| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মঞ্জুর চৌধুরী
আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ, আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’ পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ ফিং দিয়া দিই তিন দোল; আমি চপলা-চপল হিন্দোল। আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা, আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা! আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর; আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর! বল বীর - আমি চির উন্নত শির!
একাউন্ট্যান্ট
মঞ্জুর চৌধুরী
রফিকুল ইসলামের জীবনে সবচেয়ে বিলাসী জিনিসটি ছিল একটি কাঠের আলমারি।
আলমারিটা নতুন নয়। মিরপুর এগারোর যে দুই কামরার বাসায় সে আর শায়লা থাকত, তাদের বিয়েরও আগে থেকে বাড়িওয়ালার স্টোররুমে পড়ে ছিল। এক পাশের পাল্লা ঠিকমতো লাগত না, ভেতরে পুরোনো ন্যাপথলিন আর স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ। রফিক বাড়িওয়ালাকে বলেছিল, “ফেলে দিলে আমাকে দিয়েন।”
বাড়িওয়ালা অবাক হয়ে বলেছিলেন, “এইটা দিয়া কী করবেন?”
রফিক হেসে উত্তর দিয়েছিল, “আমি কাজ চালায় নিব।”
বাড়িওয়ালা কথাটাকে রসিকতা ভেবে হেসেছিলেন। রফিকও হেসেছিল। অথচ সে সত্যিই আলমারিটার পূর্ণ ব্যবহার করতো। প্রথম তাকে জামাকাপড়, দ্বিতীয় তাকে পুরানো বইপত্র এবং তৃতীয় তাকটিতে স্বপ্ন রাখত।
সেখানে একটি নীল রঙের বাক্স ছিল। বাক্সের গায়ে শায়লার হাতের লেখা "কক্সবাজার।"
আরেকটি ছোট বাক্সে লেখা "ফ্রিজ।"
তার পাশে আরও একটি "আমাদের বাবু।"
প্রথম বাক্সটিতে একসময় ছয় হাজার তিনশ টাকা জমেছিল। দ্বিতীয়টিতে চার হাজার। তৃতীয়টিতে কোনোদিন টাকা রাখা হয়নি। শুধু শায়লা এক বিকেলে লজ্জায় লাল হয়ে বাক্সটা বানিয়ে বলেছিল, “আমাদের বাবু হলে ওর জন্য আগে থেকেই জমাতে হবে।”
রফিক বাক্সটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, “হবে।”
শায়লা বলেছিল, “কী হবে?”
“বাবুও হবে, একদিন টাকাও হবে।”
“তুমি এমন নিশ্চিত হয়ে বলছ কীভাবে?”
রফিক তার স্বভাবসিদ্ধ গম্ভীর মুখে বলেছিল, “আমি তো অফিসে হিসাবপত্র দেখি। একাউন্ট্যান্টরা ভবিষ্যৎ জানে।”
তখন দুজনেই হেসেছিল।
বিয়ের প্রথম দিকে তারা খুব হাসত। তখনো তারা জানত না যে গরিব মানুষের সংসারে হাসিও একধরনের অগ্রিম ঋণ, আজ বেশি হাসলে ভবিষ্যৎ কোনো একদিন তার কিস্তি কেটে রাখে।
রফিকের বয়স যখন বিয়াল্লিশ, তখন তাকে দেখলে পঞ্চাশের কম মনে হতো না। মাথার সামনের চুল উঠে গেছে, চোখের নিচে কালি, দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে এমন একটা কুঁজো ভাব যেন অদৃশ্য কেউ তার দুই কাঁধে দুটো চালের ভারী বস্তা তুলে দিয়েছে।
সে একটি ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগে চাকরি করত। পদটির নাম ছিল "সিনিয়র অ্যাকাউন্টস এক্সিকিউটিভ।"
ভারিক্কি নাম। শুনলে মনে হতো, অফিসে তার আলাদা কেবিন আছে, কাচের টেবিল আছে, অধস্তন কর্মীরা ফাইল নিয়ে তার স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকে। বাস্তবে তার বসার জায়গা ছিল অফিসের এক কোণে, বাথরুমের পাশে। লোকজনের যাতায়াতের ভিড়েই ওকে ওর কাজ করতে হতো।
বেতন খুব বেশি ছিল না। তবে দায়িত্বের তুলনায় কোনো বেতনই কি কখনো বেশি হয়?
বাবা আজিজুল হক সিলেটের একটি হাইস্কুলে কেরানির চাকরি করতেন। অবসর নিয়েছেন। সামান্য কিছু টাকা পেনশন পান। মা সালেহা বেগম কোনোদিন চাকরি করেননি, কিন্তু সারাজীবন এমন একটি সংসার চালিয়েছেন যার আয় সবসময় ব্যয়ের চেয়ে ছোট ছিল। এই কাজের কোনো বেতন নেই, অবসর নেই, পেনশনও নেই।
রফিকের ছোট দুই বোন, শিউলি আর বকুল। ছোট বলতে বয়সে তার চেয়ে ছোট। শিউলির বয়স পঁয়ত্রিশ, বকুলের বত্রিশ। লোকের চোখে তারা কোনকালেই সুন্দরী ছিল না।
সন্তানের ত্বক যেটুকু কালো হলে বাংলাদেশের মা বাবারা "উজ্জ্বল শ্যামলা" বলে চালানোর চেষ্টা করেন, শিউলি এবং বকুলের গায়ের রং তার চেয়েও দুয়েক মাত্রা বেশি কালো ছিল। রফিকের বাবা আজিজুল হক কৃষ্ণবর্ণের মানুষ ছিলেন। মেয়েরা তাদের বাবার ত্বক পেয়েছে। এবং কে না জানে, বাংলাদেশে গায়ের বর্ণই সৌন্দর্য্যের শেষ কথা!
অথচ শিউলি খুব সুন্দর নকশিকাঁথা সেলাই করত; কাপড়ে পাখি তুললে মনে হতো, একটু পরেই ডানা ঝাপটে উড়ে যাবে।
আর বকুল এমনভাবে লোকের সাথে মিশতে পারত যে সদ্য স্বজনকে কবর দিয়ে আসা লোকটির মনও হালকা হয়ে যেত।
কিন্তু পাত্রী দেখতে আসা লোকেরা কাপড়ের পাখি দেখত না, হাসির শব্দও শুনত না। তারা গায়ের রং দেখত। তারপর চা-শিঙাড়া খেয়ে চলে যেত।
কেউ কেউ যাওয়ার আগে যৌতুকের হিসাব জানিয়ে যেত।
একবার এক পাত্রের বাবা শিউলিকে দেখে বলেছিলেন, “মেয়ের চেহারায় একটু সমস্যা আছে। তবে নগদ চার লাখ আর একটা মোটরসাইকেল দিলে ছেলেকে রাজি করানো যাবে।”
পাশের ঘর থেকে রফিক কথাটা শুনেছিল। তার ইচ্ছে হয়েছিল লোকটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিতে। কিন্তু মা তার হাত চেপে ধরেছিলেন।
অতিথিরা চলে যাওয়ার পর শিউলি রান্নাঘরে প্লেট ধুচ্ছিল। রফিক বলেছিল, “তুই প্লেট ধুচ্ছিস কেন? রেখে দে। আমি ওই লোকের খাওয়া প্লেট ডাস্টবিনে ফেলে দিব!”
শিউলি মাথা নিচু রেখেই হেসেছিল, “প্লেট কী দোষ করেছে?”
“দোষ করেছে। ঐ কুত্তাটা এই প্লেটে মুখ দিয়েছে।”
বকুল এসে বলল "প্লেটটা রেখে দাও। আবার এলে এই প্লেটেই দেয়া যাবে। শুধু শুধু নতুন প্লেট নষ্ট করার মানে কি?"
রফিক হেসেছিল। শিউলিও হেসেছিল। শুধু কলের পানির সঙ্গে তার চোখের পানি মিশে যাওয়ায় কেউ আলাদা করে কিছু বুঝতে পারেনি।
রফিকের বয়স ত্রিশ পেরোনোর পর থেকেই আত্মীয়রা তাকে বিয়ে করার কথা বলত। সে প্রতিবার একই উত্তর দিত, “আগে বোন দুটির একটা ব্যবস্থা হোক।”
ব্যবস্থা হয়নি।
সময় মানুষের অনুমতি নিয়ে এগোয় না। বোনদের চুলে পাক ধরেছে, বাবার চোখে ছানি পড়েছে, মায়ের হাঁটুতে ব্যথা হয়েছে। রফিকের নিজের যৌবনও মাসের বেতনের মতো কখন এসে কখন খরচ হয়ে গেছে, সে বুঝতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত ঊনচল্লিশ বছর বয়সে সে শায়লাকে বিয়ে করে।
শায়লার বয়স তখন চৌত্রিশ। তার বাবা মারা গেছেন। একটি কিন্ডারগার্টেনে পড়াত। বিয়ের আগে রফিক তাকে সব খুলে বলেছিল।
“আমার বেতন খুব বেশি না। প্রতি মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। দুই বোনের বিয়ে হয়নি। বাবার ওষুধ আছে। মায়ের ডাক্তার আছে। তোমাকে হয়তো খুব আরামে রাখতে পারব না।”
শায়লা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করেছিল, “খেতে দেবেন?”
“সেটা দেব।”
“মাঝেমধ্যে রিকশায় ঘুরতে নিয়ে যাবেন?”
রফিক একটু ভেবে বলেছিল, “মাঝেমধ্যে বলতে যদি বছরে দুই-তিনবার বোঝাও, তাহলে পারব।”
শায়লা সেই রসিকতায় হেসে ফেলেছিল।
তার হাসিটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু রফিকের মনে হয়েছিল, এই হাসির সঙ্গে সংসার করা যায়।
তাদের বিয়েতে কোনো আলোকসজ্জা হয়নি। কমিউনিটি সেন্টার হয়নি। বাড়ির উঠানে বাঁশ পুঁতে ত্রিপল টাঙানো হয়েছিল। বৃষ্টি এলে ত্রিপলের এক জায়গায় পানি জমে ফুলে উঠেছিল। বকুল নিচ থেকে ঝাড়ু দিয়ে ধাক্কা দিতেই পুরো পানি গিয়ে পড়েছিল পাড়ার মোতালেব চাচার মাথায়।
মোতালেব চাচা ভিজে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আসার আগে গোসল করে এসেছিলাম। এইভাবে গোসল হয়ে যাবে জানলে করতাম না।”
সবাই হেসেছিল। সবচেয়ে বেশি হেসেছিলেন মা।
রফিক পরে বহুবার সেই দিনের কথা ভেবেছে। মানুষের জীবনে কিছু দৃশ্য থাকে, ঘটে যাওয়ার সময় বোঝা যায় না সেগুলোই একদিন সবচেয়ে দামি সম্পদ হয়ে উঠবে। মায়ের সেই প্রাণখোলা হাসির জন্য পরে রফিক তার সঞ্চয়ের সমস্ত টাকা দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু জীবন পুরোনো মুহূর্ত বিক্রি করে না।
ঢাকায় তাদের সংসার শুরু হয়েছিল দুটি হাঁড়ি, চারটি প্লেট, ধার করা একটি খাট আর সেই ভাঙা আলমারি দিয়ে।
শায়লার ছোট ছোট শখ ছিল।
বারান্দায় টবে মরিচগাছ লাগাবে। শীতকালে দুজনে কক্সবাজার যাবে। একটা ছোট ফ্রিজ কিনবে, যাতে প্রতিদিন বাজার করতে না হয়। ঈদের দিন রফিক সাদা পাঞ্জাবি পরবে আর সে নীল শাড়ি।
রফিক প্রতিটি কথাতেই বলত, “হবে।”
কিন্তু মাসের প্রথম সপ্তাহেই সিলেট থেকে ফোন আসত।
“বাবার চশমাটা বদলাতে হবে।”
“বকুলের দাঁতে খুব ব্যথা। ডাক্তার দেখাতে হবে।”
“চাল ডাল কিনতে হবে। সবজির বাজারে আগুন, তাই এইবার একটু বেশি টাকা পাঠাতে হবে।”
“শিউলির জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে, পাত্রপক্ষকে দাওয়াত করে খাওয়াতে হবে।”
রফিক মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠাত। তারপর বাজারের তালিকা থেকে এক এক করে মাছ, মাংস, দুধ কেটে দিত। কখনো কক্সবাজারের বাক্স খুলত, কখনো ফ্রিজের।
শায়লা কিছু বলত না।
শুধু এক রাতে আলমারির তৃতীয় তাক গোছাতে গিয়ে বলেছিল, “আমাদের কক্সবাজার মনে হয় একটু একটু করে সিলেটে চলে যাচ্ছে।”
রফিক লজ্জিত গলায় বলেছিল, “তুমি কষ্ট পাচ্ছ?”
“পাচ্ছি তো।”
রফিক মাথা নিচু করেছিল।
শায়লা তার পাশে বসে বলেছিল, “কক্সবাজার যেতে না পারার জন্য না। তুমি আমাকে কষ্ট পাচ্ছ কি না জিজ্ঞেস করো, এই জন্য।”
“বুঝলাম না।”
“তুমি এমনভাবে সংসার চালাও, যেন আমি তোমার পর। যেন তুমি একাই সব কষ্টের মালিক। আমার ভাগের কষ্টটাও তুমি আমাকে দিতে চাও না।”
সেদিন রফিক প্রথম বুঝেছিল, ভালোবাসা মানে নিজের সুখের পাশাপাশি দুঃখেও তাকে অধিকার দেওয়া।
তবু অভ্যাস বদলায়নি।
প্রতি মাসে টাকা যায়। পাত্রপক্ষ মেয়ে দেখতে এসে চা মিষ্টি সিঙ্গারা খেয়ে যায়, কিন্তু মেয়েটিকে গ্রহণ করেনা।
এর মধ্যে বিয়ের তিন বছর পেরিয়ে যায়। বাড়িতে বাবু আসে না।
শায়লা মাঝে মাঝে খুব শান্ত গলায় ডাক্তার দেখানোর তুললে রফিক বলে, “আর কিছুদিন পরে।”
"আর কিছুদিন পরে" কথাটি গরিব মানুষের সবচেয়ে বড় মিথ্যা। তারা জানে না সেই পরে কবে আসবে, তবু আজকের মনটাকে শান্ত রাখার জন্য কথাটি বলে।
শায়লা নিজের মনকে বুঝানোর চেষ্টা করে।
রফিকের সেই সুযোগ নেই। সে শুধু হিসাব করে।
অফিসের হিসাব।
সংসারের হিসাব।
জীবনের হিসাব।
©somewhere in net ltd.