতাসিরের ফোনে আছে।

একটি ছবিতে তাহমিনা হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বাতাসে চুল মুখের ওপর এসে পড়েছে। বিরক্ত চোখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছে, “আগে চুলটা সরাতে দাও।”

মুনতাসির ছবি তুলে ফেলেছিল আগেই।

আরেকটিতে নাওয়াফ পেছন ফিরে আছে। এই বয়সে ছেলেরা ক্যামেরায় মুখ দেখাতে লজ্জা পায়।

সবচেয়ে বেশি ছবি ইরার। পাথরের ওপর ইরা, সেতুর পাশে ইরা, মোমোর প্লেট হাতে ইরা। প্রতিটি ছবিতে তার লাল জুতা দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।

জুতাগুলো কাঠমান্ডু থেকে কেনা হয়েছিল। তাহমিনা বলেছিল, পাহাড়ি পথে ওগুলো সুবিধার হবে না। ইরা দোকানের মেঝেতেই জুতা দুটো পরে বসে পড়েছিল।

“আমি আর খুলব না।”

“ঘুমাবে কীভাবে?”

“জুতা পরে।”

“গোসল করবে?”

“পা ওপরে তুলে।”

দোকানি কিছু না বুঝেও হাসছিল। তাহমিনা শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়ে দাম দিয়েছিল।

বন্যার পর থেকে মুনতাসির পৃথিবীর প্রতিটি লাল জিনিসকে ইরার জুতা মনে করে ছুটে গেছে। ছেঁড়া ব্যাগ, বিস্কুটের প্যাকেট, প্লাস্টিকের মগ, প্রার্থনার পতাকা, এমনকি এক উদ্ধারকর্মীর গ্লাভস।

মানুষের আশা খুব বুদ্ধিমান কিছু নয়।

এক টুকরো লাল প্লাস্টিক দেখিয়েও তাকে পাহাড় নামিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।



বন্যাটি এসেছিল সকালে। ঠিক তার এক মিনিট আগে তাহমিনা তাকে ফোন করেছিল।

হোটেল থেকে বেরিয়ে তারা নদীর পাশের ঝুলন্ত সেতুর দিকে যাচ্ছিল। আকাশ মেঘলা ছিল। নাওয়াফ তার মায়ের সঙ্গে ছিল। ইরা প্রজাপতির পেছনে ছুটে একটু সামনে চলে গিয়েছিল। মুনতাসির হোটেলে ফিরে গিয়েছিল পাওয়ার ব্যাংক আনতে।

তাহমিনা ফোন করে বলল, “তুমি কোথায়?”

“রুমে।”

“আমরা ব্রিজের কাছে। তাড়াতাড়ি এসো।”

“দুই মিনিট।”

“আর আমার সানগ্লাসটা দেখো তো।”

এটিই ছিল তাদের শেষ স্বাভাবিক কথোপকথন।

শেষ কথা হিসেবে এটি বড়ই সামান্য। কোনো ভালোবাসার ঘোষণা নেই। কোনো ক্ষমাপ্রার্থনা নেই। ষোলো বছরের সংসারের কোনো সারাংশ নেই। শুধু একটি সানগ্লাস এবং তাড়াতাড়ি আসার তাগিদ।

পরে মুনতাসির বারবার ভেবেছে, মানুষ যদি জানত কোন কথাটি তার শেষ কথা, তাহলে পৃথিবীর ভাষা বদলে যেত। কেউ ফোন রেখে বলত না, “আচ্ছা, পরে কথা হবে।” কেউ রাগ করে দরজা বন্ধ করত না। কেউ ভালোবাসার মানুষকে বাজার থেকে ধনেপাতা আনতে বলেই বিদায় দিত না।

কিন্তু মানুষ জানে না। এই না-জানার ওপরই সম্ভবত সমস্ত সংসার দাঁড়িয়ে থাকে।

ফোন রাখার কয়েক সেকেন্ড পর মুনতাসির প্রথম শব্দটি শুনেছিল।

শব্দটি মেঘের গর্জনের মতো ছিল না। পাহাড়ধসের শব্দও নয়। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর নিচে বিশাল কোনো দরজা বহু শতাব্দী পর খুলে যাচ্ছে।

হোটেলের জানালার কাঁচ কেঁপে উঠল। তারপর মানুষ চিৎকার করতে শুরু করল।

মুনতাসির বারান্দায় এসে দেখল, উত্তরের পাহাড়ি বাঁকের দিক থেকে ধূসর-কালো একটি দেয়াল এগিয়ে আসছে। সেটিকে প্রথমে পানি বলে মনে হয়নি। পানির রং এমন হয় না। তার মধ্যে পাথর, গাছ, বরফ, ছাদের টিন, গাড়ি ইত্যাদি সবকিছু ঘুরছিল। কোনো কোনো পাথর একতলা বাড়ির সমান। স্রোতের সামনে বাতাস পর্যন্ত পালিয়ে আসছিল।

নদী তার দুই তীর ভুলে গেছে।

মুনতাসির সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল। কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করছিল, “উপরে! উপরে যাও!”

সে নিচে যাচ্ছিল।

কারণ নিচেই তার পৃথিবী ছিল।

হোটেলের দরজা থেকে বেরিয়ে সে এক ঝলক সেতুটি দেখতে পেল। মানুষের দল উঁচু রাস্তার দিকে ছুটছে। হলুদ জ্যাকেট পরা একজন বৃদ্ধ পড়ে গেলেন। নীল গেঞ্জি পরা একটি ছেলেকে কেউ হাত ধরে টানছে।

নাওয়াফ?

দূরত্বের কারনে মুখ দেখা যাচ্ছিল না।

আরেকটু সামনে সরিষা রঙের কিছু একটা।

“তাহমিনা!”

তার নিজের কণ্ঠ সে শুনতে পায়নি।

সেতুর নিচ দিয়ে প্রথম ঢেউটি আঘাত করল। লোহার তারগুলো একসঙ্গে টানটান হয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য সেতুটি বাতাসে ধনুকের মতো বাঁকা হলো। তারপর মাঝখান থেকে ছিঁড়ে গেল।

মানুষ, কাঠ, পতাকা সব একসঙ্গে অদৃশ্য।

মুনতাসির ছুটছিল। হঠাৎ হোটেলের পাশের পাথরের দেয়াল ভেঙে তার ওপর এসে পড়ল। কেউ পেছন থেকে তাকে টেনে একটি উঁচু সিঁড়ির দিকে ছুড়ে দিয়েছিল। কে, সে জানে না। পরে তাকে আর খুঁজেও পায়নি।

তারপর শুধু পানি। বরফশীতল, কাদাভরা, পাথরের আঘাতে উন্মত্ত পানি।

স্রোত তাকে উঠিয়ে হোটেলের দ্বিতীয় তলার জানালায় ছুড়ে মেরেছিল। লোহার গ্রিল ধরে সে ঝুলেছিল কতক্ষণ, মনে নেই। তার নিচ দিয়ে একটি সাদা মাইক্রোবাস ভেসে গিয়েছিল। ছাদের ওপর একজন মানুষ দুই হাত তুলে বসে ছিল। একটু পরে গাড়িটি পাথরে আঘাত করে উল্টে যায়।

মুনতাসির কেবল একটি নাম ধরে ডাকছিল।

কিন্তু কোন নাম?

তাহমিনা?

নাওয়াফ?

ইরা?

স্মৃতির ভেতর তিনটি নাম এখন একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। যেন একই মানুষের তিনটি আলাদা ডাকনাম।



পরদিন মুনতাসির উদ্ধারকারীদের সঙ্গে নিচে যাওয়ার অনুমতি পেল।

একজন নেপালি সেনাসদস্য তার হাতে বাঁশের লাঠি দিয়ে ভাঙা ইংরেজিতে বলল, “শুধু আমাদের পেছনে থাকবেন। একা কোথাও যাবেন না।”

মুনতাসির মাথা নাড়ল।

তারপর সুযোগ পেয়েই একা চলে গেল।

যেখানে সেতুটি ছিল, সেখানে নদী এখন দ্বিগুণ চওড়া। তীর বলতে কিছু নেই। কাদার ওপর ছড়িয়ে আছে মানুষের জীবনের ভাঙা ব্যাকরণ। একটি শিশুর মোজা, চাপা পড়া স্যুটকেস, ভাঙা গিটার, রান্নার হাঁড়ি, চশমার ফ্রেম, একটি পাসপোর্টের ভেজা পাতা।

প্রতিটি জিনিস দেখে মনে হয়, এর মালিক একটু আগেই এখানে ছিল। এখনই এসে বলবে, ওটা আমার।

মুনতাসির একটি উল্টে থাকা টেবিলের নিচে সরিষা রঙের কাপড় দেখতে পেল।

সে হাত দিয়ে কাদা খুঁড়তে শুরু করল।

নখের নিচে পাথর ঢুকে রক্ত বেরোল। কাপড়টি আটকে আছে। সে আরও জোরে টানল। বুকের ভেতর একটি নাম এমনভাবে ধাক্কা দিচ্ছিল যে শ্বাস নিতে পারছিল না।

শেষে কাপড়টি বেরিয়ে এল।

একটি হোটেলের পর্দা।

মুনতাসির পর্দাটি বুকে চেপে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর এমনভাবে হাসতে শুরু করল, যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ কৌতুকটি এইমাত্র বুঝেছে। হাসতে হাসতেই তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। পাশে দাঁড়ানো সেনাসদস্যটি মুখ ফিরিয়ে নিল।

দুপুরের দিকে মুনতাসির নদীর নিচের অংশে একটি লাল জুতা পেল।

জুতাটি অর্ধেক কাদায় ঢুকে ছিল। ছোট। ডান পায়ের।

সে প্রথমে কাছে যেতে পারেনি।

প্রায় দশ মিনিট দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, জুতাটির নিচে ইরার পা থাকবে। সেই পায়ের ওপরে নীল প্যান্ট। তারপর সবুজ ফ্রক। তারপর ভেজা বেণি।

সে হাঁটু গেড়ে বসে জুতাটি তুলল।

ভেতরে কাদা আর ছোট ছোট পাথর। পা নেই।

মুনতাসির জুতাটি উল্টে দেখে ব্র্যান্ডের নাম পড়ার চেষ্টা করল। ইরার জুতার পাশে একটি সাদা বিড়ালের ছবি ছিল। এটিতেও কি আছে?

কাদা পরিষ্কার করতে গিয়ে তার হাত কাঁপছিল।

ছবিটি বেরিয়ে এল।

সাদা বিড়াল।

পৃথিবী সেই মুহূর্তে শব্দহীন হয়ে পড়ে। নদীর গর্জন ছিল, হেলিকপ্টার উড়ছিল, মানুষ ডাকছিল, তবু মুনতাসিরের কাছে সব নিঃশব্দ হয়ে গেল।

সে জুতাটি নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকল।

কাদা। পচা পাতা। নদী।

ইরার গায়ে সবসময় বেবি শ্যাম্পুর গন্ধ থাকত। সাত বছর বয়স হয়ে গেলেও তাহমিনা তার জন্য স্ট্রবেরি-গন্ধের শ্যাম্পু কিনত। মুনতাসির বলত, “মেয়ের মাথায় ফলের সালাদ বানাচ্ছ কেন?”

ইরা বলত, “আমার চুল। তোমার নাক বন্ধ রাখো।”

সে জুতাটি বুকে চেপে ধরল।

তারপর প্রথমবার উচ্চস্বরে কাঁদল।

“মা রে, তুই জুতাটা খুলে কোথায় গেলি?”

প্রশ্নটির কোনো অর্থ ছিল না। কিন্তু গভীর শোকে মানুষ অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি করতে পারে না।

“জুতা ছাড়া পাথরে হাঁটিস না, মা। পায়ে ব্যথা পাবি।”



বিকেলে জানা গেল, জুতাটি ইরার নয়।

এক নেপালি নারী ছুটে এসে সেটি দেখে কেঁদে উঠেছিলেন। তাঁর আট বছরের মেয়েরও একই জুতা ছিল। মেয়েটিও নিখোঁজ।

নারীর নাম মায়া তামাং। তিনি জুতাটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন। তারপর ভেতরের দিকে আঙুল দেখালেন। নেপালি ভাষায় কিছু বললেন।

একজন উদ্ধারকর্মী অনুবাদ করল, “তার মেয়ের নাম ভেতরে লেখা ছিল। লেখা নেই। তাই এটাও তার মেয়ের নয়।”

দুজন মানুষ একটি লাল জুতার সামনে বসে রইল। দুজনেরই মেয়ে নিখোঁজ। অথচ দুজনই চাইছে জুতাটি যেন তার নিজের মেয়ের না হয়।

এর চেয়ে নিষ্ঠুর প্রার্থনা পৃথিবীতে আর কী হতে পারে?

মায়া জুতাটি মুনতাসিরের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। মুনতাসির মাথা নাড়ল। শেষে তারা জুতাটি স্কুলে নিয়ে এসে নিখোঁজ জিনিসপত্রের টেবিলে রেখে দিল।

রাতে মায়া তাকে এক কাপ নোনতা চা দিলেন।

মুনতাসির বলল, “আপনার মেয়ের নাম কী?”

“পেমা।”

“পেমা ফিরে আসবে।”

মায়া তার চোখের দিকে তাকালেন। তারপর শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কীভাবে জানেন?”

মুনতাসির উত্তর দিতে পারল না।

মায়া বললেন, “সবাই একই কথা বলে। এমনভাবে বলে যেন তারাই ভগবান!”

কিছুক্ষণ পর তিনি নিজের কম্বল থেকে অর্ধেকটা মুনতাসিরকে দিলেন।

বিপদ মানুষকে কত কাছাকাছি নিয়ে আসে!



বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা স্যাটেলাইট ফোনে মুনতাসিরের সঙ্গে কথা বললেন। ঢাকায় তাহমিনার ছোট ভাই অপেক্ষা করছে। খবর ছড়িয়ে পড়েছে। টেলিভিশনে তাদের চারজনের ছবি দেখানো হচ্ছে।

কর্মকর্তা সাবধানে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি নিশ্চিত যে ঘটনার সময় তারা তিনজন একসঙ্গে ছিল?”

“হ্যাঁ।”

“আপনি নিজের চোখে দেখেছেন?”

মুনতাসির থেমে গেল।

সে আসলে নিশ্চিত নয়।

নীল গেঞ্জিটি নাওয়াফের হতে পারে, আবার অন্য কারও। সরিষা রঙের জ্যাকেটটি তাহমিনার। কিন্তু স্রোত আসার মুহূর্তে ইরা কোথায় ছিল?

প্রজাপতির পেছনে সামনে গিয়েছিল।

কতটা সামনে?

ব্রিজ পেরিয়েছিল?

নাকি মায়ের কাছে ফিরে এসেছিল?

মুনতাসির বলল, “ওরা একসঙ্গে ছিল।”

কথাটি সে তথ্য হিসেবে নয়, প্রার্থনা হিসেবে বলল। মৃত্যু যদি এসেও থাকে, অন্তত কেউ যেন একা না থাকে।

ঢাকা থেকে তার মা ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তুই দেশে ফিরে আয়, বাবা।”

“ওদের নিয়ে ফিরব।”

“তুই আগে আয়। তারপর লোক পাঠিয়ে....”

মুনতাসির ফোন কেটে দিল।

রাতে সে প্রথমবার তাহমিনার শেষ ভয়েস মেসেজটি শুনল। সেটি বন্যার বারো মিনিট আগে পাঠানো।

পাহাড়ি বাতাসের শব্দের মধ্যে তাহমিনা বলছে, “পাওয়ার ব্যাংকের সঙ্গে আমার চশমাটা আনতে ভুলো না। আর শোনো, ইরা আবার সামনে দৌড়াচ্ছে। এসে তোমার মেয়েকে সামলাও। সব দায়িত্ব আমার একার না।”

পেছন থেকে ইরার কণ্ঠ “আমি দৌড়াচ্ছি না! প্রজাপতিটাই পালাচ্ছে!”

তারপর নাওয়াফের বিরক্ত গলা “মা, তুমি কি ফোনটা রাখবে?”

মেসেজটি এগারো সেকেন্ডের।

মুনতাসির সারারাত এগারো সেকেন্ডের মধ্যে বাস করল।

বারবার শুনল। একসময় তার মনে হলো, তাহমিনার শেষ কথার পেছনে আরও একটি শব্দ আছে। খুব ক্ষীণ। যেন দূর থেকে কেউ ঘণ্টা বাজিয়েছে। অথবা কোনো গাড়ির হর্ন।

সে হেডফোন লাগিয়ে শুনল।

একবার। দশবার। পঞ্চাশবার।

ভয়েস মেসেজের শেষ মুহূর্তে ইরা যেন কিছু বলছে।

“বাবা”

নাকি বাতাস?

মুনতাসির ফোন বুকে চেপে ফিসফিস করে বলল, “আমি আসছি, মা।”



সকালে একজন স্থানীয় রাখাল খবর নিয়ে এল।

মূল রাস্তা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার নিচে, পুরোনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি পরিত্যক্ত সুড়ঙ্গ আছে। বন্যার দিন কিছু মানুষকে সেদিকে ছুটতে দেখা গিয়েছিল। সুড়ঙ্গের মুখ ধসে বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু রাতের বেলা ভেতর থেকে শব্দ শোনা গেছে বলে পাহাড়ের ওপরের এক পরিবার দাবি করেছে।

উদ্ধারকারীরা প্রথমে বিশ্বাস করেনি।

ধসে পড়া পাহাড়ে শব্দ হয়। পাথর বসে যায়, আটকে থাকা পানি পথ খোঁজে, গাছের শিকড় ছিঁড়ে যায়। বিপর্যয়ের পরে পৃথিবী নিজেই মানুষের মতো গোঙায়।

তবু একটি দল পাঠানো হলো।

মুনতাসির তাদের গাড়ির পেছনে উঠে বসেছিল। কেউ তাকে নামাতে পারেনি।

পথের অর্ধেক গাড়িতে, বাকিটা হাঁটতে হলো। পাহাড়ের গা কেটে তৈরি সরু পথে এক পাশে খাড়া দেয়াল, অন্য পাশে অনেক নিচে ত্রিশূলী নদী। আকাশে আবার কালো মেঘ জমেছে। উদ্ধারকারীদের রেডিওতে বারবার সতর্কবার্তা আসছে উজানে তৈরি অস্থায়ী হ্রদের পানি বাড়ছে। আবার ঢল নামতে পারে।

সুড়ঙ্গের মুখ দেখে মনে হলো, পাহাড় নিজেই ঠোঁট বন্ধ করে দিয়েছে।

বড় বড় পাথরের ফাঁক সিমেন্টের ধ্বংসাবশেষে আটকানো। পাশে একটি ভাঙা সাইনবোর্ড। কাদার ওপর ছড়ানো কয়েকটি খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, ছেঁড়া কাপড়।

মুনতাসির প্রথম বোতলটি তুলে দেখল। সাধারণ নেপালি ব্র্যান্ড।

দ্বিতীয়টি।

তৃতীয় বোতলের গায়ে কালো মার্কার দিয়ে লেখা "N.R."

নাওয়াফ নিজের জিনিসে নামের আদ্যক্ষর লিখত। স্কুলে তার পানির বোতল বহুবার বদলে গিয়েছিল বলে তাহমিনা এই অভ্যাস করিয়েছিল।

মুনতাসির চিৎকার করে উঠল, “এটা আমার ছেলের!”

উদ্ধারকারী বোতলটি হাতে নিয়ে বলল, “এখানে অন্য কারওও হতে পারে।”

“না। ওর হাতের লেখা। এই R-টা দেখুন। নিচের দিকটা বাঁকা করে লেখে।”

মুনতাসির বোতলটি চুমু খেল। কাদার স্বাদ জিভে লেগে রইল।

সুড়ঙ্গের মুখ থেকে পাথর সরানো শুরু হলো। যন্ত্র আনার রাস্তা নেই। সেনাসদস্য, পুলিশ, স্থানীয় মানুষ সবাই হাত, শাবল আর লোহার রড দিয়ে কাজ করছে।

দুই ঘণ্টা পর একটি ছোট ফাঁক তৈরি হলো।

ভেতর থেকে পচা বাতাস বেরিয়ে এল।

একজন উদ্ধারকর্মী ফাঁকের কাছে মুখ নিয়ে ডাকল, “কেউ আছেন?”

কোনো উত্তর নেই।

আবার ডাকল।

পাহাড় নীরব।

মুনতাসির হাঁটু গেড়ে ফাঁকের সামনে বসল। ফোন থেকে তাহমিনার ভয়েস মেসেজটি চালিয়ে দিল।

“ইরা আবার সামনে দৌড়াচ্ছে। এসে তোমার মেয়েকে সামলাও…”

ইরার কণ্ঠ ভেসে এল “আমি দৌড়াচ্ছি না! প্রজাপতিটাই পালাচ্ছে!”

মেসেজ শেষ হলো।

সুড়ঙ্গের ভেতর অন্ধকার। এত ঘন অন্ধকার যে মনে হয়, আলো সেখানে ঢুকলে আর ফিরে আসবে না।

মুনতাসির ডাকল, “ইরা!”

কিছু নেই।

“নাওয়াফ!”

দূরে নদী গর্জে উঠল।

“তাহমিনা!”

রেডিওতে হঠাৎ উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা গেল। উজানের পানি দ্রুত বাড়ছে। সবাইকে পনেরো মিনিটের মধ্যে এলাকা ছাড়তে হবে।

দলের নেতা বললেন, “কাজ বন্ধ করুন। এখনই ওপরে উঠতে হবে।”

মুনতাসির নড়ল না।

“স্যার, আমাদের যেতে হবে।”

“আমার পরিবার ভেতরে আছে।”

“আমরা নিশ্চিত নই।”

“আমি নিশ্চিত।”

লোকটি তার বাহু ধরতে গেলে মুনতাসির এমনভাবে ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দিল, যেন তার শরীরে ছয় দিনের সমস্ত অসহায়তা হঠাৎ শক্তি হয়ে ফিরে এসেছে।

“আপনার পরিবার ভেতরে থাকলে আপনি যেতেন?”

প্রশ্নটি শোনার পর উদ্ধারকর্মীটির মুখ বদলে গেল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার পাথর সরাতে শুরু করলেন।

আরও কয়েকজন ফিরে এল।

আকাশ থেকে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। নদীর রং গাঢ় হয়ে উঠেছে। দূরের পাহাড়ে মেঘের ভেতর বজ্রপাত হলো।

তারা পাথর সরাচ্ছে।

এক মিনিট।

দুই মিনিট।

পাঁচ মিনিট।

ফাঁকটি একটু বড় হলো। একজন ভেতরে আলো ফেলল। শুধু ভাঙা কংক্রিট আর পানি দেখা গেল।

দলের নেতার রেডিও চিৎকার করছে, “এখনই সরে যান! দ্বিতীয় ঢল আসছে!”

পাহাড়ের ওপর থেকে কেউ দৌড়ে এসে বলল, নদী ফুলে উঠেছে।

সবাই যখন মুনতাসিরকে জোর করে টেনে সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখন সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে শব্দটি এল।

ঠক।

সবাই থেমে গেল।

মুনতাসির নিশ্বাস বন্ধ করে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।

আবার

ঠক। ঠক।

তিনবার।

কেউ পাথরে আঘাত করছে।

দলের নেতা ফাঁকের কাছে ঝুঁকে চিৎকার করলেন, “ভেতরে কেউ আছেন? আবার শব্দ করুন!”

কয়েক সেকেন্ড কিছু শোনা গেল না।

তারপর

ঠক। ঠক। ঠক।

মুনতাসির মাটিতে পড়ে গিয়ে দুই হাত দিয়ে পাথর খুঁড়তে শুরু করল।

“ওরা আছে! ওরা আছে!”

উদ্ধারকারীরা তাকে সরিয়ে লোহার রড ঢোকাল। সবাই একসঙ্গে চাপ দিল। একটি বড় পাথর সামান্য নড়ে আবার আটকে গেল।

নদীর গর্জন হঠাৎ বেড়ে উঠল।

পাহাড়ের বাঁক ঘুরে ধূসর পানির প্রথম মাথাটি দেখা যাচ্ছে।

“আবার আসছে!” কেউ চিৎকার করল।

সেই মুহূর্তে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

মানুষের কণ্ঠ।

শিশুর মতো।

“বা…বা…”

মুনতাসিরের হাত থেমে গেল।

ইরা তাকে ‘বাবা’ ডাকত।

কিন্তু পেমাও তার বাবাকে কী বলে ডাকত, মুনতাসির জানে না। নিখোঁজ শিশুদের ভাষায় ‘বাবা’ শব্দটি হয়তো একই রকম শোনায়। কিংবা সেটি কোনো শিশুর কণ্ঠই নয়, হয়তো পাথরের ফাঁকে বাতাস ঢুকছে।

আবার শব্দ এল

“বাবা…”

এবার একটু স্পষ্ট।

তারপর অন্ধকারের ভেতর একটি আলো জ্বলে উঠল।

অতি ক্ষীণ। সম্ভবত মোবাইল ফোনের আলো। আলোটি একবার ডানে, একবার বাঁয়ে নড়ল। তার সামনে কয়েকটি অবয়ব দেখা গেল কি?

একটি?

দুটি?

তিনটি?

মুনতাসির চোখের পানি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে তাকাল।

আলোটির নিচে যেন সরিষা রঙের কিছু আছে।

তার পাশে নীল।

আর মাটির খুব কাছে এক বিন্দু লাল।

মুনতাসির চিৎকার করল, “তাহমিনা!”

ভেতর থেকে একই সঙ্গে কয়েকটি কণ্ঠ উঠল। শব্দগুলো পাথর আর নদীর গর্জনে ভেঙে গেল। শুধু শেষের অংশটি শোনা গেল,

“…আসো!”

উদ্ধারকারীরা পাথরে শেষবারের মতো চাপ দিল।

পাথরটি নড়ে উঠল।

ঠিক তখন পাহাড় কেঁপে উঠল।

দলের নেতা চিৎকার করে সবাইকে মাটিতে শুয়ে পড়তে বললেন। সুড়ঙ্গের ওপর থেকে কাদা ও ছোট পাথর ঝরতে লাগল। নদীর দ্বিতীয় ঢেউ বাঁক পেরিয়ে ছুটে আসছে। আগের চেয়েও কালো, আগের চেয়েও উঁচু।

কেউ মুনতাসিরের কোমরে দড়ি বেঁধে টানছিল।

সে এক হাতে পাথরের ফাঁক আঁকড়ে রেখেছে। অন্য হাতটি অন্ধকারের ভেতর বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভেতর থেকেও একটি হাত এগিয়ে এল।

ছোট একটি হাত।

কাদায় ঢাকা পাঁচটি আঙুল।

মুনতাসির ঝুঁকে আরও সামনে গেল। তার আঙুলের ডগা সেই হাতের আঙুল ছুঁয়ে ফেলল কি না ঠিক বোঝা গেল না।

কারণ সেই মুহূর্তে আকাশ, পাহাড় ও নদী একসঙ্গে গর্জে উঠল।

আলোটি নিভে গেল।

চারদিকে শুধু পানি আর মানুষের চিৎকার।

তারপর সমস্ত শব্দের ভেতর দিয়ে মুনতাসির খুব স্পষ্টভাবে শুনতে পেল, কেউ একজন তাকে ডাকছে

“বাবা!”

কণ্ঠটি ইরার।

অথবা পৃথিবীর সমস্ত হারিয়ে যাওয়া শিশুর।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.